কিশোরী বউ পর্ব-৬। স্বামী স্ত্রীর অভিমানী ভালবাসার গল্প

কিশোরী বউ সকল পর্ব 

কিশোরী বউ (সিজন ০২)
writer – কাব্য আহমেদ
#part_6

( তিথি)
সবচেয়ে বেশী ঘৃনা হচ্ছে নিজেকে। নিজের পাগলামিগুলোকে এখন নিজেরই অসহ্য লাগছে। এই বাচ্চামি স্বভাবটাকে তিথির অসহ্য লাগছে এই মুহূর্তে। কেকটা হাত নিয়ে চারদিক তাকিয়ে বাসায় ডুকে পড়ল। রুমে গিয়ে ফোন করল কাব্যকে। ফোন সুইচড অফ….। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তিথির।
– কিরে তিথি? কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেনো?
( সামিরা তিথির কাধে হাত দিয়ে বলল)
তিথি হাটু গেড়ে বসে কাঁদছিল। তিথি জরিয়ে ধরল সামিরাকে।
হু হু করে কাঁদতে লাগল,
– সত্যি, আমি এটা নিজের ইচ্ছায় করিনি। (তিথি)
– কি নিজের ইচ্ছায় করিস নি তুই?
অবাক হয়ে প্রশ্ন করল সামিরা। তিথির পিটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল সামিরা।
– সত্যি, আমি ওকে কষ্ট দিতে চাইনি। আমি তো নিজেও জানি না কি করেছি?
– মানে! কি বলছিস এসব?
– আমি কাব্যকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি সামু। ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি অজান্তে।
– মানে, কিভাবে?
তিথি সব ঘটনা খুলে বলল সামিরাকে। সামিরা কিছুক্ষণ বিজ্ঞের মতো চুপ করে রইল,
– তুই শিওওর তো যে কাব্য কষ্ট পেয়েছে?
– জানিস, কতো সুন্দর করে প্রপোজ করেছিল কাব্য। ওর মুখের এক্সপ্রেশন তখন দেখার মতো ছিল। খুব খুশি ছিল কাব্য। আর সেই আমিই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করলাম। এই দেখ কেকটাও রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে।
– হুম।
– কাব্য যদিও কষ্টটা মুখে প্রকাশ না করে কিন্তু মনে কিন্তু ঠিকই কষ্ট পেয়েছে।
তিথি কেঁদেই চলছে।
সামিরা তিথিকে জরিয়ে ধরা অবস্থায় সান্ত্বনা দিতে লাগল।
– আমি কি করে করতে পারলাম এটা সামিরা।
– তুই শান্ত হো। প্লিজ…
– ফোন করেছিলাম। ফোনও সুইচড অফ করে রেখেছে। নিশ্চয়ই খুব আঘাত পেয়েছে মনে।
– আচ্ছা। তুই আর কাঁদিস না প্লিজ। শুয়ে পড়। আর কাল কাব্যের সাথে দেখা কর। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।
– কিন্তু, কাব্য যে কষ্ট পেয়েছে?
সামিরার দিকে অসহায় হয়ে তাকাল তিথি।
– কেনো? ভালোবাসা দিয়ে সেটা ভুলিয়ে দিতে পারবি না।
তিথি জরিয়ে ধরল সামিরাকে।
– ওকে, এখন ঘুমিয়ে পড়।
সামিরা তিথিকে বালিশে শুইয়ে দিল। তারপর কাথা টেনে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
তিথি এপাশ ওপাশ করছে।
অতঃপর ঘুমিয়ে পড়ল অনেক্ষণ পর।
,
( আমি)
খুব কষ্ট হচ্ছে। কখনো সিগারেট খাইনি। বন্ধরা জোর করেও এসব ছাই পাশ খাওয়াতে পারত না। কিন্তু, এখন অনায়াসে সেটা টানছি।
ভেবেছিলাম কি আর হলো কি? যা ভেবেছিলাম ঠিক তার উল্টোটা হয়েছে। ভাবিনি, তিথি এমন আচরণ করবে।
আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তিথির চেঞ্জ হয়ে যাওয়া। সত্যি, তিথির ব্যবহার অদ্ভুদ লাগছে আমার কাছে। কোথাও কি কোনো গণ্ডগোল বা মিসআআন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছে কি? তিথি এক সময় একেক ব্যবহার করছে। কি হচ্ছে এটা?
যেটাই হোক।
তিথিকে অনুভব করতে হবে প্রিয়জনদের খারাপ ব্যবহার কেমন লাগে? প্রিয় মানুষটার বদলে যাওয়াটা কেমন লাগে আমাদের কাছে। প্রিয় মানুষের খারাপ ব্যবহার কতটা আঘাত করে আমাদের মনে।
( সকালে)
একটু দেরোতেই ঘুম ভাঙল তিথির। কারনটা রাতে খুব কেঁদেছিল। ক্লান্ত হয়ে গেছিল। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল আম্মুর কল। কল ব্যাক করল তিথি,
– আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।
– ওয়ালাইকুম আসসালাম, তুই একদম কথা বলবি না আমার সাথে বলে দিচ্ছি। ( মিসেস সাবিনা)
রেগে গেলেন তিথির শাশুড়ি মা।
– কি করেছি আমি? আম্মু।
তিথি কাচুমাচু হয়ে বলল।
ওপাশে নিরবতা। কোনো শব্দ আসল না।
– কোনো দোষ করেছি আমি? প্লিজ, ক্ষমা করেছি আম্মু।
মিসেস সাবিনা মুখ ফুলিয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না।
– প্লিজ, কথা বল না আম্মু। আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ।
কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল তিথি।
– হইছে কাঁদতে হবে না। খুব বড় হয়ে গেছিস না? একবার ও বুড়ি মায়ের কথা মনে পড়ে না। কতদিন দেখি না তোকে। একবারও এখানে আসতে ইচ্ছে করে না তোর।
– ওও, আমি খুব সরি আম্মু। পড়াশোনার জন্যই আসতে পারি না। এতো পড়াশোনা। প্লিজ রাগ করো না তুমি।
– হুম, ফোনে মেসেজ করলাম সেটাও দেখলি না?
– মেসেজ করেছো? ওয়েট ওয়েট। সত্যি আমি খেয়াল করিনি।
ফোন কেটে দিলো তিথি।
মেসেজে অফশনে ডুকল। আম্মুর মেসেজ,
” শুভ জন্মদিন আমার আম্মুটা। আমার পিচ্ছি আম্মুটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলো। দোয়া করি তোর সামনের প্রতিটা দিনই যেনো বেষ্ট হয়। ” রাত ১২ঃ০২_
তিথি কল করল আম্মুকে। কল রিসিভ করতেই তিথি বলতে শুরু করল,
– আই লাভ ইউ আম্মু। লাভ ইউ এ লট। তোমাকে এই মুহুর্তে জরিয়ে ধরে এত্তোগুলো পাপ্পি দিতে ইচ্ছে করছে। সত্যি, তুমি এই পৃথিবীর বেষ্ট শাশুড়ি।
– ঐ, ফাজিল মেয়ে। আমি তোর শাশুড়ি। তোকে না বলেছি…
বলার আগেই থামিয়ে দিলো তিথি।
– সরি, সরি। বেষ্ট আম্মু তুমি।
জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল তিথি।
– জরিয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে?
– হুম।
মন খারাপ করে বলল তিথি।
– তাহলে, চলে আয়।
– মানে!
– মানে, তোর জন্মদিনের অনুষ্টান আয়োজন করা হয়েছে সন্ধ্যায়। কাব্য বলেনি তোকে?
– ওও।
মুখ মলিন করে বলল তিথি।
– আচ্ছা, ওও কোথায়? ( তিথি)
– কে? কাব্য। ওওতো বাসায়ই আছে। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয় প্লিজ। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আমার পিচ্ছি আম্মুটাকে।
– হুম।
হালকা হাসল তিথি।
– আমি কাব্যকে পাঠাচ্ছি। তুই ব্যাগ ট্যাগ ঘুছিয়ে নে। এখানে অনেকদিন থাকতে হবে কিন্তু।
– ওক্কে।
ফোন কাটতেই তিথি ব্যাগ গুছাতে শুরু করল তিথি। সামিরা রুমে ডুকল,
– এই, এই তিথি। এরকম দৌড়াদৌড়ি করছিস কেনো?আর কাপড় ব্যাগে ভরছিস কেনো? কোথাও যাবি নাকি?
– হুম, তুইও গুছিয়ে নে। বাসায় যেতে হবে।
– তো যা। আমি গুছাব কেনো?
অবাক হয়ে বলল সামিরা।
– বাসায় আমার বার্থডে উপলক্ষে অনুষ্টানের আয়োজন করেছে সবাই। বাসায় যেতে হবে। তুইওও চল। আর তুই কি হারামি রে? জন্মদিনের উইশও করলি না?
– আরে সময় পেলাম কই? রাতে তো তোর কাঁদতে কাদতেই অবস্থা নাজেহাল ছিল।
জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল সামিরা।
– বাই দ্যা ওয়ে, শুভ জন্মদিন জানুটা।
– হুহ।
,
( আমি)
বাসার নিচে এসে হর্ণ বাজাতে লাগলাম। তিথি দৌড়ে বেলকনিতে এলো,
– একটু দাড়াও প্লিজ। মাত্র পাচঁ মিনিট।
দৌড়ে আবার রুমে চলে গেলো। ৫মিনিট পর নিচে নামল তিথি আর সামিরা। আমি একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
সামনে বসল তিথি। পিছনের সিটে বসল সামিরা।
– কেমন আছো? সামিরা। (আমি)
– ভালো, আপনি?
– ভালো।
তিথির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। মন খারাপ করে বসে আছে। বেশতো এবার বুঝ মজা।
অবহেলা! খারপ ব্যবহার!
হুহ।
( তিথি)
কত সুন্দর করে সাজলাম ওর জন্য। তাকালও না। বুঝলাম রাতে কষ্ট দিয়েছি। তাই বলে এরকম ব্যবহার করবে। সামিরাকেও তো কত কি জিজ্ঞেস করল? আমার দিকে তো তাকালও না।
– আমি রাতের…
মোবাইল বেজে উঠল। আমি কল রিসিভ করলাম,
– হ্যালো, ম্যানেজার সাহেব।
.
– হ্যা, হ্যা। ওখানেই আছে ফাইলটা।
.
– হ্যা। দেখুন পেয়ে যাবেন।
.
– হ্যা হ্যা।
সারা রাস্তাই কথা বলে আসলাম। তিথিকে কোনো কথা বলারও সুযোগ দিলাম না। তিথির কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু, সেটা বলতেই পারল না।
বলতে দিলে তো বলবে।
,
( তিথি)
ইশ!
রাতের জন্য সরিটাও বলতে পারলাম না। এতো বিজি ওও। একবার তাকালও না। দূর! ভালো লাগছে না কিছু। আম্মুর রুমে বসে আছি,
– কিরে মুখ এমন বানিয়ে রেখেছিস কেনো? মন খারাপ?
বলে মাথায় হাত দিলেন মিসেস সাবিনা।
– না, না। কই?
আমতাআমতা করে বলল তিথি।
– বুঝেছি আমার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। কথা লুকাতে শিখে গেছে।
– তেমন কিছু না আম্মু।
– হইছে। টপিক বাদ। এখন বল তোর পড়াশোনার খবর কি?
– ভালো।
– হুম।
,
সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি ওর। কিন্তু, একবারও সামনে পেলাম না। কোথায় আছে কে জানে?
এতো বিজি। একবার দেখাও করল না। কথাও বলল না। মন খারাপ করে বসে রইল তিথি।
কিন্তু, বাইরে বেরুতেই রেগে গেলো তিথি। আচ্ছা, এই কাজ করা হচ্ছে। মেয়েদের সাথে টাঙ্কি মারা হচ্ছে।
তাইতো, বলি। আমার গুনোধর বর এতো বিজি কি এমন কাজে? আমি এগিয়ে গেলাম। একটা মেয়ের সাথে কথা বলছে খুব হেসে। আর ঐ শাঁকচুন্নিটাও হেসে হেসে গায় ডলে পড়ছে কাব্যের।
আমি আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম। কিন্তু, তাকালই না। সে হাসিখুশিতেই ব্যস্ত।
,
( আমি)
তিথি মুখের এক্সপ্রেশন দেখার মতো। রাগে মনে হয় ফেটে যাবে এমন অবস্থা। বারবার আশেপাশে ঘুরছে। কিন্তু, আমি সেটা দেখেও না দেখার ভান করছি। তিথির তো মনে হচ্ছে মেয়েটাকে গিলেই ফেলবে। আমি আরো হেসে হেসে কথা বলছিলাম।
যেহেতু, তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করা আমার সাধ্য নেই। যদি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার নাই করি। তোমাকে অনুভব করাব কি করে প্রিয় মানুষটা অবহেলা করলে কি রকম অনুভব হয়?
তাই এই পথটাই বেছে নিয়েছি। বেশ ভালো কাজও দিয়েছে।
সন্ধায় হয়ে গেছে। বাসাটা সাজসজ্জায় পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত একবারও কথা হয়নি তিথির সাথে।
সবাইকে ইনভাইট করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজন। তিথির ফ্রেন্ড সার্কেল। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলদের ও।
– শুনো..
পিছনে তাকিয়ে দেখলাম তিথি।
,
সামিরা তাড়াহুড়ো করে হাঠছিল। এমনি কাজেকর্মে সাহায্য করেছিল। সবাই না করার পরও মেয়েটা এটা সেটার খেয়াল রাখছে।
তাড়াহুড়ো করেই হাঠতে গিয়েই কারো সাথে ধাক্কা খেলো।
– আউচ
পড়ে গেলো সামিরা। রাগীমুখে তাকিয়ে দেখল একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে তো গোবর গনেশের মতো। হাদার মতো..
– ঐ, ছেলে। চোখে কম দেখিস। চোখে দেখে হাঠতে পারিস না। উউ বাবা আমার কোমড়টা তো গেলো।
পূর্ব।
ছেলেটার নাম পূর্ব। কাব্যের মামাতো ভাই।
– আরে আপনি এভাবে বকছেন কেনো? আমিতো সরি। দেখিনি…
বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠে বলল পূর্ব।
– আমি সরি দেখিনি।
ভেঙচি দিয়ে বলল তিথি। পূর্ব কথাটাকে কটু করে বলল।
– চোখ নেই তোর হাদা একটা।
– আরে আমিতো…
– চুপ! কর। আর হাতটা এগিয়ে দে। ফেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে।
পূর্ভ ধমক খেয়ে হাত এগিয়ে দিলো। সামিরা হাত ভর দিয়ে উঠল,
– হাদাসাহেব! এটা কি ভুল ছিল নাকি ধাক্কা খাওয়ার ধান্ধা হুম।
পূর্বের গাল টেনে বলল সামিরা।
– আমি, সত্যি দেখে করিনি।
ইনোসেন্ট ফেস করে বলল পূর্ব। আসলেই দেখে মনে হয়না এরকমটা ওও নিজেই করেছে। বোধ হয় ভুল করেই করেছে।
তবুও, বাজিয়ে দেখতে ভালো লাগছে সামিরার।
– চুপ!

ধমক খেয়ে কেপে উঠল পূর্ব। সামিরার খুব হাসি পাচ্ছে। আসলেই এতো পুরো হাদা!
,
চলবে……

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *