একটু বেশিই অভিমানী পার্ট-০৪

গল্পঃ- একটু বেশিই অভিমানী 💖
পার্ট -০৪
#অদ্রিতআল মাসুদ


একটু বেশিই অভিমানী সকল পর্ব

.
আমি বাড়িতে এসে বেল বাজানোর পর মা দরজা খুলে দিল।আমি ঘরের ভিতরে চলে আসলাম।ঘরে আসার পর আমি অনেকটা অবাক হলাম।
.
কারণ ঘরে বাবা আর ভাইয়া বসে রয়েছে।সাধারণত এই সময়ে বাবা আর ভাইয়া অফিসে থাকে।মা,ভাবী,মিশুও বসে রয়েছে।আমি ভিতরে যেতেই বাবা আমার কাছে আসল।
.
—বা…..(আমি)

—ঠাসসসস ঠাসসস ঠাসস ঠাসস।(বাবা)
.
আমি বাবা বলার আগেই বাবা আমাকে ঠাপ্পর মারল।থাপ্পর খাওয়ার পর আমি অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছি।কারণ এই সে বাবা যে আমাকে কোনদিনই আমার শরীরে হাত তুলে নি।
.
—বাবা…..(আমি)

—ঠাসসসস ঠাসসস ঠাসস ঠাসস।(বাবা)

—বাবা তুমি আমাকে মারতে পারলে?(অবাক হয়ে)

—হ্যাঁ।(অনেকটা রাগে)

—আমি কি এমন করছি যার জন্য তুমি আমাকে মারলে?(আমার চোখের কোণে জল এসে গেছে)

—কেন তুমি জানো না তুমি কি করেছ?

—না।

—তুই এমন কিছু করতে পারবি আমি কখনও ভাবতেই পারি নি।(মা)

—আগে বলবে ত আমি কি করেছি?

—ঠাস ঠাস।(ভাইয়া)

—ভাইয়া তুমিও আমাকে মারলে?

—মারব না ত কি করব?তোর বিয়ে হওয়ার আগেই ত তোকে জিজ্ঞাস করেছিস তুই কাউকে পছন্দ করিস কিনা?তখন কেন না করলি?শুধু শুধু মিশুর জীবনটা নষ্ট করলি কেন?

—শুধু কি মিশুর?কে জানে এই শয়তানটা আরও কতটি মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে? (বাবা)

—বাবা,তুমি আমাকে শয়তান বলতে পারলে!!!

—তোকে ত শুধু শয়তান বলেছি।এখন যদি আমার কাছে লাঠি থাকত তাহলে তোর হাত-পা ভেঙ্গে ফেলতাম।আমাদের পরিবারের সব মানসম্মান ডুবিয়ে এখন ভাব করতে এসেছে যেন সে কিছুই জানে না?

—আমি সত্তিই কোনোরকম ভাব করছিনা। আমি সত্যিই জানি না তোমরা কি বলছ?

—আমরা প্রথমে মিশুর কথা বিশ্বাস করি নি।কিন্তুু আজকে নিজের চোখে দেখে আর অবিশ্বাস করতে পারলাম না।

—মা,বিশ্বাস কর মিশু তোমাদের যা বলেছে সবকিছু ভুল।ঐ মেয়েটা আমার ম্যাডাম আর আমি তার সাথে মিটিং এ গিয়েছিলাম।

—তুই যদি আর একটা মিথ্যা কথা বলচ্ছিস তাহলে তোকে আমি এখানে মেরে ফেলব।(বাবা)

.
বাবার কথা শুনে আমার অনেক কষ্ট হল।তার সাথে রাগও হল।কারণ আমি এত করে বলচ্ছি কিন্তুু আমার কথা কেউ বিশ্বাসই করচ্ছে না।
.
তাই রাগের মাথায় বাসা থেকে বেরিয়ে পাশের বাসা থেকে কয়েকটা কাঠের লাকড়ি এনে বাবার সামনে রাখলাম।
.
—নেও,যত ইচ্ছে আমাকে মার।পারলে মারতে মারতে আমাকে মেরেই ফেল।(আমি)
.
আমি মনে করেছিলাম বাবা আমাকে মারবে না।কিন্তুু আমি ভুল ছিলাম।বাবা একটা লাকড়ি নিয়ে আমাকে মারতে শুরু করল।একটা নষ্ট হয়ে গেলে আর একটা দিয়ে মারতে শুরু করল।
.
বাবা তার সর্ব শক্তি দিয়ে আমাকে মারছে।এক পর্যায়ে আমি মার সহ্য করতে না পেরে ঘরের মেঝেতে পড়ে নিজেকে দাপড়াতে লাগলাম।এত সময়ে আমার শরীরের অনেক জায়গা কেটে গেছে।
.
আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত বের হচ্ছে।আমাকে এমন করে মারছে তাও বাবার আমার প্রতি একটুও দয়া হলো না।উল্টো আরও বেশি করে মারছে।
.
মা,ভাইয়া,ভাবী এমন কি মিশুও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার মার খাওয়া দেখচ্ছে।তাদের মধ্যে কেউই বাবাকে আটকাতে আসল না।
.
একে ত পেটে ক্ষিদে তার উপর এমন মার খেতে খেতে আমি এক পর্যায়ে জ্ঞান হারালাম।আমি যে জ্ঞান হারিয়েছি সেইদিকে কারোই খেয়াল নাই।
.
জ্ঞান হারানোর পরও বাবা আমাকে মারা বন্ধ করে নি। তখনও আমাকে মারছিলো।আমাকে জ্ঞান হারাতে দেখে কাকি অর্থাৎ আমাদের বাড়ির কাছের মহিলা সে এসে বাবার পা ধরে আমাকে মারা আটকায়।
.
আমার এমন অবস্থা দেখে কাকি কান্না করে দিয়েছে।কিন্তুু যারা আমার আপনজন অর্থাৎ মা-বাবা,ভাইয়া-ভাবী এমনকি আমার নিজের বউ মিশুর চোখে একটুও জল নেই।
.
আমাকে মারা শেষ হলে বাবা তার রুমে চলে যায়।তার পিছে পিছে মা,ভাইয়া,ভাবী আর মিশুও নিজের রুমে চলে যায়।কাকি তাদের ডাক দেয়।
.
ডাক দিয়ে কান্না করতে করতে বলে স্যার সাগরকে একটু হাসপাতালে নিয়ে যান।নাহলে সাগর বাঁচবে না।দয়া করুন স্যার।
.
সাগরের জন্য নাহলেও অন্তত আমার জন্য ওকে হাসপাতালে নিয়ে যান।কিন্তুু তারা কেউই কাকির কথা শুনে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় নি।
.
তারা যার যার ঘরে চলে যায়।আস্তে আস্তে আমার শরীর থেকে আরও বেশি করে রক্ত বের হতে থাকে।কাকি আমার এই অবস্থা দেখে অনেক ভয় পেয়ে যায়।
.
তার সাথে কান্নাও করতে থাকে।অবশেষে কোন উপায় না দেখে রহিম কাকা অর্থাৎ আমাদের বাড়ির দারোয়ান তাকে ডাক দিয়ে এনে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়
.
আমার দুইদিন পর জ্ঞান ফিরে।মাথায় হাত দিয়ে দেখি মাথায় ব্যান্ডিস করা।দেখতে দেখতে হাসপাতালে আরও তিনদিন কেটে যায়।
.
এই কয়দিনে আমাকে দেখতে মা-বাবা,ভাইয়া-ভাবী,মিশু এদের মধ্যে কেউই আমাকে দেখতে আসে নি।কিন্তুু প্রতিদিন কাকি আর রহিম কাকা এসে আমাকে দেখে যেত।
.
তার পরেরদিন সকালে আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়েছি তখনই কাকি আর রহিম কাকা দৌড়ে আমার কাছে আসল।তারা আমাকে যা বলল তা শুনার পর আমার পুরো পৃথিবী উল্টে গেল।

—কি হলো কাকি তোমরা এমন করে দৌঁড়ে আসছ কেন?(আমি)

—বাবা,সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে।(কাকি)

—কি হয়েছে?

—বাবা,তোর বাড়ির সবাই একটু পরে মিশুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে।

—কেন?(অবাক হয়ে)

—মিশুর পেটে তোমার যে সন্তান আছে তাকে ফেলে দিবে।সন্তানটিকে ওরা পৃথিবীর আলো দেখতে দিবে না।(কান্না করে)

—কিকিকিকি?

—হ্যাঁ,বাবা।

—না।এ হতে পারে না।ওরা আমার সন্তানকে এইভাবে মেরে ফেলতে পারে না।

—বাবা,বিশ্বাস কর আমরা দুইজনে অনেক আটকাতে চেষ্টা করচ্ছি কিন্তুু পারি নি।

—মিশু কিছু বলল না?

—মিশুই ত তোমার পরিবারের সবাইকে রাজি করিয়েছে।

—এখন আমাকেই কিছু করতে হবে।আমি আমার সন্তানকে এইভাবে মরে যেতে দিতে পারব না।

—তুমি কি করবে?

—জানি না।আচ্ছা ওরা কি ডাক্তারের কাছে চলে গেছে?

—না।একটু পরে যাবে।

—তাহলে আমি বাড়িতে গিয়ে ওদের আটকাব।(আমি বিছানা থেকে উঠে হাঁটতে চেষ্টা করলাম।কিন্তুু এক পা দিতেই পরে গেলাম।)

—বাবা,তোমার শরীর ত ভাল না।তুমি কিভাবে যাবে?

—না,কাকি।এখন আমার শরীরের কথা চিন্তা করলে হবে না।যেভাবেই হোক না কেন আমাকে বাড়িতে যেতে হবে।নাহলে যে ওরা সবাই আমার সন্তানকে মেরে ফেলবে।(কান্না করে)

—তুমি ত ঠিক মতো হাঁটতেও পারছ না।তাহলে তুমি যাবে কি করে?(কাকা)

—কাকা,আমাকে ধরে একটু বাড়িতে নিয়ে যাবে?নাহলে যে আমি আমার সন্তানের মুখ কোনদিনই দেখতে পারব না।ওরা সবাই আমার না হওয়া বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে।(কান্না করে)

—বাবা,তুমি কান্না বন্ধ কর।আমরা তোমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি।

—আচ্ছা।
.
তারপর ডাক্তারকে বুঝিয়ে আমি রহিম কাকা আর কাকির সাহায্যে বাড়িতে চলে আসলাম।আমি বাড়িতে আসার পরই দেখতে পেলাম বাড়ির সবাই মিশুকে নিয়ে এখন বের হয়ে যাবে।
.
তারা দরজার সামনে চলে এসেছে।আমি আর একটু পরে আসলেই কাউকে পেতাম না।আমি তাড়াতাড়ি মিশুর কাছে গেলাম।
.
—মিশু,তুমি নাকি অ্যাবরশন করতে যাচ্ছো(আমি)

—হ্যাঁ।(মিশু)

—কেন?এই বাচ্চাটা কি এমন দোষ করচ্ছে যার জন্য ওকে পৃথিবীর আলো দেখতে দিবে না?

—কারণ ওর শরীরে তোমার মতো চরিএহীনের রক্ত বইছে। ও বড় হয়ে তোমার মতই চরিত্রহীন হবে – আর যা আমরা কেউ চাইনা।

—মিশু দয়া করে এমন করো না।আমার সন্তানকে এইভাবে মেরে ফেল না।(কান্না করে)

—এই বাচ্চাটা যতসময় আমার পেটে থাকবে আমার নিজের প্রতি ততই ঘৃণা হবে।

—কেন?

—কারণ ওর শরীরে চরিএহীন ব্যাক্তির রক্ত বইছে আর সেই রক্ত আমার শরীরেও আসবে ভেবেই ঘৃণা হচ্ছে।

—মিশু,আমাকে এতবড় শাস্তি দিও না।তুমি ত আমার থেকে আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছ এমনকি আমার পরিবারকেও তুমি আমার বিরুদ্ধে করে দিয়েছ।দয়া করে আমার সন্তানকে আমার কাছে থেকে কেড়ে নিও না।(কান্না করে)

—আমি কিছুই কেড়ে নেই নি।তুমি সবকিছু নিজের দোষেই হারিয়েছ।

—আমার কি কপাল কোন দোষের জন্য আমি এতবড় শাস্তি পেলাম আমি সেইটাই জানি না।মিশু,আমাকে অন্তত এই একটা উপকার করে দাও।তুমি এরপরে আমার কাছে যা চাইবে আমি তোমাকে তাই দিয়ে দিব।

—তোমার কাছে কি আছে যা আমাকে দিবে?সব ত তোমার বাবার।এখন আমার পথ ছাড়।আমাকে হাসপাতালে যেতে দাও।

—মা,ও মা।তুমি একটু মিশুকে বুঝাও যাতে করে মিশু আমার সন্তানটাকে এইভাবে না মেরে ফেলে।(মায়ের পা ধরে)

—তুই যা করেছিস তারপরেও আমি মিশুকে কোন মুখে আটকাব?(মা)

—বাবা,ও বাবা।তুমি না চেয়েছিলে তোমার তুমি আমার সন্তানের সাথে খেলবে।দেখনা মিশু আমার সন্তানকে মেরে ফেলতে যাচ্ছে।তুমি আরহীকে একটু আটকাও।(বাবার পা ধরে কান্না করে)

—মিশু ত ভুল কিছু করতে যাচ্ছে না।মিশু যা করতে যাচ্ছে সব ঠিকই আছে আর এতে আমাদের সবার মতও আছে।

—বাবা,মিশু আমাকে সন্তানকে মেরে ফেলতে যাচ্ছে আর তুমি বলছ মিশু ঠিকই করছে?তুমি এতটা নিষ্ঠুর হলে কি করে?বাহঃ বাবা বাহঃ(করুণ শুরু)

—তুই যা করেছিস সেইটা যদি ঠিক হতে পারে তাহলে মিশুর সিদ্ধান্ত ঠিক হবে না কেন?

—বাবা,বিশ্বাস কর আমি কোন অন্যায় কাজ করি নাই।(কান্না করে)

—সামনে থেকে সর আমাদের যেতে দে।

—ভাইয়া,তুই মিশুকে আটকা।দেখ মিশু কি করতে যাচ্ছে। ( পা ধরে)

—সাগর,পা ছাড়।আমাদের যেতে দে।(ভাইয়া)

—ভাইয়া তুইও আমাকে ভুল বুঝলি?

—আমি এতদিন তোকে ভুল বুঝেছিলাম।কিন্তুু আজকে তোকে সঠিক বোঝার জন্য নিজেকেই খারাপ লাগছে। মানুষ চিনতে আমি ভূল করেছি। (কান্না করে)

—আমার বাচ্চার জায়গায় যদি এইটা তোর বাচ্চা হতো তাহলেও কি তুই এমনটা করতে পারতি ভাইয়া। (কান্না করে)

—তুই যে ভুল করেছিস সেই ভুল আমি কখনও করতামই না।

—ভাবী ও ভাবী। তুমি ত মিশুকে আটকাও দেখনা মিশু কি করতে যাচ্ছে।(ভাবীর পা ধরে)

—তুমি আসবে নাকি তোমাকে রেখেই চলে যাব।(ভাইয়া)(ভাবী চলে গেল।)

—মিশু,দয়া করে আমার বাচ্চাটাকে মের না।আমাকে এতবড় শাস্তি দিও না।(মিশুর পা ধরে)

—তুমি যা করেছ তার জন্য তোমার এই শাস্তিই পাওয়া উচিত।(মিশু চলে গেল)

—বাবা,তুমি একটু মিশুকে আটকাও না।

—আজকে তোর জন্য আমি সমাজের মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারি না।সেই জন্য আমি নিজেই আজকে মিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
.
সবাই গাড়িতে করে ডাক্তারের কাছে চলে গেল।আমি আজকে সত্যিই একা হয়ে গেলাম।কি এমন ভুল করেছিলাম যার জন্য মিশু আমার পরিবারকে আমার বিরুদ্ধে করে দিল?
.
এমনকি আমার সন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই তাকে মারতেও চলে গিয়েছে।এইসব ভাবচ্ছি আর কান্না করতে লাগলাম।রহিম কাকা আর কাকিও আমার কান্না দেখে কান্না করে দিয়েছে।
.
তারা যে আমাকে কিছু বলে শান্তনা দিবে সেই ভাষাও তাদের কাছে নাই।আমি ফ্লোরে বসে কান্নাই করতে লাগলাম।রহিম কাকা আর কাকি আমার পাশে বসে তারাও কান্না করচ্ছে।আজকে আমার বাচ্চার শেষ দিন।এইটা ভাবতেই আরও বেশি করে কান্না আসছে।
.
হে আল্লাহ! কি দোষ আমার ‘ কি দোষ আমার। কোন পাপের জন্য আমাকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছো। শাস্তি দিচ্ছো দাও
কিন্তু আমার সন্তানের সাথে কোনো অবিচার করোনা। ওর তো কোনো দোষ নেই। যে সন্তান পৃথিবীর আলোই দেখেনি তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র। ওকে বাঁচত দাও, আমার সন্তান কে বাঁচতে দাও। জীবনে যদি কোনো পূন্য কাজ করে থাকি তার বিনিময় হলেও আমার সন্তানকে বাঁচতে দাও..বাঁচতে দাও। (চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমার অন্তরআত্মা আমাকে ধিক্কার জানাচ্ছে ছিঃ সাগর ছিঃ তুই নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারলিনা। জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম)
.
#চলবে

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *