অনুভূতি ! পর্ব_২৫

অনুভূতি
পর্ব -২৫
মিশু মনি

অনুভূতি সকল পর্ব 

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

৭৮.
মিশু একটু আগেই ঘুমিয়েছে। কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙায় একটু বিরক্ত হলো। দরজার ফুটো দিয়ে দেখলো মেঘালয় এসেছে। ও দরজা খুলে দিয়েই চোখ কচলাতে কচলাতে বললো, “এত রাতে!”

মেঘালয় আচমকাই কোলে তুলে নিলো মিশুকে। তারপর দরজা লাগিয়ে দিয়ে সোজা রুমে চলে এলো। রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়েই মিশুকে দরজার উপরেই ঠেস দিয়ে ধরলো দুহাতে। মিশু পরে যাচ্ছিলো বলে ওর কোলে বসেই দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরতে বাধ্য হলো। মেঘালয় ওকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দুহাতে শক্ত করে মাথাটা চেপে ধরে মিশুর নিচের ঠোঁটটা নিজের দুই ঠোঁটের ভেতরে নিয়ে নিলো।

মিশু মেঘালয়ের এমন আকস্মিক আক্রমণে খেই হারিয়ে ফেলেছে। থতমত খেয়ে গেছে একদম। গতকাল থেকে কোনো ফোনও দিলোনা। আজ এমন মাঝরাতে হুট করে এসেই এমন আকস্মিক হামলা করলো যে বাঁধা দেয়ার ও সুযোগ নেই। মিশুর এখনো ঘুমের ঘোরই কাটেনি। ও দুহাতে মেঘালয়ের গলা জড়িয়ে ধরে রইলো। মেঘালয় একটা হাত ওর কোমরে রেখে খুব জোরে চাপ দিতে লাগলো। আস্তে আস্তে হাতটা একটু একটু করে উপরে তুলছে আর জোরে চেপে ধরছে। এতদিনের সমস্ত অবহেলা আর যন্ত্রণার অবসান এভাবেই ঘটাতে চাইছে ও। সমস্ত কষ্টেরা যেন নির্বাসন নিচ্ছে এই রাগের মধ্য দিয়ে।

মিশু ওর স্পর্শে ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠছে। একটানা অনেক্ষণ ধরে চুম্বনের পর মুখটা ছেড়ে দিলো মেঘালয়। মিশু ওর বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে বিড়বিড় করে বললো, “এটা কি হলো? এভাবে এসে…”

মেঘালয় হেসে বললো, “হুট করে ফিরে এসে লুট করে নিয়ে যাবো। বলেছিলাম না একদিন?”
-“যাও দুষ্টুটা।”

মেঘালয় মিশুকে আরো জোরে ঠেস দিয়ে ধরলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, “প্রয়াসের আইডিতে এটা কি দেখলাম?”
-“আমরা সবাই ওনার বার্থডেতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওই লোকটা একান্ত আমাকেই হাইলাইট করবে আমি ভাবিনি।”

মেঘালয় খুব জোরে মিশুর পেটে চাপ দিয়ে ধরে বললো, “আমার সহ্য হয়না অন্য কাউকে। জানিস না তুই? আজকে তোকে খুন করেই ফেলবো আমি।”

বলেই মিশুকে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। কিন্তু এরপর মিশু যা করলো সেটার জন্য একদম ই প্রস্তুত ছিলোনা মেঘালয়। মিশু মেঘালয়ের ঘাড়ে জোরে কামড় দিয়ে একেবারে দাগ বসিয়ে দিলো। মেঘালয় মুখ তুলে বললো, “এরকম হিংস্র কামড় দিচ্ছো কেন?”
-“তুমি এত হিংস্র জানোয়ারের মতন বিহ্যাভ কেন করছো?”

মেঘালয় রেগে বললো, “কি বললা তুমি? এতদিন ধরে আমাকে দগ্ধ করতে করতে আজকে আমাকে জানোয়ারের সাথে কম্পেয়ার করছো?”
-“আমি তোমাকে দগ্ধ করিনি কখনো। তুমি অযথাই আমাকে ভূল বুঝলে আমার কিছু করার নেই। এখন আমাকে ছাড়ো তো। এভাবে চেপে ধরলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”

মেঘালয় আরো জোরে মিশুকে চেপে ধরে বললো, “দম বন্ধ হয়ে মরে যাও। আমাকে কেন দূরে রাখো তুমি?”
-“মেরেই ফেলো তো আমাকে। আমি মরলেই যেন তোমার কত শান্তি।”

মেঘালয় হুট করেই ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মিশু সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে এবার। বারবার মেঘালয়কে এভাবে সরিয়ে দেয়ার পরিণাম কতটা ভয়ংকর হবে ভাবতেও পারেনা ও। মেঘালয়কে কি মানুষ মনে হয়না? এটা রীতিমত অপমান। মেঘালয়ের ভেতরটা কিভাবে পুড়ছে সেটা কি ধরতে পারছে না ও? একমাস যাবত এভোয়েড করে দুবার ওকে সরিয়ে দিলো কাছ থেকে। একদিন পস্তাতে হবে এসবের জন্য।

মেঘালয় বিছানা ছেড়ে নেমে এসে বললো, “আর কখনো তোমাকে ছুঁয়েও দেখবো না। সারাক্ষণ ফোন দেই,আমাকে ব্যস্ততা দেখাও। একটা মাস হলো আমাকে নিজে থেকে ফোন দাওনা। আমি যতরাতেই দেই,তুমি টায়ার্ডনেস দেখিয়ে ঘুম দাও। আরে আমি সারাদিন কত ছুটাছুটি করে, পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে ওয়েট করি তোমার সাথে একবার কথা বলার জন্য। আর তুমি আমাকে ব্যস্ততা নামক অজুহাত দেখাও। আমার স্পর্শ আজকাল অসহ্য লাগে? সেজন্য কাছে টানলেই আমাকে অপমান করে সরিয়ে দাও? আমাকে তো খুব বিরক্ত লাগছে তাইনা? এই মেঘালয় আর কক্ষনো বিরক্ত করবে না তোমাকে। কক্ষনো বিরক্ত করবে না।”

কথাটা বলেই দ্রুত হেঁটে মেঘালয় বাসা থেকে বেড়িয়ে এলো। মিশু বিছানায় বসে রইলো থ হয়ে। মাঝরাতে কি থেকে কি হয়ে গেলো কিছুই বুঝতে পারছে না ও। মেঘালয় এভাবে মন খারাপ করে চলে গেলো! সবকিছু কেমন যেন ঘোর ঘোর লাগছে ওর। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা অনুভূত হতে শুরু করলো।

মেঘালয় বাসা থেকে বেড়িয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো খুব জোড়ে। ওর চোখেমুখে আগুন ঝরছে। মিশুর এই আমূল পরিবর্তন মেনে নেয়ার মত নয়। মেঘালয় আর কিছুই করবে না। যে নিজে পরিবর্তন হয়েছে,সে নিজ দায়িত্বেই ঠিক হয়ে যাবে। মেঘালয়কে হারানোটা কত বড় অপ্রাপ্তি ঠিকই বুঝবে ও। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
মিশু অনেক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো। তারপর বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো।

৭৯.
সকালে ঘুম ভাঙল অনেক বেলা করে। উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেয়ে নিলো। আজকে রেডিওতে প্রোগ্রাম নেই। বিকেলে ফটোগ্রাফি এক্সিবিশনের অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করতে হবে। এখন কি করা যায় তাহলে? মেঘালয়কে কি একবার কল দেবে? এরপর ই রাতের ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো। মেঘ বুঝি রাগ করেছে খুব। অত গভীর ভাবে কিছু ভাবলো না মিশু। মনেমনে বললো, “মেঘ তো আমাকে ছাড়া থাকতেই পারবে না। ঠিকই একটু পরেই কল দেবে। জগতের সমস্ত নিয়ম ভেঙে যাবে তবুও মেঘালয় আমাকে ছাড়া একটা মুহুর্ত থাকতে পারবে না।”

এটা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ইয়োগা করতে আরম্ভ করলো। মেডিটেশন করলো অনেক্ষণ ধরে। বেশ মানসিক প্রশান্তি লাগছে। মেঘালয় দারুণ একটা জিনিস শিখিয়ে দিয়েছে। টেনশন হলে একবার মেডিটেশনে বসলেই সমস্ত টেনশন উধাও হয়ে যায়। ছেলেটা এত ভালো! মিশু একবার হাসলো মনেমনে। সত্যিই ছেলেটা অনেক ভালো। এত ভালোবাসে কেউ কখনো! মেঝেতে বসেই এসব ভেবে ভেবে হাসছিলো।

ফোন বেজে উঠলো মিশুর। ও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রয়াস ফোন দিয়েছে। রিসিভ করে বললো, “হ্যালো।”
-“মিশু, গুড মর্নিং।”
-“গুড মর্নিং, কালকে আপনি ক্যাপশনে ওটা কি লিখেছেন? আর আমাকেই কেন এভাবে হাইলাইট করলেন?”
-“উম,রাগ করেছো?”
-“সেটা নয়। আমার ফ্যামিলি মেম্বারের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হয়েছে।”
-“ওহ, সরি। একটু বুঝিয়ে বলোনা। এটা আর এমন কি ব্যাপার? সবার কমেন্ট গুলো দেখেছো? আমাদের জুটিটাকে নাকি খুব সুন্দর মানিয়েছে।”
-“কিসের জুটি?”
-“হা হা হা। রেগে যাচ্ছো? আরে সবাই ভাবছে আমরা একে অপরকে.. বুঝোই তো। আমার আম্মুর ও নাকি তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। আম্মু বলছে আরেকবার তোমাকে বাসায় নিয়ে আসতে।”
মিশুর মেজাজ চড়ে গেলো। বললো, “আমি ব্যস্ত এখন। ফোন রাখছি।”

ফোন রেখে রাগে ফুঁসতে লাগলো মিশু। প্রয়াসের সাথে ওর সেরকম কোনো সম্পর্ক নেই। কেবলমাত্র কলিগ হিসেবেই দেখে মিশু। কিন্তু লোকটা ওকে খুব পছন্দ করে। একটু একটু স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছে। মিশু জানেনা এসব। ওর বার্থডে তে সব কলিগ মিলে গিয়েছিলো কিন্তু মিশুকে নিয়েই লোকটা এত মাতামাতি করেছে। কয়েকটা ছবি আপলোড দিয়েছে।

মিশু মনেমনে বললো, “আমার পক্ষে কাউকে ভালোবাসা সম্ভব নয় কারণ আমি শুধুই মেঘালয়ের। অপরপাশের মানুষটা তাকে নিয়ে কি ভাবছে সেটা না জেনেই এই লোকগুলা এমন মাতামাতি করে যে মেজাজ গরম হয়ে যায়। আমার জগতে মেঘালয় ছাড়া আর কেউ থাকতে পারেনা। আর কক্ষনো কথা বলবো না এই লোকটার সাথে। সকাল সকাল মেজাজ খারাপ করে দিলো।”

মিশু মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর উঠে শাওয়ার নিয়ে এসে লাঞ্চ সেরে নিলো। দুপুর পেরিয়েছে। একটু পরেই বের হবে এক্সিবিশনে যাওয়ার জন্য। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রেডি হয়ে নিলো। তারপর বেড়িয়ে পড়লো বাসা থেকে।

প্রোগ্রাম খুব ভালোভাবেই শেষ হলো। রাত নয়টার দিকে বাসায় ফিরলো মিশু। বাসায় এসে চেঞ্জ করে শাওয়ার নিলো। তারপর খাবার টেবিলে এসে একটা আপেল নিয়ে কামড়াতে কামড়াতে টিভিটা ছেড়ে দিয়ে বসলো। রৌদ্রময়ী কদিন হলো আলাদা বাসায় উঠেছে। ওর বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে পূর্ব’র সাথে। বাসায় একদম একা মিশু। এই মুহুর্তে হুট করেই খুব একা একা লাগতে শুরু করলো।

হঠাৎ ই মনটা কেমন বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেলো। রাত ১২ টা বেজে গেছে। ফোনের দিকে কয়েকবার তাকালো মিশু। আজ সারাদিনে ফোনটা বারবার বাজলো না কেন? মেঘালয় দিনে কয়েকবার কল দেয়,আজকে একবার ও দিলো না কেন? ফোনটা এখনো বেজে উঠছে না কেন?

মিশু এসে ফোন হাতে নিয়ে মেঘালয়ের নাম্বারে কল দিলো। ফোন আনরিচেবল শুনেই বুকটা ধক করে উঠলো ওর। সারাদিন একবার ও কল দিলোনা এখন আবার বন্ধ! মিশুর বুকটা চিনচিন করে উঠলো। পুরো বাড়িটা একা, আজ রোদও নেই। মেঘালয় ফোনও দিচ্ছেনা,কেমন যেন একাকীত্ব ভর করলো এসে। মিশু একটা টেক্সট পাঠালো মেঘালয়ের নাম্বারে, “phone bondho keno?”

মেসেজ সাকসেস হলোনা। মিশু মেসেজ বক্সের মেসেজ গুলো দেখতে লাগলো। মেঘালয় দুদিন আগে দিয়েছে, “mishu emon behave keno korcho amar sathe?”
“tomar ki hoyeche bolba please?”
“kono karone amar upor rege acho tumi? tomar vetor kichu niye confusion cholche? ki hoiche bolba amk?”

এরকম প্রায় ত্রিশটা মেসেজ যেসবের সারমর্ম হচ্ছে মিশুর কিছু হয়েছে কিনা? মিশু কেন চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে? আর মেঘালয়কে কেন কষ্ট দিচ্ছে? প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো মিশু। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো, “আসলেই কি আমি বদলে গেছি?”

আয়না দেখে নিজেই চমকে উঠলো। সত্যিই আয়নায় নিজের যে প্রতিবিম্ব ও দেখছে সেটা সত্যিকার মিশু নয়। এটা নকল মিশু। এই মিশু কৃত্রিম,অনেক রংচং মেখে বানানো। এটা মেঘালয়ের মিশু নয়। মেঘালয়ের কষ্ট পাওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়?

মিশুর বুকের চিনচিন ব্যথাটা আরো বেড়ে গেলো। খুব খারাপ লাগছে ওর। কিন্তু এই পরিবর্তন কিভাবে কোথ থেকে হলো ও কিছুই বুঝতে পারেনি। মনমরা হয়ে আয়নার পাশের সোফায় বসে রইলো অনেক্ষণ। ফোন হাতে নিয়ে কয়েকবার কল দিলো মেঘালয়ের নাম্বারে, কিন্তু বন্ধ পাচ্ছে। কেন যেন একবার সরি বলার প্রয়োজন অনুভব করছে মিশু। কিন্তু ওর নাম্বার তো বন্ধ।

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো অনেক রাতে।

পরদিন ঘুম ভাংলো অনেক দেরিতে। আজকে সকালেই প্রোগ্রাম আছে। রেডি হয়ে নাস্তা করে কাজে চলে গেলো। কাজের মাঝে কিছু মনে হয়নি। কিন্তু কাজ থেকে বাসায় এসে ফোন নিয়ে দেখলো মেঘালয় একবার ও কল দেয়নি। মিশুর এবার সত্যি সত্যি চিন্তা হচ্ছে। বিকেল হয়ে গেলো, দুদিন ধরে মেঘ কল দিচ্ছেনা। তবে কি সত্যি সত্যিই রাগ করেছে ও?

মিশু চিন্তায় ভেঙে পড়লো। মেঘালয় ফোন দিচ্ছেনা কেন? সত্যিই সেদিন রাতে কষ্ট পেয়েছে? মিশু অনেকবার কল দিয়েও নাম্বার বন্ধ পেলো। তারপর বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো সেদিন রাতে আসলেই কেমন আচরণ করেছে মেঘালয়ের সাথে। কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করতেই সব স্পষ্ট ভেসে উঠলো চোখের সামনে। সব মনে পড়ে যাচ্ছে আর বুক ফেটে কান্না বেড়িয়ে আসতে চাইছে।

মিশুর এতদিনের সব অন্যায় আচরণের কথা মনে করে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। মেঘালয় যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। নয়ত নিজের ভূলগুলো বোঝার সাধ্য ওর কখনোই হতোনা। সত্যিই মেঘালয়ের শূন্যতা খুব করে অনুভব করছে ও। মেঘালয়কে ছাড়া একটা দিনও চলবে কি? ও কোথায় এখন? ফোন দিচ্ছেনা কেন?

মিশু মেসেঞ্জার, হোয়াটস এপ সবখানেই মেসেজ পাঠিয়ে রাখলো। চারদিন আগে একটিভ ছিলো। বাসায় তো ওয়াইফাই আছে, মেঘালয় কি তাহলে বাসায় নেই? কিছুই মাথায় আসছে না মিশুর।

থাকতে না পেরে মেঘালয়ের মায়ের নাম্বারে কল দিলো। দুবার রিং হলো কিন্তু কেউ রিসিভ করলো না। মিশুর বুক ফেটে যাচ্ছে। চার পাঁচদিন আগে আংকেল আন্টি বিয়ের কথা বলেছিলেন। মিশু কিছুদিন সময় চেয়েছিলো বলেই কি ওনারাও রেগে গেছেন? মা ছেলে সবাই মিলে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে বসে আছে। মিশুর এ শহরে আর কে আছে ওনারা ছাড়া? একমাত্র মেঘালয় ছাড়া আর আপন বলতে ওর কেউ নেই। মেঘালয় কোথায়?

মিশু অনেকবার কল দিলো মেঘালয় আর ওর মায়ের নাম্বারে। ওর বাবার নাম্বারে কল দিয়ে দেখলো নাম্বার বন্ধ। টেনশন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। খুবই অসহায় লাগছে নিজেকে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লো মিশু।

৮০.
পরদিন সকালের প্রোগ্রাম শেষ করেই মিশু মেঘালয়ের বাসায় চলে এলো। এসে মেঘালয়ের মাকে দেখেই নিজেকে সামলাতে পারলো না। ছুটে এসে ওনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আম্মু আমাকে মাফ করে দাও। আমাকে মাফ করে দাওনা প্লিজ।”

মিশুর এরকম কান্নার কারণ বুঝতে না পেরে উনি জিজ্ঞেস করলেন, “কি হইছে মিশু?”
মিশু অবাক হয়ে বললো, “আপনি জানেন না কি হয়েছে?”
– “না তো। মেঘ তো কিছুই বলেনি।”
– “রাতে অনেকবার কল দিলাম আপনার নাম্বারে, ধরলেন না কেন তাহলে?”
মা বললেন, “আমার নাম্বার সাইলেন্ট করে ঘুমিয়েছিলাম।”
– “বাবার নাম্বার বন্ধ পেলাম কেন? সবাই আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে বসে আছেন?”
-“আকাশ তো রাতে ফোন বন্ধ করে ঘুমায়। সকালে কল ব্যাক করতে চাইলাম, পরে ভাবলাম তোর তো এই সময়ে প্রোগাম থাকে তাই আর কল দিইনি।”

মিশু ওনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে গেলো, “আম্মু মেঘ আমার সাথে খুব রাগ করেছে। তিনদিন ধরে আমাকে ফোন দেয়না। ওর নাম্বার ও বন্ধ।”
মা মিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানিনা তোদের মাঝে কি হয়েছে। তবে মেঘালয় যখন এসে বলল বিয়ে ক্যানসেল করে দাও তখনি ভাবলাম হয়ত ব্রেকাপ হয়ে গেছে তোমাদের। মেঘালয় আর কিছুই বলেনি। ওর ফোন রুমে পড়ে আছে। ও কোথায় গেছে কিচ্ছু বলে যায়নি।”

মিশু কান্নায় ভেঙে পড়লো। বিয়ের ব্যাপারটা ডিনাই করার কারণেই মেঘালয় আরো বেশি কষ্ট পেয়েছে। ব্রেকাপ কি করে হবে? স্বামী স্ত্রী’র মাঝে তো ব্রেকাপ হয়না। এটা তো মাকে বলা সম্ভব না। তবে সবমিলিয়ে পাহাড় সমান কষ্ট দিয়ে ফেলেছে মেঘালয়কে। এখন কি হবে? কেউই জানেনা মেঘালয় কোথায় আছে!

৮১.
মিশু মেঘালয়ের বিছানায় শুয়ে ওর বালিশ চেপে ধরে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে। এই চাদর আর বালিশে মেঘালয়ের স্পর্শ মিশে আছে, ওর শরীরের গন্ধ মিশে আছে। খুব করে অনুভব করছে মেঘালয়কে। ও কোথায় আছে কিছুই জানেনা কেউ। ওর সব বন্ধুদেরকে কল দিয়েছিলো কেউই মেঘালয়ের কোনো খোজ জানেনা। মিশু ক্রমশই অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো। একটা মাস ধরে মেঘালয়কে এভোয়েড করেছে ও,সেটা ভেবে নিজের চুল নিজেরই টেনে টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

মিশুর ফোনে প্রয়াস কল দিয়েছে। ও দুবার কল কেটে দেয়ার পরও কল দিচ্ছে। মিশু কান্না থামাতে পারছে না কিছুতেই। বাধ্য হয়েই ফোন বন্ধ করে রেখে দিলো। মেঘালয়কে একবার দেখার জন্য ছটফট করছে ও। এখন সামনে পেলে দুই পা ধরে ক্ষমা চাইতো মেঘালয়ের কাছে। তবুও ওকে চাই,খুব করে চাই।

মেঘালয়ের মা এসে মিশুকে খাবার তুলে খাওয়ালেন। বললেন, “মেঘালয় এমন করার ছেলে না। কি হয়েছিলো বলবি?”
-“আমি ওকে অনেকদিন যাবত এভোয়েড করছিলাম। ইচ্ছে করেই করিনি,আমি ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এই ব্যস্ততা আর ক্যারিয়ারের অজুহাতে অনেকবার খারাপ আচরণ করেছি ওর সাথে।”
-“আমার ছেলেটা অবহেলা সহ্য করতে পারেনা।”
-“সেটা কেউই পারেনা। আর আমিতো বারবার ওকে আমার কাছ থেকে…”

কথাটা বলতে গিয়ে মিশু থেমে গেলো। ওকে জানোয়ারের সাথে তুলনা করার কথাটা মনে পড়ে গেলো ওর। যে ছেলেটার বুকে লাথি দেয়ার পরও মেঘালয় ওর পায়ে চুমু দিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো। টানা এক ঘন্টা পা টিপে দিয়েছিলো, মাথায় জলপটি দিয়েছিলো সারা রাত জেগে থেকে। এই ছেলেটাকে কিভাবে এত কষ্ট দিতে পারলো ও? নিজের ইচ্ছে করছে নিজেকে আঘাত করতে।

মা বললেন, “টেনশন করিস না। ও যেখানেই থাকুক, কতদিন এভাবে থাকবে? এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ? তারপর ঠিকই ফিরে আসবে। আমাকে ছেড়ে ও থাকতে পারেনা, আর তোকেও ও অনেক ভালোবাসে। আমার বিশ্বাস তোকে ছেড়েও থাকতে পারবে না। সম্পর্কে এরকম হয়।”

মিশু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনেমনে বললো, এটা শুধুই সম্পর্ক ছিলোনা। মেঘালয়ের পুরো পৃথিবী জুড়ে শুধু আমিই ছিলাম। আর আমরা তো তথাকথিত প্রেমিক প্রেমিকা নই,আমরা স্বামী স্ত্রী। এই বাঁধন তুচ্ছ করার সাধ্য আমাদের নেই।
মিশু বললো, “আম্মু আমার একটা কথা রাখবে?”
-“কি কথা?”
-“আপনারা বিয়ের সব আয়োজন করে ফেলবেন প্লিজ? সব জায়গায় ছড়িয়ে দিন মেঘালয়ের বিয়ের কথা। ও যেখানে থাকুক ছুটে চলে আসবে।”
-“ওকে ছাড়াই বিয়ের আয়োজন করবো?”
-“হুম। ও তো অভিমান করে দূরে ডুব মেরে আছে,যখন দেখবে সব জায়গায় প্রচার হয়ে গেছে বিয়ে হচ্ছে। ও কিভাবে দূরে লুকিয়ে বসে থাকবে? আমাকে ছেড়ে কয়দিন ই বা থাকতে পারবে মেঘ? আর বিয়ের এরেঞ্জমেন্ট হয়েছে শুনলে দূরে থাকতেই পারবে না।”

মা হেসে বললেন, “ভালো আইডিয়া তো। মেঘালয় কতদিন অভিমান করে থাকবে? আমরা এদিকে বিয়ের সব আয়োজন করে ফেলি,দেখা যাবে বিয়ের আগেই হুট করে এসে হাজির। এত বিশাল আয়োজন হবে যে,মেঘ নিজেই মুগ্ধ হয়ে যাবে।”

মিশু শ্বাশুরিমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “আমাকে ভূল বুঝোনা প্লিজ আম্মু। আমি নাহয় একটু ভূল করেছি। শুধরানোর সুযোগ দাও আমায়।”
-“পাগলী মেয়েটা। চিন্তা করিস না। বিয়ের ব্যবস্থা করছি দ্রুত। তুই এখানেই থাক,সবার সাথে এনজয় কর।”
-“সবার সাথে এনজয়? অথচ যার বিয়ে তার খবর নাই।”
মা হেসে উঠলেন। মিশুর ও হাসি পেয়ে গেলো।

৮২.
বিয়ের আয়োজন দ্রুত গতিতে শুরু হয়ে গেলো। আকাশ আহমেদ নিজে গিয়ে সায়ান, আরাফ ও পূর্ব সবাইকে নিয়ে এসেছে বাসায়। যেহেতু আর নিজস্ব কোনো লোক নেই। এখন সমস্ত আয়োজন এদের সবাই মিলে করতে হবে।দুদিন কেটে গেছে। মেঘালয় কোথায় আছে কেউ বলতে পারছে না। সে যেখানেই থাকুক, পত্রিকায় ইতিমধ্যেই খবর প্রকাশিত হয়ে গেছে, “জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মেঘালয় আহমেদের সাথে জুটি বাঁধতে চলেছেন আর.জে মিশু।”

এই শিরোনামে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে পাত্রের কোনো খোঁজ নেই। মিশু নিজের ওয়ালেও স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়েছে, “মেঘালয়ের সাথে সম্পর্কটা প্রায় বছর খানেকের। ভেবেছিলাম আরো দেরিতে বিয়ের পিড়িতে বসবো, কিন্তু বাবা মায়ের কথা ভেবে তাড়াতাড়ি করতে হচ্ছে। আকাশ আহমেদের মতন বাবা আর বর্ষা আহমেদের মতন মাকে দূরে রাখা অসম্ভব ব্যাপার। আর মেঘালয় আহমেদ? সে কথা আর নাইবা বললাম। একটু না দেখলেই যেন দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।”

সবখানে ভাইরাল হয়ে গেলো কথাগুলি। মেঘালয় নিউজ দেখে হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারলো না। তার অনুপস্থিতিতে এসব কি ছড়িয়েছে? ওকে ছাড়াই বিয়ের আয়োজন করে ফেলেছে এটা কেমন কথা! পাত্রই নাই তাহলে বিয়ে হবে কার সাথে? হাসিও পাচ্ছে,কষ্টও হচ্ছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার। মা বাবাও মিশুর সাথে পাগলামি শুরু করে দিয়েছেন।

তিনদিনের মাথায় মেঘালয় বাসায় এসে হাজির।

৮৩.
মিশু মেঘালয়ের রুমে শুয়ে শুয়ে কি যেন ভাবছে। এমন সময় দরজায় একটা মানবছায়া দেখে চমকে উঠলো। মেঘালয়!

মিশু লাফিয়ে উঠে বিছানা থেকে নেমে এসে জাপটে ধরলো মেঘালয়কে। জড়িয়ে ধরেই কেঁদে ফেললো। কান্নার জন্য কথাও বলতে পারলো না। অনেক্ষণ ধরে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপছে রীতিমত। মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিশুকে ধরলো ও না একবার। উচিৎ শিক্ষা হয়েছে মেয়েটার। অনুশোচনায় দগ্ধ হোক,তারপর…

মিশু বললো, “কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি আমায় ফেলে? আমি তো মরেই যেতাম তোমায় ছাড়া। তুমি জানোনা এই মেয়েটা তোমাকে ছাড়া কতটা অসহায়? এভাবে কেউ ডুব দেয়?”

মেঘালয় মনেমনে হাসলো। এমন টাই হওয়া স্বাভাবিক। প্রিয় মানুষ কাছে থাকলে তার গুরুত্ব বোঝা যায়না। আর বেশি ভালোবাসা পেলে সবাই হজম করতে পারেনা,বদহজম হয়ে যায়। মিশুর গায়ে নতুন বাতাস লেগেছে, মেঘালয়ের গুরুত্ব বোঝার মত অবস্থা ওর ছিলোনা। সেজন্যই কিছুদিনের জন্য ডুব মারতে বাধ্য হয়েছিলো মেঘ।

মিশু বললো, “আমাকে যা খুশি শাস্তি দাও মেঘ। তবুও আমাকে ছেড়ে যেওনা কোথাও।”
মেঘালয় মিশুকে ওর বুক থেকে তুলে দাড় করিয়ে দিয়ে নিজে এসে বিছানায় বসলো। এসি টা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “উফফ কি গরম আজকে! যা দেখছি তাই হট লাগছে!”

মিশুর কান্না এখনো থামেনি। মেঘালয়ের মুখে এমন কথা শুনে ও কান্নারত অবস্থায়ই ফিক করে হেসে ফেললো। মেঘালয় গায়ের শার্ট টা খুলে সোফার উপর ছুড়ে মারলো। তারপর দুহাতে মাথার চুলগুলো ঠিক করতে লাগলো। মিশু ওর উন্মুক্ত বুকের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলো একেবারে। কতদিন এই রোমশ বুকটা দেখেনি ও! মেঘালয় আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়ে গেছে দেখতে। চুলগুলো বড় হয়ে গেছে,দাড়িও বড় হয়েছে। তবুও কি বিপজ্জনক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছে ছেলেটাকে।

মিশু উন্মাদের মতন ছুটে এসে আচমকাই মেঘালয়ের কোলের উপর বসে ওর বুকে মুখ ডুবিয়ে শরীরের ঘ্রাণ নিতে লাগলো। মেঘালয় থতমত খেয়ে গেলো এমন আচরণে। বাহ! মাত্র কয়েকদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখাতেই একেবারে হোমিওপ্যাথি ওষুধের মতন কাজ করেছে। ওর হাসি পেয়ে গেলো কিন্তু হাসলো না। মিশুকে দূর্বল করে দেয়ার জন্যই ও যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। ওর বিশ্বাস ছিলো, মেঘালয়ের শূন্যতা মিশুকে দহনে দগ্ধ করবে ঠিকই। সেই বিশ্বাসই সত্যি হলো।

মিশু মেঘালয়ের বুকের লোমে নাক ঘষতে লাগলো। মেঘালয় অস্থির হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এভাবে পাগলামি করলে অস্থির না হয়ে উপায় আছে? মিশু একটা হাত মেঘালয়ের গালে রেখে আরেকহাতে মাথাটা ধরে আছে আর নাকটা ঘষছে ওর বুকের সাথে। মেঘালয় বললো, “উফফ খুব উশখুশ লাগছে। শাওয়ার নিতে হবে।”

কথাটা বলেই মিশুকে ছাড়িয়ে রেখে উঠে পড়লো বিছানা থেকে। মিশুকে সরিয়ে দেয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেলো মিশুর। রাগ উঠে গেলো। একইসাথে মনে পড়ে গেলো সেইদিনের কথা। যেদিন মেঘালয়কে সরিয়ে দিয়ে ও বলেছিলো খুব উশখুশ লাগছে গোসল করতে হবে। মেঘালয় বিছানায় ছটফট করছিলো আর ও গোসল করে এসে ওকে ফেলে বাইরে চলে গিয়েছিলো। কথাটা মনে করে অনুশোচনা হচ্ছে মিশুর। ইস! কেন যে সেদিন অমন করেছিলো। এই ছেলেটার থেকে কিভাবে দূরে থাকা যায়? যায়না যায়না।

মেঘালয় বাথরুমে ঢুকে গেলো। একবার দরজাটা একটু ফাঁক করে মিশুর মুখটা দেখে নিয়ে আবার দরজা লাগিয়ে দিলো। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে হেসে উঠলো শব্দ করে। এতক্ষণ অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিলো। বুদ্ধিতে কাজ হয়েছে তাহলে। ও জানতো একটু দূরে গেলেই মিশু ঠিকই বুঝবে। এবার দ্যাখ কেমন লাগে? এবার ঠ্যালা বুঝো, কতধানে কত চাল আর কত চালে কত ময়দা?

মিশুর চোখে পানি এসে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখ মুছতে লাগলো ও। মেঘালয় এসে একবার কথাও বলছে না ওর সাথে। কি রাগ রে বাবাহ! কতক্ষণ এভাবে রেগে থাকবে কে জানে? খুব কষ্ট হচ্ছে তো।

মেঘালয় গোসল করে বের হলো। টাওয়েল পড়ে খালি গায়ে এসে দাঁড়ালো আয়নার সামনে। বডি স্প্রে নিয়ে গায়ে স্প্রে করলো কয়েকবার। মিশু ওর দিকে তাকিয়ে আবারো শিহরিত হয়ে উঠলো। পাগল করা সুন্দর লাগছে মেঘালয়কে। টাওয়েলটা হাঁটু অব্দি। আর হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের গোড়ালি অব্দি ঘন লোমে ঢাকা। মেঘালয় জানে মিশুর অন্যরকম দূর্বলতা এই পায়ের লোমের প্রতি। তাই ও পা মোছেনি। ভেজা পায়ে ভেজা লোমগুলো লেপ্টে আছে একেবারে। কি যে সুন্দর লাগছে! মিশু দেখছে আর কেঁপে কেঁপে উঠছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে মেঘালয়ের পায়ের দিকে। মেঘালয় আয়নায় দেখছে মিশুর মুখটা। ও বুঝতে পারছে মিশুর দৃষ্টি এখন ওর পায়ের প্রতি। পায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করছে মেয়েটা। মেঘালয় মুখ টিপে হাসছে, হাসি চেপে রাখতে খুবই কষ্ট হচ্ছে ওর।

মেঘালয় আয়নার পাশের সোফায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে চাপতে লাগলো। প্যান্ট পড়া ছেড়ে ফোনে কিসের এত কাজ? মিশু রেগে যাচ্ছে ক্রমাগত। আর পিটপিট করে তাকাচ্ছে। মিশু রুমে আছে এটা যেন মেঘালয়ের খেয়ালেই নেই। মেঘ এমন ভাব করে ফোন চাপছে। বাব্বাহ! নতুন ফোন কিনেছে? ফোন কিনেছে তবুও মিশুকে একবার কল দেয়নি? এত বড় সাহস!

মেঘালয় ওয়াইফাই কানেক্ট করামাত্রই টুংটুং করে মেসেঞ্জারে মেসেজ আসতে লাগলো। মিশু জ্বলে পুরে ছাই হওয়ার মত অবস্থা। মেঘালয় আড়চোখে দু একবার তাকায় মিশুর দিকে। আর মনেমনে হাসে, দ্যাখ কেমন লাগে?

মেঘালয় কাকে যেন কল দিয়ে বললো, “এত কেন মেসেজ দিতে হবে? মেসেজ দেয়া বন্ধ করো প্লিজ। কি বললা? নাহ,আমি মাত্র শাওয়ার নিয়ে আসলাম। কিহ! ভেজা স্নিগ্ধ চেহারাটা দেখতে ইচ্ছে করছে? আর ইউ ক্রেজি রিমিকা? আমার স্নিগ্ধ চেহারা আমি কাউকে দেখাই না। আর তোমাকে তো নয়ই। কেন বুঝছো না আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমিতো জানিনা, বাবা মা ঠিক করে ফেলেছে আর কিইবা করতে পারি? আমি আবার ওদের বাধ্যগত সন্তান। হা হা হা, আচ্ছা হোয়াটস এপে আসো। না না, ভিডিও কল দিতে পারবো না। দুটো ছবি দিচ্ছি,জাস্ট দুটো। আর হ্যা, এটাই লাস্ট। দুদিন বাদে আমার বিয়ে, নেক্সট টাইম আর কিচ্ছু চাইবে না।”

মেঘালয় কল কেটে দিয়ে কয়েকটা ছবি তুললো ফোনে। মিশুর কান্না পেয়ে যাচ্ছে আর রাগে ফুঁসছে ও। রিমিকা টা আবার কে? আর কিসের এত প্রেম তার সাথে? গোসল করে খালি গায়ের স্নিগ্ধ চেহারা তাকে দেখাতে হবে? এত বড় সাহস? মিশু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এসে মেঘালয়ের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দেখলো রিমিকা’র সাথে কনভারসেশন। অনেক গুলা মেসেজ। মেসেজ দেখে মনেহচ্ছে মেয়েটা মেঘালয়কে খুবই ভালোবাসে। আর মেঘালয় ওকে পাত্তা দেয়না বলে কান্নাকাটিও করে। মেঘালয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে সে হাত কেটে সেই ছবি আবার সেন্ড করেছে। মিশু হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে।

মেঘালয় কিছু বললো না। মুখ টিপে হেসে অন্যদিকে তাকালো। রিমিকা মেঘালয়ের ই ফেক আইডি। এক বান্ধবীর ছবি নিয়ে প্রোফাইলে দিয়েছে। মেঘালয় নিজেই রিমিকার আইডি থেকে মেসেজ গুলো পাঠিয়েছে। শুধুমাত্র মিশুকে ক্ষেপানোর জন্য। তাই হাসি চেপে রাখতে পারছে না। ওর হাসি দেখলে মিশু ক্ষেপে যাবে তাই দেখাতে চায়না। অন্যদিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে হাসি চেপে গেলো। মিশু ফোনটা রেখে বললো, “এই মেয়ে কে? আমার স্বামীর সাথে তার কিসের এত লটরপটর? রিমিকা না টিমিকা, খুন করে ফেলবো একদম। তোমার সাহস তো কম না,তুমি ওকে পিক পাঠাতে যাচ্ছো?”

মেঘালয় হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বললো, “যা করছি সব ওপেনে। কারো আড়ালে গিয়ে তো করিনি। আমিতো আর অন্যের মত কাউকে না জানিয়ে বার্থডে পার্টিতে গিয়ে কেক খাওয়াইনি,নাচিনি। সেই ছবি পাবলিক ও করিনি।”

মিশুর বুক ফেটে যেতে চাইলো কথাটা শুনে। ভেতর থেকে ঠেলে কান্না বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ও যখন এসব করেছে তখন বুঝতে পারেনি কাজটা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। আর মেঘালয় কিনা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ইচ্ছেকৃত ভাবে এমন করবে?

মিশু মেঘালয়ের কোলের উপর এসে বসলো। তারপর মেঘালয়ের মুখটা দুহাতে ধরতে যাবে এমন সময় মেঘালয় বললো, “কোলের উপর বসার কোনো মানে হয়? এত ভারি ওজনের মানুষটাকে কোলে নেয়ার মত এনার্জি নাই গায়ে। খিদা লাগছে।”

মিশু রেগে বললো, “কি বললা? আমি ভারী মানুষ? আমার এতই ওজন?”
-“ছোটখাটো আলুর বস্তা,আবার বলে কিনা এতই ওজন? হাও ফানি।”
-“কি বললা? আমাকে সবসময় কোলে নিয়ে থাকতে,যেখানে যেতে সেখানেই কোলে নিয়ে যেতে আর বলছো আমার ওজন আলুর বস্তার মতন?”
– “আলুর বস্তা তো কম হয়ে গেলো। ছোটখাটো হাতির বাচ্চা বলা উচিৎ ছিলো।”
-“আমি হাতির বাচ্চা? আমায় কেন বিয়ে করেছিলে তুমি?”
-“একটা চুমু খেয়েছিলাম বলে। বাবারে সেকি কান্না! আমার মতন ইনোসেন্ট ছেলেদের মাথা এভাবেই নষ্ট করো তোমরা।”

মিশুর চোখে পানি এসে গেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। মেঘালয়ের গলা টিপে ধরে বললো, “মেরে ফেলবো।”

মেঘালয় হাসি চেপে বললো, “আই এম সো হাংরি। আই নিড ফুডস”
-“ইংরেজি মারাচ্ছো? আমার সাথে ইংলিশ কপচাপা না।”
– “চুল কাটাকে আপনার সামনে হেয়ার কাটিং বলতে হয়। তাহলে খাবারকে ফুডস না বললে অন্যায় হয়ে যাবেনা?”

মিশুর আবারো কান্না পেয়ে গেলো। ও মেঘালয়ের মুখটা দুহাতে ধরে বললো, “মেঘ, এমন বিহ্যাভ কেন করছো?”

মেঘালয় অন্যদিকে তাকালো। কারণ চোখাচোখি হলেই মেঘ শেষ। তাই মিশুকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। মিশু বললো, “না,আমি উঠতে দিবো না। আমি তোমার কোলেই বসে থাকবো। যেখানে যাবা আমাকে কোলেই নিয়ে যাবা।”

তারপর মেঘালয়ের বুকে একটা আলতো চুমু একে দিলো মিশু।

মেঘালয় মনেমনে হাসলো। এইতো বাচ্চাটার বাচ্চামি ভাব ফিরে এসেছে। ঠেলায় পড়লে বিলাই গাছে উঠে। মেঘালয় জোরে জোরে মাকে ডাকলো, “এই আম্মু একটু আসবা এই রুমে?”

মিশু লাফ দিয়ে কোল থেকে নেমে বললো, “আম্মুকে ডাকছো কেন?”
-“কোল থেকে নামানোর আর কোনো উপায় পাচ্ছিলাম না তাই।”

কথাটা বলেই মেঘালয় রুম থেকে বেড়িয়ে খাবার টেবিলে চলে গেলো। মিশু মেঝেতে বসে কান্না করে ফেললো। মেঘালয় বদলে গেছে। প্রিয় মানুষ বদলে গেলে এতটা কষ্ট হয়! সত্যিই তাহলে মেঘ ও অনেক কষ্ট পেয়েছে! সহ্য হচ্ছেনা মিশুর। এদিকে মেঘ খাবার টেবিলে বসে মায়ের হাতে খাবার খাচ্ছে আর মনেমনে বলছে,এবার বুঝুক কেমন লাগে? একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি!

চলবে..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *