অনুভূতি ! পর্ব_৭

অনুভূতি
পর্ব -০৭
মিশু মনি

অনুভূতি ! পর্ব_১

অনুভূতি ! পর্ব_২

অনুভূতি ! পর্ব_৩

অনুভূতি ! পর্ব_ ৪

অনুভূতি ! পর্ব_৫

২১.
আজকে খুব ভোরেই দুপুরের ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে শাড়ির আঁচলে টান পড়তেই পিছন ফিরে দেখলো অরণ্য’র গায়ের নিচে পুরোটা আঁচল। সেটা টেনে বের করা এখন কিছুতেই সম্ভব না। ঘুম ভেঙে যাবে অরণ্য ‘র। আবারো শুয়ে পড়লো দুপুর। বালিশে মাথা রেখে অরণ্য ‘র দিকে তাকিয়ে রইলো অনেক্ষণ। অন্ধকার ঘরে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে ওর মুখটা। কিন্তু তাতেই কেমন যেন লাগছে ওর। সত্যিই খুন হয়ে যাওয়ার মত মায়া ওর চেহারায়।বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না।
চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে রইলো অনেক্ষণ। অরণ্য ঘুমের মাঝেই একটা হাত রাখলো দুপুরের গায়ের উপর। কেমন যেন ছ্যাত করে উঠলো বুকটা। তার স্পর্শ অসহ্য লাগে কিন্তু কিছুই করার নেই। সে তো এখন দুপুরের স্বামী, মেনে নিতেই হবে। স্বামীর সবটুকু অধিকার সে নেবেই। ভাগ্যিস অরণ্য আর সব ছেলের মত নয়। দুপুরকে রাতে কোনোরকম বিরক্ত করেনা বরং মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
নিখিলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে হঠাৎ। একদিন ফোনে চার্জ ছিলোনা বলে নিখিলকে ফোন দিতে পারেনি দুপুর। এদিকে ইলেকট্রিক লাইনে সমস্যার কারণে ফোনে চার্জও দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। সারাদিন কথা হয়নি, রাতেও কথা হয়নি। বাড়ির কারো ফোন দিয়ে ওকে জানায় ও নি দুপুর। নিজে দিব্যি আরামে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। রাত সাড়ে এগারো টার দিকে হঠাৎ এভাবেই গায়ের উপর একটা হাত পড়লে চমকে ঘুম ভেঙে যায় দুপুরের। ও পাশ ফিরে শুতে যাচ্ছিলো। ফিসফিস করে কেউ একজন ডাকলো, “দুপুর, এই দুপুর…”
দুপুর চমকে উঠলো নিখিলের গলা শুনে। এতরাতে নিখিল কোথ থেকে এলো? তাছাড়া রৌদ্রময়ী তো ওর পাশেই ঘুমিয়েছিলো। আপুই বা গেলো কোথায়? লাফিয়ে উঠে বিছানার উপর বসলো দুপুর। নিখিল ফিসফিস করে বললো, “তোমার ফোন বন্ধ পেয়ে টেনশন হচ্ছিলো। তাই চলে আসলাম।”
– “সেকি! আপু কোথায় গেলো?”
– “আপু তো বাসায় নেই। পাশের বাড়িতে তামিমার বিয়ে হচ্ছেনা? তামিমা আপুকে এসে নিয়ে গেছে, আপু তামিমার সাথে ওর শ্বশুরবাড়ি যাবে।”
– “তুমি কিভাবে জানলা?”
– “আমিই তো তামিমাকে বলেছি যাতে আপুকে নিয়ে যায়। আমি নিজেই বিদায় দিয়ে আসলাম।”
– “আপু কিছু বুঝতে পারেনি তো?”
– “না। ফোন বন্ধ থাকলে টেনশন হয়না বলো?”
দুপুর খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো নিখিলকে। সে রাতে পুরোটা রাত নিখিল আর ও একই বিছানায় ঘুমিয়েছে। কিন্তু নিখিল একবার ও দুপুরকে অন্য কোনো মতলবে স্পর্শও করেনি। পুরোটা রাত দুপুর শুধুমাত্র নিখিলের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। এতটাও দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ও সত্যিকার একজন মানুষ ছিলো নিখিল। ভোরবেলা চলে যাওয়ার সময় দুপুর একবার জিজ্ঞেস করেছিলো, “তুমি আমাকে নিজে থেকে একবার টাচ ও করলা না। ভেবেছো আমি কষ্ট পাবো? তুমি টাচ করলে আমি বাধা দিতাম না।”
নিখিল দুপুরের হাত শক্ত করে ধরে বলেছে, “আমি তোমাকে পবিত্র ভাবে ভালোবাসি দুপুর। আর স্পর্শটা একান্তই তোমার স্বামীর হক। যেদিন আমাদের বিয়ে হবে,সেদিন থেকে সবরকমের স্পর্শের অধিকার আমার। আর যদি কোনো কারণে আমাদের বিয়ে না হয়, আজীবন এই অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে বেড়াবে।”
সেদিন নিখিলের কথা শুনে খুব বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিলো দুপুর। তামিমা রোদের বান্ধবী, নিখিলের ও বান্ধবী। সেই মেয়েটাকে রাজি করিয়ে আপুকে বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিয়ে তারপর সে কিভাবে যেন দুপুরের ঘরে ঢুকেছে। অথচ সারাটা রাত দুপুরকে একবার স্পর্শ ও করলো না, এরকম মানুষ ও আছে দুনিয়ায়! এই আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্যই নিখিলকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো দুপুর। এখনো বাসে, কিন্তু এখন…. শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস!
গাল ভিজে চোখের জল বালিশে গিয়ে পড়েছে। চোখ মুছলো দুপুর। নিরব কান্না, এই কান্না কেউ দেখেনা, কেউ জানেনা। কিন্তু অরণ্য হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি কাঁদছ দুপুর?”
দুপুর চমকে উঠে বললো, “কই না তো।”
চোখের জল মুছতে যেতেই অরণ্য নিজেই আলতো করে দুপুরের মুখটা স্পর্শ করলো। তারপর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে চোখ মুছে দিয়ে বললো, “কাঁদছ কেন?”
দুপুর নিজের হাত দিয়ে অরণ্য ‘র হাত ধরে ফেলে বললো, “এমনি।”
– “এমনি কেউ কখনো কাঁদেনা, আর কাঁদলেও সেটা অন্তত সারাক্ষন স্থায়ী হয়না।”
দুপুর কোনো কথা বললো না। অরণ্য ওকে জড়িয়ে নিলো নিজের বুকে। তারপর বললো, “কাঁদছ কেন বলবা না? আমি ঘুম ভাঙার পরই তোমার নাক টানার শব্দ শুনেই টের পেয়েছি তুমি কাঁদছ।”
– “আমি নাক টেনে কাঁদি?”
– “না, তবে একটা ফ্লেভার আছে কান্নার। বোঝা যায়।”
– “কান্নার কখনো ফ্লেভার থাকে?”
– “তোমার কান্নার আছে। তুমি অনেক দূরে থাকলেও কাঁদলে আমি বুঝতে পারবো। বুঝেছো?”
দুপুর কিছু বললো না। অরণ্য ওকে জাপটে ধরে রইলো। সকালের পাখির কিচিরমিচির কানে আসছে। এখন উঠতে হবে। অরণ্য বললো, “নাস্তা করে এসে দুজন মিলে ব্যাগ গোছাবো। আজ আমাদের সিলেট যাওয়ার কথা।”
দুপুর কিছুই বললো না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। অরণ্য’র শরীরে একটা গন্ধ আছে, সেটা অনুভূতি ইন্দ্রিয়েরা জানিয়ে দিচ্ছে ওকে। ধীরেধীরে এই গন্ধটাই সবচেয়ে চেনা আর প্রিয় হয়ে উঠবে।
২২.
ট্রেন থেকে নেমে আবারো ঢাকার ট্রেনে উঠে পড়েছে মিশু ও মেঘালয়। কাউন্টারে কথা বলে জেনেছে কোনো সিট ফাঁকা নেই, কিন্তু একটা কেবিন ফাঁকা আছে। মেঘালয়ের কাছে অতবেশি টাকা ছিলো না। বাসায় ফোন দিয়ে টাকা নিয়ে পুরো কেবিনটাই বুক করে ফেলেছে।
মিশু একদম অবাক! এতবড় কেবিন বুক করে হবেটা কি? আর দুজন মানুষের জন্য একটা কেবিন নিতে হয়? ছেলেটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের। বিশাল সাইজের একটা মন আছে বলতে হবে। তবে অযথা টাকা খরচ করার অভ্যাস টা ভালো লাগেনা মিশুর।
কথাটা বলতেই হেসে ফেললো মেঘালয়। জবাব দিলো, “অযথা খরচ করলাম কোথায়?”
– “এত টাকা দিয়ে একটা কেবিন পুরোটাই বুক করার কি দরকার ছিলো? সিট না পেলে আমরা দাঁড়িয়ে থেকে যেতাম।”
– “প্রথমত এখনো রাত বাকি আছে, আর দ্বিতীয়ত আমি সজ্ঞানে তোমাকে কষ্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবো না।”
মিশু বেশ অবাক হয়ে বললো, “একটা অচেনা মেয়ের জন্য এত দরদ কেন আপনার শুনি?”
– “যার মনে দরদ আছে তার চেনা অচেনা সবার জন্যই আছে।”
এর কোনো জবাব খুঁজে পেলো না মিশু। ট্রেনের কেবিন খুঁজে সেখানে ঢুকে পড়লো। মেঘালয় কেবিনে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিলো। মিশু আঁৎকে উঠে বললো, “খোলা থাক, খোলা থাক।”
– “সেকি! খোলা থাকবে কেন?”
– “আমার ভয় করে।”
– “আমাকে?”
মেঘালয় জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে মিশুর দিকে। মিশু কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। মেঘালয়কে ভয় লাগছে বললে অন্যায় হয়ে যাবে। যে ছেলেটার সাথে বারবার দেখা হওয়ার পরও কখনো বদ নজরে তাকায় নি, তাকে তো ভয় পাওয়ার কোনো কারণ ই নেই। তাছাড়া মেঘালয় কতটা মহান সেটা মিশু ভালোভাবেই জানে। তবুও কেন যে কথাটা বললো নিজেও বুঝতে পারছে না। অবশ্য হঠাৎ একজনের সাথে বদ্ধ কেবিনে থাকতে একটু ভয় তো লাগবেই।
মিশুকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে মেঘালয় বললো, “কি ভাবছো?”
– “কিছু না। লাগিয়ে দিন।”
মেঘালয় দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে সিটে বসতে বসতে বললো, “আমি কোনো সুযোগ নিবো কিনা সেটা ভয় পাচ্ছো?”
মিশু তাকালো মেঘালয়ের দিকে। কিছু বললো না মুখে। মেঘালয় বললো, “ট্রেনে যখন আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলে, তখন চাইলে অনেক সুযোগ নিতে পারতাম। সেটা যখন করিনি, এখন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া একটা মেয়ে যখন আমার সাথে থাকে, তাকে সেফলি বাসায় পৌছে দেয়াটাকে আমি আমার দায়িত্ব মনে করি। সেখানে তুমি তো মিশু…”
মিশু আগ্রহ ভরা চোখে জিজ্ঞেস করলো, “আমি মিশু তো?”
মেঘালয় থতমত খেয়ে বললো, “না মানে খুবই ইনোসেন্ট একটা মেয়ে।”
কিন্তু মনে মনে বললো, “আমার মনের ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছো সেটা কিভাবে বলি বলো? এত তাড়াতাড়ি নিজের মনের কথা বুঝতে দিতে নেই। একটু সময় নিতে হয়। তুমি নিজে থেকেই বুঝবা এই মেঘ তোমার প্রতি কতটা আসক্ত হয়ে পড়েছে, তারপর নিজেও একটু একটু করে দূর্বল হতে শুরু করবা। তখন জানাবো মনের কথাটা।”
মিশু জিজ্ঞেস করলো, “কি ভাবছেন এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে?”
– “তোমার দিকে তাকিয়ে আছি?”
– “তো? আপনার চোখ তো আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।”
লজ্জা পেয়ে হাসলো মেঘালয়। মিশুও হাসলো। আর মনেমনে ভাবল, “কি চাইছে এই ছেলেটা? এত আপন মনেহচ্ছে কেন ওকে? কিন্তু ওকে তো আপন ভাবা যাবেনা। মিশু যে বড্ড গরীব আর অসহায় ঘরের মেয়ে। তাকে নিজেকেই রোজগার করে বাঁচতে হয়। আর মেঘালয়! সে তো অনেক উঁচুতে। মেঘ যাকে ছুঁয়ে চলে যায়, সেখানে শুধু মেঘেদের বসবাস। অত উঁচুতে ওঠার সাহস হবেনা মিশুর। আর মেঘালয় অনেক ভালো গান গাইতে পারে, একদিন নিশ্চয় ই অনেক বড় শিল্পী হয়ে যাবে।
এবার একই প্রশ্ন মেঘালয় করলো, “আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি ভাবছো?”
মিশুও মেঘালয়ের মত লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলো। সুন্দর হাওয়া আসছে। বাইরে হাত বাড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলো মিশু। তারপর মেঘালয়কে বললো, “এখন তো কেউ নেই। একটা গান শোনান না।”
বলামাত্রই মেঘালয় গান গাইতে আরম্ভ করলো। মিশু গান শুনছে আর বাইরে তাকিয়ে আছে। মেঘালয় ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক্ষণ ধরে গান গাওয়ার পর সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লো মেঘালয়। মিশুকে বললো ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু তখন অত যাত্রীর ভিড়ে ঘুম পেলেও এখন ফাঁকা কেবিনে ঘুম আসছে না ওর।
দুজন দুদিকের আসনে বসে মুখোমুখি বসে আছে। হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেলো দুজনাতে। মিশুর বুকের ভেতর টা কেমন যেন করে উঠলো। ধুকধুক করে উঠলো। এদিকে মেঘালয়ের ও একই অবস্থা। এর আগে কখনো এমন হয়নি ওর। কেমন যেন মায়া কাজ করছে। অন্যরকম একটা মায়া যার কোনো নাম দেয়া যায়না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ও মিশুর দিকে। একদম নির্জনে এভাবে মিশুকে দেখলে মনটা কেমন যেন বিষণ্ণতায় ছেয়ে যায়। এত কাছে তবুও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বড্ড ছুতে ইচ্ছে করছে ওর লাজুক চিবুক, কিন্তু সেটা তো হয়না। সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। সীমা লংঘন ব্যাপার টা ভালো লাগেনা মেঘালয়ের, তবুও আজ বড্ড ইচ্ছে করছে একটু সীমা অতিক্রম করতে। এতবেশি মিশুকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে যে নিজেকে শেষ পর্যন্ত কন্ট্রোল করতে পারবে কিনা সেটা নিয়েই ভয় হচ্ছে মেঘালয়ের।

২৩.
মেঘালয় আর বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। এবার ঘুমানো দরকার। জেগে থাকলে মাথায় ভূত চাপবে এসে।
কিন্তু ঘুমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারবার চোখ খুলে যাচ্ছে আপনা আপনি। খুলে অন্যদিকে না তাকিয়ে সোজা মিশুর দিকে চলে যাচ্ছে। মিশুও বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে মেঘালয়ের দিকে। এভাবে কতক্ষণ থাকা যায়? কেমন যেন অসহ্য লাগছে। একদিকে বুকের ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিজেকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। একবার ইচ্ছে করছে মিশুকে ভালোবাসি বলতে, একবার মন সায় দিচ্ছে না। খুব খারাপ একটা অবস্থায় পড়ে গেছে মেঘালয়।
মেঘালয়ের হঠাৎ কি হলো নিজেই জানেনা। ঘোর ঘোর লাগছে বড্ড। ঘোরের মাঝেই মিশুকে জিজ্ঞেস করে বসলো, “আমি কি তোমার কোলে মাথা রেখে শুতে পারি?”
অদ্ভুত প্রস্তাব! এরকম প্রস্তাব জীবনেও কখনো শোনেনি মিশু। আর মেঘালয়ের মুখ থেকে এটা শুনছে সেটাও আশ্চর্যের ব্যাপার। কিন্তু না বলতে পারলো না। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “আচ্ছা।”
মেঘালয় অপ্রকৃতস্থের মত উঠে মিশুর সিটে গিয়ে বসলো। বেশ লম্বা সিট। অনায়াসে শোয়া যায়। যদিও সিটের উপরে বালিশ রাখা তবুও মেঘালয় মিশুর কোলেই মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। কোনোদিনো কেউ এভাবে কোলে মাথা রেখে শোয় নি, মিশুর কেমন যেন অপ্রস্তুত লাগছে।
মেঘালয়ের এখন একটু শান্তি লাগছে ভেতরে। মিশু আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মিশুর হাতের স্পর্শে ঘুম এসে যাচ্ছে। চোখ বুজতেই ঘুমিয়ে পড়লো মেঘালয়।
জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে দেখে মিশুর বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে মেঘ ঘুমিয়ে পড়েছে। ও আস্তে আস্তে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অনেক সুন্দর মেঘালয়ের চুলগুলো। যেমনি সিল্কি, তেমনি সুন্দর ঘ্রাণ! মিশুর হঠাৎ চোখ চলে গেলো মেঘালয়ের বুকের দিকে। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। সেখান দিয়ে ওর ফর্সা বুকে কিছু লোম উঁকি দিচ্ছে। এত সুন্দর লোভনীয় কারো বুক হতে পারে সেটা ভাবতেও পারছে না মিশু। কেমন ঘোরের মাঝে চলে যাচ্ছে। ছেলেদের বুকের লোম এত সুন্দর হয়? মেঘালয়ের হাতের লোমগুলোও ভারী সুন্দর দেখতে। মিশু একবার ওর হাতের দিকে তাকাচ্ছে, একবার বুকের দিকে তাকাচ্ছে। মাঝেমাঝে পলকহীন ভাবে ওর মুখের দিক তাকিয়ে থাকে। কেমন ঘোর ঘোর লাগে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর ওর মুখটা সবসময় ই হাসি হাসি জন্য একটা অন্যরকম স্নিগ্ধতা ছেঁয়ে থাকে। সত্যিই মেঘ অনেক বেশি সুন্দর!
ফ্যালফ্যাল করে ওর ঘুমন্ত মুখের দিয়ে চেয়ে চেয়ে নানান আঁকিবুঁকি স্বপ্ন দেখছে মিশু। নিজেও ঘুমিয়ে পড়তে ঘুম বেশি সময় লাগলো না। চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
কতক্ষণ ঘুমালো বলতে পারেনা কেউ। ট্রেন স্টেশনে দাঁড়ানোর আগ মুহুর্তে ট্রেন থামার ধাক্কায় মিশুর মাথাটা ঢলে পড়ে গেলো মেঘালয়ের মুখের উপর। ঠক করে দুজনের কপালের সাথে কপাল লেগে একটা আওয়াজ হলো। আঁৎকে উঠে ঘুম ভেঙে গেলো মেঘালয়ের। মিশু নিচু হয়েই আছে। একদম কাছাকাছি চলে এসেছে দুটো মুখ। একে অপরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। এত কাছ থেকে কখনোই কোনো পুরুষের চোখ দেখেনি মিশু। হার্টবিট রকেট গতিতে ছোটার মত দ্রুত বেড়ে গেলো। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগলো। দৃষ্টি যত গভীর হচ্ছে হার্টবিট তত বেশি বাড়ছে। মিশুর সমস্ত শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। মেঘালয়ের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এ কেমন অনুভূতি! মিশু ওর মুখের কাছে ঝুঁকে চোখে চোখ রেখে চেয়ে আছে। মাথা তুলতেই ভূলে গেছে কিছুক্ষণের জন্য। এভাবে কতক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো বোঝা গেলো না। মিশু মেঘের চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে আছে, আর মেঘ ও। দৃষ্টির গভীরতা বাড়ছে, যেন একে অপরের ভেতরটাও পরিষ্কার বুঝতে পারছে। মিশু অনুধাবন করতে পারছে মেঘের ভেতরে কি তুমুল ঝড় চলছে। ও ধীরেধীরে একদম ঝুঁকে পড়লো মেঘের মুখের কাছে। দুজনের নাকের সাথে নাক লেগে গেলো। ঘোরের মধ্যে চলে গেছে দুজনেই। মেঘালয় মিশুর মাথাটা চেপে ধরে ওর ঠোঁট স্পর্শ করলো।
কেঁপে উঠলো মিশু। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। বুক ফেটে কান্না এসে যাচ্ছে ওর। এটা কি হয়ে গেলো? চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। মেঘালয় মিশুর মাথাটা ছেড়ে দিতেই ও সোজা হয়ে বসলো। কিন্তু চোখ খুলতে পারলো না। মেঘালয় ও উঠে ওর পাশে বসে বিভ্রান্তের মত ভাবতে লাগলো শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে ও? মিশুর কোলে মাথা রেখে শুয়েছে কখন? ও তো পাশের সিটে বসে ছিলো। এখানে কখন আর কিভাবেই বা এলো? কি থেকে কি হয়ে গেলো মাথায় ঢুকছে না।
মিশুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ও একদম সোজা হয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ কিন্তু দুই গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে মেঘালয়ের। মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত কষ্ট দিয়ে ফেললো? ওর জন্য এতকিছু ভেবেও শেষ রক্ষা হলো না? মেয়েটা যে বড্ড ইনোসেন্ট, ওকে কিভাবে কি বোঝাবে মেঘালয়? মাথায় কিছুই আসছে না।
মেঘ একবার ডাকলো, “মিশু।”
মিশু চোখ খুললো না। নিচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে চেপে ধরলো আর কান্নার গতিটা আরো বেড়ে গেলো। মেঘালয় আবারো বললো, “মিশু, আমি সরি।”
মিশু কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেঘালয় কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। নিজের মাথার চুল নিজেরই টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তবুও হয়ত রাগ কমবে না।
মেঘালয় আরেকবার বললো, “মিশু সরি, বুঝতে পারিনি এমন হবে। তুমি প্লিজ…”
আর কিছু বলতে পারলো না।মিশু ওর বুকে মাথা রেখে কেঁদে উঠলো। দুহাতে খামচে ধরলো মেঘালয়ের শার্ট। ওর কান্নার গতি যত বাড়ছে, হাতের শক্তিও যেন তত বাড়ছে। দুহাতে গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে মেঘালয়ের বুকে খামচে ধরছে ও। মেঘালয়ের খুব লাগছে কিন্তু টু শব্দটিও করলো না। মিশুকে ছুঁয়ে ও দেখলো না। মিশু একাই ওর বুকে মাথা রেখে অঝোরে কেঁদে চলেছে আর সমানে খামচে যাচ্ছে ওর বুক আর গলা। হাতটা উপরে তুলে গলায় কতগুলা যে খামচি দিলো কোনো হিসেব নেই। গলা থেকে কাঁধে, ঘাড়েও অজস্র আচড় দিয়ে তারপর ক্ষান্ত হয়ে ওর গলা জরিয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
যেসব জায়গায় ও খামচি দিয়েছে কয়েক জায়গায় বোধহয় ক্ষত হয়ে গেছে। জ্বালা করছে অনেক। তবুও কোনো শব্দ করলো না মেঘ। এমনকি একটু নড়লো ও না। মিশু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে করতে একসময় সেটাও থেমে গেলো। স্তব্ধ হয়ে রইলো একদম। মেঘালয় নিজেও স্তব্ধ। নিশ্বাস পড়ছে খুবই আস্তে। মিশুর কান্না থেমেছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। চোখের পানিতে বুক ভিজে একাকার হয়ে গেছে। মিশুর কোনো নড়াচড়া নেই। মেঘালয় ডাকতে গিয়েও গলায় জোর পাচ্ছেনা। চুপ করে রইল একদম, যতক্ষণ খুশি এভাবেই থাকুক মেয়েটা।
বেশ কিছুক্ষণ পর হাতটা মেঘের গলা থেকে সরিয়ে সামনে নিয়ে এলো মিশু। চোখ মুছলো এক হাতে। তারপর উঠে বসলো। দুহাতে বারকয়েক চোখ ও গাল মুছলো। তারপর একবার আড়চোখে মেঘালয়ের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেলো। মিশু আচমকা ওর গলা টিপে ধরে বললো, “খুন করে ফেলবো, খুন করে ফেলবো। এভাবে তাকান কেন? মেরে ফেলবো আপনাকে।”
মেঘালয় অনেক চেষ্টা করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দুহাতে মিশুর মুখটা ধরে ফেললো। মিশু চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। চোখে পানি। মেঘালয় এক হাতে মুছে দিয়ে আলতো করে ওর মুখটা ধরলো দুহাত দিয়ে। তারপর খুব নরম গলায় বললো, “বিয়ে করবা আমায়?”
২৪.
খুব তাড়াতাড়ি ই বিছানা ছেড়ে নিচে নামলো দুপুর ও অরণ্য। দুজনের মাঝে এখন অনেকটাই সহজ ভাব চলে এসেছে। দুপুর ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসে চুল আড়চাচ্ছে। হঠাৎ বাথরুমের খোলা দরজার দিকে চোখ চলে যাওয়ায় দেখলো অরণ্য ওর ব্রাশ টা দিয়েই দাঁত মাজছে। আশ্চর্য হওয়ার মত ব্যাপার! একজনের ব্রাশ অন্যজন কখনো ব্যবহার করে?
ছুটে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দুপুর বললো, “আপনি আমার ব্রাশ নিয়েছেন কেন? আপনার ব্রাশ নেই?”
– “নাহ নেই।”
– “আপনার গায়ে হলুদের তত্ত্বের সাথে ব্রাশ পাঠিয়েছিলো আমাদের বাড়ি থেকে। সেটা কি করেছেন?”
– “জানিনা, কোথায় যে রেখেছে।”
– “আপনার আগে ব্রাশ ছিলোনা? সেটা?”
– “হারিয়ে গেছে।”
– “বিয়েতে আপনাকে নতুন ব্রাশ কিনে দেয়নি?”
– “না, দেয়নি।”
দুপুর বিরক্ত হয়ে বললো, “সেজন্য আপনি আমার ব্রাশ ব্যবহার করবেন?”
– “হুম, এ যাবত চারবার এটা দিয়েই দাঁত মেজেছি। তুমি ব্রাশ করার পর।”
– “ছি, এটা কেমন বিশ্রী ব্যাপার।”
– “বিশ্রী মনে হবে কেন? যদি একটা ব্রাশই দুজনে শেয়ার করতে না পারি তাহলে কিসের স্বামী স্ত্রী?”
প্রশ্নটা যথাযথ ছিলো। এর কোনো উত্তর দুপুরের জানা নেই। নিখিলের সাথে কথা হয়েছিলো, বিয়ের পর দুজনের একটাই ব্রাশ থাকবে। অরণ্য’র ক্ষেত্রে এর উলটা হবে কেন?
ও আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে এলো।
শাড়ি বদলে সুন্দর একটা শাড়ি পড়ে নিলো। চোখে কাজল ও কপালে একটা কালো টিপ দিলো। অরণ্য বাইরে আসার পর কেউ কারো সাথে কোনো কথাই বললো না।
আজ বাসায় তেমন কোনো কাজ নেই। বিয়েতে আসা অতিথি রা সবাই চলে যাচ্ছেন। সকালের নাস্তা খাওয়ার পর ব্যাগ গুছিয়ে নিতে আরম্ভ করলো ওরা। অরণ্য নিজেই ব্যাগ গুছাচ্ছে আর দুপুর বসে আছে। একটুও দেরি করতে চায়না ছেলেটা। ব্যাগ গুছানো শেষ হতেই দুপুরকে রেডি হতে বলে সে বাবাকে বলতে গেলো যে এখনি বেড়িয়ে পড়তে চায়। দুপুর থতমত খেয়ে রেডি হতে লাগলো। ছেলেটার সবকিছু তে এত চঞ্চলতা কেন বোঝেনা ও। মাঝেমাঝে খুব বিরক্ত লাগে ওকে। কিছু বলাও যায়না।
রেডি হতে হতে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠলো দুপুরের। এখন একটা লম্বা জার্নি দেয়া হবে। সুন্দর করে সেজেগুজে বসে রইলো। অরণ্য আসলেই বেড়িয়ে পড়তে হবে।
এমন সময় দুপুরের ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো নিখিলের নাম্বার থেকে কল। বুকটা কেমন ধক করে উঠলো ওর।
চলবে..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *