অনুভূতি ! পর্ব_১৩

অনুভূতি
পর্ব -১৩
মিশু মনি

অনুভূতি সকল পর্ব 

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

৩৮.
মেঘালয় মিশুকে সিটে শুইয়ে দিয়ে ওর মাথাটা নিজের কোলের উপর রাখলো। ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, “তুমি ঘুমোও।”
মিশুর মোটেও ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। মেঘালয় জোর করে ওকে ঘুম পাড়াতে চাইছে। বারবার বলছে, “কালকে সারাদিন ঘুরতে হবে। তুমি ঘুমাও সোনামণি।”
বাধ্য হয়েই ও ঘুমানোর ভান করে চোখ বন্ধ করে রইলো। মেঘালয় ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর মেঘালয় ওকে জিজ্ঞেস করলো, “ঘুমাইছো?”
মিশু কোনো সাড়া দিলো না। জেগে আছে বুঝতে পারলে মেঘালয় আবারো জোর করে ঘুম পাড়াতে চাইবে। সেজন্যই ও চুপ করে রইলো।
মেঘালয় যখন বুঝতে পারলো মিশু ঘুমিয়ে গেছে তখন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে এসি বাড়িয়ে দিলো। ব্যাকসিট থেকে হাত বাড়িয়ে চাদর নিয়ে মিশুর গায়ের উপর দিয়ে দিলো। তারপর আবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মিশুর চোখে পানি এসে যাচ্ছে। প্রায় আধ ঘন্টা ধরে ছেলেটা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এভাবে কেয়ার করতে হয় বুঝি? মানুষ নাকি দুই অবস্থায় পড়লে কান্না করে। অধিক সুখে আর অধিক কষ্টে! ইদানীং মিশুর শুধু সুখেই কান্না পায়। এমন করে কেউ কেয়ার করলে সুখী না হয়ে উপায় আছে!
সায়ান জিজ্ঞেস করলো, ” ভাবি ঘুমাইছে?”
মেঘালয় জবাব দিলো, “হুম, বাচ্চাটা ঘুমালো।”
– “হা হা হা, বাচ্চাটা? রাতেও কি বাচ্চাটা বাচ্চাটাই ছিলো?”
– “কথায় বলেনা ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে? বাচ্চা তো সবসময় বাচ্চাই। সে কি বাসর ঘরে হুট করে বড় হয়ে যাবে নাকি?”
পূর্ব বললো, “যাই বল,মিশুর মত আনাড়ি বউ পাওয়াটাও সৌভাগ্য। মেয়েটা কিচ্ছু বুঝেনা। হাতে ধরে সবকিছু শিখিয়ে দিবি,প্রেম শেখাবি, তারপর দেখবি তোর চেয়েও বেশি বেশি করে তোকে ভালোবাসবে।”
মেঘালয় হেসে বললো, “আমার এতেই হবে। সবসময় যে ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসাই লাগবে এমন টা তো নয়। মিশু আজীবন এমন পাগলী আর অবুঝ থাকুক না। আমি একাই না হয় ভালোবাসবো। আমার ভালোবাসা দিয়েই সবটুকু উসুল করে নিবো।”
আরাফ বললো, “সে কি তোকে ভালোবাসে না? লাইফের প্রথম প্রেমে পড়েছে তো, আস্তে আস্তে দেখিস কেমন পাগল হতে শুরু করে।”
মেঘালয় বললো, “আমি চাইনা ও পাগল হোক। ও আমার পাগলী হয়েই থাকুক। তবে ও আমাকে একটু দূরে সরিয়ে দিলেই কেমন যেন আমার মাথা খারাপ হয় যায় রে। আজকে ও আমাকে রেগে বলেছে, আমাকে একা থাকতে দাও কিছুক্ষণ। যাও এখান থেকে। বিশ্বাস কর বাইরে এসে আমি কান্না করে ফেলছি। মেঘালয়ের সমস্ত নিয়ম ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে মেয়েটা। আমি আমার নিয়মের বাইরে গিয়ে যত সব কাণ্ড করে ফেলছি।”
সায়ান বললো, “এরকম ই থাকিস আজীবন। মিশুর জন্য এটা খুব জরুরি। মানুষ বড় হলে নাকি চেঞ্জ হয়ে যায়। তুই আবার ওই নিয়মের মধ্যে ঢুকে যাস না যেন। তাহলে তোকে নিয়ে যত প্রাউড ফিল করি, সব ভেস্তে যাবে আমাদের।”
মিশুর চোখ থেকে পানি পড়ছে। মেঘালয় আর ওর বন্ধু বান্ধবদের কথা শুনে আরো সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছে। মেঘালয়ের মত একজনকে পাওয়াটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। অনেক ভাগ্য করে ওকে পেয়েছে মিশু। এসব ভেবে ভেবে কান্না এসে যাচ্ছে। মেঘালয় ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আরামে চোখ বুজে রইলো ও।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানেনা। ঘুম ভাংলে চোখ কচলে উঠে বসলো। মেঘালয় বললো, “ঘুম হলো মহারাণী’র? আর কিছুক্ষণ ঘুমাতে।”
মিশু মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। ওর বুকে মাথা রেখে শুয়ে বললো, “আর ঘুম আসছে না।”
কথাটা বলা শেষ হতে না হতেই আবারো ঘুমিয়ে গেলো। মেঘালয় হাসলো। পাগলী একটা। এক হাতে ওকে ধরে রইলো মেঘালয়। হাতটা মিশুর কাঁধের উপর দিয়ে নিয়ে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মেঘালয় একটু নড়তেই মিশু রেগে বললো, “এত নড়াচড়া করো কেন?”
মেঘালয় হেসে ফেললো। প্রায় এক ঘন্টা যাবত ওর কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে আর মেঘালয় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে আবার মেঘালয়কেই ঝাড়ি মারে? হা হা হা।
হাসি চেপে গেলো মেঘালয়। পাগলিটা ঘুমাক আরাম করে। কাঁধটা একটু সোজা করে নিতে পারলে ভালো হতো তবুও আর একবার ও নড়লো না মেঘালয়। গাড়ির গান ও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মিশু ঘুমাচ্ছে বলে সবাই নিরবতা পালন করছে। মেঘালয় সিটে হেলান দিয়ে মিশুকে জাপটে ধরে ঘুমিয়ে গেলো।
গাড়ি ব্রেক কষতেই ঘুম ভাংলো মেঘালয়ের। একটা দোকানের সামনে এসে গাড়ি দাড় করিয়েছে। মেঘালয় কারণ জিজ্ঞেস করতেই সায়ান বললো, “দোস্ত চা খেয়ে আসি। খাবি?”
– “ইচ্ছে তো করছে। মিশু ঘুমাচ্ছে,ওর ঘুম ভাঙাবো না।”
– “আচ্ছা এনে দিচ্ছি।”
ওরা তিনজন গাড়ি থেকে নেমে গেলো। মেঘালয় বসে রইলো মিশুকে ধরে। মিশু একদম ওর বুকে মাথা রেখে গলা ধরে বাচ্চাদের মতন গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। দোকানের বারান্দায় লাইট জ্বলছে, লাইটের আলো এসে পড়েছে মিশুর মুখে। ঘুমন্ত মুখটা দারুণ আদুরে দেখাচ্ছে। কিছু চুল এসে পড়েছে মুখের উপর, আরো বেশি মায়াবতী লাগছে মেয়েটাকে। মেঘালয় অপলক ভাবে চেয়ে রইলো।
মিশু নড়েচড়ে উঠে চোখ মেললো। হাই তুলে বললো কোথায় আমরা?
– “বুঝতে পারছি না। দোকানে তো কোনো সাইনবোর্ড ও নেই। ওরা আসলে জিজ্ঞেস করে নিবো। তবে ঢাকা ছেড়েছি অনেক আগেই ”
– “ওরা কি বিড়ি খেতে গেছে?”
মেঘালয় হেসে বললো, “হুম। একটু আধটু খায় আরকি।”
– “তুমি খাওনা কেন?”
– “আমি আগে মাঝেমাঝে খেতাম। এখন আর ছোঁবো না।”
– “কেন ছোঁবে না?”
– “বারে, নিকোটিন নিলে আয়ু কমে যায়। আমিতো আর তাড়াতাড়ি মরতে চাইনা। আমি মরে গেলে এই পাগলী টাকে ভালোবাসবে কে?”
– “তাহলে আগে খেয়েছো কেন?”
– “আগে কি জানতাম আমার এমন একটা লক্ষী বউ জুটবে? জানলে তো কখনোই খেতাম না।”
– “অনেক আয়ু কমিয়ে ফেলছো। ধরে মাইর দেই?”
– “আচ্ছা দাও।”
– “নাহ, এরকম মিষ্টি ছেলেটাকে মারতে ইচ্ছে হয়?”
বলেই মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো। মেঘালয় বললো, “আরো একটু ঘুমাও মিশমিশ।”
– “নাহ। এখন ঘুমালে অন্যায় হয়ে যাবে। আমি জার্নিতে কখনোই ঘুমাই না।”
– “সেজন্যই তো সেদিন ট্রেনে আমার বুকের উপর পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলে।”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “সত্যি! ছি আমি কি নির্লজ্জ!”
– “অবশ্য ঘুমিয়েছো বলেই আরো পাগল হয়ে গেছি। তোমার ঘুমন্ত মুখে একটা মায়া আছে।”
পূর্ব এসে গাড়ির পাশে দাঁড়ালো। মেঘালয় জানালা খুলে দিলো। পূর্ব এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বললো, “ভাবির ঘুম ভেঙেছে? ভাবি কি খাবেন আপনি?”
– “চুমু”
কথাটা বলেই জিহ্বায় কামড় দিলো মিশু। ও মোটেও এটা বলতে চায়নি। এমনকি এটা চিন্তাও করেনি। তবুও কেন যে এটাই বেড়িয়ে এলো মুখ দিয়ে! লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। পূর্ব হেসে জানালা থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। তারপর দোকানের দিকে চলে গেলো। মেঘালয় মিশুর দিকে তাকিয়ে বললো, “ওর সামনে এটা বলতে হলো?”
মিশু মুখ কাচুমাচু করে বুঝিয়ে বললো। ওর একদম ই অজান্তে মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেছে কথাটা। লজ্জায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। মেঘালয় হাসছে মুখ টিপে। পাগলি একটা মেয়েকে নিয়ে কি যে করবে!
মিশু বললো, “একটু বাইরে নামতাম।”
– “এখানে নামা যাবেনা।”
– “কেন যাবেনা?”
– “শহরের বাইরে চলে এসেছি, একলা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই রিস্কি হয়ে যাবে। তার উপর আমরা চারজন ই ছেলে।”
– “তাহলে তাড়াতাড়ি গাড়ি ছাড়তে বলো।”
মেঘালয় জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে ওদেরকে ডাকলো। সায়ান একটা পলিথিন ব্যাগ ভর্তি খাবার এনে দিলো মেঘালয়ের হাতে। মিশু চেয়ে দেখে সেটার ভেতর দুটো চিপস,কয়েকটা চকোলেট, দই,বিস্কুট, কেক আরো কি কি যেন। ও অবাক হয়ে বললো, “এগুলা কে খাবে?”
সায়ান বললো, “তোমার জন্য।”
– “আমি এত্তগুলা খাবো? আমি কি ছোট মানুষ? এগুলা তো ছোট মানুষ খায়।”
সায়ান হেসে ফেললো। ব্যাগটা দিয়ে গাড়ির ভেতর চেপে বসলো। এবার ও মেঘালয়ের পাশেই বসেছে। পূর্ব ও আরাফ এসে সামনে উঠে পড়লো। এবার গাড়ি ড্রাইফ করে পূর্ব। পাশের সিটে আরাফ বসেছে। মিশু ব্যাগটা নিয়ে ইতিমধ্যে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। ও মেঘালয়কে বললো, “তোমরা সবাই এত্ত ভালো কেন!”
মেঘালয় উত্তরে হাসলো। মিশু একটার পর একটা খেতে শুরু করেছে। মেঘালয় ও চিপস নিচ্ছে একটু পরপর। সায়ান মেঘালয়কে বললো, “দোস্ত গান ধরছিস না কেন?”
মিশুও সাথে যোগ দিয়ে সায়ানকে গান গাইতে বললো। মিশুর কথা শুনে মেঘালয় গান গাইতে আরম্ভ করলো। সাথে ওর বন্ধুরাও যোগ দিলো,
“যার সনে যার ভালোবাসা..
যার সনে যার ভালোবাসা,
তারে ছাড়া প্রাণ বাঁচেনা…
পিরিতি এই জগতে জাতি কূলের ধার ধারেনা… পিরিতি..ই..ই
পিরিতি এই জগতে জাতি কূলের ধার ধারেনা… পিরিতি..ই..ই
এক জাইত্যা লতা আছে বাইতে বাইতে উঠে গাছে,
গাছ মরিলে লতা মরে, তবু লতায় গাছ ছাড়েনা…
পিরিতি এই জগতে জাতি কূলের ধার ধারেনা…”
গান শেষ করতেই মিশু হাত তালি দিয়ে বললো, “খুব সুন্দর করে গেয়েছো।”
মেঘালয় বললো, “তোমার জন্য ছিলো। আমি হচ্ছি সেই লতা,আর তুমি হচ্ছো গাছ। গাছ মরলে লতাও মরবে তবুও লতা গাছ ছাড়বে না।”
মিশু হেসে উঠলো- “গানটা সত্যি সুন্দর ছিলো! আরেকটা গান শুনাবা?
মেঘালয় আবারো গান ধরলো। একটার পর একটা গান চলতেই লাগলো। চারবন্ধু মিলে একসাথে গাইছে। মিশু জানালায় মাথা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে আর গান শুনছে। মেঘালয়ের হাতের মুঠোয় ওর হাত। মিশুর যে কি পরিমাণ আনন্দ হচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করা হয়ত সম্ভব নয়। ও বারবার খুশিতে মেঘালয়কে জাপটে ধরছে। মেঘালয় ওর উচ্ছ্বসিত মুখ দেখে হাসছে।
ভৈরবে এসে গাড়ি থামাল ওরা। রাত আড়াইটা বাজে। রেস্টুরেন্ট এ ফ্রেশ হওয়ার জন্য ঢুকলো। ফ্রেশ হয়ে এসে একটা টেবিলে বসে গেলো নাস্তা করতে। মিশুর একটুও খিদে পায়নি। তবুও মেঘালয় জোর করে খাওয়ালো ওকে। খাওয়া শেষ করে আবারো গাড়ি স্টার্ট দিলো। এবার সায়ান ড্রাইভ করছে। আরাফ মেঘালয়ের পাশে এসে বসে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, পূর্ব সামনের সিটে বসেই ঘুম। সায়ান ড্রাইভ করছে গান ছেড়ে দিয়ে।
মিশু মেঘালয়কে বললো, “আমি একটা কথা বলি তুমি কি রাগ করবা?”
– “না, বলো।”
মিশু বললো, “তুমি এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। একটু ঘুম দরকার না বলো? আমি বরং সামনের সিটে গিয়ে সায়ান ভাইয়ার সাথে বসে গল্প করি আর রাস্তা দেখতে দেখতে যাই? আমার বাইরেটা দেখতে খুব ভালো লাগে। এখানে বসে তো ভালোমতো দেখাই যায়না। আর আমি কথা বলতে থাকলে সায়ান ভাইয়ার ও ঘুম আসবে না। সবাই ঘুমাচ্ছো, সে একা একা গাড়ি চালাচ্ছে।”
মেঘালয় বললো, “আচ্ছা ঠিকাছে, সামনে গিয়ে বসো।”
পূর্ব পিছনে এসে মিশুর সিটে বসলো। আর মিশু ড্রাইভারের পাশে অর্থাৎ সায়ানের পাশে বসে ননস্টপ রেডিওর মত কথা বলতে শুরু করলো। মেঘালয় হাসছে ওর কথা শুনে। এভাবে বকবক করলে সায়ানের কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। বেচারার ভূলেও ঘুম আসবে না। সায়ান শুধু মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর গল্পের সাথে তাল মিলাচ্ছে। মেঘালয় সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। বাকিরা ঘুমিয়ে পড়তেই মিশু সায়ানের সাথে বকবকানি চালিয়ে যেতে লাগলো।
হোটেলে এসে পৌছল সকাল ছয়টার একটু আগেই। মিশু বাইরে নেমে দাঁড়ালো। বাকিদের ঘুম থেকে ডেকে তোলা হলো। মেঘালয় নেমে এসে মিশুকে জিজ্ঞেস করলো, “জার্নি কেমন লাগলো?”
– “খুব ভালো। সামনের সিটে বসতে দারুণ মজা তো। সবকিছু সুন্দর দেখা যায়! আমিতো আর একটুও ঘুমাই নি। তোমার ঘুম হলো?”
মেঘালয় মিশুর কানেকানে বললো, “স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। ‘মিশু রাজ্যের রাজকন্যা’ স্বপ্নে এসে প্রেম বুনছিলো।”
– “ওহ আচ্ছা।”
মিশু মাথা ঝাঁকিয়ে হাসতে লাগলো। ওরা হোটেলের ভেতরে ঢুকে লিফটের কাছে চলে এলো। লিফটে পূর্বরা তিনজন সহ আরো কয়েকজন উঠলো। মেঘালয় মিশুকে নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। পরেরবার মিশুকে নিয়ে লিফটে উঠলো মেঘালয়। এবার শুধু ওরাই দুজন ভেতরে। মেঘালয় একটানে মিশুকে বুকে টেনে নিলো। শক্ত করে এক হাতে ওর মাথাটা চেপে ধরে আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। মিশুর পেটে হাত রেখে আস্তে আস্তে চাপ দিতে দিতে ওকে উপরে তুলে গভীর আবেশে চুমু খেতে লাগলো।
লিফট থেকে বের হয়ে রিসিপশনিস্টের কাছে এসে মিশু লজ্জায় চোখ মেলতেই পারছিলো না। রুমের চাবি নিয়েই ওরা একসাথে রুমে চলে এলো। দুটো রুম পাশাপাশি। সায়ান, পূর্ব ও আরাফ একরুমে ঢুকে গেলো। মেঘালয় বলে দিলো “আট টায় দরজায় নক করবি।”
রুমে ঢুকে দরজা লক করেই মিশুকে কোলে তুলে এনে বিছানায় ফেলে দিলো মেঘালয়। মিশু লজ্জায় নীল বর্ণ ধারণ করলো। ও দুহাতে মুখ ঢেকে আঙুলের ফাঁক দিয়ে মেঘালয়কে দেখতে লাগলো। মেঘালয় লাগেজ খুলে জামাকাপড় বের করে নিয়ে বললো, “ওঠো, এখন কোনো আদর নয়। গোসল করে রেডি হয়ে নিবে আসো।”
মিশু লজ্জা পেয়ে বিছানা থেকে নামতে গেলো, সেই মুহুর্তে মেঘালয় আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। একে অপরের মাঝে মিশে যেতে লাগলো। নরম তুলোর বিছানায় তলিয়ে গেলো দুজনে।

৩৯.
আট টার দিকে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো ওরা।
বাইরে এসে রেস্টুরেন্ট এ নাস্তা করে প্রথমেই গেলো হযরত শাহজালাল (রহ:) এর মাজারে। ভেতরে ঢুকে মিশুকে নিচে দাড় করিয়ে রেখে ওরা উপরে মাজার দেখতে চলে গেলো। মাজারে মহিলাদের ঢোকা নিষেধ। মিশু নিচে ঘুরেঘুরে কবুতর, পুকুর, নামাজের জায়গা, আর নিচে শুয়ে থাকা লোকজন দের দেখছিলো। একজন গার্ড টাইপের কেউ এসে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লাঠি দিয়ে মেরে ঘুমিয়ে থাকা লোকজন দের তুলে দিচ্ছে।
মেঘালয় পিছনে দাঁড়িয়ে বললো, “ম্যাম।”
মিশু পিছন ফিরতেই মেঘালয় হাসলো। বললো, “আসুন।”
বাইরে বের হয়ে রাস্তার দুপাশে অনেক দোকান দেখতে পেলো মিশু। একটা দোকান থেকে মেঘালয় হালুয়া কিনে দিলো ওর হাতে। দুপাশের দোকান গুলো দেখতে দেখতে মিশু হালুয়া খাচ্ছিলো আর রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো। গাড়িতে উঠে মিশু সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসার জন্য অনুনয় করতে লাগলো। মেঘালয় ওকে বসিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে লাগল। একমাত্র মেঘালয় ই এদিকের রাস্তা চেনে। বাকিরা চেনেনা।
মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
– “রাতারগুল।”
– “রাতারগুল আবার কি? কি আছে সেখানে?”
– “রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট।”
– “সোয়াম্প ফরেস্ট আবার কি?”
– “বাংলাদেশে দুটো বিখ্যাত বন আছে শোনোনি? ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আর সোয়াম্প ফরেস্ট?”
মিশু লাফিয়ে উঠে বললো, “ওহ বুঝতে পেরেছি। আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি? খুব মজা হবে।”
– “হুম, অনেক মজা হবে।”
মিশু একটু কি যেন ভেবে বললো, “আচ্ছা শুনেছি ওই ফরেস্ট টা পুরোটাই জলের উপর? আমরা যখন ভেতরে ঢুকবো আমার পায়জামা ভিজে যাবে না?”
সবাই হেসে ফেললো মিশুর কথা শুনে। একদম বাচ্চাদের মতন কথাবার্তা। মেঘালয় হেসে জবাব দিলো, “আমরা তো পায়ে হাঁটবো না রে পাগলী। আমরা নৌকায় পুরো বনটা ঘুরবো।”
– “ইস! কত্ত মজা হবে তাহলে।”
ওর এমন শিশুসুলভ কথাবার্তা শুনে বাকিরা হাসছিলো। মজা লাগছে শুনতে। পূর্ব বললো, “ভাবি ওখানে কিন্তু গাছে সাপ ঝুলে ঝুলে থাকে। আমরা যখন নৌকা নিয়ে জংগলের ভেতর ঢুকবো, টুপ করেই একটা সাপ আপনার কোলের উপর পড়বে।”
মিশু অবাক হয়ে মেঘালয়কে জিজ্ঞেস করলো, “সত্যি! তাহলে তো আরো মজা হবে। আমি সাপ কোলে নিয়ে বসে থাকবো আর তুমি সায়ান ভাইয়ার ক্যামেরা দিয়ে আমার একটা ছবি তুলে দিবা আচ্ছা?”
সবাই আবারো হেসে উঠলো। পূর্ব ভেবেছিলো সাপের কথা বললে মিশু হয়ত আঁৎকে উঠবে। কিন্তু মিশুর আরো মজা লাগছে সেটা শুনে। সত্যিই মেয়েটা এখনো বড্ড ইনোসেন্ট।
মেঘালয় একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাড় করালো। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর। মিশু একবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে সেদিকে তাকালো। তারপর মেঘালয় কে জিজ্ঞেস করলো, “আমরা এই বাড়ির ভেতর দিয়ে জংগলে ঢুকবো?”
মেঘালয় হাসতে হাসতে বললো, “না রে পাগলী। বাড়ির ভেতর দিয়ে কখনো জংগলে ঢোকা যায় বুঝি? তোমার কি মনেহয় এর ভেতরে নদী আর বন আছে?”
মিশু লজ্জা পেয়ে গেলো। সত্যিই তো! বাড়ির ভেতরে কিভাবে বন থাকতে পারে। কি যে বোকার মত প্রশ্ন করে সে! নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো। মেঘালয় একজনকে কল দিয়ে কথা বললো। তারপর মিশুকে বললো, “এটা নায়ক সালমান শাহ এর বাড়ি।”
– “কোন সালমান শাহ?”
– “বাংলাদেশে একজন ই জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ ছিলেন।”
– “তুমি আমার এমন ই একজন, যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন,সেই সালমান শাহ?”
– “হ্যা, সেই সালমান।”
মিশুর চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেলো। আর ওকে দেখে বাকি চারজন হেসেই খুন। বেশি আনন্দে মেয়েটা একেবারেই ছোট বাচ্চাদের মতন হয়ে যায়। কি বলে না বলে কোনো বোধ থাকেনা। মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বের হলো। বাকিরাও নেমে দাঁড়ালো।
একজন লোক এসে মেঘালয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, “আরে মেঘালয় যে! অনেক দিন পর।”
– “ফ্রেন্ডস দের নিয়ে ঘুরতে চলে এলাম। কেমন আছেন?”
লোকটি হাসিমুখে কথা বলতে লাগলেন। উনি বোধহয় শুধু পূর্বকেই চেনেন। পূর্ব’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছো?
ওরা বেশিক্ষণ দেড়ি করলো না। এমনিতেই বেলা দশটা বেজে গেছে। রাতারগুল পৌছাতে দুপুর প্রায় হয়েই যাবে। বিকেলে আবার চা বাগানে মিটিং আছে। তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দিতে হলো। মিশু অবাক হয়ে সবকিছু দেখছে আর মুগ্ধ হচ্ছে। গাড়ি থেকে চা বাগান দেখতে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে। মেঘালয়ের হাত চেপে ধরে বললো, “এত্ত সুন্দর কেন!”
মেঘালয়ের খুবই ভালো লাগছে মিশুকে দেখে। যে মানুষ টার মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নেই, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে যে অভিভূত হয়না, তাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গিয়ে আনন্দ নেই। মিশুর উচ্ছ্বসিত মুখ, আনন্দে বারবার লাফিয়ে উঠা, উত্তেজনায় হাত তালি দেয়া সবই মেঘালয়কে মুগ্ধ করছে প্রতি মুহুর্তে। ইচ্ছে করছে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য যদি মিশুকে দেখিয়ে আনতে পারতাম!
মিশু বললো, “আমার কি ইচ্ছে করে জানো? ওই যে গামছার মত ড্রেসগুলো পড়ে, পিঠে একটা বালতির মত ঝুড়ি ঝুলিয়ে চা বাগানে চা পাতা তুলি। আমাদের একটা ছোট্ট সুন্দর সোনামণি হবে, তাকে গামছায় বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে আমি চা বাগানে চা পাতা তুলবো। কেমন মজা হবে বলোতো?”
মেঘালয় হেসে ফেললো। সায়ান বললো, “কোনোকালে কোনো মেয়ের এরকম ইচ্ছে হয় আমার জানা ছিলোনা।”
মিশু বললো, “আমার খুব হয়। আমার ইচ্ছে হয় পাহাড়ের উপর গিয়ে জুম চাষ করি, কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে কুপিয়ে জমি চাষ করবো। অনেক কষ্ট করবো, অনেক পরিশ্রমী হবো। তারপর অনেক দিন বাঁচবো।”
পূর্ব চোখ দুটো বড়বড় করে বললো, “কেয়া বাত হ্যায়! দারুণ দারুণ ইচ্ছে তো তোমার মিশু। আর কি কি ইচ্ছে আছে বলোতো শুনি?”
মিশু আগ্রহী হয়ে বলতে লাগলো, “আমার ইচ্ছে করে পাহাড়ের উপর গিয়ে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। আমাদের অনেক অভাব থাকবে, আমি আর মেঘ কষ্ট করে রোজগার করে আনবো। তারপর মজা করে খাবো। মেঘ অনেক দূর থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে আনবে, আমি জুম চাষ নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। আবার ইচ্ছে করে মেঘের দেশে একটা ঘর বানিয়ে থাকি। ঘুম থেকে উঠে যখনি বাইরে এসে দাঁড়াবো, মেঘ উড়ে এসে আমাদের ছুঁয়ে যাবে।”
মেঘালয় বললো, “বাড়ি বানিয়ে থাকাটা হয়ত সম্ভব না। তবে সাজেকে মেঘের দেশে নিয়ে যাবো তোমায় একদিন। ঘুম থেকে উঠে যখন বাইরে এসে দাঁড়াবে, তুলোর মত মেঘ এসে তোমাকে শীতল স্পর্শ দিয়ে যাবে।”
– “আচ্ছা। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবা হ্যা?”
– “হুম তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো।”
পূর্ব জিজ্ঞেস করলো, “ভাবি আর কি কি ইচ্ছে আছে বলেন না শুনি। আপনার ইচ্ছেগুলো একদম ইউনিক। লাখ টাকায় ও কেনা যাবেনা। বলেন শুনি?”
মিশু একটু নড়েচড়ে বসলো। পিছন ফিরে ওদের দিকে তাকিয়ে পা দুটো সিটের উপর তুলে বসলো। মেঘালয় মিশুর বসার স্টাইল দেখে মুখ টিপে হাসলো। অন্যকেউ ওর সামনে এভাবে বসার সাহস হয়ত পাবেনা। আর ওর চারপাশের সবাই খুব বেশি ভদ্র সবসময়। মিশু কোনোকিছু না ভেবেই পা উপরে তুলে বসলো সেটা মেঘালয়ের কাছে অন্যরকম লাগাটাই স্বাভাবিক। নিঃসংকোচ আচরণ বরাবর ই ওকে মুগ্ধ করে।
মিশু বললো, “আমার না পাহাড়ের প্রতি খুব টান। পাহাড়ের উপর একটা পিঠার দোকান দিতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা মেঘ,পাহাড়ে পিঠা বিক্রি হবে?”
মেঘালয় বললো, “কেন হবেনা? পাহাড়ের উপর হাজার হাজার ট্রাভেলার্স ঘুরতে আসে। তারা পিঠা কিনে কিনে খাবে।”
– “বিদেশি রাও আসে? বিদেশিরা তো দুই টাকার পিঠা খেয়ে আমাদের দশ টাকা দিয়ে যাবে। তখন আমাদের অনেক গুলা টাকা হবে।”
সায়ান বললো, “তোমার বরের এমনিতেই অনেক গুলা টাকা আছে মিশু। সারাজীবন পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে খেতে পারবা।”
মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তারপর সায়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমার রেডিমেড কিছু ভালো লাগেনা। কিছু প্রস্তুত আছে,সেটা ভোগ করতে একটুও আরাম পাইনা আমি। বরং নিজে প্রস্তুত করে সেটা ভোগ করার মাঝে অন্যরকম আনন্দ। বাপের টাকায় ফুটানি মারার চেয়ে নিজে দু টাকা ইনকাম করে কষ্ট করে চলাটাও শান্তি।”
সবাই লজ্জা পেয়ে গেলো। মেঘালয় মুচকি হাসলো মিশুর জীবন দর্শন দেখে। মেয়েটা যেমন সরল,তেমনি তেজীও। কোনোকিছুর জন্য কারো উপর নির্ভর করতে রাজি নয়। আমার যা আছে, আমি তাই নিয়েই সুখী। অন্যের কাছে ফ্রিতে কিছু নিয়ে আলগা সুখের কোনো মানেই হয়না। এসব ভেবে ভেবে মেঘালয় হাসছিলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “এই আমার না খুব আচার খেতে ইচ্ছে করছে।”
মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এখন সে আচার কোথায় পাবে? পূর্ব ফাজলামি করে বললো, “ভাবির কি বমি বমি পাচ্ছে?”
– “না, আমার জার্নিতে বমি আসেনা।”
– “মাথা ঘুরাচ্ছে?”
– “না, আমার কখনো মাথা ঘুরায় না।”
– “ওহ শিট, কোথায় ভাবলাম আমরা আংকেল হবো।”
বলেই সবাই হেসে উঠলো। মিশু এই ইয়ার্কির আগাগোড়া কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। ইহকালে কেউ কখনো ওর সাথে এরকম ফাজলামি করেনি। আচার খাওয়ার সাথে আংকেল হওয়ার কি সম্পর্ক মাথাতেই ঢুকলো না। সবাই হাসছে আর মিশু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেঘালয় ও ফ্রেন্ড দের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মিশু যে এই সাধারণ ফাজলামিটা ধরতে পারেনি সেটা দেখে আরো মজা লাগছে সবার।
মিশু মেঘালয়ের দিকে ফিরে বললো, “এখানে কোথাও আচার পাওয়া যাবে না?”
ওরা আবারো হেসে উঠলো। মিশু জিজ্ঞেস করলো, “হাসছো কেন তোমরা?”
মেঘালয় বললো, “তুমি বাংলা সিনেমা দেখো না? সিনেমায় বাড়ির বউরা আচার খেলে স্বামী আর শ্বাশুরিরা কি বলে জানো না?”
মিশু মুখ বাঁকা করে বললো, “সিনেমা দেখার সময় কখনো পাইনি। ছোটবেলা থেকেই প্রত্যেকটা সেকেন্ডকে আমি কাজে লাগাতাম। যেটুকু অবসর পেয়েছি, বিদেশি উপন্যাস পড়েই কাটিয়েছি।”
সবাই চুপ হয়ে গেলো। আনন্দময় শৈশব হয়ত মিশুর ছিলোনা। নিজে যদিও বাচ্চা স্বভাবের,তবুও সময়ের ব্যাপারে সবসময় ই খুব সিরিয়াস ও। ইচ্ছে পূরণের বেলায় যেকোনো উদ্ভট কাজ করা যেতে পারে, কিন্তু সময়কে সবসময় কাজে লাগানো চাই।
সায়ান বললো, “মিশুর একটা জিনিস দেখে আমি খুব অবাক হই। আমরা সচরাচর যেসব বলাবলি করি,ও সেসব জানেনা। আবার আমরা যেসব কল্পনাও করিনা, ও সেসব নিয়ে ভাবে।”
মেঘালয় বললো, “এটা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার। আল্লাহ মেয়েটাকে যে কি দিয়ে বানাইছে! জগতের সব উদ্ভট চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খায়।”
মিশু বললো, “আমি আবার কি উদ্ভট চিন্তা করলাম?”
– “পাহাড়ের উপর পিঠার দোকান দেয়ার চিন্তাটা কি উদ্ভট নয়?”
– “আহা! আমি তো অল্প কয়দিন ব্যবসা করবো। পনেরো দিন পিঠা বেচবো। তারপর আবার অন্য ব্যবসা।”
পূর্ব বললো, “এরা দুটোই সবসময় ব্যবসার চিন্তা ভাবনা মাথায় নিয়ে ঘোরে।”
বলেই হেসে উঠলো। সবাই মিলে হাসাহাসি করতে করতে রাতারগুলের কাছাকাছি পৌছে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে দোকান থেকে একগাদা চাটনি কিনে মেঘালয় মিশুর হাতে ধরিয়ে দিলো। মিশু চাটনি গুলো গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে বললো, “আমরা জংগলের ভেতরে গিয়ে চাটনি বেচবো। যারা আমাদের মত ঘুরতে এসে আচার খেতে চাইবে, তারা আমার কাছে চাটনি কিনে কিনে খাবে। এক পিছ তিন টাকা।”
পূর্ব সবাইকে দাড় করিয়ে কোমরে হাত রেখে বললো, “সাধে কি বললাম এরা সবসময় ব্যবসার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘোরে? রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের ভেতরে গিয়ে সে নাকি আচার বেচবে?”
সবাই আরেক দফা হেসে নিলো এসব নিয়ে। মিশুও খিলখিল করে হাসতে লাগলো।
৪০.
ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো দুপুরের। নিখিল!
ও রিসিভ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নিখিলের কর্কশ গলা ভেসে আসলো, “রিসিভ করতে এত সময় লাগে?”
ভয় পেয়ে গেলো দুপুর। নিখিল কখনো এভাবে রাগ দেখায়নি ওকে।আর এখন তো ও অন্য কারো স্ত্রী। গত দুদিন নিখিলের সাথে কোনোরকম কথাও হয়নি। আজকে হঠাৎ কি হলো ওর?
নিখিল বললো, “বরের সাথে প্রেম নিয়ে ব্যস্ত ছিলে বুঝি?”
– “নিখিল, তুমি এভাবে কেন কথা বলছ?”
– “তোমার সাথে আর কিভাবে কথা বলা উচিৎ?”
– “এরকম বিহ্যাভ দেখানোর জন্য কল দিয়ে থাকলে ফোন রাখো।”
– “রাখবো। তার আগে শুনি মহারাণীর নতুন জীবনটা কিভাবে শুরু হচ্ছে?”
নিখিলের কথা বলার স্টাইল দেখে রাগ হলো দুপুরের। ও বললো, “খুব ভালো ভাবেই শুরু হচ্ছে। আমার বর আমার অনেক কেয়ার করে।”
– “তা তো করবেই। সুন্দরী বউ পেয়েছে না? তার তো আর রৌদ্রময়ীর দরকার ছিলো না, তার দরকার ছিলো তোমাকে। সে তো কেয়ার করবেই।”
– “নিখিল, ভাষা এমন করছো কেন?”
– “তাছাড়া? তোমার শ্বশুরঘরের লোকরাও তো অনেক কেয়ার করে তাইনা? করবেই তো। তাদের তো একজন পুত্রবধূ দরকার ছিলো, স্পেশালি রৌদ্রময়ীর কোনো দরকার ছিলোনা।”
দুপুরের মেজাজ রীতিমত খারাপ হতে শুরু করেছে। ও সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু বিনা কারণে খারাপ আচরণ একদম ই সহ্য করতে পারেনা। বললো, “নিখিল তুমি দয়া করে ফোনটা রাখো। আর রাগ ঝাড়ার জন্য ফোন দিওনা প্লিজ।”
– “আমি রাগ গুলো কাকে দেখাবো তাহলে? তোমার কি কিছুই করার ছিলোনা? আমি তোমার বাবাকে ভালো করেই চিনি। তুমি যদি তাকে একবার বলতে বিয়েতে তোমার মত নেই তবে উনি কখনোই তোমাকে জোর করে অরণ্য’র সাথে বিয়ে দিতো না।”
দুপুর রেগে বললো, “এই জন্য রেগে আছো? দেখো, হয়ত আমি চাইলেই বিয়েটা ভাংতে পারতাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে আমার কাছে আমার বাবার সম্মান টাই সবচেয়ে বড় ছিলো। বাবার মুখের উপর না বলে দেয়ার মত শক্তিটা পাইনি আমি।”
– “আমি কি তোমার অযোগ্য ছিলাম? আমাকে বিয়ে করলে তোমার বাবার সম্মান নষ্ট হয়ে যেত? আমি তো চেয়েছিলাম গিয়ে তোমার বাবার হাতে পায়ে ধরে তোমাকে চাইতে। আমাকে বারণ করেছিলে কেন?”
– “নিখিল,আমার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে একবার ভাবো। আশাকরি উত্তর পেয়ে যাবা। গত দুদিন যাবত পুড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি আর তুমি ফোন দিয়ে আমাকেই রাগ ঝারছো?”
কণ্ঠটা হঠাৎ নরম হয়ে গেলো নিখিলের। ও বললো, “আমি তোমার সাথে চরম খারাপ আচরণ করতে চাই দুপুর। যাতে করে খুব সহজেই আমার প্রতি তোমার বিতৃঞ্চা চলে আসে আর আমাকে ভূলে যেতে পারো।”
দুপুর হাসার চেষ্টা করে বললো, “তোমার ধারণা ভূল। যত খারাপ কাজ করেই আমার সামনে আসোনা কেন, দুপুর কখনো তোমাকে ভূলতে পারবে না। তোমার জায়গাটা আজীবন তোমার। সেখানে খারাপ আচরণ করে অযথা আমাকে কষ্ট দিওনা নিখিল।”
নিখিলের কান্না পেয়ে গেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “হুম। ভালো থেকো।”
– “আর আগামী তিনদিন আমাকে কল দিওনা। এই তিনদিন অরণ্য হয়ত প্রত্যেকটা সেকেন্ড আমার সাথে থাকবে।”
– “হানিমুনে যাচ্ছো?”
প্রশ্নটা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো দুপুরের। হানিমুন নিয়ে কত্ত প্লান ছিলো নিখিলের সাথে। নিখিল বলেছিলো ওকে দার্জিলিং নিয়ে যাবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়ে আনবে। রিসোর্টের বিছানায় শুয়ে নিখিলের বুকে মাথা রেখে দূরের হিমালয় দেখবে ও। সব স্বপ্ন নিমেষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
নিখিল বললো, “আচ্ছা রাখছি দুপুর। নিজের খেয়াল রেখো।”
– “তুমিও। আর প্লিজ সিগারেট খেও না।”
– “আমার জন্য চিন্তা করাটা বাদ দিও দুপুর। আমি চেষ্টা করবো যাতে কখনো তোমাকে ফোন না দেই।”
– “ফোন দিও। আগামী তিনটা দিন দিওনা।”
– “কোথায় যাচ্ছো?”
– “সিলেটে যাচ্ছি। নূরজাহান গ্রান্ডে উঠবো। একদিন ট্যুরে গিয়ে ওই হোটেলে শুয়ে শুয়ে আমাকে ভিডিও কল দিয়েছিলে। কি পরিমাণ কষ্ট হবে আমার ভাবতে পারো নিখিল?”
– “আচ্ছা যাও। সাবধানে থেকো।”
শেষ মুহুর্তে গলাটা ভিজে উঠলো দুপুরের। ফোন রেখে আয়নার দিকে তাকালো ও। চোখ মুছলো শাড়ির আঁচলে। এই চোখের জল কাউকে দেখাতে চায়না ও। একটু বাদেই অরণ্য এসে বেড়িয়ে পড়ার জন্য তাগাদা দিলো। লাগেজ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে দুপুরের সামনে দাঁড়ালো। টিস্যু পেপার নিয়ে দুপুরের কাজল ঠিক করে দিতে দিতে বললো, “একটু নিজের কেয়ার করতে পারো না? বড্ড অগোছালো তুমি।”
দুপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বেড়িয়ে পড়লো ওরা সিলেটের উদ্দেশ্যে।
চলবে..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *