অনুভূতি ! পর্ব_ ৪

অনুভূতি
পর্ব -০৪
মিশু মনি

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

অনুভূতি ! পর্ব_৩

 

১০.
গভীর রাত।
রেলস্টেশনের ওভারব্রিজ দিয়ে হাঁটছে মেঘালয়। মাঝেমাঝেই এই কাজগুলো করে ও। হুটহাট করে বেড়িয়ে পড়ে বাড়ি থেকে, তারপর যেদিকে ইচ্ছে হয় হাঁটা শুরু করে। রাতের পরিবেশ বড্ড বেশি রোমাঞ্চিত করে মেঘালয়কে। রাতের মধ্যে অন্যরকম একটা ব্যাপার আছে। রাতে সবকিছুই কেমন যেন রহস্যময় হয়ে ধরা দেয়।
ওভারব্রিজ এর উপরে অনেক লোকজন শুয়ে আছে, কিছু বাচ্চা একেবারে খালি গায়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। এদের দেখলেই মনটা কেমন যেন করে উঠে। কত অসহায় এরা! মেঘালয়ের ইচ্ছে করছে এগিয়ে গিয়ে একটা বাচ্চার গায়ে হাত বুলিয়ে ছুঁয়ে দিতে। একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়,সে রাতে খেয়েছে কিনা? এরা দুবেলা ঠিকমত খেতেও পারেনা।
এসব ভাবতে ভাবতে মেঘালয় ওভারব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ঘুরিয়ে আশপাশ টা দেখছে। হঠাৎ খেয়াল করে দেখলো সিঁড়ির নীচের ধাপগুলোর দিকে একটা মেয়ে বসে আছে। মাথায় ওড়না দেয়া। পিছন দিকটা দেখে কেমন চেনাচেনা লাগছে। এরকম ওড়না কারো দেখেছিলো ও। কিন্তু এই মাঝরাতে সে স্টেশনে বসে থাকবে কেন? ভেবেই পেলো না মেঘালয়।
কৌতুহলে ভরা চোখ নিয়ে ধীরেধীরে নেমে এলো নীচে। সিঁড়ির নীচের ধাপগুলোর কাছাকাছি এসেই বুঝতে পারলো এটা আর কেউ নয়, এটা সেই বাচ্চা স্বভাবের মিশু নামের মেয়েটা। মেঘালয় বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলো মিশুর দিকে। পিছনে মেঘলয় এসে দাঁড়িয়েছে মিশু সেটা খেয়াল করেনি। মেয়েটা সামনে ই চেয়ে আছে আর গভীর ভাবে কিছু একটা ভাবছে।
মেঘালয় এগিয়ে এসে সিঁড়িতে মিশুর পাশে বসে পড়লো। মিশু এক পলক ওর দিকে তাকিয়েই বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে ফেললো। মেঘালয়ের চোখেও বিস্ময়! এত রাতে এই মেয়েটা রেলস্টেশনে গালে হাত দিয়ে বসে আছে, কত রকমের বিপদ ঘটতেও পারে। কিন্তু সে নির্বিকার চাহনিতে চেয়ে আছে সামনের দিকে। ভাবতেই অবাক লাগে!
মিশু বললো, “আপনি খুব সুন্দর করে গান গাইতে পারেন।”
– “সেটা আমিও জানি। এত রাতে তুমি এখানে কেন?”
– “এত রাত আর কোথায় হলো? সবেমাত্র রাত সাড়ে এগারো টা।”
– “এটা কি সন্ধ্যাবেলা মনেহচ্ছে? তুমি এখানে কেন?”
– “আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। ওদেরকেই ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিলাম।”
– “সেকি! তোমার আম্মুও অসুস্থ! কি হয়েছে ওনার?”
– “কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর আম্মুর জণ্ডিসের দিকেও যাচ্ছিলো। তাই গ্রামে যেতে চাচ্ছিলো।”
– “চলে গেছেন ওনারা?”
– “হ্যা, ওদেরকে বিদায় দিয়ে আমি এখানে বসে আছি। আমার আর বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না।”
– “তোমার মায়ের সাথে আর কে আছেন?”
– “ছোটবোন।”
– “আচ্ছা বেশ।”
মেঘলয়ের চেহারায় চিন্তার ছাপ পড়েছে। মিশুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর মুখ দিব্যি হাসিহাসি। মেঘালয় জিজ্ঞাস করলো, “তোমার খারাপ লাগছে না?”
– “একটু লেগেছিলো। মানিয়ে নিয়েছি।”
– “কি বলে মানিয়ে নাও নিজেকে?”
– “এইযে স্টেশনে কত কত লোক এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে, বাচ্চাদের গায়ে জামাও নেই। কি করুণ চেহারা ওদের, ঠিকমত খেতেও পারেনা। আমি শুধু নিজের দিকে তাকাই আর ভাবি, ওদের চেয়ে আমিতো কত্ত ভালো আছি। তাহলে কেন সামান্য কিছু দুঃখে মন খারাপ করে বসে থাকবো”
মেঘালয় মিশুর এই উক্তিতে একেবারে অবাক হয়ে গেলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো মিশুর দিকে। ছোট্ট একটা মেয়ে, অথচ কত গভীর চিন্তা ভাবনা! এরকম কেন এই মেয়েটা! সত্যিই অদ্ভুত!
মিশু জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কোথাও যাচ্ছেন?”
– “না, আমি মাঝেমাঝে এরকম বাইরে বের হয়ে হাঁটি। রাত আমাকে মোহিত করে তার সৌন্দর্য দিয়ে।”
– “আমার ও রাত প্রিয় অনেক। রাত কত স্তব্ধ, কত নির্জন, কত রহস্যময় তাইনা?”
– “হুম। এ জন্যই রাতকে আমার ও এত বেশি ভালো লাগে। এনিওয়ে মিশু, মুখটা খুব শুকনা শুকনা লাগছে। বসো, চা নিয়ে আসি।”
মেঘালয় উঠে গিয়ে দুকাপ চা নিয়ে এসে আবারো মিশুর পাশে বসে পড়লো। মিশু মুগ্ধ হচ্ছে এটা ভেবেই যে, এরকম বড় একজন মানুষ এত অনায়াসে, এত নিঃসংকোচে কিভাবে মিশতে পারেন! বড্ড মুগ্ধ হতে ইচ্ছে করে।
মেঘালয় চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো। মিশু চা নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চায়ে চুমুক দিলো। মেঘালয় বললো, “কি ভাবছো মিশু?”
মিশু রেললাইনের দিকে চেয়ে আছে। ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনে। যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে ছুটাছুটি করছে। কেউ কেউ নামছে, কেউ উঠছে। কত সুন্দর একটা দৃশ্য! মিশুর ও খুব ইচ্ছে করছে একবার ট্রেনে উঠে লম্বা একটা জার্নি দিতে। কিন্তু সকালেই অফিস আছে, আবারো সকাল দশটা থেকে রাত দশটা অব্দি ডিউটি। জীবন টাকে নিজের মত করে উপভোগ করার কোনো সুযোগ ই যে নেই।
মেঘালয় জানতে চাইলো কি হয়েছে? মিশু জবাব দিলো, “আমার খুব ট্রেন জার্নি করতে ইচ্ছে করছে।”
– “কোথাও ঘুরে আসো ট্রেনে করে।”
– “কিন্তু আমার লাইফটা তো ব্যস্ততায় ঢাকা। ঢাকা শহরের ব্যস্ততায় ঢাকা হলে কি অবস্থা হয় জানেন ই তো। সকালে ডিউটি আছে।”
– “আমি তো তোমাকে একটা অফিসের এড্রেস দিয়েছি। সেখানে চাকরী কনফার্ম। তুমি শুধু গিয়ে ইন্টার্ভিউ দিয়ে, এপোয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে আসবে।”
মিশু একবার তাকালো মেঘালয়ের দিকে। এটার কথা ওর মনেই ছিলোনা। বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ওর চোখ। চোখের মণি ঝিকমিক করে উঠলো।
মিশু বলল, “আজ তো বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই। আমি তাহলে আজই ট্রেনে করে কোথাও ঘুরে আসি।”
মেঘালয় হেসে বললো, “আচ্ছা যাও। হুটহাট করে কোথাও যাওয়ার মজাই আলাদা।”
মিশু এক চুমুকে সবটুকু চা শেষ করে দ্রুত উঠে পড়লো। তারপর এগিয়ে গেলো ট্রেনের দিকে। মেঘালয় উঠে দাঁড়িয়েছে। মিশু একবার ওর দিকে তাকিয়ে বললো, “যাই ঘুরে আসি। ট্রেন যেখানে যাবে, সেখানেই যাবো।”
মেঘালয় হেসে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। মিশু ছুটে গিয়ে টেনে উঠে পড়লো। ব্যাপার টা চমকানোর মতই ছিলো। এত রাতে একা একটা মেয়ে স্টেশনে একা একা গালে হাত দিয়ে বসে আছে, আবার ইচ্ছে হতেই ছুটে গিয়ে ট্রেনে উঠলো। এমন মেয়েও এ পৃথিবীতে আছে! ভারী অদ্ভুত!
মিশু ট্রেনে উঠে দাঁড়িয়ে আছে। টিকেট কাটা হয়নি,কাজেই সিট পাওয়ার প্রশ্নও আসেনা। গাড়িতে প্রচণ্ড রকমের ভিড়। সকলেই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছেন। অবশ্য যে যার সিটে বসে পড়লেই গাড়িটা ফাঁকাফাঁকা লাগবে। মিশু চুপচাপ একটা সিটের উপরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলো। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো মেঘালয়কে দেখতে পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু ওকে দেখা যাচ্ছেনা।
গাড়ি হুইসেল বাজিয়ে চলতে আরম্ভ করে দিয়েছে। মিশু দরজার দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে দেখলো মেঘালয় ও ছুটে এসে গাড়িতে লাফিয়ে উঠে পড়লো। মিশু এগিয়ে এসে বিস্ময়ের ঘোরেই বললো,”এভাবে ছুটে এলেন যে! আপনার ও বুঝি ট্রেনে চড়তে ইচ্ছে করছে?”
– “হুম, হঠাৎ ই ইচ্ছে করে বসলো। আর আমার কিছু ইচ্ছে হলে আমি সেটা করেই ফেলি।”
মিশু হেসে বললো, “আমিও খানিকটা এরকম পাগলী পাগলী। যখন যা ইচ্ছে হয়,কিছু না ভেবেই করে ফেলি। জানেন, একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রাইভেটে যাচ্ছিলাম। সাথে ছিলো আমার চারজন বন্ধু। রাস্তার পাশেই রেলওয়ে স্টেশন। কিন্তু আমরা যেখানে আছি,সেখান থেকে গিয়ে ট্রেনে উঠতে চাইলে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট দৌড়াতে হবে। তবুও সম্ভব কিনা সন্দেহ। তো, আমার এক বন্ধু আমাকে বললো, “ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দিবে। এখন ছুটে গিয়ে উঠা সম্ভব?” আমি উত্তরে বললাম, “হ্যা সম্ভব।” এরপর দু একটা কথায় রীতিমত ওরা আমাকে চ্যালেঞ্জ জানালো। আমি আর কিছুই না ভেবে ছুটা আরম্ভ করে দিলাম। উসাইন বোল্টের মত গতিতে দৌড়েছি বোধহয় কারণ আমি দ্রুতই স্টেশনে পৌছে গেলাম।কিন্তু ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আস্তে আস্তে সেটা চলতেও আরম্ভ করেছে। আমি অনেক দ্রুত দৌড়াচ্ছিলাম। লোকজন শুধু চেঁচাচ্ছিল আমাকে দেখে। কেউ কেউ বলছিল,এই মেয়ে ট্রেনে উঠতে পারবে না। পড়ে যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি সব কথাবার্তা। ট্রেনে খুব জোড়েই ছেড়ে দিয়েছে। আমি চলন্ত ট্রেনে গিয়ে উঠে পড়লাম। কি যে থ্রিলিং ছিলো ব্যাপার টা!”
কথা শেষ করতে করতেই মিশু রীতিমত হাঁফাচ্ছিলো। মেঘালয় মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছে। মনেমনে ভাবছে, “আমার মতই পাগলাটে স্বভাবের মেয়েটা। এমন রিস্কি কাজও কেউ করে!”
মিশু হাসছে আর বারবার মেঘালয়ের দিকে তাকাচ্ছে। মেঘালয় বললো, “কোথায় যাবে এখন?”
– “ট্রেন যতদূর নিয়ে যাবে।”
– “আচ্ছা বেশ। আজ বোধহয় খুব টাকা পয়সা নিয়ে বেড়িয়েছো?
মিশু মুখ বাঁকা করে হেসে বললো, “না। মানে আজ বেতন পেয়েছি তো।”
– “আচ্ছা। আজ তোমার অফিসে আমি যেতেও পারিনি, ক্লাস শেষে ফ্রেন্ডরা মিলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। আজ কিছু কেনাকাটা করা হয়নি। সে যাই হোক, এখন চলো বসে পড়ি।”
– “টিকেট তো কাটিনি। কোথায় বসবো?”
মেঘালয় আশেপাশে তাকিয়ে একটা সিট দেখিয়ে দিয়ে বললো, “আপাতত এখানে বসো। এরপর দেখি কি করা যায়।”
মিশু একবার মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে সিটে গিয়ে বসলো। এই লোকটা সত্যিই একটু অন্যরকম! যাক, ট্রেন জার্নিটাও তবে বেশ অন্যরকম হবে!

১১.
শিকদার সাহেবের মেজো মেয়ে রৌদ্রময়ীর আজ বিয়ে।
পুরো বাড়িতে বিয়ের আনন্দের বন্যা বইছে। এত হাসাহাসি আর এত আনন্দের ফোয়ারা অনেক দিন দেখেননি শিকদার সাহেব। মেয়েটাকে ভালো ঘরে বিয়ে দিতে পেরে বুকটা অনেক শান্তি শান্তি লাগছে। স্ত্রীকে বারবার ডেকে ডেকে বলছেন, “ওগো নিধির মা, দেখবা আমাগো রোদ অনেক ভালা থাকবো।”
– “হ, আমার ও তাই মনেঅয়। আমাগো রোদ অনেক ভাগ্য কইরা জন্মাইছিলো তাইনা?”
– “তুমি তো ওর মা, তুমিই কইবার পারো সেইটা।”
– “ধুর, আমারে এইভাবে কইবেন না তো। আমার শরম করে।”
– “হ, করবো ই তো। নিজে যখন কইলা, তখন শরম লাগে নাই?”
শিকদার সাহেবের স্ত্রী লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেলেন। এমন সময় শোনা গেলো অনেক আনন্দধ্বনি আর চেঁচামেচি, বর এসেছে, বর এসেছে।
শিকদার সাহেব ও ওনার স্ত্রী ব্যস্ত হয়ে পাত্রপক্ষ কে বরণ করতে ছুটলেন। রৌদ্রময়ী’র ঘরে বসে থাকা সবাই ছুটে গেলো বরকে দেখতে। পুরো বাড়িতে যেন শুধু হাসির কল্লোলধ্বনি ধ্বনিত হচ্ছে।
পাত্রকে দেখে রোদের ছোটবোন দুপুর খুশিতে গদগদ হয়ে ঘরের দিকে ছুটছে। আপুকে জলদি জলদি বলতে হবে আজ অরণ্য ভাইয়াকে কি দারুণ দেখাচ্ছে! উফফ এত্ত সুন্দর আর কিউট লাগছে আজ দুলাভাইকে! কিজানি বিয়ের সাজে বুঝি সবাইকেই দারুণ লাগে। আজ রোদ আপুকেও দারুণ দেখাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে ঘরে এসে দেখলো রৌদ্রময়ী নেই। বোধহয় ওয়াশরুমে গেছে। অনেক্ষণ বিছনায় বসে পা দুলাতে লাগলো দুপুর। বেশ খানিকটা সময় কেটে গেছে। এখনো আপুর দেখা নেই,কোথায় যে গেলো মেয়েটা। একটু পরেই বিয়ে পড়ানো হবে আর সে বাথরুমে গিয়ে বসে আছে। নিশ্চয় ই কাঁদছে। পাগলি একটা।
আপনমনে এসব ভাবছিলো দুপুর। সে সময়ে হঠাৎ ফোনের মেসেজ টোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বুকটা ছলাৎ করে উঠলো। রোদ আপুর মেসেজ, “dupur, ami basa theke paliye jacchi. baba ma k bolis amk maf kore dite. ar kichu bolte parchi na. amr jonno kew tension koris na. babar dike kheyal rakhis.”
মেসেজ টা সিন করেই চোখ ফেটে কান্না বেড়িয়ে আসতে চাইলো দুপুরের। বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগলো। আপু এই কাজটা কেন করলো? কখনোই তো ওকে দেখে কিচ্ছু বোঝা যায়নি। আজ এই কাজের কারণ টা কি? আপু কেন এমন করলো? আপুরে, বাবার সম্মান ধূলায় মিশিয়ে দিলি তুই!
কয়েকবার কল ব্যাক করে দেখলো নাম্বার বন্ধ। কিছুতেই রোদের সাথে এখন যোগাযোগ করা সম্ভব না। এবার কি হবে! বাবাকে কিভাবে বলবে এ কথা! পুরো গ্রামের লোক জানে রৌদ্রময়ী কত ভালো একটা মেয়ে। আর আজ এভাবে বাবাকে অপদস্থ হতে হবে সবার সামনে!
চুপচাপ বসে কাঁদতে লাগলো দুপুর। ধীরেধীরে সবাই ঘরে এসে রোদকে খুঁজতে আরম্ভ করে দিলো। দুপুরকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে ও চেপে গেলো। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আর মুখ বন্ধ করে থাকা যায়না। ও মাকে জড়িয়ে ধরে বলেই দিলো কথাটা।
মা কথাটা শুনে কয়েকমুহুর্ত নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। কথাটা দুঃস্বপ্নের মত কানে বাজছে। কিভাবে স্বামীকে বোঝাবেন উনি!
দুই মা মেয়ে মিলে আড়ালে দাঁড়িয়ে চুপচাপ কথা বলছিলেন। আর কেউ যেন শুনতে না পায়। কিন্তু দু একজন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। গ্রামের লোকদের মুখ সামলানো দায়। এবার যে কি তুলকালাম কান্ড হবে কে জানে! বুকটা ধুকপুক করে উঠলো দুপুরের।
শিকদার সাহবকে ডেকে নিয়ে এসে দুপুর বললো, “আব্বা একটা বিপদ ঘইট্যা গ্যাছে।”
শিকদার সাহেবের মুখ শুকিয়ে গেল। আসন্ন বিপদের শংকা স্পষ্ট হয়ে উঠলো চেহারায়। দুপুর আস্তে আস্তে কথাটা বুঝিয়ে বললো বাবাকে। বাবা সব শুনে মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে রইলেন। দুপুর কান্নায় ভেঙে পড়েছে। বাবার একটা সম্মান আছে এ এলাকায়। সব আপু নষ্ট করে দিলো। কেন করলো এরকম টা?
খুব বেশি সময় সবকিছু শান্ত রাখা গেলো না। বাধ্য হয়ে শিকদার সাহেব বেয়াইকে ডেকে কথাটা বললেন। সব শুনে বেয়াই নিশ্চুপ হয়ে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বড় কিছু বলে অপমান করার ইচ্ছে তার নেই। তার মেয়ে এই কাজটা করলে তিনি চুপ করেই থাকতেন, অযথা শিকদার সাহেবকে অপমান করার কোনো মানে হয়না।
ঘটনা বুঝতে পেরে অরণ্য এসে জিজ্ঞেস করলো, “কি হইছে আব্বু?”
অরণ্য’র বাবা কথাটা বলতেই কিছু না ভেবেই অরণ্য উত্তর দিলো, “আব্বু এখনো কথাটা কেউ জানেনা। শুধু আমরাই চার পাঁচজন জানি। এখন ই কিছু একটা উপায় বের করতে হবে।”
– “কিসের উপায়?”
অরণ্য এক মুহুর্ত চুপ থেকে বললো, “আব্বু,আমি দুপুরকে বিয়ে করে ফেলি। তাহলে আমাদের উভয়ের সম্মান ই বেচে যাবে। আর লোকজন কে বলবে, আমিই দুপুরকে বিয়ে করতে চেয়েছি। তাই রোদ কষ্ট পেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। আর দুপুরের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও আমাকে। আর একটু দেরি হলেই লোকজন নানা কথা বলবে আব্বু।”
অরণ্য’র মুখে এমন প্রস্তাব শুনে চমকে উঠলেন শিকদার সাহেব। ছেলেটা সম্মানের কথা ভেবে এভাবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো! সিদ্ধান্ত টা খারাপ নয়। এখন অরণ্য’র বাবা যদি রাজি হোন আরকি। উনি অসহায় ভাবে বেয়াইয়ের দিকে তাকালেন। অরণ্য নিজেও বাবার হাত ধরে বললো, “সবকিছু পরে ভেবো আব্বু। আমি জানি তুমি রোদকে অনেক পছন্দ করতে। এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই। আমি নিজেও জানিনা রোদ এ কাজটা কেন করলো! কখনোই কিছু বুঝতে পারিনি ওকে দেখে।”
অরণ্য বাবাকে অনেক বোঝানোর পর বাবা রাজি হলেন। শিকদার সাহেব বেয়াইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেললেন প্রায়। ছুটে এসে দুপুরকে বললেন কথাটা। কিন্তু এখন নিজেকেই বিয়ে করতে হবে শুনে মাথায় বাজ পড়লো দুপুরের! বাবার সম্মানের প্রশ্ন। রোদ আপু পালিয়ে গিয়ে যে অসম্মানিতে ফেলে দিতে যাচ্ছে, সেটা সামলানোর জন্যই বিয়েটা করতে হবে ওকে। কিন্তু দুপুরের সবকিছু জুড়েই যে নিখিল। ছেলেটাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসে ও। নিখিলকে কিভাবে কষ্ট দেবে ও? এদিকে এখান না বলে দিলে বাবার অপমান হবে, সেইসাথে অপমানিত হবেন অরণ্য ভাইয়া আর ওর বাবাও। কারণ ওনারা নিজে থেকে এই প্রস্তাব দিয়েছেন শিকদার সাহেবের সম্মান বাঁচানোর জন্য। এখন কি করবে দুপুর!
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে, “আমি রাজি আব্বা” কথাটা বলেই ছুট লাগালো একটা। এক ছুটে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো। বিছানার উপর ধপ করে পড়ে গিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
অনেক্ষণ নিরবে কাঁদার পর ফোনটা নিয়ে নিখিলকে কল দিলো। নিখিল রিসিভ করেই বললো, “এতক্ষণে সময় হলো তাইনা? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি মহারানীর কলের জন্য।”
ডুকরে কেঁদে উঠলো দুপুর। নিখিল স্তব হয়ে বলল, “কি হয়েছে দুপুর? আপু চলে যাচ্ছে বলে কাঁদছো?”
দুপুর আরো কিছুক্ষণ কেঁদে বলল, “হ্যা। কিন্তু শুধু চলে যায়নি, আমাকে তোমার থেকে কেড়ে নিয়ে চলে গেছে নিখিল।”
নিখিল একেবারেই স্তব্ধ! কিছুই বুঝতে পারলো না। অবাক হয়ে বললো, “মানে!”
কাঁদতে কাঁদতে সবকিছু খুলে বললো দুপুর। নিখিল বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছে। সব শোনার পর মনেহচ্ছে ওর কথা বলার শক্তি হারিয়ে গেছে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে টপটপ করে।
দুপুর বলল,”আমি কি করবো নিখিল? বলো তুমি?”
– “আমি এসে তোমার বাবার পায়ে ধরে তোমাকে চাই?”
– “আমার খুশির জন্য হয়ত বাবা তোমার হাতে তুলে দিতে চাইবে। কিন্তু সবার সম্মানের কথা ভেবে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে নিখিল। আমি কি করবো এখন তুমিই বলো। প্লিজ নিখিল বলো। আমাকে খুন করে যাও তুমি। আমি পারছি না ভাবতে।”
নিখিল অনেক্ষণ চুপ থেকে বলল, “বিয়ে করে নাও।বাবার সম্মান রক্ষা করো।”
– “নিখিল! তুমি বাঁঁচবা কিভাবে?”
– “ভাগ্যে তুমি ছিলেনা। এটা ভেবেই বাঁচতে হবে আমাকে। ভালো থেকো দুপুর।”
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিলো নিখিল। দুপুরের মরে যেতে ইচ্ছে করছে এখন। বাবাকে দুপুর এতটাই ভালোবাসে যে বাবার সম্মানের কথা ভেবে বিয়েটা করতেই হবে। আর নিখিলকে হারিয়ে ফেলতে হবে রোদের জন্য। আপু এত বড় সর্বনাশ টা কেন করলো? কি দোষ ছিলো দুপুরের?
মা এসে ডাকাডাকি করে দরজা খুলতে বাধ্য করলেন। পাত্রপক্ষ বসে আছে, কাজি বসে আছে এসব বলে দুপুরকে বউয়ের সাজে সাজালেন। দুপুরের গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মায়ের চোখেও জল বাঁধ মানছে না। দুই মা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দুপুরকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করালেন।
১২.
মেঘালয় একজন পুলিশ কে ডেকে নিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠেছি তাই টিকেট করার সময় পাইনি। আমাদের দুটো টিকেট দিলে ভালো হতো।”
পুলিশ জানালেন, “এই কম্পার্টমেন্টে সিট ফাঁকা নেই। সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। প্রথম শ্রেণির বগিতে অনেক সিট ফাঁকা আছে। সেখানে চাইলে বসতে পারেন।”
– “পরের স্টেশনে নেমে তাহলে ওখানে যাবো। আপনি একটু দেখিয়ে দেবেন প্লিজ।”
– “শিওর মিস্টার মেঘালয়। আপনাদের সেবার জন্যই আমরা নিয়োজিত।”
– “থ্যাংকস ভাইয়া।”
পুলিশ টি হেসে মেঘালয়কে আপাতত একটা সিটে বসতে বলে চলে গেলেন অন্যদিকে। মেঘালয় এসে মিশুর সামনে বসে পড়লো। মিশু অবাক হয়ে চেয়ে আছে। মেঘালয় জিজ্ঞেস করলো, “কি ভাবছো মিশু?”
– “সারপ্রাইজড আমি।”
– “আমি ধন্য।”
– “তাই নাকি! কেন?”
– “আপনি সারপ্রাইজড হয়েছেন বলে। কেন হয়েছেন?”
– “আমি সারপ্রাইজড হলে আপনি ধন্য হবেন সেজন্য।”
মেঘালয় হেসে উঠলো। মিশুও মুচকি হাসলো। এরপর অনেক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। মিশু আশেপাশে তাকিয়ে ট্রেনের ভেতরের পরিবেশ উপভোগ করছে। মেঘালয় বারবার তাকাচ্ছে মিশুর মুগ্ধ চোখের দিকে। এই মেয়েটা যা দেখে, তাতেই মুগ্ধ হয়। মুগ্ধ হবার জন্যই বোধহয় জন্ম হয়েছে ওর!
রাত বেড়ে যাচ্ছে। ট্রেনের যাত্রীগণ ঘুমে ঢলে পড়ছেন একেকজন। দেখতে দেখতে পরের স্টেশনে এসে ট্রেন থামলো। এই বগি থেকে নেমে প্রথম শ্রেনীর একটা বগিতে এসে উঠলো মেঘালয়। মিশুকেও সাথে আসতে হয়েছে। পাশাপাশি দুটো সিট নিয়ে টিকেট কাটলো। তারপর বসে পড়ল নিজেদের সিটে।
মিশু জানালার পাশে বসতে পেরে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। কি যে আনন্দ হচ্ছে ওর। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখলো একটা সিটে একটা সুন্দর বেনারসি পড়া লাল টুকটুকে বউ বসে আছে! কি মিষ্টি দেখতে। মিশু মেঘলয়কে বললো, “আমার ওই বউটার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। একটু যাই?”
মেঘালয় হেসে বললো, “আচ্ছা যাও।”
মিশু উঠে গিয়ে মেয়েটির পাশে বসে বললো, “কিগো বিয়ের কনে, নাম কি গো তোমার?”
– “রৌদ্রময়ী।”
– “বাহ! নামটাও যেমন মিষ্টি, দেখতেও তেমন মিষ্টি। বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছো বুঝি?”
রোদ কিছু বললো না। মিশু ওর পাশে বসে হাত দুটো ধরে বলল, “সরি এমন প্রশ্ন করার জন্য। আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো।”
রোদ মৃদু স্বরে বললো, “হুম পালাচ্ছি বাসা থেকে।”
– “প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছো বুঝি?”
চমকে উঠলো রৌদ্রময়ী। কি করে যাবে সে? তার তো কোনো প্রিয়জন ই নেই!
মিশু বলল, “নাকি জোর করে বিয়ে দিচ্ছিলো?”
– “থাক না প্লিজ। আমি এসব নিয়ে এখন কথা বলতে আরাম পাচ্ছিনা।”
– “ওহ আচ্ছা। ঠিকাছে আপুটা। তাহলে একটু ঘুমিয়ে নাও, খুব টায়ার্ড মনেহচ্ছে তোমাকে।”
মিশু উঠে গিয়ে নিজের সিটে বসলো। মেঘালয় বললো, “কথা হলো?”
– “হ্যা, মেয়েটার বোধহয় অনেক কষ্ট।”
– “হুম। কষ্ট না হলে কি কেউ এভাবে পালায়?”
মিশু এক পলক মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বাইরে তাকালো। জানালা দিয়ে সুন্দর বাতাস আসছে, মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠছে, আহ! কি শান্তি।

চলবে…

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *