ডাক্তার বউ । স্বামী স্ত্রীর অভিমানী ভালোবাসার গল্প

 ডাক্তার বউ

.
চেম্বারে বসে রোগী দেখছে শোভা ।
হঠাৎ করে বাইরে থেকে একটা স্ট্যাফ
এসে বলল ম্যাডাম আপনার সাথে একজন
ভদ্র লোক দেখা করতে এসেছে।
.
উনাকে বসতে বলো,,আর বলো যে
ম্যাডাম এখন ব্যস্ত আছে।(শোভা )
.
উনাকে বলছি ম্যাডাম ব্যস্ত আছে
কিন্তু উনি বললেন যাতে উনার নামটা
আপনাকে জানাই। (স্টাফ)
.
আচ্ছা,,কি নাম উনার?(শোভা )
.
উনিতো বললেন শুভ। (স্টাফ)
.
শুভ!!! শুভ কথাটা শুনেই যেনো শোভা
চমকে উঠলো। এটা কিভাবে সম্ভব?? যে
মানুষটা এতো বছরে একদিনও আসেনি
আজ হঠাৎ কি মনে করে এলো।
ঠিক আছে,,তুমি উনাকে পাঠিয়ে দাও।
(শোভা )
.
ভেতরে এসেই, মা তোমাকে দেখতে
চেয়েছে আর মার শরীরটাও বেশী
ভাল না।(শুভ)
মার শরীর খারাপ,, আগে জানাবা না।
ওকে দাড়াও আমি এই রোগীটা
দেখেই যাচ্ছি।(শোভা )
.
এক সাথে যখন তারা বের হলো
ক্লিনিকের সবাই তাদের দিকে অবাক
দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারন আজ
পর্যন্ত শোভাকে কখনো কোনো ছেলের
সাথে এমন ঘনিষ্ঠতায় কেউ দেখিনি।
ক্লিনিকের সবাই হা করে তাকিয়ে
আছে,তারা জানেই না যে তারা
স্বামী- স্ত্রী আর জানবেই বা কি করে
শুভ এর আগে এখানে কখনোই আসেনি
এবং শোভার সাথে শুভকে তেমন
দেখা যায়নি।
.
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবা-মায়ের জন্য
শুভকে আজকে বিয়ে করতে আসতে
হয়েছে। সারা বিয়ে বাড়ীতে
সকলের মুখেই হাসি শুধুমাত্র শুভ
ছাড়া। বিষন্নমাখা মুখ নিয়েই শুভর
জীবনের প্রথম বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে
গেলো।
বাসর ঘরেই ঢুকতেই শোভা উঠে শুভকে
সালাম করতে গেল কিন্তু সালাম করার
আগেই শুভ শোভাকে আটকিয়ে দিলো
এবং বললো আমি এটার বিরোধী। তুমি
আমাকে সালাম করার অর্থ হলো তুমি
আমার কাছে মাথা নত করলা আর আমার
জানা মতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো
কাছে মাথা নত করা সম্পূর্ণ নিষেধ
এটা বলেই শুভ শোভাকে বিছানায়
বসে দিল। তারপর বললো আমি শুনেছি
তুমি নাকি পড়াশুনায় অনেক ভালো।।
তো, পড়াশুনা বাদ দিয়ে এতো
তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে কেনো?
(শুভ)
.
আপনি তো সবি জানেন আমার বাবা-
মা নেই।চাচার বাসায় মানুষ হয়েছি।
চাচা আমাকে পড়াতে চাইলেও
চাচী তার বিরোধীতা করেন। এরপর
আমি মেডিকেল এ চান্স পেলে চাচা
চাচীকে লুকিয়ে আমাকে
মেডিকেলে ভর্তি করে দেন কিন্তু
তা বেশী দিন চাচীর কাছে গোপন
থাকে না। তারপরও অনেক কষ্টে
পড়াটা চালাচ্চিলাম কিন্তু তীরে
এসে তরীটা শেষমেশ ডুবলই।(শোভা )
.
মেডিকেলের স্টুডেন্ট কথাটা শুনেই
শুভ চমকে উঠলো। ওকে চিন্তা করো
না,তুমি যেহেতু পড়তে চাও, আমি
তোমাকে পড়াব। এখন অনেক রাত হয়ে
গেছে আর আজ সারাদিন অনেক ধকল
গেছে আমাদের উপর। যাও ফ্রেশ হয়ে
আসো।
.
শোভা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে শুভ
ঘুমিয়েছে। শোভা একটু আগেও বাসর
রাত নিয়ে যেসব ভয় করেছিলো তা
এখন শুধুই অবাকে পরিনত হয়েছে। বাসর
রাতে আদৌ কেউ এইভাবে হুট করে
ঘুমায় নাকি এইসব ভাবতে ভাবতে
শোভা শুভর পাশে শুয়ে পড়লো।
.
পরেরদিন শুভ শোভা আবার পড়ার সব
ব্যবস্থা করলো। শুভর মাও সব কিছু
শুনে তিনিও রাজি হয়ে যান। এক
সপ্তাহ পড়েই শোভার ক্লাশ শুরু হবে। এর
মধ্যে শুভ খুব প্রয়োজন ছাড়া শোভার
সাথে কথা কথা বলতো না কিন্তু
শুভর মুখে সব সময়ই প্রসন্নের হাসি
লেগে থাকতো যা শোভাকে অবাক
করতো।
.
তুই মেডিকেলে পড়িছ কই তোর চাচা-
চাচী তো জানায়নি মা। যাই হোক
আমি শুনে অনেক খুঁশি হয়েছি। (শুভর
মা)
.
মা,একটা কথা বলার ছিলো। (শোভা)
.
কি মা,,বলে ফেলো। ( শুভর মা)
শুভ আমার মেডিকেলে পড়ার কথা
শুনে এতো খুঁশি কেনো?(শোভা)
.
তুই যেহেতু শুভর বউ তো সবকিছু
জানা দরকার,,,,,শুভ মুন্নি নামক
একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসত।
মুন্নি শুভর ক্লাশমেট ছিলো।
মুন্নি লেখা- পড়ায় অনেক ভালো
ছিল। শুভ তেমন ভাল ছিল না কিন্তু
শুভর বাবার টাকা থাকায়
মেয়েটা শুভর সাথে মিসতো।শুভ
মুন্নিকে টাকা দিয়ে অনেক
সাহায্য করত। যখন যা লাগতো তাই
দিতো। শুভ মুন্নি কে মন থেকে
ভালোবাসত কিন্তু মুন্নি শুধুই শুভর
টাকাকে ভালোবাসত। এর মধ্যে হঠাৎ
মুন্নি মেডিকেলে চান্স পেয়ে
যায়। মুন্নিদেখতে অনেক সুন্দরি
ছিলো তার উপর মেডিকেলের ছাত্রী
দেশের বড় রাজনৈতিক ব্যক্তির
ছেলের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়।
শুভ শোভাকে অনেক অনুরোধ করেছিল
যাতে তাকে না ছেড়ে যায় কিন্তু
মুন্নি তার কোনো কথাই শুনেনি বরং
তাকে অনেক অপমান করেছিল আর
বলেছিলো ডাক্তার মেয়ে তোমার
জন্য না তুমি তোমার লেভেলের
কাউকে খুঁজে নিও।
শুভ মুন্নির ধোঁকা কিছুতেই মেনে
নিতে পারেনি। তারপর আস্তে আস্তে
শুভ স্বাভাবিক হতে থাকে। তারপর
ওকে বিয়ের কথা বললেই ও এড়িয়ে
যেত কারন ও মুন্নিকে কিছুতেই
ভুলতে পারতো না, শুভর
ভালোবাসা তো আর মিথ্যা ছিলো
না।(শুভর মা)
.
শোভার চোখে এতক্ষনে পানি এসে
গেছে। যতই হোক বাঙ্গালী নারীতো
স্বামী অন্য মেয়েকে ভালোবাসে
এটা শুনলে যে কারোই কষ্ট হবে।
.
জানি তো শুনে তোর অনেক খারাপ
লাগছে কিন্তু আমার তোর উপর পুরা
বিশ্বাস আছে তুই আবার পুরানো
শুভকে ফিরিয়ে দিতে পারবি। ওর
জীবনে ঘৃণার অবসান ঘটিয়ে আবার
ভালোবাসার ফুল ফুটাতে পারবি, কি
পারবি না মা।(শুভর মা)
.
শোভা তাৎক্ষণিক ভাবে চোঁখের
পানি মুছতে মুছতে একটা হাসি দিয়ে
বলে আমাকে যে পারতেই হবে মা।
.
শুভ শোভাকে হোস্টেলে ভর্তি করে
দিল। যদিও শোভার কোনো
ছিলো না। যাওয়ার সময় শোভা
বারবার শুভর দিকে করুন দৃষ্টিতে
তাকাচ্ছিলো যদি একবার বলতো
তোমার যাওয়া লাগবে না,তুমি এখান
থেকেই পড়ো।
.
শুভ শোভাকে হোস্টেলে রেখে
আসে। শুভ শোভা প্রয়োজনীয় খরচ
এবং জিনিস পাঠে দিত কিন্তু কখনোই
দেখা করতে যেত না। শোভা
অভিমানে শুভর সাথে কোনো
যোগাযোগ করতো না।শোভা শুধু দুই ঈদে
বাসায় যেত। প্রথমে ভেবেছিল
চাচার বাসায় যাবে সেখানে গিয়ে
চাচাকে জানাবে যে সে আবার
পড়া শুরু করেছে। কিন্তু সেখানে যে
তার জন্য আর একটা চমক অপেক্ষা
করেছিলো না গেলে সে বুজতেই
পারতো না। গেট খোলা ছিল তাই
সোজা চাচার রুমে যেতেই সে কিছু
একটা শুনতে পেল।
.
এই তুমি এতো টাকা কোথায় থেকে
পেলে? (শোভার চাচী)
এগুলা শোভার বাবার টাকা। ভাই
মারা যাওয়ার আগে ব্যাংকে শোভার
জন্য অনেক টাকা রেখেগিয়েছিল। আর
শোভা বড় হলে ওকে এই টাকা দিয়ে
ডাক্তারি পড়াস আর ভালো একটা
ছেলে দেখে ওরে বিয়ে দিস,, ওর
কোনো অভাব দিস না। তাইতো ওর
পিছে এতো টাকা খরচ করেছিলাম
যাতে সব টাকা ব্যাংক এর না হয়ে
যায়। ভাইয়া উইল করে গেছিলো যদি
শোভা ডাক্তারি না পড়ে তাইলে সব
টাকা ব্যাংকের হয়ে যাবে।( শোভার
চাচা)
বলো কি? তুমি আমাকে আগে বলবা
না? (শোভার চাচী)
তুমি যেমন তোমার পেটে তো কোনো
কথাই আটকে না তোমাকে বলি আর
তুমি মুখ ফসকে ওরে বলে দাও।(শোভার
চাচা)
নিজের চাচার এই রকম রূপ দেখে শোভা
যেন নিজের চোঁখ- কান কেই বিশ্বাস
করতে পারছিলো না। কিভাবে সম্ভব?
আপন চাচা হয়ে টাকার জন্য এমন অভিনয়
করতে পারলো। শোভা সাথে সাথে
ওখান থেকে চলে আসলো। যে টাকার
জন্য এমন নিচে নামতে পারে সে
নিশ্চয়ই টাকার জন্য তার ক্ষতি করতেও
দ্বিধা করবে না। তাই শোভা
সেদিনের পর থেকে চাচা-চাচীর
সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে
দিয়েছিল।
.
আজ ৩ বছর পর শুভ শোভাকে নিতে
এসেছে কারন শোভার আজ পরিপূর্ণ
ভাবে ডাক্তার হতে পেরেছে। এইসব
ভাবতে ভাবতে কখন বাসায় পৌঁছে
গেছে শোভা বুঝতেই পারিনি।শুভর ডাকে শোভা বাস্তবে ফেরে।
.
আজ সকাল থেকেই শুভ শোভার সাথে
কথা বলার সুযোগ খুঁজছে আর শোভা
শুভকে এড়িয়ে যাচ্ছে। কারন শোভা
জানে আজ শুভ তাকে কি বলবে আর
শুভ যে তাকে ভালোবেসে
ফেলেছে এটাও সে বুঝতে পেরেছে।
যখন শোভা হোস্টেল থেকে আসতো
শুভ কথা বলার অনেক চেস্টা করতো
কিন্তু বলতে পারতো না। শোভা তখন
আরো রেগে যেত কারন নিজের বউয়ের
সাথে কথা বলতেও কেউ সংকোচ করে
নাকি।
.
রাতে খাওয়ার পর শুভ রুমে যেয়ে
দেখে শোভা ঘুমিয়ে গেছে।শুভ
ইচ্ছা করেই লাইট জ্বালালো কারন
শোভার লাইট সহ্য হয় না। জ্বালালেই
জেগে যায়!শুভ আবিস্কার করলো যে
৫ মিনিট হয়ে গেল তবুও শোভা ঘুম
ভাংলো না তার মানে শোভা
জেগেই আছে। শুভ শোভার কপালে
একটা চুমা দিতেই শোভা চোখ খুলতে
ধরলেই শুভ বললো আগেই চোখ খুলো
না, আমি কথাটা শেষ করি তারপর
খুলো।
আমি কখনোই ভাবিনি যে আমি একটা
ডাক্তার বউ পাবো। আর যখন শুনলাম তুমি
মেডিকেলে পড়ো আমি তো খুশিতে
আত্ন হারা হয়ে গেছিলাম। তোমার
যাতে পড়ার ক্ষতি না হয় তাই
হোস্টেলে পাঠাইছি। তুমি চলে
যাওয়ার পর খুব শুণ্য শুণ্য লাগছিলো এবং
মনের অজান্তেই তোমাকে
ভালোবেসেছিলাম। (শুভ)
ভালো যখন বেসেই ছিলে আগে
বলোনি কেনো? (শোভা )
আমি চাইনি তুমি পড়াশুনা ছাড়া
মাথায় অন্য কিছু আনো। আমি তখন
ভালোবাসার কথা বললে হয়তো তুমি
পড়াতে মন বসায়েই চাইতা না এবং
বাসায় আসতে চাইতা যা আমি কখনোই
চাইনি।(শুভ)
তাই বলে এতো কষ্ট দিবা?(শোভা )
কষ্ট না দিলে তুমি আজ এই জায়গায়
আসতে পারতা বলো?? আর আমি
ডাক্তার বউ পেতাম বলো?(শুভ)
হুম,,পঁচা কোথাকার। (শোভা )
যাই হোক আজ থেকে আমাদের নতুন
জীবন শুরু। তুমি শুধুই আমার আর আমি শুধুই
তোমার এই বলেই শুভ শোভাকে তার
বুকের উপর টানে নিল আর অন্য হাতে
লাইট অফ করে দিল। বাকীটা
নেটওয়ার্ক চলে যাওয়ায় সম্প্রচার করা
সম্ভব হচ্ছে না।
.
সকালে নাস্তা করতে করতে শুভ হঠাৎ
টিভিটা অন করলো সাথে সাথেই
ব্রেকিং নিউজ দেখতে পেল ধর্ষনের
মামলায় মন্ত্রীর ছেলে গ্রেফতার। আর
একটু ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখতে
পেল আরে হ্যা এতো মুন্নির স্বামী।
মনের অজান্তেই এক প্রসন্নতা অনুভব
করলো শুভ। টাকার লোভে যে
বিশ্বাসঘাটকতা করেছিল তার শাস্তি
আজ পেল মুন্নি। এতোদিন পানিতে
ভেজা ছিল শুভর চোঁখ এখন বাকী
জীবনটাই ভেজা থাকবে মুন্নির
চোঁখ। কারন না পারবে এটা মেনে
নিতে না পারবে ওকে ছেড়ে দিতে।
দুনিয়ার ধার দুনিয়াতেই শোধ হয়। অদ্ভুত
খেলার অদ্ভুত নিয়ম।

(সমাপ্ত)

গল্প

অচেনা সেই মেয়েটি । রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *