কিশোরী বউ পর্ব-৫। স্বামী স্ত্রীর অভিমানী ভালবাসার গল্প

কিশোরী বউ সকল পর্ব 

কিশোরী বউ (সিজন ০২)
writer – কাব্য আহমেদ
#part_5

চোখে ঘুম ভর করল। ঘুমিয়েও পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙল। তাকিয়ে দেখি তিথি এখনো ঘুমিয়ে আছে বুকে।
– তিথি..
তিথি কোনো কথা বলল না। নড়াচড়া ও করল না।
– তিথিইই…
– হু
– সকাল হয়ে গেছে উঠে পড়ো।
– না।
ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল।
– না, কি? কলেজে যাবে না।
– না।
ঘুমের ঘোরেই বলল তিথি।
– কেনো?
– আমি ঘুমুব।
– কলেজে যেতে হবে তো। উঠো..
– উফফ, যাবো না বললাম তো। আর আমাকে একটুও বিরক্ত করার চেষ্টা করবে না। আমি ঘুমুব।
– আচ্ছা, তাহলে আমাকে উঠতে দাও। আমি অফিসে যাবো তো…
– না।
– না, কি?
– মাথা মোটা। তোমার বুকে শুয়ে আছি বলেই তো আমার এতো আরামের ঘুম হচ্ছে। তুমি উঠে পড়লে তো আমি আর ঘুমুতে পারব না।
চোখ বন্ধ অবস্থায় বলল তিথি।
– তাহলে, আমার অফিস।
– গোল্লায় যাক। আজ কোনো অফিসে টফিস নেই। আপনাকে অফিসে যেতে হবে না। বুঝলেন..
চোখ খুলল তিথি। আবার বন্ধ করে নিলো।
– আরে বাবা অফিসে তো…
বলার আগেই তিথি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল।
– উউউ, উউ।
হাত দিয়ে তিথির হাত সরিয়ে হাপাতে লাগলাম। মুখ সহ নাকেও ধরে নিয়েছিল। নিঃশ্বাস তো প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল।
– আরে আমার দম বন্ধ করে…
বলার আগেই তিথির ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিলো। বেশকিছুক্ষণ পর ছাড়ল,
– মাফ চাই ভাই, মুখ বন্ধ করে থাকো প্লিজ। আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমুতে দাও।
চোখ বন্ধ করে বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল তিথি। উফফ! এই মেয়েটার জ্বালায় আর পারি না। হঠাৎ করে ওর চোখে এতো ঘুম ভর করল কোত্থেকে কে জানে? আমিও চুপচাপ শুয়ে রইলাম।
,
( তিথি)
জম্পেশ একটা ঘুম হলো। কিন্তু, তাকিয়ে দেখি কাব্য নেই। কখন গেলো। আর গেলই বা কোথায়? ওকে তো অফিস যেতে মানা করেছিলাম। তাহলে…
অফিস ওর কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ। আমার থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। একটা দিনই তো চেয়েছিলাম ওর কাছে। কি এমন চাইলাম? মন খারাপ করে রইল তিথি। কলেজেও তো গেলাম না ওকে কাছে পাওয়ার জন্য। কাব্যের মোবাইলে ফোন করলে রিয়া ফোন পিক করল। তিথি কেটে দিলো। আর ওও…
তিথি ফ্রেশ হয়ে বেরুলো রুম থেকে,
– কিরে তোর ঘুম ভাঙল? ( সামিরা)
– হুম।
– ইশ! তোকে দেখে আমার খুব হিংসে হয় রে?
তিথি ভ্রু কুচকালো,
– কেনো?
– কাব্য ভাইয়ার মতো একটা স্বামী পেয়েছিস। কি রোমান্টিক ভাইয়া? রাতে কেমন আদর করল রে?
ভ্রু নাচিয়ে হেসে প্রশ্ন করল তিথিকে।
– শুনবি।
হেসে উত্তর দিলো তিথি।
– হুম।
খুশি হয়ে বলল তিথি।
– তাহলে, গালটা এদিকে নিয়ে আয়।
সামিরা মুখ এগিয়ে নিতেই তিথি ঠাস করে একটা চড় মেরে গট গট করে চলে গেলো সেখান থেকে। সামিরা বুঝতে পারল না। কিছুই…
গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইল তিথির যাওয়ার দিকে।
তিথি রান্নাঘরে গিয়ে ঠাস ঠাস করে বাসনাদি মাঠিতে ছুড়ে মারতে লাগল। সামিরা কানে হাত চেপে ধরে বসে রইল। তিথি সামিরার সামনে এলো,
– ঐ, ঐ ছেমড়ি। তোর কাছে গান আছে গান। গান বুঝিস তো। পিস্তল আছে পিস্তল…
রেগেমেঘে লাল হয়ে বলল তিথি।
– পিস্তল দিয়ে কি করবি তুই?
– কি করব জানিস? ঐ কাব্য কুত্তাটার মাথায় ঠেকিয়ে শুট করব। তারপর ঐ রিয়া না ফিয়া ঐ মেয়েটার মাথায়।
– আরে কাব্য ভাইয়া আবার কি করলেন?
– কি করেনি? জানিস ওকে বারণ করা সত্ত্বেও ওও অফিসে গিয়েছে। কি এমন চাইছিলাম ওর কাছে? একটা দিনই তো। আজ অফিস না গেলে হতো না ওর।
– সেটা বুঝলাম। হয়তো, অফিসে কোনো দরকারি কাজ ছিল তাই। কিন্তু, রিয়াটা কে? আর ওকে তুই মারবি কেনো?
– আরে কোন কাজ না। ওগুলো শুধু বাহানা। আমার কি মনে হয় জানিস? ঐ রিয়া মেয়েটা আমার কাব্যের উপর যাদু করেছে। আম যখনই ফোন করি কাব্যের ফোনটা ওর হাত থাকে। আর কুত্তাটাকেও বলেছি, ঐ মেয়েটাকে পি,এ থেকে চেঞ্জ করতে। কিন্তু, করে নি কেন জানিস?
– কেনো?
গালে হাত দিয়ে বলল সামিরা।
– আমার মনে হয়, ওদের দুজনার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু একটা চলছে।
– ইউ মিন?
– আমি মিন, রিলেশন।
– পরকীয়া।
– ইইই, চুপপ। একদম চুপ। আর কখনো বলবি না ঐ খারাপ কথাটা। শুনলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়।
– তো, এক কাজ কর। গোয়ান্দাগিরি শুরু করে দে না।
– হুম, সেটাই করব।
– তো যা। অফিসে গিয়ে দেখ। কি করছে ওরা? আমার মনে হয় তুই ভুল ভাবছিস। আসলে কাব্য ভাইয়ার মতো ভালো মানুষ।
মুচকি হেসে বলল সামিরা। রাগী চোখে তাকাল তিথি। যেন চোখ দিয়েই গুলি ছুড়বে,
– তোর সাথেও রিলেশন চলছে ঐ কুত্তার।
– এএ, ছিঃ কি বলিস এসব?
– তাহলে, ওর পক্ষ নিচ্ছিস কেনো?
– আরে আমি তো এমনিই বললাম। কাব্য ভাইয়া তোকে কত ভালোবাসে উনি এরকম খারাপ কাজ করতেই পারে না।
– হুম, তা ঠিক। কিন্তু, যদি কোনোরকমে ঐ শাঁকচুন্নি টা যাদু করে নেয় আমার কাব্যকে।
ঠোঁট ভেঙে বলল তিথি।
– হুম। তাও ঠিক।
দুজনে ভাবুক হয়ে বসে রইল।
,
( আমি)
রিয়া জানাল যে তিথির নাম্বার থেকে একটা কল এসেছিল। কিন্তু, কোন কথা না বলেই কল কেটে দিয়েছে। বউটাকে একা ফেলেই চলে এলাম অফিসে। আসলে আজ একটা কোম্পানির সাথে প্রেজেন্টেশন ছিল তাই…
মোবাইল হাত নিয়ে ভাবলাম কল করব। নাহ, কল করব না। আজ খুব বড় একটা সারপ্রাইজ দিবো পিচ্ছি বউটাকে।
তিথির জন্মদিন কাল।
প্রথম উইশটা আমিই করব। অবশ্য তিথির তো মনে হয় ওর জন্মদিনের কথা মনেই নেই।
থাকবে কি করে? পিচ্ছির আবার মনে থাকা।
অজান্তেই হেসে দিলাম,
– কিরে একা এলা হাসছিস যে? (রিয়া)
– নাহ, এমনি।
– এমনি কেউ হাসে? ব্যাপার কি?
দুষ্টুমি হেসে বলল রিয়া।
আমি চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,
– না, হঠাৎ করেই তিথি কথা মনে পড়ে গেলো। তাই আর কি?
– মিষ্টি একটা বউ পেয়েছিস। যেমন সুন্দর তেমনি তার ভালোবাসা। তাই না?
– তা আর বলতে।
( তিথি)
– দেখেছিস সামিরা, এখনো একটা কলও করেনি। এই বুঝি তার ভালোবাসা?
ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিলো তিথি।
– আরে কাঁদছিস কেনো?
– কি করব বল ? আমি নিজে থেকে কাঁদছি নাকি?
– তো?
– আমার তো এমনি এমনিই কান্না পাচ্ছে।
– এমনি এমনিও কান্না পায় কারোর?
– জানি না। তবে আমার পায়। আচ্ছা, এখন তুই যা তো। আমার ভালো লাগতেছে না।
সারাদিন কাটল। একটা কলও করল না কাব্য। হুহ, বুঝিতো সব বুঝি। আমাকে আর ভালো লাগে না। ঐ শাঁকচুন্নিকেই ভালো লাগে।
আচ্ছা, আমি একটা কল করে দেখি।
কল করবে না করবে না করেও কল করল তিথি। আরে ফোনতো সুইচড অফ।
তাহলে, এই কান্ড! বাহ ভালো তো। একটা ফোনও করল না। আর এখন ফোন বন্ধ করে রেখেছে।
তিথি প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে।
,
( আমি)
ফোন সুইচড অফ করে রেখেছি। জানি, তিথি ফোন করছে। ফোন সুইচড অফ পেয়ে বোধ হয় রাগে কেঁদেও ফেলেছে।
কিন্তু, একটু পরই যে ওর জন্য সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে সেটা কি কখনো ভাবতে পারছে তিথি?
একটা পার্টি এরেঞ্জ করেছি কাল সন্ধায়। আব্বু-আম্মুও জানে তিথি বার্থডে। বাসায়ই করেছি। তিথি নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। এখন একটা হাতে বস আছি। মুচকি হাসছি।
রাত ১২ঃ০০ টা বাজতে চলল। গাড়ি নিয়ে সোজা তিথির বাসার নিচে এসে পড়েছি। গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন করলাম তিথিকে।
,
( তিথি)
সারারাত কান্না করেছে তিথি।
খুব কান্না পেয়েছে ওর।
কারন কাব্য তাকে কল করেনি। মাত্রই একটু একটু চোখ লেগেছে। খুব গাঢ় ঘুম এসে ভর করছে চোখে। একটু ঘুমুল।
তখনই মোবাইলে কল আসল। প্রচন্ড শব্দে জেগে উঠল তিথি। বিরক্তি নিয়ে তাকাল ফোনের দিকে। রিসিভ করল,
– হ্যালো।
– তিথি।
– হ্যা।
– একটু নিচে আসবে প্লিজ।
বলেই ফোন কেটে দিলাম। আসুক না নিচে তারপর না হয়…।
ঘুমে দুলতে দুলতে নিচে আসল তিথি। আমি দেখেই বুঝতে পারলাম তিথি ঘুমিয়ে ছিল। নিচে এসেই বড় করে হাই তুলল,
হাটু গেড়ে ফুলটা এগিয়ে দিলাম তিথির দিকে,
আমি খুব খুশি, কারন তুমি আজ জন্মগ্রহণ করেছিলে। তাইতো আমি তোমাকে আমার বউ হিসেবে পেয়েছি। ধন্যবাদ জানাই সৃষ্টিকর্তাকে। ধন্যবাদ জানাই আমার শশুড় -শাশুড়িকে। বলেই একটু মুচকি হাসলাম। একটু বিরতি নিলাম। তারপর শুরু করলাম,
তোমার জন্মটা বোধ এই বুড়োটার জন্যই হয়েছিল। অনেক তো হয়ে গেছিল বয়স। কিন্তু, বিয়েতে তেমন ইন্টেরেষ্ট ছিল না। কিন্তু, যখনই প্রথম দেখলাম তোমাকে। কেনো জানি? তখনই মনে হয়েছিল। এখনই বিয়ে করে নিই তোমাকে। সত্যি, খুব সৌভাগ্যবান আমি তাইতো পেয়েছি তোমাকে।
পরিশেষে, খুব ভালোবাসি তোমাকে। আই লাভ ইউ তিথি। এন্ড হ্যাপি বার্থডে…
হাসি মুখেই বললাম। তিথি ফুলটা হাতে নিলো। কেকটা বের করে হাতে উপর নিলাম,
– কিছুই বলছো না যে।
– এই কথাগুলো বলার জন্যই ডেকেছিলে।
– হুম।
– ফালতু এসব কথার জন্য তুমি আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে। গেট লস্ট…
বলেই তিথি বাসার দিকে চলে গেলো। আমার হাত থেকে কেকটা পড়ে গেলো।
,
( তিথি)
এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। পরমুহূর্তেই হুড়মুড় করে উঠে বসলাম। সমস্ত ঘুম উদাও হয়ে গেলো।
– একটু আগে এটা কি হয়েছিল? স্বপ্ন নাকি সত্যি।
ভাবতে লাগল তিথি।
– নাহ, বাস্তবই তো ছিল। এই যে হাতে গোলাপ ফুল।
একটাই গোলাপ ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছে কাব্য। কারন, আমি বলেছিলাম আমি অপচয় করা পছন্দ করি না।
তাহলে, বাস্তব ছিল। তিথির যেন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। ফুলটা বুকে আকড়ে ধরল। এতো রাতে কাব্য আমার জন্মদিনের উইশ করতে এসেছে। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি রমণী মনে হচ্ছে।
পরক্ষণেই,
তিথির মুখ মলিন হয়ে গেলো। কাব্য সত্যিই যদি প্রপোজ আর আমার বার্থডে উইশ করে থাকে। তাহলে, আমি এখানে কেনো? রুমে বিছানায় শুয়ে আছি কেনো? আমারতো…
সাথে সাথেই তিথি মনে পড়ল একটু আগের ঘটনার কথা।
ওয়াট!
কি করলাম এটা আমি? তিথি দৌড়ে রুম থেকে বেরুলো। সোজা নিচে গেলো। এতোটা রাবিশ, রাসকেল হলাম কি করে আমি? ভাবতে ভাবতেই নিচে আসল তিথি।
তিথি ভাবল হয়তো, কাব্য নিচেই রয়ে গেছে। কিন্তু, নিচে গিয়েই দেখল কাব্য নিচে নেই। আরেকটু সামনে গিয়ে দেখল গেটের সামনে একটা কেক পড়ে আছে। তিথি বসে পড়ল। কেকটা নোংরা হয়ে গেছে। তবে লেখাটা দেখা যাচ্ছে,
” শুভ জন্মদিন পিচ্ছি বউটা ”
তিথির বুকটা ধক করে উঠল। কাব্য আমাকে জন্মদিন উইশ করতে এসেছিল। কিন্তু, আমি। আমি কি করলাম এটা?
বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে তিথির। প্রচন্ড ঘুমের ঘোরে উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে তিথি। কাব্যকে বিরক্তির স্বরে কথা বলে উপরে উঠে গেছে।
কি করে পারলাম এটা? তিথি ভাবছে। কি করলাম এটা? কাব্যকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম। আমিতো নিজেই তো জানি না কি করে ফেলেছি। নিজের অজান্তেই করে ফেলেছি এটা।
কিন্তু, কাব্য!
কাব্যও চলে গেলো। একটু দাঁড়াতে পারল না।
হু হু করে কেঁদে উঠল তিথি,
– কাব্য, আই এম সরি। কাব্য…
চিৎকার করে উঠল।
– আমি সত্যিই জানি না। কি করে ফেলেছি এটা?
মাঠিতে বসেই কাঁদতে লাগল তিথি।
চলবে……..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *