কিশোরী বউ পর্ব-৩। স্বামী স্ত্রীর অভিমানী ভালবাসার গল্প

কিশোরী বউ সকল পর্ব 

কিশোরী বউ (সিজন ০২)
writer – কাব্য আহমেদ
#part_3

রাতে কখন ঘুমিয়েছিলাম মনেই নেই। ঘুম ভেঙে গেলো। বুকের মধ্যে তিথি শুয়ে আছে। আষ্টেপৃষ্ঠে জরিয়ে ধরে ঘুমুচ্ছে। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর তেমন নেই। মনে হয় কমে গেছে। তিথিকে সরিয়ে উঠতে চাইলাম।
– উম্মম..
করে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরল। ৯ঃ০০টা বেজে গেছে। অফিসে যেতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে। কিন্তু, তিথিকে তো বুক থেকে নামাতেই পারছি না। সরাতে চাইলেই আরো জোরে জরিয়ে ধরে।
শেষে কোনোরকমে ছাড়িয়ে মাথার নিচে বালিশ দিয়ে ঠিকঠাক করে শুইয়ে দিলাম। ফ্রেশ হয়ে তিথির কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম,
– একি আপনি কোথায় যাচ্ছেন? (সামিরা)
– অফিসে।
– ওও, কিছু খেয়ে যান। কফি?
– না, অফিসে গিয়ে খেয়ে নিবো।
– না, সেটা কি করে হয়? আপনি বরং দুই মিনিট বসুন। আমি কফি নিয়ে আসছি।
– হুম।
কফি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম অফিসের উদ্দেশ্যে। আম্মু কল করেছিল। রাতে ফিরিনি তাই বোধ হয়। আম্মুকে কল করে তিথির জ্বরের কথা বললাম।
( তিথি )
ঘুম থেকে উঠে বিছানার মাঝখানটায় ঝিম মেরে বসে আছে। আচ্ছা, ওর শরীরের স্মেলটা আমার নাকে আসছে কেনো? কাব্য তো এখানে নেই তাহলে…।
– সামিরা, সামিরা..
– হ্যা, বল। তোর ঘুম ভাঙল। জ্বর কমেছে নাকি?
তিথি কপালে হাত দিয়ে বলল।
– আচ্ছা, ও কি এখানে এসেছিল?
– মানে! ওও টা কে?
– আরে কাব্যের কথা বলছি। এখানে এসেছিল?
– হ্যা, এসেছিল তো। কেনো তোর মনে নেই?
– না তো।
– আহা! কি রোমান্টিক সিন!
পুলকিত হয়ে বলল সামিরা।
– মানে, এই এই কি বলছিস তুই এসব?
– মানে, দেখলাম তুই কাব্য ভাইয়াকে জরিয়ে ধরে ঘুমুচ্ছিলি। কাব্য ভাইয়ের বুকে শুয়েছিলি। আর রোমান্স গুলোর কথাতো নাই বললাম।
– মানে! এই তুই কি কি দেখেছিস?
– অনেক কিছু। ইশ! উনার মতো আমারও যদি একটা বর থাকতো। কত্তো রোমান্টিক! কত্তো কেয়ার করে তোকে। কাল সন্ধ্যার সময় এসেছিল। সারারাত তোর পাশে থেকে জল পট্রি দিচ্ছিল কপালে। নিজের হাতে খাইয়ে দিলো। জ্বর কি এমনি এমনি কমে গেছে নাকি?
– হুহ, কেয়ার না ছাই!
মুখ ফুলিয়ে বলল তিথি।
– আচ্ছা, আমার জ্বরের কথা জানল কি করে ওও?
– আমি বলেছি।
– কেনো? তুই ওকে বলতে গেলি কেনো?
রাগ দেখিয়ে বলল তিথি।
– মানে, তোর কি জ্বরটাই না ছিল? জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল। তাই কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে উনাকে কল করে বললাম তোর কথা।
– পুড়ে গেলে পুড়ে যেতো। কাল সারাদিন একটা কলও করেনি আমাকে। কি ভাবে ওও নিজেকে? আচ্ছা, এখন কোথায় আছে কুত্তাটা?
– অফিসে গেছে।
– জাহান্নামে যাক। আমার কি তাতে?
রাগে গজ গজ করতে লাগল তিথি। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল বেলা অনেক হয়ে গেছে। আজও কলেজ মিস হয়ে গেলো। ধ্যাৎেরি……।
আর গাধাটা এখনো ফোন করেনি কেনো? এই ওর ভালোবাসা। আমি অসুস্থ দেখে গেলো। অফিসে গিয়ে একবারও কল করে জেনে নিলো না আমি কি করছি না করছি? যত সব আদিক্ষেতা!
ভাবতেই কান্না পাচ্ছে তিথির। ঐ বুড়োটাকে না মাঝে মাঝে চুমু দিতে দিতে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে। দূর। কি সব বলছি? চুমু দিয়ে আবার মেরে ফেলা যায় নাকি?
অপেক্ষা করতে করতে আর পারছে না তিথি। ফোন করল। বেশ কিছুক্ষণ পর ফোন রিসিভ হল,
– হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। ( ওপাশ থেকে একটা মেয়ে)
– ওয়ালাইকুম আসসালাম।
– কে বলছেন?
– আমি তিথি।
– ওও, তুমি। কেমন আছো তিথি? আমি রিয়া। চিনতে পেরেছো।
– হুম ভালো, আপনি কেমন আছেন?
– ভালো।
– আচ্ছা, কাব্য কোথায়?
– কাব্য তো মিটিংয়ে। মিটিং শেষ হলে আমি বলে দিবো, তুমি কল করেছিলে।
– হুম।
ফোন রেখে মোবাইল বিছানায় ছুড়ে মারল। বিছানায় বসে জোরে জোরে পা নাচাতে লাগল।
– মিটিং করা হচ্ছে। বের করছি তোর মিটিং।
রাগে গজ গজ করতে করতে বলল তিথি।
( আমি)
মিটিং শেষ রুমে এসে বসলাম। রিয়া জানাল, তিথি কল করেছিল। মোবাইল হাতে নিয়ে কল ব্যাক করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর রিসিভ করল,
– হ্যালো, তিথি।
ওপাশে নিরবতা। কিছুই শুনতে পেলাম না।
– তিথি, আমার কথা শুনতে পারছো?
– হুম।
দাতে দাত চেপে ধরে বলল তিথি।
– ওও, কি করছো? তোমার জ্বর কমেছে?
– হুম।
– কল করেছিলে?
– হুম।
– তোমার কি হয়েছে বলতো? কখন থেকে হুম হুম করছো।
– অনেক কিছু হয়েছে। আমার না এই মুহূর্তে তোর মাথাটা চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে। তাই, তুই এক্ষুনি অফিস থেকে বেরুবি। গাড়ি চড়ে সোজা বাসায় আসবি বুঝলি।
– তিথি, কি আবোলতাবোল বকছো? নিশ্চয়ই তোমার জ্বরের ঘোর এখনো রয়ে গেছে।
আমি হেসে বললাম।
– বাল।
রেগে গিয়ে বলল তিথি।
– আরে এটা কি রকম ভাষা তিথি? এরকম করে কেউ বলে। আমি না তোমার স্বামী।
অবাক হয়ে বললাম তিথিকে।
– তোকে যা করতে বলেছি তুই তাই তাই করবি। তুই এক্ষুনি আমার বাসায় আসবি। না হয় তোর সাথে ব্রেকাপ।
– মানে! স্বামী স্ত্রীর আবার ব্রেকাপ হয় নাকি?
হেসে দিলাম আমি।
– হয়। সেটা জেনে নে তুই। আর ১০ মিনিটের মধ্যে যদি তুই না আসতে পারছিস। তাহলে তোর সাথে তিন ব্রেকাপ। ব্রেকাপ,ব্রেকাপ,ব্রেকাপ।
ফোন কেটে দিলো তিথি।
,
সব মাথার উপর দিয়ে গেলো। কি বলল এসব তিথি? মনে হয় জ্বরের ঘোরে এসব বলছে। কিন্তু, জ্বরের ঘোরে তো এরকম বলার কথা না। জ্বর হলে তো তিথি ভালোভাবেই কথা বলে। শুধু,একটু বাচ্ছা হয়ে যায়। কিন্তু, একটু আগে এটা কি হলো? বাব্বা ১০ মিনিট তো হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। না হয় কি যে হবে? আল্লাহই জানে।
গাড়ি স্টার্ট করে সোজা বাসায় গেলাম। কলিং বেল টিপার কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল সামিরা। কিছু বলতে চাইছিল আমি কিছু বলার সময় না দিয়ে সোজা তিথির রুমে গেলাম। গিয়ে হাপাতে লাগলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ১০ হতে ২/১ বাকি।
তিথির দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললাম,
– ১০ মিনিটের মধ্যেই এসেছি।
তিথি এসে সোজা আক্রমণ করল আমার মাথার উপর। চুলধরে টানতে লাগল। মাথা ঝাঁকাতে লাগল,
– আরে আরে করছো কি তিথি? কি হয়েছে তোমার?
– তুই একটা খারাপ, লুচ্চা, খবিশ।
বলে মারতে লাগল আমাকে।
– মানে, কি করলাম আমি?
– আর একটাও কথা বলেছিস না তোকে আমি খুন করে ফেলল।
রাগে গর গর করতে করতে বলল তিথি।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম।
– কি ভাবিস তুই নিজেকে? অভারস্মার্ট। তুই তো একটা গাধারাম। জানিস সারাদিন ধরে তোর কলের অপেক্ষা করছি আর তুই। মিটিং করা হচ্ছে তাই না। মিটিং! তোকে তো আমি…
আমার দিকে এগিয়ে এলো। বুঝতে পারলাম তিথি অতিরিক্ত রেগে আছে। আমার কাছে আসতেই আমি শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম তিথি। ঠোঁটে আস্তে করে চুমু খেলাম,
– ছাড়,আমাকে। ছাড়, ছাড় বলছি।
– আচ্ছা, আচ্ছা। সরিরে বাবা।
– না, ছাড়। এখন ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে তাই না। ছাড় বলছি…
কেঁদে দিলো তিথি।
আমি জরিয়ে ধরলাম তিথিকে।
– প্লিজ, ক্ষমা করে দাও আমাকে। আমিতো ভেবেছিলাম তুমি ঘুমিয়ে আছো। এমনিতেই তোমার জ্বর তাই আর ফোন করে ঘুম থেকে জাগানো ঠিক হবে না। তাই ফোন করিনি। রাগ করে না প্লিজ লক্ষিটি।
– বুঝি তো। সব বুঝি। একটুও ভালোবাসো না আমাকে।
কান্না করতে করতে বলল।
আমি তিথির চোখের পানি মুছে দিলাম।
– প্লিজ, কেদো না। এই যে কান ধরলাম আর ভুল হবে না।
– কাল কল করলে না কেনো?
– তোমার পড়ায় ডিস্টার্ব হবে। আর তুমিতো বিরক্ত হয়ে যায় আমার ফোনে।
– তোর মাথা।
– আরে আবার কি হলো?
– তুমি কেনো বুঝনা? আমি কি তোমার ফোনে বিরক্ত হই। আমার তো সারাক্ষণ ইচ্ছে করে তোমার সাথে কথা বলতে। সবসময় অপেক্ষায় থাকি কখন তুমি কল করবে।
– ওকে, আমি ভুল করে ফেলেছি। এমন ভুল আর হবে।
– সত্যি তো।
– হুম।
– আচ্ছা, ঐ মেয়েটার সাথে তোমার এতো গায়ে পড়া ভাব কেনো? তোমার ফোন ঐ মেয়েটার কাছে থাকবে কেনো?
ভ্রু কুঁচকে বলল।
– আরে। আমার পি,এ ওও আর ফ্রেন্ডও। আমি মিটিং গেলে ওর কাছেই ফোন রেখে যাই। মিটিংয়ে তো ফোন নেয়া যায় না। তাই বুঝেছো…
– হুম,এখন শুনো। আজ তুমি সারাক্ষণ এখানেই আমার সাথে থাকবে। বুঝলে..
– আর অফিস?
– আমার থেকে তোর অফিস বড়।
– ওকে, ওকে যাচ্ছি না।
এতো দেখি রেগে পুরো ফায়ার। এতো রাগ!। কথায় কথায় রেগে যায়। তিথির কপালে হাত বুলিয়ে দেখলাম। জ্বর কমে গেছে।
– আচ্ছা, তুমি তো সকাল থেকে কিচ্ছু খাওনি। তোমার জন্য কিছু রাধি?
– নাহ, তুমি অসুস্থ। তোমার রাধে লাগবে না।
– আমি এখন পুরো সুস্থ। তাই তোমার কথা আমি শুনছি না। আমি তোমার প্রিয়ে বিরিয়ানি রেডি করছি। ওকে…
– আরে তুমি তো…
তিথি কোনো কথা না শুনে রান্নাঘরে চলে গেলো। এই পিচ্ছিকে নিয়ে আর পারা যায় না।
ফেভারিট বিরিয়ানি দিয়ে জম্পেশ একটা খাওয়া দিলাম। তিথিকে খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাওয়ালাম। যদিও তিথি খেতে চাইছিল না।
,
রাতে তিথি পড়ছে। আমি ওর পাশে বসে আছি। আমি তিথিকে জরিয়ে ধরলাম,
– তিথি!
– হুম।
পড়ার দিকে মনযোগ দিয়ে বলল।
– আচ্ছা, তুমি একদিন বলেছিলে না তোমার একটা বাবু চাই?
– হুম।
– তাহলে, এখন সেটার ব্যবস্থা করে ফেলি।
– হুম।
– কি হুম, হুম করছো? আমার দিকে তাকাও..
তিথির মুখ আমার দিকে করলাম।
– উফ! ডিস্টার্ব করো নাতো। পড়ছি তো..
– আগে, আমার কথা শুনো। তোমার একটা বাবু চাই বলেছিলে না? এখন আমারও ইচ্ছে করছে একটা বাবু হবে আমার।
হাসিমুখে বললাম আমি।
তিথি ভ্রু কুঁচকে বলল,
– তুমি কি বলতে চাইছো?
– আমি বলতে চাইছি, এখন তো তুমি অনেকটাই বড় হয়ে গেছো। একটা মা হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তোমার মধ্যে তা গড়ে উঠেছে। আই মিন তুমি এখন মা হওয়ার জন্য সবদিকে পার্ফেক্ট। তাই…
– অসম্ভব!…
তিথি চোখ বড় বড় করে বলল। আমার মুখ মলিন হয়ে গেলো,
– মানে!
– মানে, আমি এখন বাবু নিতে চাই না। আমি পড়াশোনা করছি এখনো। আমি আমার ক্যারিয়ার গড়তে চাই।
চলবে…….

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *