অনুভূতি ! পর্ব_১০

অনুভূতি
পর্ব -১০
মিশু মনি

অনুভূতি সকল পর্ব 

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

৩১.
বিয়ের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ। মেঘালয় দরজায় গিয়ে মিশুকে ডাকলো।
মিশু দরজা খুলতেই দারুণ ভাবে চমকে গেলো মেঘালয়। লাল শাড়ি,ঘোমটা, আর পুরো কনের সাজে মিশুকে স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো পরি মনে হচ্ছে। মিশু যে এত সুন্দর সেটা আজকের সাজে না দেখলে ও হয়ত বুঝতেই পারতো না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো মিশুর দিকে।
মিশুও বেশ অবাক। খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি আর কালো জিন্সে মেঘালয়ের রূপ যেন আরো ফুটে উঠেছে। কি পরিমাণ সুন্দর লাগছে সেটা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। গোসলের পর একটা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে মেঘালয়ের মুখে। ভেজা চুলে,লাল খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি পড়ে ওর স্নিগ্ধ চেহারা আরো স্নিগ্ধ রূপ ধারণ করেছে।
মেঘালয় ই প্রথম কথা বললো, “মিশু! এটা তুমি!”
– “কেন?”
মেঘালয় দু পা এগিয়ে আসতেই মিশু একটু পিছিয়ে গেলো। মেঘালয় একহাত ওর কোমরে রেখে একটানে ওকে বুকে টেনে নিয়ে ওর মুখটা দুহাতে ধরলো। মিশু অবাক হয়ে বললো, “কি করছেন?”
– “আমার মিষ্টি বউয়ের সাথে শুভদৃষ্টি করছি।”
মিশুও মেঘালয়ের চোখে চোখ রাখলো। এত কাছ থেকে ওর স্নিগ্ধ মুখটা দেখে বুকের ভেতরে ধুকপুকুনিটা আরো বেড়ে গেলো যেন। এত সুন্দর একটা ছেলে ওর বর হতে চলেছে! ভাগ্য করে একটা রাজকুমার কে পেয়েছে ও। সত্যিই মেঘালয় অনেক বেশি সুন্দর!
একে অপরের চোখের দিকে অনেক্ষণ চেয়ে রইলো এভাবে। মিশুর চোখের পাতা ঘনঘন কাঁপছে। এর আগে কখনো মেয়েটাকে লিপস্টিক দেয়া অবস্থায় দেখেনি ও। আজকে দেখে কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে। একটা কিউট ভাব আছে চেহারায়। মেঘালয় চোখ বড়বড় করে চেয়ে রইলো। মিশু একটু নড়াচড়া করে বললো, “উহ ছাড়ুন তো।”
মেঘালয় ওকে ছেড়ে দিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে মাথা চুলকালো। তারপর বললো, “আসো, বিয়ে করবো।”
মিশুর হাসি পেলেও খুব ভালো লাগলো কথাটা শুনতে। এভাবে কেউ কখনো বিয়ের কথা বলে নাকি? লজ্জা করছে তো। লজ্জায় ওর লাল মুখটা আরো লাল বর্ণ ধারণ করলো। মেঘালয় মিশুর হাত ধরে ওকে বসার ঘরে নিয়ে আসলো। বর কনেকে একসাথে দেখে ওর তিন বন্ধুই মুগ্ধ হয়ে গেলো। দুজনকে বেশ মানিয়েছে। মিশু এত সুন্দর সেটা ওরাও আগে বুঝতে পারেনি। তিনজন ই নতুন বউয়ের প্রশংসা করতে লাগলো। একা একা শাড়ি পড়ার কারণে কুচিগুলো একটু এলোমেলো হয়েছে। তবুও ভালো লাগছে, মনেহচ্ছে কুচিগুলো গোছালো হলে ভালো লাগতো না।
এরপর বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু হলো। বুকের ভিতর টা কেমন ঢিপঢিপ করছে মিশুর। বিয়েটা তো জীবনে একবার ই হয়,সেটা করতে চলেছে ও। অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছে। মেঘালয়ের মত একজনকে সারাজীবনের কত করে পাচ্ছে সেটা যেন স্বপ্নাতীত ব্যাপার। স্বপ্ন বাস্তবে নেমে এসেছে মনেহচ্ছে। ও একবার মনেমনে নিজের মাকে মনে করলো। আম্মুকে ফোন দিয়ে বললো, “আমার জন্য দোয়া করো আম্মু।”
আর বিশেষ কিছুই বললো না। ফোন রাখতেই কাজি ওনার কর্মকাণ্ড শুরু করে দিলেন। মেঘালয়ের খুব কাছের একজন চাচা আছেন, ওনাকে ডেকে এনেছে মেঘালয়। একজন মুরুব্বি অন্তত বিয়েতে উপস্থিত থাকুক। চাচা অনেক বিশ্বস্ত, মেঘালয়ের সব কথা উনি রাখবেন। একজন বড় ভাইকেও নিয়ে এসেছে ওরা।
সুপ্রসন্ন ভাবে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলো। মিশুর প্রথমে বুক কাঁপলেও পরে বেশ উত্তেজিত বোধ করলো। কেবলই মনে হতে লাগলো, বিয়ের মত মজার জিনিস বোধহয় আর হয়না। ওকে কবুল বলতে বলামাত্রই কবুল বলে দিলো। রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করার সময়েও মুখে প্রসন্ন হাসি ছিলো। কিন্তু কলম ধরার সময় মেঘালয়ের হাত কাঁপছিল, কারো চোখ এড়ায়নি ব্যাপার টা। মেঘালয় ছেলেটা সত্যিই অনেক ভালো।
বিয়ের কাজ শেষ হয়ে গেলে গেস্ট দুজন সহ সবাই একসাথে মিষ্টিমুখ ও খাওয়াদাওয়া করলো। তারপর গেস্টরা ও কাজি চলে গেলে পূর্ব বললো, “ওরা দুজন থাক,আমরা বরং বের হই?”
মেঘালয় বললো, “কই যাবি তোরা?”
– “আমরা থেকে কি করবো এখানে? পার্টি হবে রাতে। আমরা তিন জন এখন মিনি কক্সবাজার যাচ্ছি,সূর্যাস্ত দেখে তারপর ফিরবো। রাত্রে ফেরার সময় পার্টির জন্য যা লাগে কিনে নিয়ে আসবো।”
– “মিনি কক্সবাজার মানে? এখন তোরা মৈনট যাচ্ছিস?”
– “আজ্ঞে হা, আপনি তো বউ নিয়ে স্বর্গে যাবেন, আমরা কি ঘাস কাটবো? ঘুরে আসি।”
মেঘালয় হেসে বললো, “আচ্ছা যা। রাত্রে খাবার নিয়ে আসিস।”
সায়ান ইয়ার্কি করে বললো, “মামা তুমি আরো কি খাবার চাও? লিপস্টিক আজ থেকে তোমার প্রধান খাদ্য।”
বলেই ওরা তিনজন হেসে উঠলো। মেঘালয়ের সাথে খুনসুটি লেগে গেলো ওদের। মিশু লজ্জা পাচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সেও মুখ টিপে হাসছে। যেন ওদের ফাজলামো দেখে মজ্জা পাচ্ছে বেশ।
ওরা ক’জন বন্ধু মিলে অনেক ফাজলামি করে বের হওয়ার জন্য দরজায় গেলো। সায়ান নব দম্পতির দিকে তাকিয়ে বললো, “মাত্র তো দুপুর দুইটা বাজে। রাত দশটা পর্যন্ত পুরা বাড়ি শুধু তোদের। ফিরে এসে যেন দেয়ালে দেয়ালে প্রেমের চিহ্ন দেখতে পাই।”
মেঘালয় হেসে বললো, “অনেক হইছে ভাই, এখন যাবি?”
– “এখন আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছিস? ভালোই। শোন, চিপাচাপায় কিন্তু সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। আমরা না থাকলে কি হবে? আমাদের ক্যামেরা আছে। মেঘ দেখে কেউ করিস না ভয়,আড়ালে তার ক্যামেরা আছে।”
বলেই চোখ মারলো। মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে বললো, “সিরিয়াসলি?”
তিন বন্ধু হো হো করে হেসে উঠলো। আরাফ বললো, “ওর পুঁচকে বউ ভয় পেয়ে যাবে তো। তোরা ইয়ার্কি থামাবি এখন? তাড়াতাড়ি চল।”
– “আচ্ছা আচ্ছা যাচ্ছি। মেঘালয়, তোদের বাসর রাত থুক্কু বাসর দিন শুভ হোক।”
ওরা হাসাহাসি করতে করতে চলে গেলো। মেঘালয় মেইন দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “ওদের ফাজলামি দেখে কিছু মনে কোরো না। ওরা এরকম ই।”
– “সে তো প্রথম দিনেই জেনেছি। কিছু মনে করিনি।”
– “প্রথমবার রাতে রাস্তায় দেখা হইছিলো না? সায়ান তোমাকে ভাবি বলেছিলো? হা হা, শেষ অব্দি ওর ভাবি ই হয়ে গেলে তাহলে।”
মিশু হাসলো। তারপর এগিয়ে এসে মেঘালয়ের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। মেঘালয়ের দিকে আঙুল তুলে বললো, “আমি পুঁচকে? আমি বাচ্চা? আমাকে কি বাচ্চাবাচ্চা লাগছে?”
মেঘালয় ওর আঙুল ধরে বললো, “নাহ, বিপজ্জনক লাগছে। রেড সিগন্যাল বরাবর ই বিপদজনক। ভয় পাচ্ছি।”
– “মানে!”
– “বুঝাচ্ছি।”
মেঘালয় দুম করেই মিশুকে কোলে তুলে নিলো। মিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো ওর দিকে। মেঘালয় ওকে কোলে নিয়ে এমন একটা রুমে চলে আসলো যার চতুর্দিকেই গ্লাস লাগানো। যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু ওদের দুজনকেই দেখা যাচ্ছে। ফুল আর বেলুন দিয়ে সাজানো, তিনরকম আলো খেলা করছে ঘরটাতে। এসির শীতল হাওয়া আর শিউলি ফুলের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগছে। চারিদিকের গ্লাসের সামনে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, সেই ফুলের মাঝে ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে মিশু। মেঘালয় ওকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে ওর। মুগ্ধতার চেয়ে বেশি কিছু থাকলে সেটাই হলো ও। ঘরে ঢুকেই মনেহচ্ছে অন্য একটা জগতে চলে এসেছে ওরা। সম্ভবত থ্রিডি আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছে ঘরটাতে, নয়ত এরকম চোখ ধাঁধিয়ে যায় কেন?
মিশু দুহাতে মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “এত সুন্দর কেন!”
– “তোমার জন্য।”
মিশুকে এনে একটা দোলনায় বসিয়ে দিলো ও। দোলনা দোল দিতেই মিশু দোলনার রশি দুহাতে চেপে ধরলো। মেঘালয়ের থেকে কয়েক হাত পিছিয়ে গেলো দোলনাটা। মিশু কিছুতেই ওর বিস্ময় চেপে রাখতে পারছে না। দোলনার রশিতেও ফুল দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যরকম সুবাস মিশে আছে সবকিছুতে। দোলনা অনেক দূর পিছিয়ে এসে আবার যখন সামনের গিয়ে এগিয়ে এলো, মেঘালয়ের সামনে আসতেই মিশু বুঝে উঠতে পারলো না কি হচ্ছে। মেঘালয় আচমকা দোলনা আটকিয়ে দিয়ে মিশুর মুখটা ধরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চাপ দিলো। এটা বুঝতে অনেক সময় লেগে গেলো মিশুর। ওর দারুণ ঘোর লেগে যাচ্ছে। এরকম অনুভূতি সত্যিই অভাবনীয়, কেবল স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে সবকিছু!
মেঘালয় মিশুকে ছেড়ে দিয়ে জোড়ে একটা নিশ্বাস নিয়ে বললো, “উফফ রাঙা ঠোঁটদুটো দেখার পর থেকে এটা করার জন্য পাগল হয়ে গেছিলাম।”
বলেই হেসে ফেললো। মেঘালয় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা অনেক লম্বা। মিশু দোলনায় বসে ওর বুক অব্দি পৌছে গেছে। জাপটে ধরলো দুহাতে। মেঘালয় বললো, “এখন থেকে যখন তখন এরকম ভয়ংকর আক্রমণ হবে তোমার উপর। প্রস্তুত থেকো।”
– “আপনি একটা খুব খারাপ। খারাপের চেয়েও বেশি খারাপ।”
-“হা হা হা, সারাজীবনের কত ফ্যান্টাসি জমিয়ে রেখেছি তোমার জন্য। আস্তে আস্তে দেখবে কত সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। এই রুমের সাজসজ্জা দেখছো না? এটাও আমার একটা ফ্যান্টাসি ছিলো। এটা তো আমার প্লান মতই সাজানো হয়েছে।”
– “অদ্ভুত রকমের সুন্দর, মনেহচ্ছে অন্য কোনো পৃথিবীতে চলে এসেছি। এত টাকা খরচ করার কি দরকার ছিলো?”
– “একবার ই তো বিয়ে করছি রে, পরেরবার ওয়েডিং প্রোগ্রামে এত মজা হবেনা। আমার আনাড়ি বউটা তখন সেয়ানা হয়ে যাবে।”
মিশু ক্ষেপে গিয়ে বললো, “আপনি এত খারাপ কেন শুনি? পাজি কোথাকার।”
মেঘালয় মিশুকে দোলনা থেকে নামিয়ে এনে মেঝেতে বসিয়ে দিলো। রুমের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিলো। মিশু হা করে সবকিছু দেখছে। অন্ধকারে দারুণ সুগন্ধিতে ভরে গেছে ঘরটা, আর এসির হিমেল হাওয়ায় সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে।মনেহচ্ছে শীতের রাতে ও বাইরে ঠাণ্ডা ঘাসের উপর বসে আছে। মেঘালয় একটা মোমবাতি হাতে ঘরে প্রবেশ করলো। মিশুর বিস্ময় চরমে পৌছে গেছে। ঘরের চারিদিকেই মেঘালয়কে দেখা যাচ্ছে। ও ঘুরেঘুরে চারপাশে তাকাচ্ছে। চারদিকেই মেঘালয়ের প্রতিচ্ছবি! অন্ধকারে মোমের আলোয় শুধু মেঘালয়ের শুভ্র মুখটাই দেখা যাচ্ছে। হালকা খয়েরি পাঞ্জাবীতে ছেলেটার স্নিগ্ধ মুখটা মোমের আলোয় অন্যরকম দেখাচ্ছে। মেঘালয় এসে মেঝেতে মিশুর পাশে বসে পড়লো। মিশুর মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে আরাম করে বসলো। মিশু মাথাটা ওর কাঁধে রাখার পর সামনে তাকিয়ে দেখে মোমের আলো আয়নায় রিফ্লেক্ট করছে, ঘরটা দারুণ আলোয় ভরে গেছে। মনেহচ্ছে ঘরে অনেক গুলো মোম জ্বলছে। আর মোমের মিষ্টি আলোয় দুজন সদ্য বিবাহিত বর বউ বসে আছে। আবছা আবছা আলোয় কত সুখী দেখাচ্ছে দুজনকে। এত সুখের মুহুর্ত যেন কখনো শেষ না হয়!
মেঘালয় একহাত মিশুর কোমড়ে রেখে আলতো চাপ দিয়ে ওকে একদম কাছে টেনে নিলো। মিশু লজ্জায় চোখ মেলতে পারছে না। ওর সবকিছু ঘোর ঘোর লাগছে। মেঘালয় মিশুকে কাতুকুতু দিয়ে নিজেই হেসে উঠলো। মিশু তিড়িং তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মেঘালয় হাসছে। মিশু ক্ষেপে বললো, “এত দুষ্টু ক্যান আপনি?”
মেঘালয় গান গেয়ে উঠলো,
“কথা হবে,দেখা হবে, প্রেমে প্রেমে মেলা হবে,
কাছে আসা আসি আর হবেনা…
চোখে চোখে কথা হবে, ঠোঁটে ঠোঁটে নাড়া দেবে,
ভালোবাসা বাসি আর হবেনা…
শত রাত জাগা হবে,থালে ভাত জমা রবে,
খাওয়া দাওয়া কিছু মজা হবেনা…
হুট করে ফিরে এসে লুট করে নিয়ে যাবে
এই মোন ভেঙে যাবে জানো না…
আমার এই বাজে স্বভাব কোনোদিন যাবেনা…”
এতটুকু গেয়েই মিশুর হাত ধরে টেনে ওকে বুকে নিলো। নিয়ে আবারো কাতুকুতু দিলো। মিশু আবারো তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে উঠে পিছিয়ে গিয়ে বললো, “আসলেই বাজে স্বভাব। বাজে বাজে, চরম বাজে একটা লোক আপনি।”
মেঘালয় আবারো গাইতে আরম্ভ করলো,
“যদি তুমি ভালোবাসো, ভালো করে ভেবে এসো
খেলে ধরা কোনোখানে রবেনা,
আমি ছুঁয়ে দিলে পরে,অকালেই যাবে ঝরে
গলে যাবে যে বরফ গলেনা…
আমি গলা বেঁচে খাবো, গানের আশেপাশে রবো
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে কথা হবেনা…
কারো একদিন হবো, কারো এক রাত হবো
এরবেশি কারো রুচি হবেনা…
আমার এই বাজে স্বভাব কোনোদিন যাবেনা…”
মিশু মেঘালয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “গলা বেঁচে খান, গান করুন, বড় শিল্পী হোন, যাই করুন ঠোঁটে ঠোঁট রেখে কথা বলতেই হবে। আর কারো রুচি হওয়ার দরকার তো নেই, আমার রুচি থাকলেই হলো।”
মেঘালয় হেসে ফেললো। মিশুকে নিয়েই দোলনায় বসে মিশুর মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে বলল, “আমার পাগলী টা।”
– “গানটা ভালো লেগেছে। আপনি সত্যিই একদিন অনেক বড় শিল্পী হবেন।”
– “বউয়ের দোয়া কি কাজে লাগে? লাগলে হয়ে যাবো। তা বউটা আমাকে কতক্ষণ আরো আপনি আপনি করে বলবে?”
মিশু হাসলো। মেঘালয়ের কাঁধে মাথা রেখে দোলনায় দোল খেতে লাগলো।

৩২.
দোলনায় বসে গল্প করে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিলো ওরা। মেঘালয় দোলনা থেকে নেমে মিশুকে কোলে তুলে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। বসার ঘরের পাশে করিডোরে এসে দাঁড়ালো।
করিডোরে সূর্যের আলো এসে পড়েছে। চোখ ধাঁধানো অন্ধকার থেকে বের হয়ে এসে সূর্যের আলো খুবই ভালো লাগছে। মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো, “দাড়াও দুটো চেয়ার নিয়ে আসি।”
মেঘালয় রুমে ঢুকতেই মিশু “ওমাগো” বলে চেঁচিয়ে উঠলো। মেঘালয় ছুটে চলে এলো বারান্দায়। এসে দেখে মিশু পা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মেঘালয় উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে?”
মেঘালয় মিশুর সামনে বসে ওর হাত সরিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে অনেক খানি জায়গা কেটে গেছে। ও উত্তেজিত হয়ে চেঁচাল, “এটা কিভাবে হলো?”
বারান্দার এক কোণে একটা ভাঙা ফুলদানি রাখা। কাঁচের ফুলদানি, সেটা দিয়েই মিশুর পা কেটে গেছে। কেমন যেন কষ্ট হতে লাগলো মেঘালয়ের। বললো, “কেন যে ওসব জিনিস এখানে রাখে? সায়ানকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। যত্তোসব।”
মিশু বললো, “ওরা কি আর জানত আমি এই কোণায় গিয়ে দাঁড়াবো? বাড়িতে কেউ নেই,বারান্দায় কেউ আসার কথা না। রেগে যাচ্ছো কেন?”
– “তাহলে?”
– “আহা! দোষটা তো আমার ই। আমার উচিৎ ছিলো দেখে পা ফেলা।”
-“তোমার পা কেটে গেছে মিশু। এটা আমার জন্য কি পরিমাণ যন্ত্রণার বুঝতে পারছো তুমি? এরচেয়ে যদি আমার গলা কেটে যেতো তবুও এত কষ্ট হতো না।”
মিশু মেঘালয়ের মুখের উপর হাত দিয়ে বললো, “ছি এসব কথা কেন বলো?”
– “তুই আমার কি তোকে কিভাবে বোঝাবো পাগলী?”
মিশু খুব বেশি অবাক হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময় চেপে রেখে বললো, “এসব কখনো বলবা না।”
মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। ওকে সোফার উপর বসিয়ে দিয়ে সায়ানকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করে নিলো ফাস্ট এইড বক্স আছে কিনা। সায়ান জানালো ওর ঘরের প্রথম ড্রয়ারে রাখা আছে। মেঘালয় ফোন রেখে মিশুর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো রক্ত পড়ছে মেঝেতে। ও দ্রুত ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এসে মিশুর পায়ের কাছে বসে খুব যত্নে ওর ক্ষতটা পরিষ্কার করে দিলো। সুন্দর ভাবে মুছে দিয়ে পা তুলে নিয়ে কাটা জায়গার উপর আলতো করে চুমু দিলো। মিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। মেঘালয় বললো, “এবার ঠিক হয়ে যাবে।”
তারপর ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো। মিশু মেঘালয়কে যত দেখছে তত অবাক হয়ে যাচ্ছে। ওর ভালোবাসার ধরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে। মেঘালয় মিশুর পাশে এসে বসলো। দুহাতে মিশুর মুখটা ধরে বললো, “আমার জন্য এই অবস্থা হয়েছে। বিয়ের পর প্রত্যেকটা সেকেন্ড তোমার খেয়াল রাখতে চেয়েছিলাম। পারলাম না, আমি থাকতেও তোমার পা কেটে গেলো। আমাকে মাফ করে দাও, আর কক্ষনো মুহুর্তের জন্যও তোমাকে একা ছাড়বো না। সরি মিশু, সরি।”
মিশুর চোখে পানি এসে গেলো। মেঘালয় এমন কেন! এভাবে ভালোবাসতে হয়? সুখে মরে যেতে ইচ্ছে করবে তো। যত সময় যাচ্ছে, মেঘালয়ের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে মিশুর। এরকম মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে! সত্যিই মিশু অনেক ভাগ্য করে ওকে পেয়েছে।
মেঘালয় মিশুকে বুকে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ওর ভেতরে চরম অস্থিরতা কাজ করছে। মিশু ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করেছে, আর এক বিন্দু পরিমাণ কষ্টকেও মিশুর কাছে ঘেষতে দেবেনা ও। মিশু মনে মনে ভাবল, একটা মজার ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হবে। এই ব্যাপারটা ভূলিয়ে দিতে হবে মেঘালয়কে। ও মুখ তুলে বললো, “আচ্ছা আমাকে কেমন লাগছে?”
মেঘালয় ওর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে বললো, “মাথা খারাপ হওয়ার মতো সুন্দর।”
– “ইস! আর বলতে হবেনা। আপনাকে আজ দারুণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে।”
– “তুমি কি বলতে চাচ্ছো আমি হ্যান্ডসাম নই?”
– “আহা! আপনি সবসময় ই হ্যান্ডসাম। আজকে আপনার ভাষায় বিপজ্জনক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে।”
মেঘালয় হেসে বললো, “তাই নাকি! বিপদ ঘটাচ্ছো না কেন?”
মিশু ভ্রু কুঁচকে বললো, “বিপদ ঘটাবো মানে!”
মেঘালয় দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বললো, “না কিছুনা।”
মিশু ওর গলার দিকে তাকিয়ে বললো, “শাস্ত্র পালন করতে হবে? সেটা আমি পারবো না আগেই বলেছি। আপনার গলায় কত্তগুলো আচড়ের দাগ। আর দাগ করে দিতে পারবো না আমি।”
মেঘালয় বললো, “সে আর বলোনা। আজকে মার্কেটে গিয়েছি, যে মেয়েটা আমাদের জিনিসপত্র দেখাচ্ছিলো সে বারবার হা করে আমার গলার দিকে তাকাচ্ছিলো। কি লজ্জার ব্যাপার। পরে একটা মাফলার কিনে নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শপিং করেছি।”
– “হা হা হা, এই গরমে মাফলার?”
– “হ্যা। পূর্ব আর আরাফ খুবই জ্বালাচ্ছিলো এগুলো নিয়ে। দাগগুলো দেখে বারবার বলছিলো আমি নাকি অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেছিলাম যার জন্য এই অবস্থা হয়েছে।”
মিশু হেসে বললো, “অন্যায়ভাবে কিনা জানিনা তবে সাংঘাতিক ভাবে। আমি কান্না করে ফেলেছিলাম।”
– “এই চোখের জলের দাম দিতেই তো বিয়েটা করলাম। তুমি কাঁদছিলে বলে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেজন্যই এত তাড়াতাড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম।নয়ত আরো কিছুদিন সময় দিতাম তোমাকে।”
মিশু বলল, “বিয়েটা করা উচিৎ কাজ হয়েছে। এত সুন্দর একটা ছেলেকে সারাক্ষণ সামনে বসিয়ে রেখে দেখতে পাচ্ছি,এরচেয়ে সুখকর ব্যাপার আর কি আছে? কাউকে দেখার মাঝেও যে এত সুখ থাকতে পারে আমার জানা ছিলোনা।”
মেঘালয় হাসলো। ওর নিজের ও মনেহচ্ছে বিয়েটা করে ভালো হয়েছে। মিশুকে দূরে রাখা অনেক কষ্টকর একটা ব্যাপার। মিষ্টি খুকিটার গাল টেনে দিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে। পাগলী একটা।
মিশু মেঘালয়ের কোলে মাথা রেখে সোফার উপর শুয়ে রইলো। মেঘালয় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সারারাত ট্রেনে ঘুম হয়নি। ঘুম এসে যাচ্ছে মিশুর। কথা বলতে বলতে ঘুমিয়েও পড়লো। মেঘালয় ওকে কোলে নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুইয়ে দিলো। তারপর ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইলো অনেক্ষণ। পবিত্র একটা মুখ মেয়েটার! বড্ড সুন্দর দেখাচ্ছে।
মিশুর ঘুম ভাংলো বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। ও ঘুম থেকে উঠে চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো মেঘালয় নেই। ও অনেক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে রইলো তারপর উঠে এলো বিছানা থেকে। বাইরের ঘরে আসতেই দেখলো মেঘালয় খাবার টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে। ও এসে সামনে দাঁড়ালো। মেঘালয় ওকে দেখে বললো, “ঘুম হলো মহারাণী’র?”
– “হুম,এত সুখের ঘুম কক্ষনো হয়নি আমার। কিন্তু আপনি নাস্তা বানাচ্ছেন কেন?”
– “মহারাণী ঘুম থেকে উঠে কি খাবে তাহলে? ভাবলাম কিছু কিনে নিয়ে এসে রাখি। কিন্তু ফ্রিজে ফ্রুটস পেয়ে গেলাম, স্যান্ডুইচ পেলাম। মাত্র তিনটা আইটেম বানিয়েছি। কফি করেছি, কফি খাবে নাকি চা?”
– “উম, চুমু খাবো।”
মেঘালয় মাথা নিচু করে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলো। কথাটা শুনে চমকে তাকালো মিশুর দিকে। সে ভূল শোনেনি তো? ভূত দেখার মত চোখ বড়বড় করে চেয়ে রইলো মিশুর দিকে। ঘুম থেকে উঠে মিশুকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। কণ্ঠটাও আবেগ মিশ্রিত। মেঘালয় হেসে বললো, “কি খাবা?”
মিশু মুচকি হেসে বললো, “কিচ্ছু না।”
বলেই একটা দৌড় দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না,পায়ে ব্যথা পেয়ে আহ বলে বসে পড়লো। মেঘালয় এসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “হাঁটতেই পারছো না ঠিকমত। দৌড় দিতে যাও কেন হুম?”
– “তুমি যদি আবার হামলা করে বসো।”
– “পায়ে কি খুব ব্যথা? আমি তোমাকে একা রেখে বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম না। ওদেরকে বলে দিয়েছি, ফেরার সময় ওষুধ নিয়ে আসবে।”
– “ইস! আমার খুব বেশি কিছু হয়নি যে ওষুধ খেতে হবে। আমি ঠিক আছি।”
– “সেজন্যই তো হাটতে পারছো না। অবশ্য ভালোই হয়েছে, তোমাকে এখন কোলে নিয়ে সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো। পুতুলের মত একটা বাচ্চা, তাকে কি হাটতে দেয়া যায়?”
মিশু দুহাতে মেঘালয়ের গলা চেপে ধরে বললো, “এখন কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
– “স্বর্গে…”
– “হেঁটে হেঁটে বুঝি স্বর্গে যাওয়া যায়?”
মেঘালয় মিশুকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলো। শক্ত করে চেপে ধরে গভীর আবেশে চুমু খেলো ওর ঠোঁটে। মিশু সমানতালে দুই পা ছোড়াছুঁড়ি করছে, কিন্তু মেঘালয় শক্ত করে ওর একহাতে কোমর ধরে রেখেছে, আরেক হাতে ওর মুখ। মিশু দুহাতে মেঘালয়ের গলা খামচি দিয়ে ধরলো। অনেক্ষণ পর মেঘালয় ওকে ছেড়ে দিয়ে বললো, “শাস্ত্র পালন করে ফেলেছো।”
– “সরি।”
মিশু লজ্জায় মুখ লুকোচ্ছে মেঘালয়ের বুকে। মেঘালয় একটু সময় পর ওকে ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে গেলো। মিশু হা করে চেয়ে রইলো ওর চলে যাওয়ার দিকে। ভেবেছে মেঘালয় বুঝি রাগ করেছে। কিন্তু মেঘালয় টেবিল থেকে ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এসে হাজির হলো। হাসি ফুটলো মিশুর মুখে। দুজনে একসাথে বসে নাস্তা খেতে খেতে গল্প করলো। মিশুর শাড়ি এলোমেলো হয়ে গেছে। কফি খাওয়ার পর মেঘালয় ওর শাড়ি ঠিক করে দিলো।
আট টার পরেই ফিরলো ওরা। মিশুর জন্য ওষুধ এনেছে, খাবার এনেছে। সবাই মিলে একসাথে বসে খাবার খেলো। তারপর আড্ডায় বসলো। মেঘালয় বারবার তাকাচ্ছে মিশুর দিকে। ওর ইচ্ছে করছে একান্তই মিশুর সাথে সময় কাটাতে। কিন্তু বন্ধুদের কাছ থেকে মেয়েটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়াও যায় না। বড্ড লজ্জাকর হয়ে যাবে ব্যাপার টা। মেঘালয় মাথা নিচু করে এসব ভাবছে।
পূর্ব জিজ্ঞেস করলো, “ভাবিজী বাসর দিন কেমন কাটলো?”
– “খুব ভালো। এতবেশি ভালো যে আমার কিচ্ছু মনে নেই। কারণ, আমি আড়াইটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছিলাম।”
সায়ান হেসে বলল, “মেঘু দোস্ত কি করছে একা একা? ফেসবুকিং?”
– “না, ও নাস্তা বানিয়েছে আমার জন্য।”
– “পূর্ব, তাহলে ওদের ছেড়ে দে। আমরা বরং নাচানাচি করি।”
মিশু বললো, “নাচানাচি করবেন? আমিও করবো।”
সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। মেঘালয় চোখ বড়বড় করে তাকালো মিশুর দিকে। তারপর বললো, “তুমি নাচতে পারো?”
– “হ্যা, খুব পারি।”
– “রুমে গিয়ে নাচাবো।”
-“না, আমি ওদের নাচ দেখবো।”
মেঘালয় উঠে দাঁড়িয়ে মিশুর হাত ধরে টানছে ওকে রুমে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মিশু নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই রুমে যাবে না। এখানে বসে বসে সবার সাথে আড্ডা দেবে আর নাচ দেখবে। মেঘালয় মুখটা কাচুমাচু করে সায়ানের কানেকানে বললো, “যা করবি তাড়াতাড়ি কর না ভাই। নাচলে এখনি নাচ,আমার বউটাকে ছেড়ে দে।”
– “আমি কি তোর বউকে ধরে রাখছি?”
– “ভাই, তোর দোহাই লাগে একটু নাচ দেখা। আমি আমার বউটাকে নিয়ে যাই।”
সায়ান হাসতে হাসতে বললো, “ওটা তো একটা অবুঝ শিশু। ওকে নিয়ে গিয়ে কি করবি? সে নাচ দেখতে চাচ্ছে, দেখা। তোর দেখতে মন না চাইলে তুই গিয়ে ঘুমা।”
– “হারামি, আমি গিয়ে ঘুমাবো?”
– “হ্যা ঘুমা, আমাদের নাচানাচি শেষ হলে তোর বউকে সহী সালামতে তোর কাছে রেখে আসবো।”
– “আমার আজ বাসর রাত রে ভাই, আমারে একটু ওরে নিয়ে যাইতে দে।”
– “আমরা তো নাবালক শিশু, আমরা কি কিছু করছি আপনার বউকে? আপনার বউই তো যাইতে চাচ্ছে না।”
– “প্লিজ একটু নাচ দেখা না।”
মেঘালয়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো সায়ান। উঠে সাউন্ড বক্সে গান দিতে গেলো। মিশুকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। রাতে আবার কি পাগলামি করে সেটা ভেবে চিন্তা হচ্ছে মেঘালয়ের। সে নাচ না দেখে কিছুতেই এখান থেকে যাবে না। যদি বলে সারারাত ওদের সাথে বসে পার্টি করবে তাহলেই সেরেছে। এত সাধের বাসর রাত এ জন্মের মত ঘুচে যাবে।
মেঘালয় মিশুর দিকে চেয়ে আছে। মিশু ওর বন্ধুদের কাজকর্ম দেখছে। ওরা এখন কেক কাটবে, পার্টি স্প্রে দিচ্ছে বারবার। বেলুন ফুলিয়ে সাজিয়ে রাখছে আবার হাত দিয়ে ফাটাচ্ছে। তিনজন মিলে হাসাহাসি করছে, কোক খাচ্ছে। মিশু ও যোগ দিলো ওদের সাথে। এদিকে মেঘালয়ের মাথায় হাত। যা ভেবেছে তাই হতে যাচ্ছে। একবার যদি ও মেয়ে বলে, সে এখন এদের সাথে পার্টি করবে তবে আজ আর মিশুকে সে পাচ্ছে না। গালে হাত দিয়ে ওদের বাচ্চামো কাণ্ডকারখানা দেখছে মেঘালয়।
মিশু হাঁটতে পারছে না তবুও দিব্যি এনজয় করছে ওদের সাথে। সাউন্ড বক্সে গান বাজছে,
“Kabhi joo badal, barse na dekhu tujhe akhe…”
মিশু বললো, “এসব গানের সাথে কি নাচা যায়? আমি গান দিচ্ছি, সায়ান ভাইয়া নাচের জন্য রেডি হও।”
সায়ান সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মিশু পা খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে হেটে গান বদলাতে গেলো। মেঘালয় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। কান্না করতে ইচ্ছে করছে ওর। বউটা এত অবুঝ কেন! এদিকে রাত বেড়ে যাচ্ছে। মিশু গান ছেড়ে দিলো, ” দিলবার দিলবার.. দিলবার দিলবার..”
সবাই অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। সায়ান মিশুর দিকে হাত বাড়িয়ে সিনেম্যাটিক স্টাইলে তাকালো। মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তাকালো ও না। ও সায়ানের হাত ধরে কাছে এগিয়ে এলো। রিমিক্স বাজছে, বাকি তিনজন একদম হতভম্ব! মিশু শাড়ি পড়েই সায়ানের হাত ধরতে নাচতে আরম্ভ করলো,
“Ab toh hosh na khabar hai
Yeh kaisa asar hai
Hosh na khabar hai
Yeh kaisa asar hai
Tumse milne ke baad dilbar..
Tumse milne ke baad dilbar…
Dilbar dilbar.. Dilbar dilbar..”
মিশু এমন দক্ষ ভাবে সায়ানের হাত ধরে নাচছে যে মনেহচ্ছে দুজনেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ড্যান্সার। সবাই হা করে চেয়ে আছে। পূর্ব উঠে গিয়ে মিশুকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে নাচতে শুরু করলো। মিশু পূর্ব’র মুখটা ধরে কাঁধে হাত রেখে তাল মিলাচ্ছে,
“Tu mera khaab hai
Tu mere dil ka qaraar
Dekh le jann-e-mann
Dekh le bas ek baar..”
মেঘালয় আর বসে থাকতে পারলো না। উঠে গিয়ে সবার সামনেই মিশুকে কোলে তুলে নিলো। মিশু রীতিমত অবাক! ও বারবার বলতে লাগলো, “নাচবো আমি,নাচবো আমি..”
বাকি দুই বন্ধু হাসছে আর নেচেই চলেছে। মেঘালয় ওদেরকে বললো, “তোরা একেকটা ভিলেন”
ওরা হাসতে হাসতে বললো, “হ্যাপি ফুলশয্যা, হ্যাপি জার্নি।”
বলতে বলতে নাচতেই লাগলো। মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে এসে রুমে ঢুকে দরজা আটকিয়ে দিলো। তারপর মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই মিশু বললো, “আমি নাচ দেখতাম।”
মেঘালয় আচমকা গায়ের সমস্ত জোড় দিয়ে কষিয়ে থাপ্পড় দিলো মিশুর গালে। মিশু গাল ধরে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। মেঘালয় কিছুতেই রাগ সামলাতে না পেরে বললো, “ওদের সাথে যা খুশি বলো কিছু মনে করতাম না। দুজনের সাথে হাত ধরে নাচবে আর আমি সেটা সহ্য করবো এটা ভাবলে কি করে?”
মিশুর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মেঘালয়ের এমন আচরণ ওর কাছে দুঃস্বপ্নের মত লাগছে। ও বললো, “বিয়ে করতে না করতেই বিহ্যাভ চেঞ্জ হয়ে গেলো!”
মেঘালয়ের খুব খারাপ লাগলো কথাটা শুনতে। ও এগিয়ে এসে মিশুর মুখটা ধরে চোখ মুছে দিয়ে বললো, “সরি মিশু, সরি ”
মিশু এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দিলো। মেঘালয় বারবার সরি বলছে তবুও মিশু কান্না করেই চলেছে। মেঘালয় মিশুর পায়ে হাত রেখে সরি বলতেই মিশু চমকে উঠে ওর হাত ধরে বললো, “কি করছো তুমি এটা?”
– “আমাকে মাফ করে দাও। আমি তোমাকে আঘাত করে ফেললাম।”
– “ছি, তাই বলে পা ধরবা?”
মিশু মেঘালয়ের বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেললো।মেঘালয় নিজেও কেঁদে ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আমি রাগ সামলাতে পারিনি। তুমিই বলো, আমাকে কোনো মেয়ের হাত ধরে নাচতে দেখলে তোমার কেমন লাগতো? তার উপর তুমি একজন মেয়ে। আমার এসব পছন্দ না।”
মিশু আরো জোরে কাঁদতে লাগলো। মেঘালয়ের গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেঘালয় বললো, “তোমাকে আর কারো সাথে দেখলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। শোনো,তোমার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ আমার। আর কারো না।”
মিশু দুহাতে খামচে ধরলো মেঘালয়ের পাঞ্জাবি। মেঘালয় ওকে বুকের সাথে শক্ত করে ধরে বললো, “আমি জানি তুমি এখনো অনেক বাচ্চা স্বভাবের। ছেলেমানুষি ভাবটা এখনো যায় নি, সেজন্যই ওভাবে নাচছিলে। কিন্তু আমি পারিনা রে মানতে, আর কেউ তোর আঙুল স্পর্শ করুক আমি সহ্য করতে পারবো না। মরে যাবো।”
মিশু বললো, “আমিই সরি। আর কক্ষনো এমন হবেনা।”
– “আমাকে মাফ করে দিয়েছো তো? প্রথম দিনেই আঘাত করলাম তোমায়। আমি আসলে রেগে গেলে ভয়ংকর হয়ে যাই মিশু। সরি।”
– “না মাফ করবো না। একটা কাজ করলে মাফ করবো ”
– “কি কাজ?”
মিশু ওর বুকে মুখ লুকাতে লুকাতে বললো, “ট্রেনে যেটা করেছিলে সেটা করতে হবে। তুমি না বলছিলে বিয়ের পরে ওসব করতে হয়।”
মেঘালয় মিশুকে ছেড়ে দিয়ে হাসার চেষ্টা করলো, “আচ্ছা, মাফ করে দিও।”
বলামাত্রই যেই চোখ ঘুরিয়েছে দেখলো পেটের উপর থেকে মিশুর শাড়ি সরে গেছে। নাভীতে চোখ যাওয়া মাত্রই মেঘালয়ের সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। ঘোর লেগে গেলো চোখে। অনেক্ষণ ধরে চেয়ে রইলো। তারপর মিশুকে এক হাতে শুইয়ে দিয়ে আরেক হাতে ওর শাড়িটা সরালো। মিশু বুঝতে পারছে না মেঘালয় কি করতে চাইছে। মেঘালয় নিচু হয়ে ওর নাভীর উপর ঠোঁট স্পর্শ করলো। শিহরিত হয়ে উঠলো মিশু। এক অন্যরকম সুখের স্পর্শে মিশে যেতে লাগলো। মেঘালয়ের চুল খামচে ধরলো দুহাতে। গায়ের জোরে ওর চুল টানতে লাগলো। মেঘালয় মাথাটা ডুবিয়ে দিয়ে গভীর আবেশে চুম্বন করতে লাগলো। কেঁপে কেঁপে উঠছে মিশু।
চলবে..

 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *