অনুভূতি ! পর্ব_১

“অনুভূতি ” Romantic valobasar Golpo

পর্ব_০১
মিশু মনি
Onuvuti moy Romantic valobasar Golpo
১.
– “আপনার রেইনকোট টা দিবেন প্লিজ? আমার বৃষ্টি সহ্য হয়না”
একেবারেই নিঃসংকোচ আবেদন! চমকে ফিরে তাকালো মেঘালয়। মেয়েটাকে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। একজন অচেনা অজানা লোকের কাছে এভাবে কিছু চাওয়া যায় সেটা একদম ধারণার বাইরে ছিলো।
বিস্ময় কাটিয়ে মেঘালয় বলল, “সরি, বুঝলাম না।”
– “আমার বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর আসে।”
– “তো?”
মেয়েটি করুণ গলায় বললো, “দশটার মধ্যেই ডিউটি তে পৌছতে হবে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বোধহয় পৌছতে পারবো না।”
মেঘালয় স্পষ্ট ভাষায় বলল, “আজ না হয় একটু দেড়িতে যাবেন।”
মেয়েটি আরো করুণ গলায় বলল, “আসলে রেগুলার দশটার মধ্যেই পৌছাতে পারলে মাস শেষে একটা বোনাস পাবো। সেজন্যই।”
মেঘালয় একটু ভেবে বললো, “আচ্ছা ঠিকাছে। কিন্তু আমার কোট তো আপনার গায়ে হবেনা মেয়বি।”
– “উপায় তো নেই। প্লিজ দিন না। মানবতার খাতিরে এই উপকার টা করা উচিৎ।”
মেঘালয়ের হাসি পেলো। হাসি চেপে রেখে গা থেকে রেইনকোট টা খুলতে খুলতে বলল, “তাহলে একটু মানবতা দেখানোই উচিৎ। এই নিন।”
মেয়েটি রেইনকোট টা হাতে নিয়ে এখানেই গায়ে পড়ে ফেললো। ছোটখাটো এই পুঁচকে মেয়েটাকে এতবড় সাইজের রেইনকোটের ভিতরে একদম এলিয়েন এলিয়েন লাগছে। তবুও বেশ কিউট কিউট ভাব চলে এসেছে। রেইনকোট টা পড়েই জোরে একবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা ছোট্ট ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় গিয়ে নামলো।
মেঘালয় বেশ অবাক হলো। আরে রেইনকোট তো নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা কি একেবারেই দিয়ে দেয়া হবে? মোটেও না।
মেঘালয় চেঁচিয়ে ডাকলো, “এইযে শুনুন।”
মেয়েটি পিছন ফিরে তাকাতেই মেঘালয় বলল,”আমার কোট টা অবশ্যই ফেরতযোগ্য। কোথায় গেলে পাবো?”
মেয়েটি ঝটপট উত্তর দিলো “কৃষি মার্কেটে ইভা সুপার শপে গেলেই আমাকে পাবেন।”
কথাটা বলেই আর এক মুহুর্ত ও দাঁড়াল না। হনহন করে হেঁটে চলে গেলো। মেঘালয় অবাক হয়েই দাঁড়িয়ে রইলো বিল্ডিং এর নিচে। মেয়েটি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। মেঘালয় আসামাত্র ই নিঃসংকোচে রেইনকোট টা চেয়ে বসলো। কিজানি সঠিক ঠিকানা দিয়েছে নাকি ভূল! তবে কারো উপকার যদি হয় তো হোক না।
২.
দুপুরে বাসায় ফেরার সময় কৃষিমার্কেটের পাশ দিয়েই যাচ্ছিলো মেঘালয়। ভাবলো ইভা সুপার শপে গিয়ে দেখা যাক মেয়েটিকে পাওয়া যায় কিনা। দেখে তো বেশ সৎ ই মনেহয়েছিলো।
ভিতরে ঢুকে একটু সামনে যেতেই দেখলো মেয়েটি একটা গোলাপি রঙের টি শার্ট পড়ে মাথায় ওড়না দিয়ে কাস্টমারের সাথে কথা বলছে। তারমানে সে এখানেই চাকরী করে। যাই হোক, ভূল ঠিকানা অন্তত দেয় নি। মেঘালয় একটু কাছে যেতেই মেয়েটি মিষ্টি করে হাসলো। তারপর বললো, “ওয়েলকাম স্যার।”
মেঘালয় কণ্ঠটা শুনেই একটু ভড়কে গেলো। একদম অফিসিয়াল হয়ে গেছে গলার স্বরটা। আর অনেক স্পষ্ট উচ্চারণ ও। অথচ সকালবেলা এরকম ছিলোনা।
পাশের কাস্টমার টি চলে যেতেই মেয়েটি বললো, “আপনার রেইনকোট টা এখানে দিতে পারবো না। একটু কষ্ট করতে হবে আপনাকে।”
মেঘালয় বাঁকা ঠোটে হেসে বলল, “আবার বৃষ্টি আসবে নাকি?”
– “না মানে এখানে কোট টা আপনাকে দিলে বস দেখে ফেলবে। আর তখন আমাকে জিজ্ঞেস করবেন আপনি আমার রিলেটিভ কিনা। আমি কোনোকরম জেরার সম্মুখীন হতে চাইছি না।।”
– “ওহ আচ্ছা। তা আমাকে এখন আপনার বাসায় যেতে হবে নাকি?”
– “না, আপনি একটু পাশের রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে বসুন কষ্ট করে। আমি দুই মিনিটের মধ্যেই লাঞ্চের জন্য বেরোবো। তখন আপনাকে দিয়ে দিবো।”
মেঘালয় হেসে বলল, “বাহ! জিনিয়াস তো। ওকে, আমি ওয়েট করছি রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে।”
– “ধন্যবাদ স্যার।”
– “স্যার স্যার করাটা কি আপনার মুদ্রাদোষ নাকি? একটু আগেও একজন কে স্যার স্যার বলছিলেন।”
– “আসলে সম্মান প্রদর্শনের জন্য বলা হয় আরকি।”
মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে বলল, “বেশ ভালো। তো দোকানদার ম্যাডাম, আমি তো আপনাকে রেইনকোট টা দিয়ে উপকার করেছি। সেই সুবাদে একটু ছাড় দিয়ে একটা কিছু বিক্রি করা যায়না?”
মেয়েটি মৃদ্যু হেসে বলল, “আমার রিলেটিভ হলে আমি কথা বলিয়ে একটু ছাড় দিয়ে দিতে পারতাম। আর রেগুলার কাস্টমার দের জন্য একটু ছাড় দেয়া যায়। আপনি আমার রিলেটিভ সেটা তো কিছুতেই বলা যাবেনা। বললেই বস জেরা করবেন।”
– “কেন জেরা করবেন?”
– “আপনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, আপনার সাথে আমার কেমন আত্মীয়তা সেটা জানতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক।”
মেঘালয় বেশ অবাক হয়ে বলল, “আমি বিখ্যাত ব্যক্তি আপনাকে কে বলেছে?”
– “আসলে আপনার রেইনকোটে একটা আরোহী আরোহী গন্ধ পাচ্ছিলাম।”
মেঘালয় হেসে বলল, “সিরিয়াসলি?”
মেয়েটিও মিষ্টি করে হেসে জবাব দিলো, “আসলে আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছিলো। ট্রেকার ও পর্বতারোহী মেঘালয়ের মত দেখতে আপনি। তাই গুগলে এটা দিয়ে সার্চ দিয়েই পেয়ে গেলাম। ছবি দেখে তো আমি একদম অবাক! একজন পর্বতারোহী’র কোট আমার গায়ে! উফফ নিজেকেও মুহুর্তের জন্য আরোহী মনে হচ্ছিলো।”
মেয়েটি খুব উৎফুল্ল হয়ে কথাগুলো বললো। মেঘালয়ের বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছে। ও অবাক হয়েই বলল, “বেশ তো। এবার তাহলে কিছু বিশেষ ছাড় দিয়ে বেঁচুন।”
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, “আচ্ছা কিছু নিন। আমি কথা বলে কমাচ্ছি। বলুন কি নেবেন?”
মেঘালয় একটু ভেবে বললো, “এমন একটা বডি স্প্রে দিন যেটা দিয়ে বের হলে মেয়েরা হুরহুর করে কাছে আসবে।”
মেয়েটি হেসে বলল, “ওকে স্যার।”
এরপর দ্রুত গিয়ে হাতে করে তিনটা বডি স্প্রে এনে দিয়ে বলল, “স্যার কোনটা নেবেন? তিনটাই ভালো।”
– “কোনটা ভালো হবে বেশি?”
– “আপনি নিশ্চয় ই ব্যবহার করেছেন আগে। আপনার জানার কথা।”
মেঘালয় হাসি দিয়ে একটা স্প্রে তুলে নিয়ে বলল, “ওকে তাহলে বাইরে ওয়েট করছি।”
– “আচ্ছা বসকে বলছি আপনাকে একটু ছাড় দিয়ে দিতে।”
– “থ্যাংকস। আগে রেগুলার কাস্টমার হই, তারপর সুবিধা ভোগ করবো। আমি বিধা কারণে সুবিধা নেইনা। এনিওয়ে, রেইনকোট টা নিয়ে আসুন।”
কথাটা বলেই মেঘালয় বিল পরিশোধ করে বাইরে বেড়িয়ে গেলো। মেয়েটিও কয়েক মুহুর্ত অবাক চোখে চেয়ে থেকে লাঞ্চের কথা বলে রেইনকোট নিয়ে পাশের রেস্টুরেন্ট এ চলে এলো।
মেঘালয় একটা টেবিলে বসে আছে। মেয়েটি এসেই বললো, “এই নিন আপনার কোট। অসংখ্য ধন্যবাদ।”
– “স্বাগতম। বসুন একসাথে নাস্তা করি।”
– “সরি, আসলে বস হঠাৎ এখানে এসে দেখে ফেললে আমার সমস্যা হবে। উনি আমাকে প্রশ্ন করবেন।”
– “বসকে এত ভয় পান কেন?”
– “চাকরী হারানোর জন্য।”
– “চাকরী গেলে যাবে। তাই বলে এত ভয় পেতে হবে। আবারো আরেকটা চাকরী পেয়ে যাবেন।”
মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “এই শহরে চাকরী পাওয়াটা সোনার হরিণের মত। আর এটাই আমার পরিবারের একমাত্র ইনকাম সোর্স। তাই হারাতে চাইনা।”
কথাটা শুনেই মেঘালয়ের কেমন যেন অনুভূত হলো। মনে মনে ভাবলো, এটা পরিবারের একমাত্র ইনকাম সোর্স? কতই আর বেতন দেয়, বড়জোর সাত আট হাজার। তাতেই সংসার চলে? কথাটা খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু প্রশ্নটা কেন যেন করতে পারলো না। মুখে এসে আটকে যাচ্ছে। মেয়েটি গিয়ে পাশের টেবিলে বসে পড়লো। টিফিন বক্স খুলে খাবার খেতে শুরু করলো। মেয়েটার বয়স অল্প, সতের হবে হয়ত। কত ফুটফুটে আর চঞ্চল একটা মেয়ে, উজ্জল শ্যামলা বর্ণের মেয়েটিকে দেখলেই মায়া লাগছে। এরকম ফুটফুটে একটা মেয়ে কিনা চাকরী হারানোর ভয়ে সবসময় তটস্থ হয়ে থাকে? দেখতেই খারাপ লাগে।
মেঘালয় উঠে এসে জিজ্ঞেস করলো, “চাকরী পার্ট টাইম নাকি ফুল টাইম?”
– “ফুল টাইম। ১২ ঘন্টা ডিউটি।”
কথাটা শুনে আরো মনটা কেমন করে উঠলো। মেয়েটা নিতান্তই বাচ্চা বাচ্চা। এরকম পুঁচকে একটা মেয়ে কিনা মাত্র সাত হাজার টাকার জন্য সকাল থেকে রাত অব্দি ১২ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে? কাস্টমার দের কাছে প্রোডাক্ট বিক্রির জন্য নানান কথা বলতে হয়, আবার বসের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতে হয়! এইটুকুন একটা মেয়ে। কেমন যেন মায়া লাগছে মেয়েটির জন্য।
মেঘালয় খেয়াল করে দেখলো মেয়েটি মোটা চালের ভাতের সাথে ভর্তা টাইপের কিছু একটা আর ছোট্ট এক পিস ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে। বোধহয় একটা ডিম ভেজে তিন ভাগ করা হয়েছে। এত পরিশ্রম করে এরকম স্বল্প বেতন পেয়ে, এইসব খেয়েও তার মুখে হাসি! হায়রে দুনিয়া!
মেঘালয়ের অনেক কিছুই জানতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু কিছুই বললো না। মেঘালয় নিজেও অনেক সংগ্রাম করে বড় হয়েছে। তাই কাউকে একটু খারাপ অবস্থায় দেখলে মায়া লাগে তার জন্য। কেমন যেন ব্যথা অনুভূত হয়। মেয়েটিকে দেখে আরো বেশী হচ্ছে। ফুটফুটে একটা মেয়ে,যার এখন বন্ধু বান্ধব নিয়ে এনজয় করার বয়স। ওর বয়সী মেয়েরা পিজ্জা হাটে পিজ্জা খেতে খেতে মুখ বাঁকা করে সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড দেয়,হৈ চৈ করে কলেজে যায় আর এই মেয়ে কিনা এরকম ভর্তা ভাত খেয়ে ১২ ঘন্টা ডিউটি করছে! খুবই চিনচিন করে উঠলো ভিতর টা। মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারলে বেশ হতো। মেঘালয়ের অনেক পরিচিত জায়গা আছে, কোথাও একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দিতে পারলে বোধহয় অনেক উপকার হবে মেয়েটার। অবশ্য সে যদি করতে চায় আরকি!
মেঘালয় বলল, “এই মেয়ে,”
মেয়েটি মুখ তুলে তাকালো। মেঘালয় মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলল, “সরি নাম জানিনা আপনার।”
– “জি আমার নাম মিশু।”
– “আচ্ছা মিশু, আপনার পড়াশোনা কতদূর?”
– “উচ্চ মাধ্যমিকের ডিঙি টপকেছি, এখন অনার্সে ভর্তি হবার পালা।”
– “আচ্ছা থ্যাংকস।”
– “ভাত খাবেন?”
– “না, আপনি ই খান।”
মেঘালয় হেসে রেইনকোট টা নিয়ে বেড়িয়ে আসলো। আসার সময় মেয়েটির ব্যাপারে কত সন্দেহ ছিলো। অথচ এখন তার অসহায় অবস্থা দেখে খুব ইচ্ছে করছে কিছু করার। মানব মন এত বিচিত্র! মিশু নামের মেয়েটি সবসময় হাসিতে উৎফুল্ল অথচ তার মুখ দেখেই মেঘালয় বুঝে গেছে ওর ভিতরের অবস্থা। কেন যেন মেঘালয়ের অনুভূতি গুলো খুবই তীব্র, অন্যের কষ্ট দেখে সেটা নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারে।
বাসায় ফিরে রেইনকোট টা মেলে দিতেই এক ধরণের গন্ধ নাকে লাগলো এসে। মিষ্টি পারফিউমের সুগন্ধ! নিশ্চয় ই মিশুর গায়ের। কথাটা মনে পড়তেই মেঘালয় ফোন হাতে নিয়ে দুয়েকজন লোকের সাথে যোগাযোগ করলো কোথাও কোনো কাজের সুযোগ আছে কিনা। তারপর ফ্রেশ হতে গেলো।

৩.
ড্রয়িংরুমে বসে আব্বু আম্মুর পায়ে আলতা দিয়ে দিচ্ছে। মায়ের মুখটা খুবই উচ্ছল। দেখে মনে হচ্ছে যেন ষোল সতের বছরের তরুণী।
হঠাৎ আম্মু চেঁচিয়ে উঠে বললো, “একদম ছ্যারাব্যারা করে দিলা। তুমি আসলেই কোনো কাজের না।”
আব্বু বললো,”ত্রিশ বছর ধরে দিয়ে দিচ্ছি আর আজ এই বদনাম?”
আম্মু মুখটা বাঁকা করে বললো, “ইস! ত্রিশ বছর ধরে দিয়ে দিচ্ছেন। কক্ষনো ভালো মত দিয়ে দিতে পেরেছো?”
– “দেখো বৃষ্টি, অযথা এরকম তর্ক কিন্তু ভালো লাগেনা। তুমি সেটা ভালো করেই জানো। আমি সব কাজেই পারদর্শী।”
– “এহ,চাম নাই কুত্তার বাঘা নাম।”
– “আমাকে কুত্তা বললা?”
– “কুত্তাকে কি বাঘ বলা উচিৎ নাকি?”
– “বৃষ্টি ভালো হচ্ছেনা কিন্তু।”
মেঘালয় দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো এরকম কান্ড। এখন ওকে গিয়েই বাবা মায়ের মাঝে ঢুকে যেতে হবে নয়ত ওদের ঝগড়া চলতেই থাকবে অনেক্ষণ। নিতান্তই ছেলেমানুষি ঝগড়া। আসলে বাবা মা দুজনে একসাথে পড়তেন বলে সম্পর্ক টা আজো বন্ধুত্বের মতই আছে।
মেঘালয় বলল,”মে আই কাম ইন মিস্টার এন্ড মিসেস আকাশ?”
বাবা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,”নো।”
মেঘালয় থতমত খেয়ে গেলো। আম্মু আবার বলল,”মেঘালয় আয় বাবা। দ্যাখ তোর আব্বু কি শুরু করেছে আমার সাথে।”
বাবা বলল,”কে কি শুরু করেছে সেটা ভালো করেই জানো।”
মা ক্ষেপে গিয়ে বলল, “আবার শুরু করে দিলা? তুমি আসলেই একটা…..”
– “থামলে কেন বলো? ছেলের সামনে বলতে লজ্জা লাগছে? তোমার আবার লজ্জা আছে নাকি?”
মা রেগে বলল,”এরকম গায়ে পড়ে ঝগড়া করা লোক জীবনেও দেখিনি। ত্রিশ বছর ধরে জ্বালিয়ে মারছে।”
মেঘালয় কাছে গিয়ে বলল, “আম্মু থামো তো। একটু কথা বলি আমরা?”
আম্মু গলার স্বরটা যথাসম্ভব ঠাণ্ডা করে বলল, “হ্যা বল।”
মেঘালয় জিজ্ঞেস করলো, “তোমার কি কিছু লাগবে?”
– “বাব্বাহ! আমার আবার কি লাগবে?”
– “না মানে এমনকিছু কি লাগবে যেটা এনে দিলে তোমার উপকার হবে?”
মা মুখ টিপে হেসে বলল, “সিস্টেমে বিয়ের কথা বলছিস নাকি বাবা মেঘ?”
– “উহ মা তুমিও না। আমি জানতে চাচ্ছি কোনো কসমেটিক্স প্রোডাক্ট লাগবে কিনা?”
মা বেশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করছে হয়ত। মেঘালয় ভ্যাবাগঙ্গারামের মত চেয়ে আছে মায়ের দিকে।
আব্বু বলল, “আজকাল কি গার্ল ফ্রেন্ড এর জন্য শপিং টপিং করা হয় নাকি?”
মেঘালয় মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোট উলটে বলল, “সেরকম না আব্বু। আসলে একজন দোকানদারের সাথে খুব খাতির হয়েছে আমার। তার দোকানে কিছু কেনাকাটা করলে বিশেষ ছাড় দিয়ে দিবে। সেখানেই যাবো। আম্মুর কিছু লাগলে বলো?”
আম্মু একটু ভেবে বলল, “আমার জন্য একটা লাল টুকটুকে বউ লাগবে।”
আব্বু মুখ টিপে হেসে জবাব দিলো, “তুমি বউ দিয়ে কি করবে বৃষ্টি? তোমার জন্য তো স্বামী দরকার।”
মা ভয়াবহ ক্ষেপে গেলো। আসলে আব্বু এমনসব রসিকতা করে সবসময়, একইসাথে হাসিও পায়,আবার রাগও পায়।
মেঘালয় বলল, “বউ সময় হলেই আনবো আম্মিজান। এখন বলেন আপনার কিছু লাগবে কিনা?”
– “একটা শ্যাম্পু নিয়ে আসিস। আর কিচ্ছু লাগবে না এখন।”
– “ওকে,তুমি রোদেলা কে জিজ্ঞেস করে দেখিও তো ওর কিছু লাগবে কিনা।”
– “আচ্ছা ঠিকাছে।”
মেঘালয় উঠে নিজের রুমে চলে এলো। শুয়ে শুয়ে ফেসবুকে ঘুরাঘুরি করতে লাগলো।
৪.
সকালবেলা ঘুম ভাংলো একটু দেরীতে।
রোদেলা বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে সমানতালে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মেঘালয় বিরক্ত হয়ে চোখ মেললো -“এই এত সকাল সকাল চেঁচাচ্ছিস কেন?”
– “ভাইয়া, সাড়ে নয়টা বাজে। আমি ক্লাসে যাচ্ছি।”
– “যা তো আমাকে বলার কি আছে?”
– “তুই নাকি জানতে চেয়েছিস আমার কিছু লাগবে কিনা?”
– “হুম, বল।”
– “এইযে লিস্ট করেছি, এইগুলা এনে দিস।”
মেঘালয় বিছানায় ওপাশ ফিরে শুয়ে বলল, “টেবিলের উপর রেখে যা।”
রোদেলা লিস্ট টা টেবিলের উপর রেখে বেড়িয়ে গেলো। আরো কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করলো মেঘালয়। আজ খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না সেটা। স্বপ্নটা মনে করতে চাইলে আরেকটু ঘুমিয়ে নেয়া দরকার। ও দুচোখ বুজে কোলবালিশ টা বুকে চেপে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
মিনিট বিশেক ঘুমানোর পর ঘুম ভেঙে গেলো। এখন স্বপ্নটা মনে পড়েছে। একটা মেয়ে শাড়ি পড়ে সমুদ্রের তীর ঘেষে হেঁটে চলেছে। পিঠ জুড়ে লম্বা মৃদু কোঁকড়ানো চুল। শাড়ির আঁচল টা উড়ছে। মেয়েটি একদম তীর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ এসে হঠাৎ মেয়েটির খুব কাছ ঘেষে চলে গেলো। আৎকে উঠলো মেঘালয়। ভেবেছিলো সমুদ্র ভিতরে টেনে নিয়েছে মেয়েটিকে। কিন্তু না, মেয়েটি দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে। আবারো উত্তাল ঢেউ এসে মেয়েটিকে গ্রাস করার জন্য অনেক দূর উপরে উঠে গেলো। মেঘালয়ের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এবারে মেয়েটি ভেসে গেছে। কিন্তু না, ঢেউ নেমে যেতেই দেখা গেলো মেয়েটি তীর ঘেষেই হেঁটে চলেছে!
স্বপ্নটা দেখার পর মেয়েটির জন্য মন কেমন করতে লাগলো। সেই স্বপ্নকুমারীর মুখ দেখা হয়নি। কিন্তু স্বপ্নটা দেখার পর কেমন যেন মায়া মায়া লাগছে। মেঘালয় বুঝতে পারেনা ওর অনুভূতির মাত্রাটা এতটা তীব্র আর প্রখর কেন? স্বপ্নেও কেমন মন খারাপ লাগছিলো। কেন যে এমন হয়! কেন যে এই স্বপ্ন দেখলো? ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো ও।
বাইরে বের হওয়ার সময় টেবিলের উপর রাখা লিস্ট টা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলালো। লিস্ট দেখেই মাথা ঘুরে যাওয়ার মত অবস্থা। লিস্ট টা ছিলো এরকম-
* সানস্ক্রিন, (ব্রান্ডের নাম আমাকে ফোন দিয়ে শুনিস)
* প্যানকেক (সাদা)
* লাল ম্যাট লিপস্টিক
* পিংক লিপস্টিক (ল্যাকমি)
* ব্লাশ
* আইশ্যাডো
* আইলানার
* ব্রেসলেট (তিনটা)
* সানগ্লাস
* ব্লাক নেইলপলিশ
এভাবে লিস্ট টা বাড়তেই থাকবে। প্রায় গোটাবিশেক জিনিসের নাম লিখা এতে। দেখেই মেঘালয়ের আক্কেলগুড়ুম হওয়ার জোগাড়। লিপস্টিক আর নেইলপলিশ ছাড়া আর একটা নাম ও কখনো শোনেনি ও। মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। এইসব জিনিসের কাজ কি? রোদেলা তো সেরকম সাজগোজ করেনা। তাহলে কি হবে এসব দিয়ে?
ও রোদেলার নাম্বারে কল দিলো। ফোন রিসিভ করতেই বলল, “তোর কি সিরিয়াসলি এসব লাগবে? তোকে তো কখনো সেভাবে সাজতে দেখিনা।”
– “মাঝেমাঝে বিয়েতে গেলে, ফ্রেন্ড দের বার্থডে, পার্টি শার্টিতে একটু লাগে আরকি। তুই জানতে চেয়েছিস, আমি বলেছি। আনবি কি আনবি না তোর ব্যাপার। রাখলাম।”
রোদেলা ফোন রেখে দিয়েছে। মেঘালয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “মেয়েরা পারেও বাবাহ! অবশ্য ভালোই হলো। প্রতিদিন দুটো করে জিনিস কিনতে গেলেও অন্তত দশ দিন মার্কেটে যেতে হবে। ব্যাপার টা মন্দ হবেনা। মিশু নামের মেয়েটির জন্য যদি কোনো চাকরীর ব্যবস্থা করা যেতো, কত যে ভালো লাগতো!
বাসা থেকে বেড়িয়ে সোজা ভার্সিটি তে গেলো মেঘালয়। ক্লাস শেষ করে বন্ধুবান্ধব মিলে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলো। তারপর বাসায় ফেরার সময় সুপার শপে গিয়ে ঢুকলো।
মিশুর সাথে চোখাচোখি হতেই দুজনের ঠোঁটের কোণে একটু হাসির আভাস দেখা গেলো। মেঘালয় কাছে যেতেই মিশু বলল, “ওয়েলকাম স্যার।”
– “এরকম রোবটিক্স স্টাইলে আমার সাথে কথা বলবেন না।”
মিশু থমকে গেলো কথাটা শুনে। রোবটিক্স স্টাইল আবার কেমন? কিন্তু কাস্টমার যা খুশি বলতে পারে, কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না বোধহয়। যাই হোক, সব কথা নিয়ে ভাবতে হয়না।
মিশু বলল, ” কিছু লাগবে?”
– “একটা ভালো মানের প্যানকেক দিন তো। যেন খেতে খুব সুস্বাদু হয়।”
মিশু মুখ টিপে হেসে বলল, “আপনি প্যান কেক খান?”
– “কখনো খাইনি। তবে আজ খেয়ে দেখবো যদি ভালো লাগে তাহলে পরে আরো খাবো।”
মিশু কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারছে না। কি বলবে তাও বুঝতে পারছে না। ও উঠে গিয়ে কয়েকটা প্যান কেক হাতে করে নিয়ে এসে মেঘালয়ের সামনে রাখলো। মেঘালয় হা করে একবার সেগুলোর দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার মিশুর দিকে তাকাচ্ছে! মিশুর বেশ মজা লাগছে ব্যাপার টা।
মেঘালয় হা বন্ধ করে বলল, “এটা তো কাইন্ড অফ ফেস পাউডার মনেহচ্ছে।”
– “জি স্যার।”
– “সেকি! আমিতো ভেবেছিলাম কোনো কেক টেক হবে।”
মিশু এবার আর কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারছিলো না। পিছন ফিরে নিঃশব্দে হেসে ফেললো। তারপর মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেক তো আমাদের এখানে বিক্রি হয়না।”
মেঘালয় প্রচুর লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় হাসি পাচ্ছে ওর। হেসে বলল, “সেটা আমি ও জানতাম। তো একজন বান্ধবী কে জিজ্ঞেস করলাম সুপারে প্যানকেক পাওয়া যায় কিনা। ও বলেছে যাবে।”
– “প্যানকেক পাওয়া যায় কিন্তু খাবার কেক নয়।”
– “বোকা বনে চলে গেলাম।”
মেঘালয়ের মুখের ভঙ্গি দেখে মিশুর আবারো হাসি পেলো। ও অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখে বলল, “এটা নিতে পারেন, অনেক ভালো হবে।”
মেঘালয় সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, “এত কষ্ট করে হাসি আটকে রাখার কি আছে? হাসি পেলে হাসবেন।”
– “কাস্টমার দের কোনো কাজ বা কথায় হাসলে তাকে বিদ্রুপ করা হয়।”
– “তাই নাকি! জানতাম না তো।”
মেঘালয় মিশুর মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। মিশু মেঝের দিকে চেয়ে আছে। অনেক্ষণ এভাবে কেটে যাওয়ার পর মিশু বলল, “আপনি এটা নিন, খুব ভালো হবে।”
মেঘালয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “দিন। আর ওইখান থেকে সবচেয়ে ভালো সানগ্লাস নিয়ে আসুন তো একটা।”
মিশু গিয়ে চারটা সানগ্লাস নিয়ে আসলো। মেঘালয় অবাক হয়ে খেয়াল করলো চারটাই বেশ সুন্দর! মেয়েটার রুচিবোধ অনেক উন্নত তো! একবার মিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি পড়ে দেখান তো দেখি কেমন লাগে।”
মিশু সানগ্লাস টা চোখে দিলো। ওর মুখের গড়নের সাথে দারুণ ম্যাচ করেছে গ্লাসটা। মেঘালয় কয়েক মুহুর্ত চোখ সরাতে পারলো না। সানগ্লাসে একদম অন্যরকম লাগছে ওকে! মেঘালয় ভাবলো কখনো ওর চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারলে, মাঝেমাঝে যাবে ওর অফিসে। লাঞ্চে ওকে সামনে বসিয়ে কাচ্চিবিরিয়ানি খাওয়াবে। আর পুরোটা সময় ওকে এরকমই একটা সানগ্লাস চোখে দিয়ে থাকতে বলবে।
মিশু বলল, “এটাই নিন।”
মেঘালয় আরেকটা সানগ্লাস তুলে দিয়ে বলল, “এই দুইটাই দিন।”
– “দুইটাই তো একইরকম প্রায়। অন্য আরেকটা…”
মেঘালয় ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এই দুইটাই দিন। আলাদা আলাদা দুজন মানুষের জন্য নিবো।”
মিশু ঘাড় বাঁকিয়ে আচ্ছা বলে প্যাকেটে তুলে দিলো। মেঘালয় এটা মিশুর জন্যই কিনেছে। কিন্তু সেটা তো আর বলা যায়না। কেন কিনেছে তাও জানেনা মেঘালয়। তবে এটুকু বিশ্বাস আছে যে, মিশুর চাকরীর ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন একদিনের জন্য হলেও এটা ওকে পড়তেই হবে।
মিশু বলল,”আরো কিছু লাগবে?”
– “আজ আর কিছু নেবো না। আবার কাল আসবো।”
কথাটা শুনেই চমকে উঠলো মিশু। শেষের বাক্যটা আর প্রত্যেকটা শব্দের উচ্চারণ এতটাই মধুর লাগলো শুনতে! মনে হলো কথাটা ওকেই উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে, “কাল আবার আসবো।” যেন ওর জন্যই আসতে হবে, ও যেন অপেক্ষা করে বসে থাকে। পরক্ষণেই মাথাটা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল মিশু। ওনার কেনাকাটা করার প্রয়োজনে উনি আসতেই পারেন। অন্যকিছু ভাবা যাবে না।
মেঘালয় হেসে প্যাকেট টা নিয়ে সামনে চলে গেলো। বসের সাথে কিছুক্ষণ কি যেন কথা বললো। মিশু বারবার তাকাতে লাগলো সেদিকে। বস হেসে হেসে কথা বলছেন। মেঘালয়ের মুখেও হাসি। বিল পরিশোধ করে মেঘালয় একবার মিশুর দিকে তাকালো। চোখাচোখি হতেই মিশু অন্যদিকে চোখ ঘুরালো। মেঘালয় মিষ্টি হেসে বেড়িয়ে এলো মার্কেট থেকে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *