অনুভূতি ! পর্ব_৬

অনুভূতি
পর্ব -০৬
মিশু মনি

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

অনুভূতি ! পর্ব_৩

অনুভূতি ! পর্ব_ ৪

অনুভূতি ! পর্ব_৫
১৭.
– “সকাল নয়টা অব্দি বাসর রাত থাকে?”
ভাবির এমন রসিকতা শুনে মুখ টিপে হাসলো অরণ্য। হেসে হেসে বললো, “তাও তো কম হয়ে গেলো, আমি ভেবেছিলাম টানা দুদিন দরজা খুলবো না।”
বলেই শব্দ করে হাসল। ভাবিও হাসলো। কিন্তু এরকম কথা শুনে বুকটা চিনচিন করে উঠলো দুপুরের। ভালো লাগছে না এরকম কিছু শুনতে। নিতান্তই বাধ্য হয়ে বিয়েটা করতে হয়েছে ওকে। তারমানে এই নয় যে, আর সবার মত করে তাকেও এরকম রসিকতা শুনতে হবে। কিন্তু কিছুই করার নেই। শুনতেই হবে তাকে। কেউ তো আর জানেনা তার ভেতরে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ভাবি রুমে ঢুকে কিছুক্ষণ হাসাহাসি করার চেষ্টা করল দুপুরের সাথে। কিন্তু দুপুরের মুখে কিছুতেই হাসি আসেনা। উনি তাড়াতাড়ি খাবার টেবিলে যেতে বলে চলে গেলেন রুম থেকে। অরণ্য এসে দুপুরের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোনো সমস্যা?”
– “না।”
– “একটু সহজ হও আমার সাথে। বলো কি হইছে তোমার?”
দুপুর চোখ তুলে তাকালো। চোখাচোখি হতেই বুকটা কেমন যেন করে উঠলো ওর। অরণ্য’র চোখে কি যেন একটা আছে। সেই চোখের দিকে তাকালে খুন হয়ে যাবে যেকোনো মেয়েই। দুপুর তাকাতে পারলো না আর। চোখ নামিয়ে নিলো।
কিন্তু অরণ্য এগিয়ে এসে দুপুরের মুখটা আলতো করে ধরে একদম কাছে চলে এলো। দুপুর কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেললো। বুকের ধুকপুকুনি টা বেড়েই যাচ্ছে ওর। অরণ্য আলতো করে একটা চুমু একে দিলো দুপুরের কপালে। দুপুরের বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। অনেক কষ্টেও চেপে রাখতে পারলো না। চোখে একটু পানি চলে এলো। অরণ্য দুপুরের মুখটা তুলে বলল, “তোমাকে আমার করে নিলাম। এখন থেকে তুমি শুধুই আমার। আর আমিও শুধুই তোমার। কাজেই নিজেকে আমার থেকে আলাদা ভেবোনা। যা কিছু ভেতরে চেপে রেখেছো, আমাকে বলে হালকা হতে পারো। ”
দুপুর চোখ বন্ধ করেই রইলো। খুলতে পারলো না কিছুতেই। অরণ্য বলল, “তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে আসো, সবাই ওয়েট করছে আমাদের জন্য।”
কথাটা বলেই অরণ্য বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। কপালের যে জায়গাটায় অরণ্য চুমু একে দিয়েছে, সেখানে একবার হাত রাখলো দুপুর। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। এখন তো এই অধিকার শুধুই অরণ্য’র, সে দোষের কিছুই করেনি। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে অন্যকারো জন্য। অরণ্য কে পেয়ে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী ভাবলে ভূল হবেনা, তবে কষ্টটা যে অন্য কোথাও। নিখিলকে কিছুতেই ভূলতে পারছে না দুপুর। বারবার ওর কথা ভেবে কান্না আসতে চাইছে, কষ্টে মরে যেতে ইচ্ছে করছে ওর।
তাড়াতাড়ি নাস্তার টেবিলে চলে এলো ও। নাস্তা খেতে খেতে অরণ্য ওর বাবাকে বললো, “আব্বু আমি কালই দুপুরকে নিয়ে একবার সিলেট থেকে ঘুরে আসতে চাই। বাংলোয় কথা বলে দাও।”
বাবা একবার চোখ তুলে তাকালেন। কিন্তু কিছুই বললেন না। মাথা নেড়ে খাবার খেতে লাগলেন। অরণ্য বলল, “আব্বু আমি কিছু বলেছি। আমার অফিসের ছুটি মাত্র কয়েকদিন। এর ফাঁকেই একবার ঘুরে আসতে চাই। বাসায় দুপুরের কোনো কাজ নেই। আজ বৌভাত হয়ে গেলে কালই চলে যাবো।”
সবাই খাওয়ার মাঝে একবার তাকালেন অরণ্য ও দুপুরের দিকে। দুপুর লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। ওর গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তবুও নাড়াচাড়া করতে হচ্ছে। অরণ্য বউকে নিয়ে বিয়ের পরদিন ই ঘুরতে যেতে চাইছে! একটুও কি লজ্জা লাগছে না বলতে?
অরণ্য আবারো বললো, “আব্বু, কিছু বলছো না কেন?”
– “যাবি ঘুরতে। বারণ তো আর করবো না। কয়দিনের জন্য যেতে চাস?”
– “দুদিন তিনরাত।”
– “চা বাগানের ভিতরে থেকে কি করবি? বউ নিয়ে যাচ্ছিস হোটেলে ওঠ। নূরজাহান গ্রান্ডে কথা বলে দেখ।”
অরণ্য উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো, “থ্যাংকস আব্বু। আমি এক্ষুণি কথা বলে দেখছি রুম বুক করা যায় কিনা। আর তোমরা খেয়ে নাও, আমি খুশির ঠেলায় আর খেতেই পারবো না।”
অরণ্য উঠে রুমের দিকে চলে গেলো। দুপুর একবার তাকালো ওর চলে যাওয়ার দিকে। ছেলেটা প্রচণ্ড রকমের খুশি হয়েছে। উত্তেজনায় চোখে পানি চলে এসেছে ওর। কিন্তু এরকম আচরণ সাধারণত কেউ করেনা, খাওয়ার মাঝখানে উঠে যাওয়াটা তো ঠিক না। খাবার শেষ করে যেতে পারতো।
দুপুরের শ্বাশুরি মা বললেন, “তুমি কিছু মনে করোনা মা। ও একটু এমন ই। পাগলাটে ছেলে আমার।”
দুপুর এমনিতেই খেতে পারছিলো না, এখন আরো পারছে না। মনটা কেমন কেমন যেন করছে। বেড়াতে গেলে প্রত্যেকটা মুহুর্ত অরণ্য ওর সাথে সাথেই থাকবে, অনেক কষ্ট হচ্ছে ভাবলে। একজনকে মন থেকে সরিয়ে আরেকজনকে জায়গা করে দেয়াটা সত্যিই খুব কষ্টের।
কোনোমতে খাওয়া শেষ করে রুমে আসতেই অরণ্য বললো, “রাগ করছো দুপুর?”
– “না, রাগ করবো কেন?”
– “ভাবছো কেমন নির্লজ্জের মতন বললাম কালকেই বেড়াতে যেতে চাই? আসলে আমি তোমার জন্যই ওটা বলেছি। আমি জানি তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, কিছুতেই সহজ হতে পারছো না। তোমাকে নিয়ে একটু ঘুরে এলে ভালো লাগবে তোমার।”
দুপুর কিছুই বললো না। কিন্তু অবাক হলো বেশ। আস্তে করে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে রইলো জানালার পাশে। অরণ্য এসে দুপুরের পিছনে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু কেউই কোনো কথা বললো না। এভাবে সময় পেড়িয়ে যেতে লাগলো। অরণ্য ভাবছে কিভাবে মেয়েটার মনটাকে একটু ভালো করা যায়? আর দুপুর ভাবছে, জীবন এত অদ্ভুত কেন!
১৮.
মিশু রৌদ্রময়ীর সাথে গল্প করার অনেক চেষ্টা করেও পারলো না। মেয়েটা কিছুতেই মুখ খুলতে চায়না। শুধু সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে, গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। মিশু একবার রোদের হাত ধরে আলতো করে চেপে ধরলো। বললো, “আমাকে তোমার বোন ভাবতে পারো। মনে যা আছে বলে ফেলতে পারতে, হালকা লাগতো অনেক।”
দুপুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কিছুই বললো না। এমনকি চোখ ও খুললো না। মিশু উঠে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়লো। একটু পরেই মেঘালয় চলে এলো। এসে হাসতে হাসতে বললো, “ম্যাম সরি, হাঁসের গোশত পাওয়া গেলো না।”
মিশু হেসে ফেললো ওর সরি বলার ধরণ দেখে। বললো, “থাক, হাসের গোশত এখন খেতেও চাইনা। আপাতত ওই নতুন বউয়ের মুখ থেকে দুটো শব্দ বের করতে চাই। অনেক চেষ্টা করেও পারলাম না। কি করি বলুন তো?”
মেঘালয় একবার রোদের দিকে তাকিয়ে মিশুকে বললো, “আমার মনেহয় মেয়েটা সুইসাইড করার জন্য এসেছিলো। কিন্তু সেটা পারেনি, হয়ত মরার মত সাহস ছিলোনা। তাই ট্রেনে উঠেই বসে আছে। এখন কোথায় যাবে তাও জানেনা।”
মিশু মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “হতেও পারে। নাও হতে পারে, অন্য কোনো কষ্ট আছে মেয়েটার।”
– “এখন কি তাকে নিয়েই ভাব্বে? তোমার না খিদে পেয়েছে? খাবেনা?”
– “হুম চলুন। আচ্ছা আপনার বন্ধু আমাকে ভাবি ডাকলো কেন?”
মেঘালয় হেসে বললো, “সে তোমাকে আমার বউ ভেবেছে।”
বউ কথাটা শুনতে কেন যেন অনেক ভালো লাগলো মিশুর। মুখ টিপে হাসলো ও। তারপর খাবার বগিতে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো।
চলন্ত ট্রেনে হাটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলো মিশু। টাল সামলাতে পারছে না, মেঘালয় ওর হাত ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মিশুর মনটা বেশ উৎফুল্ল। মেঘালয়কে খুব আপন মনেহচ্ছে ওর। বারবার মেঘালয় ওর হাত ধরছে, এই ব্যাপার টাকেও অনেক ভালো লাগছে!
খাবার খেতে খেতে অনেক বকবক করলো মিশু। রোদের জন্য কিছু নাস্তা ও চা নিয়ে আবারো নিজেদের সিটে ফিরে এলো। মিশু নিজেই গিয়ে রোদকে নাস্তা ও চা দিয়ে শুধু বললো, “খেয়ে নাও।”
কথাটা বলেই নিজের জায়গায় ফিরে আসলো। রোদ অনেক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর চায়ে চুমুক দিতে লাগলো। ওকে খেতে আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছে মিশুর। আর মিশুর আনন্দ দেখে বড্ড ভালো লাগছে মেঘালয়ের।
মিশু হঠাৎ বললো, “আচ্ছা আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?”
– “আপাতত গন্তব্যস্থান জানা নেই।”
– “আচ্ছা তাহলে ভোরের ট্রেনে আবারো ঢাকায় ফিরে আসবো?”
– “হুম তা করা যায়। টানা এতক্ষণ জার্নি করতে খারাপ লাগবে না?”
– “আরে নাহ, আমার জার্নিতে কোনো সমস্যা নেই। আমার মন খারাপ লাগছে ওই মেয়েটার জন্য।”
– “মিশু, প্লিজ এত মন খারাপ করোনা। ওকে ওর মত থাকতে দাও, অনেক চেষ্টা করেও একটা কথা বের করতে পেরেছো? পারোনি। অযথা কষ্ট দেয়ার দরকার নেই।”
– “আমিতো কষ্টটা কমাতে চাইছিলাম।”
– “কেউ যদি কমাতে না চায়, তুমি জোর করে কমাবা?”
মিশু আর কিছু বললো না। মুখ বাঁকিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাতাসে চুল উড়তে শুরু করেছে। ঘুম এসে যাচ্ছে ওর। কিন্তু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না, আবারো যদি মেঘালয়ের কাঁধে ঢলে পড়ে তাহলে লজ্জা লাগবে ভীষণ। এরচেয়ে বরং জেগে থাকাই ভালো।
জেগে থাকতে চেয়েও বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলো না। আস্তে আস্তে ঘুম এসে গেলো চোখে। কিছুক্ষণ পরেই গাড় ঘুমে তলিয়ে গেলো মিশু। মাথাটা আস্তে করে মেঘালয়ের কাঁধের উপর এসে পড়লো। মেঘালয় মিশুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক ভাবে। ধীরেধীরে মিশুর প্রতি অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতে শুরু করেছে ওর।

১৯.
অরণ্য পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরলো দুপুরকে। একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো দুপুর। এই কাজটির জন্য ও প্রস্তুত ছিলোনা। অরণ্য এভাবে কেন কাছে টানছে ওকে? ও যে কিছুতেই অরণ্য কে মেনে নিতে পারছে না। বলাও যায়না, সহ্য করাও যায়না। শুধু নিরবে যন্ত্রণা টুকু হজম করে ফেলতে হয়।
অরণ্য দুপুরের কাঁধের উপর নিজের মাথাটা রাখলো। দুপুর একদম স্পন্দনহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অরণ্য ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে গতরাতে খুবই সুন্দর দেখাচ্ছিলো দুপুর।”
দুপুর ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। মনে মনে ভাবছে, অরণ্য ভাইয়ার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো আপুর সাথে। আমার সাথে হয়েছে এতে ভাইয়ার খুব অস্বস্তি হওয়ার কথা, এত সহজে আর এত অনায়াসে কিভাবে মিশে যেতে পারছে? ছেলেরা সবই পারে। খুব দ্রুত একজন অচেনা মানুষ কে ভালোবাসতেও পারে, ভূলে যেতেও পারে। রৌদ্রময়ীর মত মেয়েরাও পারে। কিন্তু দুপুর পারবে না। দুপুরের মন থেকে নিখিলকে সরাতে না জানি আরো কষ্ট মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হবে!
অরণ্য বললো, “মন খারাপ করে থেকো না দুপুরবেলা আমার। দুপুরে সবসময় রোদ ঝলমল করার কথা।”
– “রোদ ই তো নেই, ঝলমল করবে কোথ থেকে?”
– “উফফ দুপুর, তুমি প্লিজ ওর নামটা আমার সামনে উচ্চারক করবে না। সে আমাদের সবার সাথে যেরকম টা করেছে, তাকে কি বলা উচিৎ আমার জানা নেই। তুমি আর কক্ষনো ওর কথা বলবে না। প্লিজ আমার সাথে একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করো।”
দুপুর কিছুই বললো না। নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো। অরণ্য শক্ত করে চেপে ধরলো ওকে। কাঁধের উপর মাথাটা রেখে বাম গালটা দুপুরের ডান গালের সাথে একবার ঘষে দিলো। শিউরে উঠলো দুপুর! সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠলো। অরণ্য’র দাড়ির খোঁচায় গা শিরশির করে উঠছে ওর। ভিতরে দহন হচ্ছে, নিখিলকে মন থেকে জোর করে সরানোর দহন। এদিকে নতুন মানুষ কে জোর করে মনে জায়গা দেয়ার দহন। দুটো আগুন একসাথে হয়ে দাউদাউ করে জ্বলছে, কাউকে বলা যায়না, কাউকে বোঝানো ও সম্ভব না। একদম ই বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না ওর। তবুও মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে সবকিছু।
অরণ্য ওকে শক্ত করে ধরেই রইলো। এভাবে অনেক্ষণ কেটে যাওয়ার পর শ্বাশুরি মায়ের ডাকে ছাড়া পেলো দুপুর। প্রতিবেশী রা নতুন বউকে দেখতা এসেছেন। বাইরে তাদের সামনে বসে থাকতে হলো। বারান্দায় চেয়ারে বসে থাকার সময় দুপুর অরণ্য’র উপস্থিতি টের পাচ্ছিলো। অরণ্য আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। বউকে চোখের সামনে রাখাতেও ওর বোধহয় তর সইছে না, সবসময় ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। বুকটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে দুপুরের। গতরাতে তো ছাড়া পাওয়া গেছেক্স আজকে রাতে অরণ্য কত রকমের অধিকার খাটাতে আসবে কে জানে! আবারো একটা ভয়ংকর বেদনা ছুঁয়ে গেলো দুপুরকে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ও।
সারাদিন অনেক ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই কাটলো। বাসায় অনেক আত্মীয় স্বজন এসেছেন। সবার সাথে কথা বয়াল্র মাধ্যমে বেশ সহজ হয়ে গেলো দুপুর। একসাথে খাওয়া দাওয়া করলো, বৌভাতের মেহমান দের সাথে বসে আড্ডা দিতে হলো। অরণ্য’র বন্ধুদের সাথেও অনেক কথা বলতে হলো। রাত নেমে আসতে আসতে মনটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেলো দুপুরের। তবুও মাঝেমাঝে কেমন একটা অন্যরকম বেদনা এসে বুকে ভর করে। কিন্তু হুটহাট অরণ্য কোথ থেকে যেন দুটো ছোট বাচ্চাকে পাঠিয়ে দেয়, নয়ত কোনো বন্ধুকে পাঠিয়ে দেয়। তারা এসে দুপুরের সাথে কথা বলার মাধ্যমে ব্যস্ত রাখে ওকে। অরণ্য নিজেও সারাদিন নানান ভাবে ফাজলামো করে মাতিয়ে রেখেছিলো দুপুরকে। দুপুর বেশ বুঝতে পারে অরণ্য অনেক খেয়াল রাখছে ওর প্রতি। নয়ত এভাবে এত করে ওর মন ভালো করার জন্য পিছনে লেগে থাকতো না। অরণ্য ছেলেটা অনেক ভালো! যদি আগের জীবনে নিখিল নামে কেউ না থাকতো, তবে অনায়াসে ভালোবাসতে পারতো এই ছেলেটাকে। নিখিল যে অরণ্য’র চেয়েও বেশি খেয়াল রাখতো ওর, নিখিলকে কিভাবে ভূলে যাবে ও?
রাত হয়ে এলো। ভাবি ও ননদরা দুপুরকে ঘরে রেখে বিদায় নিলেন। আজ বুকটা কেমন ধুকপুক করছে ওর। গতরাতে অন্যদিকে কোনো খেয়াল ছিলোনা, কোনো অনুভূতি কাজ করছিলো না। কিন্তু আজকে রাতে অরণ্য’র আগমনের কথা ভেবেই গায়ে কাটা দিচ্ছে। না জানি আজ কি আছে কপালে!
জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলো দুপুর। অরণ্য এসে দরজা লাগিয়ে বিছানার উপর বসলো। বুকের ভেতরে দুম দুম করে যেন হাতুরি পড়ছে। কষ্টের মাত্রাটা বেড়েই যাচ্ছে দুপুরের। অরণ্য একটু এগিয়ে এসে দুপুরের হাত ধরলো। এবার আরো কষ্ট হতে লাগলো দুপুরের। এ কেমন নিদারুণ কষ্ট! ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। বুকটা ভেঙে যাচ্ছে, একটা বিশাল ঝড় দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যাচ্ছে সব। দুপুর দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইলো।
অরণ্য এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে বললো, “আমার বউটাকে এখন একদম পুতুলের মত লাগছে। দুপুর সোনা, তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও?”
দুপুর দুদিকে মাথা নাড়লো। অরণ্য বললো, “ভালোবাসাও না?”
বুকটা আরো একবার কেঁপে গেলো দুপুরের। যেন রিখটার মানের ভূমিকম্প বয়ে গেলো। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড কান্না পেয়ে গেলো ওর। এতবেশি কান্না পাচ্ছে যে নিজেকে সামলাতেই পারলো না। দুম করেই অরণ্য’র বুকের উপর পড়ে গিয়ে দুহাতে অরণ্য’র টি শার্ট খামচে ধরে কাঁদতে লাগলো। ও শুধু কেঁদে কেঁদে নিজেকে হালকা করাতেই ব্যস্ত। এদিকে যে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে সেটা খেয়ালেই রইলো না। অরণ্য ওর মাথায় হাত বুলাতে গিয়েও আর স্পর্শ করলো না। মেয়েটাকে এখন কাঁদতে দেয়াই উচিৎ, কেঁদে বুক ভিজিয়ে দিক।
২০.
মিশু ঘুমাচ্ছে মেঘালয়ের কাঁধে মাথা রেখে। আর ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেঘালয়ের মুগ্ধ দুটি চোখ! একটা মেয়ে এতটা ইনোসেন্ট স্বভাবের কিভাবে হতে পারে! ঘুম থেকে উঠেই বলে, “আমার খিদে পেয়েছে। হাঁসের গোশত দিয়ে ভাত খাবো।”
কথাটা মনে করেই হাসলো মেঘালয়। মিশু ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছে ওর বুকে। মেঘালয়ের বুকটা কেমন ছ্যাত করে উঠলো। মিশুর গরম নিঃশ্বাস পড়ছে মেঘালয়ের বুকের উপর। স্তব্ধ হয়ে ফিল করছে মেঘালয়। মেয়েটাকে এখান বড্ড বেশি আপন মনেহচ্ছে। কেন যেন মনেহচ্ছে বহুদিনের সম্পর্ক ওর সাথে। যুগ যুগ ধরে একে অপরকে চেনে! একসাথে কত পথ চলে এসেছি!
কথাগুলো ভেবে আপন মনেই আবারো বললো, “ধ্যাত কি সব ভাবছি। এসব ভাবা যাবেনা। ভাবা ঠিক না। মেয়েটা অনেক বাচ্চা স্বভাবের। বুঝতে পেলে কেঁদে ফেলবে।”
মুখ টিপে হাসলো মেঘালয়। মিশু ঘুমাচ্ছে, যেন ঘুমিয়ে কত শান্তি পাচ্ছে মেয়েটা। একবার রৌদ্রময়ীর দিকে তাকালো মেঘালয়। কনের সাজে বসে থাকা মেয়েটার গাল বেয়ে অনবরত পানি ঝড়ছে। কি এমন দুঃখ আছে ওই সুন্দর মেয়েটার? জানতে বড্ড ইচ্ছে হয়। কিন্তু এখন কিছুতেই উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই, মিশু এক হাতে মেঘালয়ের এক বাহু জাপটে ধরে ঘুমাচ্ছে। ভাবলেই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে মেঘালয়।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেলো কেউই বলতে পারেনা। ঘুম থেকে উঠে একবার মেঘালয়ের দিকে তাকালো মিশু। আড়মোড়া ভেঙে বললো, “এখন কোথায় আমরা?”
– “ট্রেনে।”
– “ট্রেনটা কোথায়?”
– “রেল লাইনের উপর।”
– “রেল লাইনটা কোথায়?”
– “ভূ পৃষ্ঠের উপর।”
মিশু ক্ষেপে গিয়ে বললো, “একদম মাইর দিবো। এরকম দুষ্টুমি করছেন কেন?”
– “বাচ্চাদের সাথে তো দুষ্টুমি ই করতে হয়।”
– “আমি বাচ্চা? বাচ্চামির কি দেখালাম শুনি?”
– “কিছুই তো দেখিনি। দেখলে নাহয় বুঝতে পারতাম বাচ্চা নাকি বাচ্চার মা।”
কথাটা বলেই জিহ্বায় কামড় দিলো মেঘালয়। সর্বনাশ! খুবই লেইম টাইপের ডায়ালগ দিয়ে ফেলেছে ও। মিশু যদি অন্যকিছু বুঝে নেয় তাহলে তো খুবই রাগ করবে। কিন্তু মিশু মেঘালয়ের কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারেনি। ও অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “এখন মনেহয় আমরা ঈশ্বরদীর ওদিকে আছি।”
মেঘালয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “বাঁচলাম বাবা।”
– “বাঁচলাম মানে?”
– “না কিছুনা। কিছু খাবা?”
– “না, খিদে পায়নি। আচ্ছা ওই নতুন বউটা কোথায়?”
মেঘালয় রৌদ্রময়ীর সিটের দিকে তাকিয়ে বললো, “জানিনা তো। এখানেই তো ছিলো মেয়েটা। বোধহয় নেমে গেছে।”
-“মরে টরে যায়নি তো?”
– “মরলে আগেই মরতো, ট্রেনে উঠে বসে থাকতো না।”
– “হুম তাও ঠিক। সে যাই হোক, এরপর যেখানে ক্রসিং হবে আমরা সেখানেই নেমে পড়বো আচ্ছা?”
– “নেমে কি করবা?”
– “কি আবার? ওই ট্রেনে উঠে পড়বো। ঢাকায় ফিরে যাবো। কালকে আমাকে আপনার বাবার অফিসে যেতে হবেনা?”
– “ওহ আচ্ছা। ঠিকাছে তাই হোক। কিন্তু এটাতে তো পুলিশকে বলে সিট নিয়েছি, ওটায় দাঁড়িয়ে থেকে যেতে হবে।”
– “যাবো, সমস্যা কি?”
মেঘালয় হেসে বললো, “পুরো জার্নিতে ঘুমালে সমস্যা না থাকার ই কথা।”
– “আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না?”
– “আবার জিজ্ঞেস ও করে!”
দাঁত বের করে হাসলো মেঘালয়। মিশুর ও হাসি পেয়ে গেলো। মেঘালয় একটু মিশুর দিকে এগিয়ে আসতেই মিশু বললো, “এই এই দূরে থাকুন, দূরে থাকুন।”
মেঘালয় অবাক হয়ে বললো, “কেন?”
– “বারে, ঘুম থেকা উঠলাম না? এখন আমার মুখে গন্ধ, ওয়্যাক….”
মিশু মুখের ভঙ্গিটা এমন করলো যে হাসি পেয়ে গেলো মেঘালয়ের। নিজের মুখের গন্ধের কথা কেউ কখনো এভাবে বলেছিলো কিনা ওর জানা নেই। হাসত হাসতে সিটের পিছনে হেলান দিয়ে মিশুর দিকে চেয়ে রইলো মেঘালয়। আর মিশু তাকিয়ে আছে মেঘালয়ের হাতের দিকে। গরমে ঘেমে গেছে মেঘালয়ের শরীর। হাত ঘামে ভিজে গেছে, হাতের উপরের ঘন লোমগুলো একদম গায়ের সাথে লেগে গেছে। দেখলেই কেমন যেন অনুভূতি কাজ করে, মিশু তাকিয়ে আছে মেঘালয়ের হাতের দিকে! একদম অপলক ভাবে!
চলবে…

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *