এক নামাযি বোনের কাহিনী । ইসলামিক গল্প

এক নামাযি বোনের কাহিনী
(সম্পূর্ণ গল্পটা পড়ার অনুরোধ থাকল)
সালাতুল হাজত শেষ করে কিছুক্ষন জায়নামাজে শুয়ে রইলো আয়েশা।প্রতিদিনকার মতো আজ ও জায়নামাজে অনেকক্ষন শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে আয়েশার কিন্তু পরিক্ষার জন্য আর শুয়ে থাকতে পারলো না!
:
দুপুর ১২ টায় পরিক্ষা শুরু, আগেভাগে বের হতে না পারলে আর রাস্তায় জ্যামে আটকে গেলে পরিক্ষার টাইম শুরু হওয়ার আগে পৌছাতে পারবে কি না সন্দেহ!তাই আর দেরি না করে আয়েশা বোরকা, হিজাব,নিকাব, হাত-পা মুজা পরে নিলো আর ব্যাগ গুছিয়ে মা থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
:
রিক্সায় যেতে যেতে শরতের সুভ্র নীল আকাশ দেখতে লাগলো আয়েশা আর মুগ্ধ হয়ে ঠোট দুটো ম্যৃধু নাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলো!
আকাশ দেখতে দেখতে পথের দুরুত্ব যেনো গুছিয়ে এসেছে। খুব জলদি রিক্সা মেইন রোডে পৌছে গেলো।
রিক্সা থেকে নেমে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে রইলো আয়েশা।প্রায় ২০ মিনিট দাড়ানোর পর ও একটা বাস আসছিলো না।। পরে কিছুক্ষন দাড়ানোর পর একটা বাস আসলো।আয়েশা তাড়াতাড়ি করে বাসে উঠে গেলো।
আজ রাস্তায় খুব একটা জ্যাম না থাকায় খুব জলদি ভার্সিটি পৌঁছে গেলো আয়েশা।ফোন বের করে টাইমটা দেখে নিলো আয়েশা।
মাএ ১১:২০ বাজে তাই হলে না ঢুকে কমন রুমে কিছুক্ষন নীরবে একাকী বসে রইলো।
হলের ভিতরে সবার হৈ-হুল্লোড়ে মাথা ব্যাথা হয়ে যায় আয়েশার।নিরব নিরিবিলিতে থাকতে থাকতে এখন আর হৈ হুল্লোড় ভালো লাগে না আয়েশার।হঠাৎ বেল বেজে উঠলো,হলে ঢোকার সময় হয়ে গেছে।খুলে রাখা নিকাব আর হাত মুজা পরে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেলো আয়েশা।
[ads1]
ক্লাসের দরজায় যেতেই দেখলো তার সব ক্লাসমিটরা গল্পগুজব করছে,, স্যার, মেডাম কেউ আসেনি এখন ও।ক্লাসমিটদের সালাম দিয়ে হলে ঢুকলো আয়েশা।
আয়েশা ঢুকার পরর দুজন মেডাম হলে ঢুকলো।
সবাইকে খাতা আর প্রশ্ন দেওয়া হলো,কিছুক্ষনের মধ্যে পরিক্ষা শুরু হলো।
:
হলের ভিতর পিনপন নিরবতা!!
কেউ কোনো শব্দ না করে দ্রুতগতিতে হাত চালিয়ে লিখছে কারন,দ্রুত না লিখলে ৪ঘন্টার পরিক্ষায় কিছুতেই ফুল মার্কস করা যাবে না।
আয়েশা কিছুক্ষন লিখার পর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে জোহরের সময় হয়ে গেছে।
:
দুরের মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর সুর ভেসে আসতেই আয়েশা লিখা বন্ধ করে দিলো।সবাই লিখে যাচ্ছে কোনো থামা থামি নাই কিন্তু আয়েশার লিখা বন্ধ দেখে মেডাম আয়েশার পাশে এসে দাড়ালেন।
– কি ব্যপার লিখছো না যে ?কোনো সমস্যা ?
-না মেডাম কোনো সমস্য নেই। আসলে যোহরের আজান হচ্ছে তো……..
নামাজের জন্য আমি কি একটু ১৫ মিনিটের জন্য কমন রুমে গিয়ে নামাজটা পড়ে আসতে পারি মেডাম?
-পরিক্ষার মধ্যে নামাজ!!এটা তো সম্ভব নয়,সরি।
আর মাএ তো ১ ঘন্টা হলো পরিক্ষা দিতে ঢুকছো,এখন তো কোনোভাবেই রুম থেকে বের হতে পারবে না।
শোনো আমরা ও তো নামাজ পড়ি তাইনা?আমরা একেবারে বাসায় গিয়ে ৬/৭ টার দিকে যোহর, আছর, মাগরিবের নামাজ একসাথে পড়ি।তুমিও এটা করো।
এখন নামাজ পড়তে হবে না, পরিক্ষা দেও চুপচাপ।
আর ৪ ঘন্টায় ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট এর মেয়েরা তো লিখেই শেষ করতে পারে না আর নামাজের জন্য ১৫ মিনিট মিনিট নষ্ট করলে কতো লস হবে বুঝতে পারছো তো?
-মেডাম প্লিজ আমাকে অল্প কিছুক্ষনের জন্য বের হতে দিন।আমি না হয় এখন বের হবো না, ১ ঘন্টা পর বের হবো তখন নামাজ পড়তে যাবো তবুও যেতে দিয়েন মেডাম।
-এই তুমি থামো তো!!!
বেশি ধার্মিকতা দেখিও না! যত্তসব!
মেডামের কথা শুনে চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো আয়েশার।
আগে কখন ও নামাজের টাইমে পরিক্ষা দিতে হয় নি।তাই আয়েশা বুঝতে পারছিলো না কি করবে!
শেষমেষ আয়েশা সিদ্ধান্ত নিলো সে ফুল মার্কস এর আন্সার করবে না। ২টার সময় বেরিয়ে পড়বে আর কমন রুমে গিয়ে নামাজ পড়ে নিবে।
তাই তাড়াতাড়ি কোনোরকম কয় মার্কস এর আন্সার করে ২ টা বাজতেই খাতা জমা দিতে গেলো আয়েশা।
সবাই লিখছে আর আয়েশা ৪ ঘন্টার পরিক্ষা ২ ঘন্টায় কোনো ভাবে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রিপারেশন নিচ্ছে।
এটা দেখে সবাই কিছুক্ষনের জন্য আয়েশার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আয়েশা হল থেকে বেরিয়ে কমন রুমে গেলো নমাজ পড়ার জন্য।
কমন রুমে মাঝেমধ্যে স্যার কিংবা পুরুষ কর্মচারী রা চলে আসে তাই সে দরজা আটকে হিজাব নিকাব রেখে ওয়াশরুমে ওযু করতে গেলো।
অযু করে যেনো দেহ মন জুড়িয়ে গেলো আয়েশার।কেমন জানি এক অপার্থিব ভালোলাগা অনুভব করলো আয়েশা।মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদাদায় করছে আয়েশা,ফুল মার্কস এর আনন্সার করতে পারে নি, এতে আজ কোনো আফসোস নেই আয়েশার,বরং তার খুশি লাগছে নামাজের জন্য বেরিয়ে আসতে পারায়।
ব্যাগ থেকে জায়নামাজ টা বের করে বিছিয়ে নিলো,আর দাড়িয়ে গেলো তার রবের সামনে।
পরিক্ষা শেষ, নামাজ পড়ে lunch করে ৩ টা বাজে বেরিয়ে গেলে আসরের আগেই পৌছে যাবে বাড়িতে।
তাই আজ আর কোনো তাড়া নেই আয়েশার।
তাই শান্তিতে দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজ পড়তে লাগলো আয়েশা।
:
সন্ধ্যা ৭ টা বাজে এখন ও বাসায় আসে নি আয়েশা। প্রতিদিন আরো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে আয়েশা।অথচ আজ আয়েশার কি হলো এখনও আসছে না।আয়েশা কে তার মা বার বার কল করেই যাচ্ছেন,কিন্তু আয়েশা কল ধরছে না!
আয়েশার মা একক দিকে চিন্তা করছেন, আরেকদিকে রাগ ও হচ্ছে!
কয়েকবার কল করেও যখন আয়েশার সাথে কন্টাক্ট করা গেলো না তখন আয়েশার মা আয়েশার বান্ধুবীদের কল করতে লাগলেন।
কিন্তু কেউ আয়েশার কোনো খরব দিতে পারলো না।
ভার্সিটির স্যার, মেডাম, কর্মচারিদের কে ও আয়েশার মা কল করলেন!
কেউ বলতে পারলো না আয়েশা কোথায়!!
[ads1]
অবশেষে আয়েশার মা চিন্তায় দাঁড়ানো থেকে হঠাৎ ফ্লোরে বসে পড়লো।কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না!
আয়েশার বাবাকে ফোন করে সব জানালেন তিনি।জলদি বাসায় ফিরে এলেন আয়েশার বাবা।
আয়েশার বাবা আশেপাশে খুজতে লাগলেন।
কোথাও কেউ আয়েশার খবর দিতে না পারায় তিনি থানায় চলে গেলেন!
:
রাত ১টা বাজে!!
আয়েশার মা জায়নামাজে বসে কেদেই চলেছেন।আয়েশার বাবা কিছুক্ষন পরপর তার পুলিশ বন্ধুকে ফোন করছেন।
সকাল ৮ টা আয়েশার মা-বাবা আয়েশার ভার্সিটিতে যাওয়া উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন।
ভার্সিটি খোলা হয় সকাল ৯ টায়, তারা সাড়ে আটটায় পৌছে গেলো, আয়েশার বাবা দারোয়ান কে অনেক সুপারিশ করার পর সে গেইট খুলে দিল তারা ভিতরে যাওয়ার জন্য!
:
:
নিচ তলা থেকে পাঁচ তলা অবদি সব গুলা রুম চেক করতে লাগলো আয়েশার বাবা-মা। সব ক্লাস রুমে দেখা হলো কিন্তু আয়েশা কে পাওয়া গেলো না।অবশেষে ওয়াশরুম গুলোতে ও খুজতে লাগলেন আয়েশার মা কিন্তু সেখানে ও নেই আয়েশা!
সব ক্লাসরুম,ওয়াসরুমে খোজা হলো কোথাও পাওয়া গেলো না আয়েশা কে!!
:
পাঁচতলা থেকে নেমে যেতে নিলেন আয়েশার মা তখন মনে হলো একটা রুম তো দেখা হয়নি!!
একটা রুমের দরজা আটকানো।তাই তিনি চিৎকার করে আয়েশার বাবাকে ডাকতে লাগলেন!
আয়েশার মার ডাক শুনে আয়েশার বাবা ৫ তলায় উঠে এলেন।
দুজন মিলে দরজা বন্ধ করা রুমটার দিকে এগিয়ে গেলেন কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলেন দরজা ভিতর থেকে আটকানো।
অনেকক্ষন ডাকার পরেও কেউ দরজা খুললো না। আয়েশার মা কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন আর দুআা পড়তে লাগলেন।
আয়েশার বাবা উপায়ান্তর না পেয়ে দারোয়ানকে দরজার লক ভেংগে ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার অনুরোধ জানালেন।
দারোয়ান এ কথা শুনে নারাজ,তখন আয়েশার ডিপার্টমেন্ট এর একজন সিনিয়র শিক্ষক কে ফোন করে সব জানালেন আয়েশার বাবা, তিনি দরজার লক ভাংগার অনুমতি দিলেন।
অনেক চেষ্টার পর লক ভাংগা হল।
দরজা খুলতেই আয়েশার মা চিৎকার করে উঠলেন,,
ঐ দেখো আয়েশার আব্বু! ঐ তো আমার আয়েশা!!
আমার মেয়ে নামাজ পড়ছে। আলহামদুলিল্লাহ্! আল্লাহ আমার মেয়েকে হেফাজতে রেখেছন, এ কথা বলে আয়েশার মা আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে চেয়ারে বসে পড়লেন।
:
অনেকক্ষন পার হয়ে গেলো আয়েশা সেজদা থেকে উঠছে না!!
আয়েশার বাবা তাকে কয়েকবার ডাকলেন, কিন্তু কোনো শব্দ নেই,, আয়েশার মা ভয় পেয়ে গেলেন।
আয়েশার বাবা কাছে গিয়ে আয়েশাকে একটু নাড়া দিতেই আয়েশা কাত হয়ে পড়ে গেলো।
তার মা দৌড়ে এসে মাথাটা কোলে তুলে নিলো আর জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো।
-কি হলো আমার মেয়েটার নড়াচড়া করছে না কেনো?
চোখ খুলছে না কেনো?
খাওয়া-দাওয়া না করাতে অজ্ঞান হয়ে গেলো নাকি!!!
আয়েশার বাবা কাছে এসে আয়েশার পালস চেক করতে হাতটা ধরলেন আর বুঝতে পারলেন তার মেয়ে আর নেই, আয়েশা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।
:
আয়েশার বাবা, আশেয়ার মা’কে কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না।। তার মা এমনিতেই মানসিক ভাবে ভেংগে পড়েছে। তিনি আয়েশার হাত ধরেই নিরবে বসে রইলেন। আয়েশার মা তার নিরবতা দেখে বারবার প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন।
আয়েশার মা আজ প্রথম দেখলেন আয়েশার বাবার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।আয়েশার মা তাদের ২৫ বছরের সংসারে আর কোনো দিন কাদতে দেখেন নি আয়েশার বাবাকে।
-কি ব্যপার তুমি কাদছো কেনো??
কি হলো তোমার?
আয়েশার মা এবার ক্ষুব্ধ হয়ে আয়েশার বাবাকে সরিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে আয়েশাকে ধরলেন।
-আমার আয়েশা নিশ্বাস নিচ্ছে না তো!আল্লাহ….!!!!!!!!!
তিনি বুঝতে পেরে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের চোখের পানি ছেড়ে দিলেন।
তারপর হঠাৎ মেয়ের শিখিয়ে যাওয়া আমল গুলোর কথা মনে পড়লো।তিনি নিজেকে কিছুটা শক্ত করে হঠাৎ বলে উঠলেন,
ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আয়েশার মার দোয়া পড়া শুনে আয়েশার বাবা ও দোয়া পড়লেন।আয়েশার মায়ের কাছে গিয়ে বললেন,
চলো আয়েশার মা আর দেরি না করে বাসায় চলো। আয়েশাকে আজ সুন্দর করে ওর প্রিয় সাদা রঙের কাপড় পরিয়ে রেডি করতে হবে তো, ওর রবের কাছে পাঠানোর জন্য! চলো চলো।
কথা গুলো বলতে বলতে আয়েশার বাবার গলার স্বরটা যেনো অস্পষ্ট হয়ে এলো।
আয়েশার মা কিছুক্ষন আয়েশার নিষ্পাপ চেহেরা টার দিকে তাকিয়ে রইলেন আর কপালটায় একটা চুমু দিলেন।
বেচে থাকতে আয়েশা কতবার মায়ের কাছে একটা চুমু চেয়েছিলো। আর আজ আয়েশা না চাইতে মা তাকে চুমু দিলো।
আয়েশার মায়ের চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা পানি আয়েশার মুখে পড়লো,তাই আয়েশার মা নিজের আচল দিয়ে মেয়ের মুখ মুছে দিলেন।
এররপর আয়েশার মুখটা কে নিকাব দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিলেন।এরপর নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে আস্তে আস্তে বললেনঃ
-আজ তো আমার কান্নার দিন নয়, মন খারাপের দিন ও নয়! তাই কেনো আমি কাদবো??
আজ তো অনেক আনন্দের দিন, শোকর গুজারের দিন।
আলহামদুলিল্লাহ্! আল্লাহ আমাকে তার এক আমানত দিয়েছিলেন আর আজ তার আমানত নিয়ে গেলেন।
আমি এমন এক নেককার, জান্নাতি আমানত পেয়েছিলাম যে কি না তার রবের সাথে সাক্ষাত করতে করতে সিজদারত অবস্থায় এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারে, রবের নিকটবর্তী থেকে রবের কাছে চলে যেতে পারে।সে সব সময় দুয়া করতো সে এক সুন্দর অবস্থায় যেন তার রবের কাছে চলে যেতে পারে!
আর তার দোয়া তো আল্লাহ কবুল করে নিলেন।
সুবহানআল্লাহ!
আহ!
এতো সুন্দর বিদায় নেওয়ার সৌভাগ্য কয় জনের আছে?
এমন মেয়ের মা হওয়ার সৌভাগ্যই বা কয়জনের আছে?
সুবহানাল্লহি ওয়াবিহামদিহী
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন নামাজী হাওয়ার তৌফিক দান করুক।
আল্লাহ যাতে এমন সেজদাহ অবস্থায় মৃত্যু দেয় (আমিন)সুম্মা আমীন

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *