অভিমানের পরিসমাপ্তি!

অভিমানের পরিসমাপ্তি!

“সেই কখন থেকে বৃষ্টিতে বাহিরে দাড়িয়ে ভিজে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে না ভিজে ইচ্ছে করলে বাড়ির ভিতর আসতে পারতো। তা না বৃষ্টিতে ভিজেই যাচ্ছে।

তন্ময় জানালা থেকে মানুষটিকে দেখে এগিয়ে আসে। বৃষ্টিতে না ভিজে যেনো রুমে গিয়ে বসে। তন্ময় দরজা খোলে অবাক হয়ে হয়ে যায়।

দূর থেকেও চশমা দিয়ে দেখলেও চিনতে পারিনি মানুষটি কে হতে পারে। বৃষ্টির জন্য হয়তো খুব ভালো করে দেখা যায়নি। তবে এই টুকু অনুমান করতে অসুবিধা হয়নি কোনো স্ত্রী হবে কারো। তাই হেল্প করার জন্য এগিয়ে আসে তন্ময়।

তন্ময় দরজা খোলে মোটা ফ্রেমে বাঁধানো চশমা দিয়ে দেখে এ যে তার প্রিয়তমা। যে একদিন রাগ করে চলে গিয়েছিল।

তন্ময় তার প্রিতমাকে দেখে চুপ হয়ে যায়। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে।

হঠাৎ তন্ময় রেগে বলল ;

– “তা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজছিলি যে। এতো বছর সংসার করলি। নিজের বাড়িটাই কিছ দিনেই ভুলে গেলি ?

সত্যি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভিজছিল তৃষা। একবার ভেবছিল পুরনো বাড়িটায় যায়। কিন্তু তারপর ভাবে থাক কী দরকার যা গেছে তা যাক।

[ads2]

অফিসের কাজে এদিকে এসেছিল। আর হঠাৎ বৃষ্টি। ওর পরিচিত এলাকা । অনেক বছর সংসার করেছে এ পাড়ায়। এই সময়টা যানবাহন মেলা খুব মুশকিল তার উপর বৃষ্টি।

বাড়িটায় তন্ময়ের পিছন পিছন ঢুকতেই দেখেছে ওর লাগানো গাছগুলো ফুলে ভরে গেছে। অবাক হয়ে গিয়েছিল। এই গাছ নিয়েও কত বকা খেয়েছে তন্ময়ের কাছে। খাওয়া ফেলে আগলে রেখেছে এদের। আর সে জন্য কম বকেছে তন্ময়।

বিয়েটা সম্বন্ধ করে হলেও দুজনে খুব ঘুরে নিয়েছিল। সেখান থেকে সম্পর্কটা তুই তে। তৃষা অবশ্য তুমি বলে।
ভালোই ছিল কিন্তু বাঁধ সাধল তানিয়াকে নিয়ে।

তানিয়া তন্ময়ের কলেজের বন্ধু। কেমন যেন চেপে বসেছিল । তৃষাকে সময় কম দিতে শুরু করেছিল তন্ময়। কোথাও যেতে বললে এড়িয়ে যেত। অথচ ও অনেকের মুখে শুনতো অফিসের পর তানিয়া আর তন্ময় ঘুরতে গেছে। তৃষা এতো গুরুত্ব দেয় নি। কেউ বললে হাসি মুখে উড়িয়ে দিতো।

কিন্তু যখন মার্কেটে কেনাকাটি করত গিয়ে তৃষা নিজের চোখে দেখল তানিয়া আর তন্ময় একসাথে কেনাকাটি করছে । আর সহ‍্য হয়নি।

এমনিতে তৃষা খুব শান্ত। কোনরকম ঝগড়াঝাটি পছন্দ করে না। সেদিন ফিরলেই তন্ময়কে বলে আমার ডিভোর্স চাই ।
তন্ময় প্রথমে ভেবেছিল তৃষার মাথায় মাঝে মাঝে ভূত চাপে। তাই ইয়ার্কি মেরে তন্ময় বলেছিল;

– “বেশ তো কবে বলিস। আমি সই করে দেব।”

কিছুদিন পর সত্যিই তৃষা ডিভোর্সের ফর্ম নিয়ে আসে। তন্ময় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তৃষাকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে;

– ” হলটা কি? কি তার অপরাধ।”

তৃষা তার আগেই বলে সই করে দিও। বলেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। তন্ময় হতবাকের মতো তাকিয়ে রইল ডিভোর্সের ফর্মটার দিকে। তারপর আসতে আসতে সই করে দিল।

কোনদিন তৃষাকে না করেনি তন্ময় । ডিভোর্সের পর্ব খুব শান্তিতেই নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে হয়ে গেল। সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল তন্ময়ের সে নিজের দোষটা জানতে পারে নি। তৃষা এক কাপড়ে চলে গিয়েছিল। তন্ময় অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। তৃষা যোগাযোগ রাখতে চাইনি।

তন্ময় বলল ;

– যা ভিজে গেছিস। কাপড় ছেড়ে আয়।”

তৃষা বলল ;

– থাক। কিছু হবে না।”

তন্ময় ওর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল ;

 

– “জানি তোর কিছু হয় না। যা, ছেড়ে আয়। তোর কাপড় যেখানে যেমন ছিল তেমন আছে।”

তৃষা আস্তে আস্তে উঠে বেডরুমে গেল। তৃষা অবাক হয়ে দেখল যেখানে যেমন রেখে গেছিল তেমনই প্রায় সবই এক আছে।

বাথরুমে গিয়ে অবরুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ল। কিছুটা ঠিক হয়ে ফিরে এল তন্ময়ের কাছে।

তন্ময় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। ওকে দেখেই অ্যাস্ট্রেতে নিভিয়ে দিল। জানে তৃষার কষ্ট হয়।
দেখল এর মধ্যেই তন্ময় কফি করে এনেছে।

তৃষা অবাক হয়ে বলল ;

– ” তুমি করলে! এক গ্লাস জলও তো ভরে খেতে না।”

তন্ময় হেসে বলল “;

– ” সে তো বিয়ের পর একদিনও তোকে বুকে না নিয়ে ঘুমাই নি। এখন তো ঘুমটাই আর নেই। যেদিন ঘুমের ওষুধ খাই সেদিন ঘন্টাখানেক চোখ লাগে।”

তৃষা মাথাটা নিচু করে কফি খেতে লাগল। হঠাৎ বলল;

– তানিয়া কেমন আছে?”

তন্ময় অবাক বিষ্ময়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল;

– “ভালো। কিন্তু হঠাৎ ওর কথা। আমি কেমন আছি জিজ্ঞাসা করলি না তো।”

তৃষা হেসে বলল;

– ” ভালোই তো। শুধু বুঝতে পারছি না। সব কিছু আগের মতো কেন? তানিয়া রাগ করে না।”

তন্ময় অবাক বিস্ময়ে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল;

– “তোর সংসার তাই। কিন্তু তানিয়া রাগ করবে কেন? ওর বরের সাথে ও সুখেই আছে।”

তৃষার সব কেমন গুলিয়ে গেল। অবাক হয়ে বলল ;

-” সে কি? তুমি যে ওকে ভালোবাসতে। ওর সাথে ঘুরতে ফিরতে। মিথ্যা বল না আমি নিজে চোখে দেখেছি। তাই তো বাঁধা হয়ে দাঁড়াইনি।”

তন্ময় গম্ভীর হয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। বলল;

– “আর তাই ডিভোর্স। একবার জিঙ্গাসা করলি না। একবার আমার দোষ বললি না। সোজা মৃত‍্যুদন্ড।”

তাপর হঠাৎ উদাসীন কন্ঠে বলল ” হুম, ভালোবাসি আজও। ঘুরেছি ও একটা ছেলেকে ভালোবাসতো।দুজনের বাড়িতেই প্রচুর গন্ডগোল হচ্ছিল । রাসেল বিদেশী কম্পানিতে চাকুরী পেয়ে চলে গেছিল। তৃষার ওখানে যাবার সমস্ত ব‍্যবস্থা আমি করে দেব এই কথা দেওয়ার পর। তাই কদিন ওর সাথে ছুটতে হয়েছিল। শেষদিন আমায় একটা ঢাকাই জামদানী কিনে বলেছিল তোকে দিতে আমাদের বিবাহ বার্ষিকীতে। ও থাকতে পারবেনা তাই। এখনও ফোন করে তোর কথা বলে। এখনও আমার মতো ওর বিশ্বাস তুই ফিরে আসবি।”

[ads1]
“তবে সেদিন সত্যি টা না বুঝেই ভুল বুঝে দূরে চলে গেলি। অভিমান করে দূরে সরে গেলি। সবসময়ই তোর ইচ্ছে কে সম্মান করে এসেছি। তাই সেদিনও তোর ইচ্ছেকে সম্মান দিতে গিয়ে রুখতে পারিনি। আমার অভিযোগ টুকুও জানা হলো না।

তৃষার হাত থেকে হঠাৎ কফির কাপটা মেঝেতে পড়ে যায়। দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে।

তন্ময় ব‍্যালকানিতে গিয়ে সিগারেট খেতে থাকে। বুঝতে পারে না ডিভোর্সের পর নিজের স্ত্রী উপর আর কোন অধিকার থাকে কিনা।
হঠাৎ তৃষার পায়ের শব্দে ঘুরে তাকিয়ে দেখে তৃষার চোখে এখনও জল। আরো সুন্দর লাগছে তৃষাকে।

তৃষাকে বলল

– “চলে যাবি। দাঁড়া শাড়িটা নিয়ে যা। অনেক দিন পরে আমার কাছে। আজ ওর গতি হোক। “বলে ম্লান হাসল।

তৃষা হঠাৎ হেসে বলল ;

– থাক নতুন করেই পড়ে ফিরে আসবো । কাল নোটিশ
দেব। আপত্তি থাকলে বলে দাও।”

তন্ময়ের বুকে হঠাৎ একটা ব‍্যথা অনুভব করল। দুঃখের, সুখের না এতো দিনের অপেক্ষার সমাপ্তির বুঝতে পারল না।

তন্ময় শুধু বলল ”

– তোর কথায় কোনদিন তো না করিনি। শুধু একটা আবদার আজ থেকে যাবি। তোকে বুকে নিয়ে একটু ঘুমাই। অনেক দিনের রাত জাগরনের সমাপ্তি হোক।”

তৃষা মৃদু হেসে বলে

– “আমি না খেয়ে রাতে থাকতে পারবো না। বাজার আছে?”

তন্ময় বলে ;

– “থাক। আমি রান্না করছি। দেখ তোর বর কেমন পাকা রাঁধুনি হয়ে গেছে। সবটাই অবশ‍্য তানিয়া শিখিয়েছে। তুই তো মারবার প্লান করেছিলি না খাইয়ে। জানতিস আমি রাঁধতে পারি না।”

তৃষা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল ;

– “ক্ষমা করতে পারবে কোনদিন।”

তন্ময় হেসে বলল ;

– ” তুই যে আমার জন্যে আমায় ছেড়ে গেছিলি। আমি সুখে থাকবো বলে। তাই সেদিনই ক্ষমা করেছিলাম।যেদিন ধরতে পেরেছিলাম ব‍্যাপারটা। তোর আমার সম্পর্কের সমাপ্তি তোর ইচ্ছায় । শুরুও তোর ইচ্ছায়।”

তৃষা আর থাকতে পারলো না। তন্ময়ের বুকে ঝাঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো অঝোরে। তন্ময় মাথায় হাত দিতেই এতো বছরের অভিমানের সমাপ্তি এক নিমেষে। ইস কী বোকা সে যদি সেদিন রাগের সমাপ্তিটা ঘটতো এভাবে।

তন্ময়ের বুক থেকে মাথা তুলে বলে;

– হয়েছে! কালকেই সব ব্যাবস্থা করে তোর বুকে ফিরে আসবো। বাকীটা সময় তোর বুকেই কাটিয়ে দিবো। এখন ছাড় আমাকে।
– আবার তো ভুল বুঝে অভিমান করে দূরে সরে যাবি না।
– কখনোই না। বাকিটা সময় এই বুকেই কাটিয়ে দিতে চাই।
– সত্যি তো।
– তিন সত্যি……!!

অভিমানের পরিসমাপ্ত করে আবার নতুন করে বাঁচতে চললো দুজনে।

গল্পঃ- অভিমানের পরিসমাপ্তি!

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *