অনুভূতি ! পর্ব_১১

অনুভূতি
পর্ব -১১
মিশু মনি

অনুভূতি সকল পর্ব 

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

৩৩.
সূর্যের সোনালী আলো মুখের উপর এসে পড়ায় ঘুম ভেঙে গেলো মিশুর। বুঝতে পারলো মেঘালয়ের উষ্ণ বুকের সাথে মিশে আছে ও। বুকের ঢিপঢিপ শব্দ কানে আসছে। মিশু উঠতে যেতেই মেঘালয় ওকে টেনে কাছে নিলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো, “কখনো আমাকে বিছানায় রেখে উঠবা না। আমার আগে ঘুম ভাংলেও শুয়ে থাকবা পাশে।”
মিশু হেসে বললো, “কেন?”
– “উম, ঘুম থেকে উঠেই তোমাকে পাশে চাই।”
– “আমিতো সবসময় ই পাশে আছি।”
– “উম,কাছে চাই রে।”
বলেই মিশুকে জাপটে ধরলো। ওর প্রশস্ত বুকের ভেতর লুকোতে লুকোতে মিশুর কেবলই সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছিলো। রাতটা এতবেশি সুখকর ছিলো যার কোনো বর্ণনা দিয়ে হয়ত বোঝানো সম্ভব না। মিশু বারবার মেঘালয়ের দিকে তাকাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। গত রাতে মেঘালয় এক অন্যরকম পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছে ওকে। ঘুরিয়ে এনেছে ভালোবাসার সুখের এক অন্যরকম রাজ্য থেকে। যে রাজ্যে শুধু সুখ আর সুখ! মেঘালয় বলেছে প্রতিটা দিন নতুন ভাবে শুরু হবে আর প্রত্যেকটা রাতে নতুন নতুন কিছু রাজ্য থেকে ঘুরিয়ে আনবে ওকে। মিশু মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এসব ভেবে মুচকি হাসছিলো।
মেঘালয় চোখ বুজে ছিলো এতক্ষণ। চোখ মেলতেই মিশুর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। মিশু হাসলো মিষ্টি করে। মেঘালয় জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন?”
– “তোমার শরীরটা খুব উষ্ণ।”
– “সেজন্য হাসছো?”
মিশু মাথাটা দুপাশে নেড়ে বললো, “উহু। আগে জানতাম ভালোবাসা শুধু দুটো হৃদয়ের ব্যাপার। এখন মনেহচ্ছে, শরীর ও বিশেষ প্রয়োজন। স্পর্শ একটা বিশাল প্রাপ্তি।”
মেঘালয় হেসে বললো, “পাগলি, যেখানে ভালোবাসা থাকবে সেখানে শরীর ও থাকবেই। হৃদয় তো শরীরের ই অংশ।”
– “তুমি খুব ভালো মেঘালয়, খুব ভালো।”
মেঘালয় মিশুর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, “এই প্রথম বউটা আমার নাম ধরে ডেকেছে। এজন্য একটা মিষ্টি পাওনা।”
মিশু মেঘালয়ের কপালে আলতো চুমু এঁকে দিলো। মেঘালয় মিশুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “পাগলী একটা বউ আমার। সারাজীবন এভাবেই ভালোবাসবি হ্যা?”
– “না বাসবো না, এরচেয়ে বেশি বেশি বাসবো।”
মেঘালয় হেসে ফেললো। তারপর বিছানায় উঠে বসলো। মিশুকে টেনে তুলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “পায়ের অবস্থা কেমন? ব্যথা সেরেছে?”
– “হুম একদম। একটু ব্যথা আছে, সেরে যাবে।”
মেঘালয় মিশুকে কাছে টেনে নিয়ে ওর চুলগুলো খোঁপা বেঁধে দিলো। মিশু মিটিমিটি হাসছে। মনেহচ্ছে ছেলেটা এখন থেকে ওকে আর কোনো কাজই করতে দেবেনা। সবই সে করিয়ে দেবে। এত সুখ কি কপালে সইবে! বড্ড ভয় হয় যে।
মেঘালয় চুলগুলো খোঁপা বেঁধে দিতে দিতে বললো, “একটা গল্প আছে তোমার চুলের। পরে শোনাবো।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “আমার চুলের গল্প মানে! এক্ষুনি শোনাও না।”
– “নাহ, পরে শোনাবো বউসোনা। এখন ওঠো, ফ্রেশ হবা।”
মেঘালয় বিছানা ছেড়ে নামলো। মিশুকে কোলে নিয়ে বাথরুমে এসে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে মিশুর হাতে দিয়ে বললো, “নাও ব্রাশ করো।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, ” এটা কার ব্রাশ?”
– “তোমার। নতুন ব্রাশ কিনে এনেছি কাল।”
মিশুর বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো। ও বিস্ময় লুকাতে পারলো না। অবাক হয়ে বললো, “সামান্য একটা ব্রাশের কথাও তোমার মনে থাকে! ছোটছোট জিনিস গুলোকেও তুমি খুব গুরুত্ব দাও।”
মেঘালয় দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “কাল যখন ঘুমাচ্ছিলে, তোমার কি কি জিনিস লাগবে সব লিস্ট করে পূর্বকে মেসেজ করে পাঠিয়েছিলাম। ওই নিয়ে এসেছে। তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে, আমি বসে বসে এসব ই ভাবছিলাম।”
মিশুর ইচ্ছে করলো মেঘালয়কে জড়িয়ে ধরতে। ছেলেটা এত্ত ভালো কেন!
ও ব্রাশ করতে করতে বললো, “আর কি কি এনেছে?”
– “স্যান্ডেল, টিস্যু পেপার, হেয়ার ব্যান্ড, চিরুনি, সাবান, শ্যাম্পু,তোমার জন্য আলাদা টাওয়েল।”
– “আমার জন্য আলাদা টাওয়েল কেন?”
– “বারে, আমার বউ সায়ানের টাওয়েল ইউজ করবে নাকি?”
– “ওহ আচ্ছা।”
মিশু মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ব্রাশ করতে লাগলো। মেঘালয় চেয়ে আছে ওর দিকে। মিশুর ব্রাশ করা হতেই মেঘালয় ব্রাশটা নিয়ে নিজে দাঁত মাজতে আরম্ভ করলো। মিশু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো, “আমার টা দিয়েই ব্রাশ করবা?”
মেঘালয় কিছু না বলে দ্রুত ব্রাশ করে নিলো। তারপর বাথরুমের দরজা আটকিয়ে দিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিলো। মিশুকে শাওয়ারের নিচে দাড় করিয়ে দিয়ে ওর হাতে সাবান লাগাতে লাগাতে বললো, “টি শার্ট টা কি খুলবা নাকি লজ্জা পাবা?”
মিশু লাজুক গলায় বললো, “খুব লজ্জা পাবো।”
মেঘালয় একটা টাওয়েল ওর হাতে দিয়ে পিছন ফিরে বললো, “শার্ট খুলে এটা পড়ে নাও।”
– “কেন?”
– “তোমার উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের ময়লা সাফ করার দায়িত্ব নিয়েছি না?”
বলেই হো হো করে হেসে উঠলো। মিশু লজ্জা পেয়ে বললো, “কি খারাপ!”
টাওয়েল পড়ে নিয়ে মেঘালকে ফিরতে বললো। মেঘালয় ওর দিকে ফিরে একবার আপাদমস্তক তাকালো। মিষ্টি করে হাসি দিয়ে মিশুর গায়ে সাবান লাগাতে শুরু করলো। ভালোমতো শ্যাম্পুও করে দিলো চুলে। মিশু হাসতে হাসতে বললো, “আমি আমার জীবনে কক্ষনো এত ভালোমতো গোসল ই করিনি বোধহয়। আমিতো চুলে শ্যাম্পুও করতে পারিনা।”
– “পারতে হবেনা, আমি আছি কি করতে?”
মিশুর শ্যাম্পু করা হয়ে গেলে ওকে শাওয়ারের নিচে দাড় করিয়ে দিয়ে নিজে শ্যাম্পু করতে লাগলো। মিশু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয়ের উন্মুক্ত বুকে ঘন লোমগুলো ভিজতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন কেমন যেন করছে। হা করে সেদিকে চেয়ে রইলো অনেক্ষণ। মেঘালয়ের গোসল শেষ করতে মাত্র আড়াই মিনিট সময় লাগলো। মিশু একদম অবাক! একটা ছেলে এত তাড়াতাড়ি কিভাবে গোসল করতে পারে!
মেঘালয় প্যান্ট বদলে টাওয়েল পড়ে নিলো। তারপর মিশুকে কোলে নিয়ে রুমে এলো। মিশু মেঘালয়ের ভেজা পায়ের দিকে চেয়ে আছে হা করে। এত সুন্দর কারো পা হতে পারে! পা ভিজে লোমগুলো পায়ের সাথে আটকে আছে। দারুণ রকমের সুন্দর লাগছে। একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
মেঘালয় লাগেজ খুলে একটা শাড়ি বের করে বিছানার উপর রাখলো। মিশুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ভেজা চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগছে ওর। ভেজা চুলে মিশুর চেহারাটাই বদলে গেছে একদম। স্নিগ্ধতা ছেয়ে গেছে চেহারায়। মেঘালয় অনেক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলো। তারপর গভীর আবেশে ঠোঁটে চুমু খেলো একটা। শাড়িটা মিশুকে পড়িয়ে দিয়ে তোয়ালে দিয়ে ওর চুলগুলো পেঁচিয়ে মাথার উপরে তুলে দিয়ে বললো, “ভেজা চুল কিছুক্ষণ এভাবে পেঁচিয়ে রাখবা তোয়ালে দিয়ে।”
– “কেন?”
– “এটা চুলের জন্য উপকারী। আর ভূলেও কখনো ভেজা চুল আচড়াবা না। মনে থাকবে?”
– “হুম থাকবে।”
মেঘালয় মিশুকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে কাজল নিয়ে ওর হাতে দিয়ে বললো, “জাস্ট কাজল, আর একটা ছোট্ট কালো টিপ। ওকে?”
– “ওকে।”
– “কখনো মেকাপ করবা না, যখন লাগবে আমিই বলবো। ওকে?”
– “ওকে।”
মেঘালয় নিজে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বডি স্প্রে করলো। মিশু চেয়ে চেয়ে দেখছে। মিশুর শাড়ির কালারের সাথে ম্যাচিং করে একটা টি শার্ট ও জিন্স পড়লো। এখন বেশ দেখাচ্ছে মেঘালয়কে। ভেজা চুলগুলো আচড়ে নিলো। তারপর দুবার মুখটা ভালোমতো দেখে বললো, “দাড়ি বড় হয়ে গেছে।”
মিশু বললো, “ওটাতেই তোমাকে সুন্দর লাগছে। ক্লিন সেভে ছেলেদের ছিলা মুরগির মতো লাগে।”
মেঘালয় মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “কি বললা! কি মুরগি?”
মিশু ফিক করে হেসে ফেললো, “সরি, কিছু বলিনি। তোমাকে না এখন বিপজ্জনক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে।”
– “খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে?”
– “হ্যা।”
মেঘালয় হেসে উঠলো। তারপর মিশুর সামনে এসে বসলো। মিশুর মাথা থেকে টাওয়েল খুলে নিয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিলো। তারপর বললো, “নাস্তা তো করতে হবে। কিন্তু তোমাকে এখন যে পরিমাণ সুন্দর লাগছে, চাইনা আমার বন্ধুরা আমার মিষ্টি বউটাকে দেখুক। তোমাকে শুধু আমি দেখবো।”
বলেই এগিয়ে এসে মিশুর মাথার পিছনে হাত দিয়ে এগিয়ে এসে ঠোঁট দুটো আরেকবার স্পর্শ করলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মিশুর হাত ধরে বললো, “আসো, হাটতে পারবা তো?”
– “হুম পারবো ”
মেঘালয়ের হাত ধরে মিশু ড্রয়িংরুমে এলো। খাবার টেবিলে তিনবন্ধু নাস্তা নিয়ে বসে আছে ওদের জন্য। ওদেরকে একসাথে দেখে ওরা একবার মুগ্ধ হলো। দুটিকে সত্যিই বেশ মানিয়েছে। শাড়িতে মিশুকে বেশ বড়বড় লাগছে।মনেহচ্ছে মেয়েটা হুট করেই অনেক বড় হয়ে গেছে।
পূর্ব বললো, “গুড মর্নিং ভাবি।”
মিশুও হেসে গুড মর্নিং জানালো। মিশু বসামাত্র ওরা নাস্তা খেতে আরম্ভ করলো। মেঘালয় বললো, “আমাদের জন্য বসে আছিস কেন? তোরা খেয়ে নিতি।”
– “অতটাও স্বার্থপর ভাবিস না আমাদের। তোদেরকে রেখে খেয়ে নিবো?”
মিশু হাসলো। মেঘালয়ের বন্ধুরাও অনেক ভালো। কত হেল্পফুল, দায়িত্ববান, আর অনেক দুষ্টুও।
নাস্তা খেতে খেতে আরাফ বললো, “মেঘালয় একটা অফার আছে তোদের জন্য। তুই একসেপ্ট করবি কিনা তোর ব্যাপার। তবে করতে পারিস।”
– “বলে ফেল।”
আরাফ বললো, “আব্বু একটা চা বাগানের ব্যাপারে কথা বলছে তো, রাতে ফোন দিয়ে আমাকে দেখে আসতে বললো। আমিও বললাম, ফ্রেন্ড সার্কেল নিয়ে গিয়ে দুটো দিন ঘুরে আসি। আব্বু হোটেলে দুটো রুম বুকিং এর টাকা দিয়েছে। আমরা ভাবছি, প্রথম দিন হোটেলে থাকবো আর দ্বিতীয় দিন চা বাগানের বাংলোয়। শীত প্রায় এসে গেছে, চা বাগানের ভিতরে তোর মধুচন্দ্রিমা দারুণ কাটবে, আগামী দুদিনের মধ্যেই আবার পূর্ণিমা আছে।”
মেঘালয় একবার মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “যাবা?”
মিশু আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললো, “সত্যি! আমি কক্ষনো চা বাগানে যাইনি। মজা হবে অনেক। কিন্তু তুমি না বললা সাজেকে যাবা? সাজেকে গেলে অনেক খরচ হবে, এমনিতেও অনেক খরচা হলো। আবার সিলেট যাবো? না থাক।”
মেঘালয় একটু ঝুঁকে এসে বললো, “খরচ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা। যেতে চাও কিনা সেটা বলো?”
মিশু চুপ করে রইলো। মেঘালয় বেশ বুঝতে পারছে সে যেতে কি পরিমাণ আগ্রহী। মেয়েটা নেভারল্যান্ডে গিয়েই যে খুশি হয়েছিলো, একবার ওকে ডাউকির মেঘালয় দেখিয়ে আনতে হবে। বিছানাকান্দির শীতল জলে একবার ডুব দিলেই সুখে মরে যেতে চাইবে। রাতারগুল দেখলে তো বোধহয় বিস্ময়ে কথাই বলতে পারবে না। এসব ভেবে মেঘালয় হাসলো।
মিশু বললো, “হাসছো কেন?”
– “এমনি। আমরা তাহলে কবে যাচ্ছি?”
আরাফ বললো, “কালকে সকালে বের হই?”
সায়ান খাবার চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করল, “আজকে রাতে বের হলে কি হয়?”
– “দূর ব্যাটা, রাত্রে জার্নি করে গিয়ে সারাদিন ভাবি ঘুমাবে নাকি ঘুরবে? তাছাড়া ওদের নতুন বিয়ে হইছে, বিয়ের পরের প্রত্যেকটা রাত অনেক দামী, চাইনা সেটা গাড়িতে নষ্ট হোক।”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “নাহ, আজকে রাতেই বের হবো। তিনদিনের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে রে। আমার আবার প্রোগ্রাম আছে টিএসসি তে।”
ওরা একটু ভেবে বললো, “আচ্ছা ঠিকাছে। তবে তাই হোক। আজকে রাতেই যাচ্ছি আমরা। গাড়ি কার টা নেবো?”
মেঘালয় বললো, “আমার টাই নিস। তেল ভরবে পূর্ব।”
পূর্ব লাফিয়ে উঠে বলল, “আমি ক্যান?”
– “থাকার দায়িত্ব আরাফের,গাড়ি আমার, তেল তোর।”
– ” আর খাওয়া?”
– “খাওয়া সায়ানের।”
সায়ান চেঁচিয়ে উঠলো, “সবচেয়ে বেশি খরচ হয় খাওয়া দাওয়ায়। সেটাই আমার?”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “আমাদের সদ্য বিয়ে হইছে ভাই। আমাদের জন্য তোদের একটু ছাড় দেয়া উচিৎ না বল? নতুন সংসার পাততে চলেছি।”
সায়ান মুখ কাচুমাচু করে বললো, “অগত্যা.. কি আর করার? বন্ধু মানুষ, ভাবি আছে তো কিছু বললাম না।”
হাসাহাসি করতে করতে ওরা নাস্তা করার পর্ব শেষ করলো।

৩৪.
রৌদ্রময়ীকে নাস্তা এনে দিয়ে নিখিল বললো, “এখন যাবি কোথায়?”
– “জানিনা রে।”
নিখিল একটু কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, “দুটো দিন এখানে থাক। তারপর দেখা যাবে।”
রোদ বেশ অবাক হয়ে গেলো। নিখিলের বুকের ভেতর কেমন দহন চলছে সেটা ও বেশ ভালো করেই জানে। বুঝতে পারছে সবই। ছেলেটার চেহারা একরাতেই কেমন করুণ হয়ে গেছে। তবুও কত সুন্দর ভাবে বলছে থেকে যেতে।
নিখিল বললো, “কি ভাবছিস? খেয়ে নে।”
– “তুই খেয়েছিস?”
– “আমি খাবো না,রুচি নেই খাওয়ার।”
রোদ জানে নিখিল কেন খেতে চাইছে না। নিখিল কে জোর করে খাওয়াতে পারলে হয়। যদিও ওর নিজের ও খেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও নিখিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো, “খেয়ে নে প্লিজ।”
– “বাদ দে।আমি খাবো না,ভালো লাগছে না খেতে।”
– “নিখিল প্লিজ,তুই না খেলে আমিও খাবো না।”
নিখিল একবার রাগত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললো, “ঢং আমার একদম ই ভালো লাগেনা। চুপচাপ খেয়ে নে।”
রোদ আরো জোরালো গলায় বললো, “তুই না খেলে আমি খাবো না একবার বলেছি।”
– “আমার উপর কিসের অধিকার খাটাচ্ছিস তুই?”
– “কোনো অধিকার খাটাচ্ছি না, মানবতার খাতিরে খেতে বলছি।”
– “যে বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে ছোট বোনের লাইফটা শেষ করে দেয় তার আবার মানবতা।”
কথাটা খুব খারাপ লাগলো রোদের। তবুও কিছু মনে করলো না। এখন এই কথাটা বারবার শুনতে হবে ওকে। তবুও মুখ বন্ধ রাখতে হবে। এখন কিছুতেই মুখ খোলা যাবেনা, কিছুদিন যাক তারপর নিখিলকে সব বলে দিবে ও।
নিখিল দেখলো রোদ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তারমানে এই মেয়ে খাবেনা। প্রচুর জেদি একটা মেয়ে। কি যেন ভেবে নিখিল নিজেও এক প্লেট খাবার নিয়ে এসে ওর পাশে বসে খেতে শুরু করলো। ওর খাওয়া দেখে রোদ হেসে খেতে শুরু করলো।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুই বন্ধু মিলে টুকটাক কথাকাটি আর ঝগড়াও হলো। অনেক কিছু নিয়ে যুক্তি তর্কও হলো। নিখিল বারবার করে শুনতে চাইছে কেন বাড়ি থেকে পালালো রোদ? কিন্তু রোদ কিছুতেই সেটা বলতে চাইছে না। কটা দিন সময় নিয়ে তারপর বলবে বলছে। বাধ্য হয়েই আশা ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো নিখিল।
রোদ একাই বসে রইলো বিছানার উপর। এখানে কয়টা দিন আপাতত নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, তারপর ঢাকায় চলে গেলে ভালো হবে। কিন্তু কি করবে সে গিয়ে? চাকরী পেতেও তো সময় লাগে,সুযোগ লাগে।
বসে বসে এসব চিন্তা করতে লাগলো।
৩৫.
নাস্তার পর্ব শেষ করেই মেঘালয় মিশুকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লো। ওর বন্ধুরাও ব্যাগ গুছানোর জন্য যে যার বাড়িতে চলে গেলো। বিকেল অব্দি ঘুমিয়ে সবাই সন্ধ্যায় চলে আসবে ব্যাগ নিয়ে। কিন্তু মেঘালয় মিশুকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে এটা কাউকেই জানালো না। এমনকি মিশুকেও জানালো না। মিশু খুব কৌতুহলী হয়ে উঠছে। মেঘালয় নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে আর ও পাশে বসে আছে।
গাড়ি এসে থামলো একটা চমৎকার বাড়ির সামনে। মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে মিশুকে নামতে বললো। গাড়ি থেকে নেমে অনেক্ষণ মিশু চেয়ে রইলো বাড়িটার দিকে। ডিজাইন, রং, গ্লাস সবমিলিয়ে অন্যরকম সুন্দর একটা বাড়ি! এটা আবার কার বাড়িতে নিয়ে এলো মেঘ? বাড়িটার সৌন্দর্য দেখেই তো মিশু নির্বাক হয়ে যাচ্ছে। মুগ্ধতা চেপে রাখতে পারছে না।
মেঘালয় ওর হাত ধরে বাড়ির প্রধান দরজায় আসলো। দরজায় এসে চাবি দিয়ে লক খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। পুরো বাড়ির সৌন্দর্য চোখে পড়ার মত। সাজসজ্জা অনেক আকর্ষণীয়! কিন্তু বাড়িটা কার কিছুতেই বুঝতে পারছে না মিশু। মেঘালয়ের বাড়ি তো মোহম্মদপুরে, আর মিশু নিজেই ওর বাড়ি চেনে। একদিন ওর বাড়ির সামনে দিয়েই বাইকে করে মেঘালয় মিশুকে বাসায় পৌছে দিয়ে এসেছে। তাহলে এটা আবার কার বাড়ি!
মিশু দুবার জিজ্ঞেস করলো মেঘালয়কে। কিন্তু মেঘালয় কোনো উত্তর দিলো না। মিশুকে কোলে তুলে নিয়ে একটা রুমে এসে দরজা আটকিয়ে দিলো। মিশুকে বিছানার উপর বসিয়ে দিতেই অনেক দূর নিচে তলিয়ে গেলো ও। অবাক হয়ে বললো, “এত সফট বিছানা!”
মেঘালয় ঝাঁপিয়ে পড়লো মিশুর উপর। অনেক্ষণ ধরে দুজনের খুনসুটি চলতে লাগলো। একে অপরকে বালিশ দিয়ে মারামারি করছে, একটা বালিশের তুলো ইতিমধ্যে পুরো ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। বালিশের তুলো উড়িয়ে মারামারি করতে এত ভালো লাগে আগে জানতো না মিশু। ও তুলা গুলো দুহাতে তুলে মেঘালয়ের মাথার উপর দিয়ে দিলো। মেঘালয়ের মাথা,চুল,মুখ শার্ট সব তুলা দিয়ে একাকার হয়ে গেছে।
মিশু এগিয়ে এসে মেঘালয়ের কলার টেনে ধরে ওকে কাছে নিয়ে বললো, ” এটা কার বাড়ি বলছো না যে? বাড়ির লোকজন সবাই কোথায়?”
– “ওহ হো, দাড়াও একটা ফোন করে আসি।”
মেঘালয় বাইরে গিয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। কি এমন কথা যা মিশুর সামনে বলা যায়না! কৌতুহল চেপে গেলো মিশু। মেঘালয় এসে বললো, “বাইরে যাবো।”
মিশুর জানতে ইচ্ছে করছে কোথায় যাবে কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলো না। মেঘালয় আলমারি খুলে একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার এনে দিয়ে বললো, “পড়ে নাও দ্রুত।”
– “এগুলো তো তোমার মনেহচ্ছে। আমি কেন পড়বো?”
– “উফফ পড়ো তো। তাড়াতাড়ি।”
মিশু থতমত খেয়ে গেছে। গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে দেখলো অনেক ঢোলা ঢোলা লাগছে। আর প্যান্ট টা হচ্ছে না কিছুতেই। সেটা পড়ে খুবই হাস্যকর দেখাচ্ছে মিশুকে।
মিশু মুখটা কাচুমাচু করে বললো, “কিরকম বাজে দেখাচ্ছে! ছি, তুমি কেন পড়তে দিলা এটা?”
মেঘালয় মিশুকে দেখে হেসেই খুন। মেঘালয়ের গেঞ্জির ভিতর ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা ওর, এত বেশি ঢোলা আর লম্বা। প্যান্ট পড়ে আরো হাস্যকর লাগছে। মিশু মুখটা বিকৃত করছে দেখে মেঘালয় হো হো করে হাসছে। মেঘালয় বললো, “খারাপ লাগছে?”
– “রাগ লাগছে।”
– “তাহলে খুলে ফেলে দাও। খালি গায়ে আসো।”
– “ছি,…”
মিশুর মুখ দেখে আবারো হেসে উঠলো মেঘালয়। তারপর ওকে কোলে তুলে নিয়ে হাটতে শুরু করলো। মিশুকে বললো চোখ বন্ধ করে রাখো। একদম খুলবা না। মিশু দুহাতে চোখ চেপে ধরে আছে। খুব হাসি পাচ্ছে,রাগও হচ্ছে। এই টি শার্ট পড়া অবস্থায় কারো সাথে দেখা হয়ে গেলে সে নির্ঘাত হাসবে। বলবে মেঘালয়ের বউটা খুব বাজে দেখতে। এসব ভেবে ভেবে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে মিশুর। কিন্তু মেঘালয় কি করতে চাইছে সেটা এখনো বুঝতে পারছে না।
মেঘালয় মিশুকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো, “এবার চোখ খোলো।”
মিশু চোখ খোলামাত্রই বিস্ময়ে ওর চোখ বড়বড় হয়ে গেলো! সুইমিংপুল! একদম নীল রঙের পানি, তরঙ্গ খেলা করছে উপরে, চারিদিকে সবুজ গাছপালায় ঘেরা! উফফ এত্ত সুন্দর কেন!
মিশু খুশিতে মেঘালয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “পুল! আমি জীবনেও কখনো এরকম পুল সামনাসামনি দেখিও নি। এত সুন্দর সুইমিংপুল কিভাবে হয়? ন্যাচারাল লাগছে, চারদিকে এত ঘন গাছ!”
মেঘালয় মিশুকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, “বউ নিয়ে রোমাঞ্চ করবো তো, সেজন্য এত ঘন করে গাছ লাগানো হয়েছে।”
– “তুমি খুব খারাপ! বাজে বাজে খুব বাজে একটা লোক।”
মেঘালয় হাসতে হাসতে দুইপা পিছিয়ে গেলো। মিশু অবাক হয়ে সবকিছুর সৌন্দর্য দেখছে। সত্যিই পানিগুলো একদম নীল, মাথার উপরে নীলাকাশ দেখা যাচ্ছে। আকাশে তুলোর মত মেঘ উড়ছে। খুব ভালো লাগছে মিশুর। এমন সময় মেঘালয় পানিতে লাফিয়ে পড়লো। ঝাপ দিয়েই একদম সাঁতরানো আরম্ভ করে দিয়েছে। মিশু হা করে চেয়ে চেয়ে দেখছে। নীল পানির ভেতরে মেঘালয়ের মুখটা যখনি উকি দিচ্ছে,অন্যরকম ভালো লাগা ছেয়ে যায় ভেতরে। মেঘালয় কিছুক্ষণ সাতরিয়ে মিশুর সামনে এসে ওকে নামতে বললো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকছে ওকে। কিন্তু মিশু চেয়ে আছে মেঘালয়ের রোমশ বুকের দিকে। ছেলেটা কখন খালি গা হয়ে লাফ দিয়েছে খেয়াল ই করেনি মিশু। কিন্তু ওর খোলা বুকে লোমগুলো ভিজে ভয়ংকর সুন্দর দেখাচ্ছে। চুলগুলো ভিজে গেছে, চুল থেকে গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। হাতের লোমগুলোও ভিজে হাতের সাথে লেপ্টে গেছে। এত সুন্দর কেন মেঘালয়! মিশু মুগ্ধতা লুকিয়ে রাখতে পারছে না।
মেঘালয় ওর হাত টেনে ধরে কোলে তুলে নিয়ে সুইমিংপুলে নামালো। মিশু ওর কোলেই দুহাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে দেখছে মেঘালয়কে। ঘোর লেগে যাচ্ছে ওর। মেঘালয় সত্যিই অনেক সুন্দর! মেঘালয়ের শরীরে বিন্দু বিন্দু লেগে লাগা সমস্ত জল গুলো খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
মিশু বললো, “আমার হিংসে হচ্ছে মেঘ।”
– “কেন?”
– “এই পানিগুলোর কত সৌভাগ্য, তারা তোমার চোখে, গালে, মুখে, ঠোঁটে সবখানে লেগে আছে। আমি পারছি না।”
মেঘালয় একদম অবাক হয়ে গেলো মিশুর কথায়। ওর চোখের মায়ায় তলিয়ে যাচ্ছে মেঘালয়। চোখে চোখ রেখে বললো, “এত ঘোর কেন তোমার চোখে?”
– “আমার এত ঘোর ঘোর লাগে ক্যান মেঘ?”
– “তোমার ও কি পানির মত আমার চোখে,গালে ঠোঁটে সবখানে লেগে থাকতে ইচ্ছে করে?”
– “হুম।”
মেঘালয় মিশুকে নিয়ে পানির ভেতর তলিয়ে গেলো। মিশু ওর কোলে,মনেহচ্ছে শূন্যে ভেসে আছে ও। মেঘালয়ের স্পর্শ অনুভব করছে তীব্রভাবে। আর সুখের অন্য এক রাজ্যে প্রবেশ করছে দুজনে। আবেশে চোখ বুজে আসে মিশুর। হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আসে। মেঘালয় ওকে জড়িয়ে রেখেছে, আটকে রেখেছে দুহাতে আর ঠোঁটের কোমল বাঁধনে। মিশুর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, মেঘালয় ওকে আবার ভাসিয়ে তুললো পানির উপরে। মেঘালয়ের গায়ের উপর ভর দিয়েই মাথাটা উপরে তুলে হাফাতে লাগলো মিশু। ঘনঘন নিশ্বাস নিতে লাগলো। মিশু চোখ মেলে তাকাতে পারছে না। এতক্ষণ মেঘালয় ঠিক কি কি করেছে বুঝতে পারেনি ও। কিন্তু কেবলই মনেহচ্ছে, এত সুখ সুখ লাগে কেন!
মেঘালয় মিশুর মুখের উপর নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বললো, “ঠিক আছো?”
মিশু কথা বলতে পারলো না। মেঘালয় তীরে এনে ওকে পুলের শানের সাথে ঠেস দিয়ে দাড় করিয়ে দিয়ে মিশুর দুই পা নিজের দুই কাঁধের উপর তুলে নিলো। মেঘালয়ের কাঁধের উপর পা তুলে দিয়ে দুহাতে ওকে হালকা করে ধরে রইলো মিশু। মাথাটা ভেসে আছে পানির উপরে। মিশু চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে সাদা মেঘের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে আর প্রাণভরে নিশ্বাস নিচ্ছে। মেঘালয় দুহাতে ওকে আকড়ে ধরে আছে, আর ও দুইপা মেঘালয়ের কাঁধের উপর তুলে দিয়ে আরামে পানির উপর শুয়ে আছে।
স্বাভাবিক হওয়ার পর মেঘালয় বললো, “কেমন লাগছে মেঘবতী?”
মিশু এগিয়ে এসে মেঘালয়কে জড়িয়ে ধরে ওর রোমশ বুকে নাক ডুবিয়ে বললো, “আগে জানতাম দম বন্ধ হয়ে আসলে মানুষের কষ্ট হয়। কিন্তু দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতিটাও সুখের হতে পারে এটা আজ প্রথম জানলাম। এত সুখ সুখ লাগে কেন মেঘ?”
মেঘালয় শক্ত করে মিশুকে জড়িয়ে ধরে রইলো। মিশুকে পিঠের উপর নিয়ে পুরো পুল সাতরিয়ে আসলো একবার। মিশু পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারো ওকে নিয়ে জলের ভেতর ডুব দিলো মেঘালয়। মিশু সমস্ত শরীর ছেড়ে দিয়ে আলগা হয়ে পুরো ভরটাই মেঘালয়ের উপর দিয়ে দিয়েছে। মেঘালয় ওর কোমল দেহটাকে নতুন নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করে দিয়েছে। মিশুর কেবলই মনেহচ্ছে সে স্বপ্নের রাজ্যে ভাসছে।
এভাবে কতক্ষণ চলে গেলো কেউই বলতে পারেনা। মেঘালয় মিশুকে কোলে নিয়ে যখন তীরের দিকে আসলো তখন ও মিশুর চোখ বন্ধ। মেঘালয় মিশুর মুখটা একহাতে ধরে বললো, “মিশু, আমি কি অন্যায় করে ফেলেছি?”
মিশু মেঘালয়কে জাপটে ধরে বললো, “আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না বলে দিচ্ছি। তুমি আমাকে ফেলে কক্ষনো মুহুর্তের জন্যও দূরে যাবেনা।”
মেঘালয় হেসে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। বললো, “যাবো না রে পাগলী। ছেড়ে গিয়ে এত ভালোবাসবো কাকে?”
মিশু আস্তে আস্তে চোখ মেললো। এখনো ওর চোখে ঘোর, মায়া! ওর চোখের দিকে তাকালেই তো খুন হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয় মেঘালয়ের।
মিশু একা উঠতে পারলো না। মেঘালয় টেনে তুললো ওকে। তারপর আবারো ওকে কোলে নিয়ে বাসার ভিতরে গিয়ে ঢুকলো। বাথরুমে মিশুকে ঢুকিয়ে দিয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে দিলো।
মিশু ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে দেখে মেঘালয় একটা ব্লাক শার্ট ও প্যান্ট পরে বডি স্প্রে দিয়ে একদম জেন্টলম্যান সেজে বসে আছে। কে বলবে এই ছেলেটা একটু আগে কি পরিমাণ ভালোবাসার অত্যাচার চালিয়েছে ওর উপর? মিশু এসে বিছানার উপর বসতেই অনেক দূর তলিয়ে গেলো। এত সফট বিছানায় কিভাবে কেউ ঘুমায় ভাবতে পারেনা ও।
মেঘালয় একটা শাড়ি ও ব্লাউজ এনে দিয়ে বললো, “এটা পড়ে নাও।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “কোথায় পেলে এটা? কার শাড়ি?”
মেঘালয় প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ওকে যত্ন করে শাড়ি পড়িয়ে দিলো। মিশু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা সাজুগুজু করে নিলো। ব্লাউজটা একদম ফিট হয়ে গেছে। ও বারবার জানতে চাইছে এটা কার বাড়ি? বাড়িতে কোনো লোকজন নেই কেন? মেঘালয় কোনো প্রশ্নের উত্তর ই দিলোনা। শুধু হাসলো।
মিশু সাজুগুজু করে সোফার উপর বসে রইল চুপ করে। মেঘালয় আলমারি খুলে কি যেন দেখছে। বিছানার উপরে অনেক গুলো টাকা রাখলো। মিশু হা করে চেয়ে আছে সেদিকে। মেঘালয় একটা রুমালের মত মাফলার জাতীয় কিছু গলায় বেধে বললো, “দাগ গুলো দেখা যাচ্ছে?”
– “না।”
মেঘালয় একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। এমন সময় দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। মেঘালয় মিশুকে রুমেই বসতে বলে দরজা খুলতে চলে গেলো। মিশু একাই বসে রইলো চুপচাপ। রুমটা অনেক সুন্দর, শুভ্রতা ছেয়ে আছে পুরো রুমে। কার বাড়ি এটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না ও।
মেঘালয় এসে মিশুর হাত ধরে ওকে বসার ঘরে নিয়ে আসলো। বসার ঘরে একজন মধ্যবয়স্ক লোক ও মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। ওনারা এইমাত্র অফিস থেকে ফিরলেন সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মেঘালয় মিশুকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, “তোমাদের পুত্রবধূ।”
মিশুর চোখ কপালে উঠে গেলো কথাটা শুনে। তারমানে এনারা মেঘালয়ের বাবা মা! আর এত বিশাল আর সুন্দর বাড়িটা মেঘালয়ের নিজের! অবিশ্বাস্য লাগছে সবকিছু। মেঘালয় তো বলেছিলো এখনি বাসায় বিয়ের কথা জানাবেই না। তাছাড়া এটা কিভাবে ওর বাড়ি হতে পারে! সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
চলবে..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *