তোকে চাই। পার্ট_১৮ স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প

#তোকে চাই❤
#writer: রোদেলা❤
#part: 18♥

তোকে চাই সকল পর্ব

বিছানায় বসে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছি,,,বিরক্তিভাবটা মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে,, আমার বিরক্তির প্রধান এবং একমাত্র কারণ হলো শুভ্র।।সে পুরো ঘরে কার্পেট বিছাতে ব্যস্ত।।তার চিন্তার বিষয় হলো যদি আমি পা পিছলে পড়ে যাই।।মাত্র ১০ দিন হলো আমি জানতে পেরেছি আমি কনসিভ করেছি আর এর মধ্যেই উনি সারা বাড়িতে কার্পেট বিছাতে শুরু করে দিয়েছেন,,,উনার ভাব দেখে মনে হচ্ছে দুনিয়াতে একমাত্র উনার বউই বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে,,,আর সবার বাচ্চা তো আকাশ থেকে টুপটুপ করে পড়ছে,,বিরক্তিকর।।। আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো,,মামু উনাকে অলরেডি তিনবার ডেকে গেছেন যে অফিসে ইম্পোর্টেন্ট মিটিং আছে,,বাট উনার এককথা তিনি অফিস যাবেন না।।ডেলিভারি হওয়ার আগে ঘর ছেড়েই বেরুবেন না,,,কথাটা শুনেই মেজাজটা চড়া হয়ে গেলো,,,এখনো একমাস ও হলো না আর মহাশয় সব কাজ বাদ দিয়ে ডেলিভারির চিন্তা করছে,,,ভাবা যায় এগুলো??রাগে আমার রীতিমতো মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে ,,, বাড়ির সবাই কি ভাববে??ছিহ,,,আপুও তো প্রেগনেন্ট তবু তো ভাইয়া একা হাতে সব সামলাচ্ছেন নাকি,,,আর এক উনাকে দেখো!!”উফফফ,,ইচ্ছা করছে উনাকে উষ্ঠা মেরে উগান্ডা পাঠিয়ে দিই,,যত্তোসব।।।

এই যে মিষ্টার???

হুম,,বলো

বলো মানে??এদিকে আসুন,,(রাগী গলায়)

আমি বিজি আছি বলো শুনছি,,,(কার্পেট মোড়াতে মোড়াতে)

আপনার কাজের গোষ্ঠী কিলাই,,,,এদিকে আসুন বলছি,,(চিৎকার করে)

কি হয়ছে??সমস্যা টা কি??(ভ্রু কুচঁকে)চেচাঁচ্ছো কেন??

চেচাচ্ছি কি সাধে??আপনি অফিস যাবেন না??

না,,,

কেন??

তোমাকে রেখে যাবো না,,,

তাহলে চলুন আমিও আপনার সাথে যাই(দাঁতে দাঁত চেপে)

উনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন,,,,”তুমি কি রেগে আছো??”

উনার কথাটা শুনে মেজাজটা আরো খারাপ হয়ে গেলো,,মহাশয় এতোক্ষণে বুঝতে পারছে যে আমি রেগে আছি,,,,”নাহ,,রাগবো কেন??খুশিতে নাচানাচি করছি দেখছেন না???”

আরে বাবা,,হয়েছেটা কি সেটা তো বলবে,,

কি হয়েছে মানে??আপনি অফিস যাচ্ছেন না কেন??আপনার কি মনে হয়??আমিই পৃথিবীতে ফাস্ট কনসিভ করেছি নাকি??আজিব…আপুর ৮ মাস চলছে,,তবু ভাইয়াকে দেখছেন ঘরে বসে থাকতে??(ঝাঁঝালো গলায়)

বউ মনি আর তুমি এক হলা??তোমাদের বয়সের ডিফারেন্স তিন তিনটা বছর।।ও তোমার থেকে যথেষ্ট স্ট্রং,,,তাই ভাইয়ার টেনশনও কম,,,

আপনি বলতে চাইছেন আমি স্ট্রং গার্ল নই??(ভ্রু কুচঁকে রাগী গলায়)

আ,,আ নাহ,,,আমি বলছি যে,,,

হ্যা কি বলছেন তাই শুনতে চাইছি,,,,(দাঁতে দাঁত চেপে)

ত,,তুমি অনেক স্ট্রং বাট আমি একদম স্ট্রং নই,,,তোমাকে এখানে রেখে গেলে আমি টেনশনেই মরে যাবো,,,

ফাউল কথা বাদ দিয়ে চলুন ফটাফট রেডি হয়ে নিন,,,,ডায়নিং এ যাবো তারপর আপনি সোজা অফিসে,,,,ওকে??

নট ওকে,,,আমি অফিস যাবো না ব্যস।। এখন চলো খাওয়া কমপ্লিট করে আসি।।

তাহলে আমিও খাবো না,,,ব্যস

রোদ,,,,ওলওয়েজ তোমার এসব জেদ ভালো লাগে না(রাগী গলায়)

আমি খাবো না মানে খাবো না,,,,

ওকে ফাইন,,,যাবো অফিসে এখন উঠো,,,(দাঁতে দাঁত চেপে)

সত্যি,,,উফফ আপনি কতো ভালো,,

হুমমম,,,আই নো আমি ভালো,,,

কথাটা বলেই উনি আমার গালে ঠোঁট ছুয়ালেন৷।। আর আমি রাগী চোখে তাকালাম,,,

কি হলো??এভাবে তাকাচ্ছো কেন??(ভ্রু কুচঁকে)

আপনার রিয়েকশন কপি করছিলাম,,,(একগাল হেসে)

আমার রিয়েকশন??

হুমম,,,আগে আমি আপনাকে কিস করলে এমন রিয়েকশনই তো দিতেন,,,,

ওহ তাই??তাহলে এখন একটা দিয়ে দেখো,,,দারুন রিয়েকশন দিবো বেবি,,,(চোখ টিপে)

ধেৎ চলুন তো,,,ক্ষুধা লাগছে,,,(ঠোঁট উল্টে)

ওকে,,,,চলুন মহারানী।।(মুচকি হেসে)

খাবার টেবিলে বসে আছি,,,সবাই খাচ্ছে বাট আমি খেতে পারছি না।।তার কারণ হলো আমার ব্যাপক হাসি পাচ্ছে,,,কিন্তু এমন নিসিদ্ধ জায়গায় হাসা যাবে না তাই হাসি চাপার চেষ্টায় আছি।।আমার হাসির মূল উৎস হলো অভ্র ভাইয়া।।আপুর ডেলিভারি ডেট যতো এগিয়ে আসছে ততোই উনার চুখেমুখে একটা অসহায় অসহায় ভাব ফুটে উঠছে,,,এই মুহূর্তে উনি ঠিক নীরিহ বিড়াল ছানার মতো আপুর দিক তাকিয়ে আছেন,,,উনারই যদি এই অবস্থা হয়,,,তাহলে আমার শুভ্রর যে কি হবে???আল্লাহই জানে,,,আপু খাওয়ার মাঝপথে একটু নড়েচড়ে বসতেই ভাইয়া যেনো চমকে উঠলেন,,,,কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলতে শুরু করলেন,,,ঠিক আছো??পেট ব্যাথা করছে??খেতে সমস্যা হচ্ছে??বমি পাচ্ছে,,,,এমন হাজারো প্রশ্নের স্তুপ।। আর আপু বিরক্তি নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছেন।।আপুর চাহনি দেখেই বুঝা যাচ্ছে উনি এই কাজটা ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার করে ফেলেছেন।।ব্যাপারটা আমি বেশ ইনজয় করছি,,,,শান্তি শান্তিও লাগছে,,, বাহ,,,আমার মতো আপুও দেখি “অতি ভালোবাসা” নামক প্যারায় আক্রান্ত যদিও শুভ্ররটা একটু বাড়াবাড়ি।।আমার আরো হাসি পেলো যখন মামু বললো,,,”অভ্র,শুভ্র,,লেটস গো বয়েজ।।” কথাটা শুনার সাথে সাথেই দুজনের মুখেই রাজ্যের অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো।।অভ্র ভাইয়া আপুর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,,আর আপু নির্বিকার ভঙ্গিতে খেয়ে চলেছে।।শুভ্রর দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে ও আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে,,কিন্তু আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আপু আর ভাইয়ার কান্ড দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।।।ওদের দুজনের উঠার নাম গন্ধ না দেখে মামুও অসহায় চোখে মামানির দিকে তাকালেন,,,যার অর্থ এই,,,”তোমার ছেলেরা বউ পাগলা হয়ে গেছে এদের কিছু করো,,,এই বুড়ো বয়সে একা অফিস করতে পারবো না আমি।।” কিন্তু মামুর এই অসহায় দৃষ্টি মামানির কাছে কোনো পাত্তা পেল বলে মনে হচ্ছে না।।।উনি খুব মনোযোগ দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চলেছেন।।।এদের অবস্থা দেখে আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো,,, গড়াগড়ি দিয়ে হাসি বাট উপায় নেই দেখে চেপে গেলাম।।।অবশেষে তিনজনই অফিসের জন্য পা বাড়ালান,,,আলহামদুলিল্লাহ।।।


বিছানায় হেলান দিয়ে বসে বেবির কথা ভাবছি।।মাত্র ১০ মাসে আমার লাইফটা কতোটা বদলে গিয়েছে ভাবতেই অবাক লাগে,,,১০ টা মাস আগেও,,,রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে পুরো বাসায় মাথায় করে ফেলতাম,,,সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে,,বাবা-মার মাঝখানে গিয়ে বসে থাকতাম,,আর এখন??আমার নিজেরই এমন একটা পুচকু হবে,,, ইসস ভাবা যায়??কার মতো হবে ও??আমার মতো??বাপরে তাহলে নিশ্চয় হার জ্বালিয়ে খাবে,,,তারচেয়ে বরং উনার মতো হওয়ায় ভালো,,,একদম শান্ত শিষ্ট।।।দরজায় শব্দ হওয়ায় ফিরে তাকালাম,,,উনি ফিরেছেন,,,ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত এগারোটা বাজে।।সারাটা দিনে উনি যে কতোবার কল করেছেন তার ইয়াত্তা নেই।।উনাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে খুব টায়ার্ড,,আমাকে দেখেই শুকনো হাসি দিয়ে কপালে ঠোঁট ছুইয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেন।।।আমার চোখদুটো ওয়াশরুমের দরজায় স্থির,, কখন বেরুবেন আর আমি দেখবো,,সারাটাদিন খুব মিস করেছি উনাকে।।কিছুক্ষণ পরই উনি বেরিয়ে এলেন,,,ব্লু টিশার্ট আর এ্যাশ কালারের থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট পড়েছেন উনি।।উনার পায়ের লোমগুলো মারাত্মক লাগছে।।এলোমেলো চুল আর হাজারো ক্লান্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন,,,আমি হাতের ইশারায় উনাকে কাছে ডাকলাম আর উনিও বাচ্চাদের মতো হেলেদুলে আমার কাছে এসে বসলেন,,,

কি??(ভ্রু নাচিয়ে)

আমি সোজা হয়ে বসে,,আমার কোল ইশারা করে বললাম,,”শোয়ে পড়ুন।”উনি অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে শুয়ে পড়লেন,,কোলে মাথা রেখেই দু’হাতে কোমর জরিয়ে ধরে পেটে ঠোঁট রেখেই বলে উঠলেন,,,

প্রিন্সেস??মাম্মামকে একদম ব্যাথা দিবে না।।ইউ নো না??গুড গার্লরা কখনো কাউকে হার্ট করে না।।আর মাম্মামকে তো কখনোই না।।এন্ড আই নো,,মাই প্রিন্সেস ইজ আ গুড গার্ল রাইট???সো বি কুয়াইট,,,আদারওয়াইজ,,,বাবাই তোমাকে একদম কোলে নিবে না,, আর আদরও করবে না,,গট ইট???

আপনি এতো সিউরিটির সাথে কিভাবে বলছেন ও মেয়ে?? ছেলেও তো হতে পারে,,

না মেয়েই হবে,,,,

বাহবা,, এতো কনফিডেন্স??

হুমম,,,একদম তোমার মতো কিউট হবে দেখো,,,

নাহ,, আপনার মতো হবে,, অনেক সুন্দর।।।

উহুম,,,বেবির সুন্দর হওয়াটা ইম্পর্টেন্ট না,,,কিউট হওয়াটাই বেশি ইম্পোর্টেন্ট,,,

পার্থক্য কি হলো??(ভ্রু কুচঁকে)

পার্থক্য আছে রোদপাখি,,আছে।।অনেককে দেখবে সুন্দর হলেও তাদের জন্য কিউট ওয়ার্ডটা সুইটেবল মনে হয় না,,,আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখবে তেমন সুন্দর না হলেও দেখেই বলতে ইচ্ছে করে,,বাহ খুব কিউট তো।।বুঝতে পারছো ডিসটেন্স টা??(নাক টেনে)

হুমম বুঝলাম,,,এবার আপনি ঘুমোন তো,,,,

আমার কথায় উনি মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে নিলেন,,,আমি উনার চুলে হাত বুলিয়ে চলেছি,,,চোখ বন্ধ করা অবস্থায়ও উনাকে কি সুন্দর লাগছে,,,ইসস কি সুন্দর করে ঘুমাতে পারেন উনি,,,ভাবতে ভাবতেই উনার চোখে ঠোঁট ছুইয়ে দিলাম,,আর সাথে সাথেই উনি চোখ মেলে তাকালেন,,,



ছি রোদ,,তুমি আমার ঘুমিয়ে থাকার সুযোগ নিচ্ছো??তুমি আমার ভার্জিনিটি নষ্ট করে দিলা রোদ??এখন আমার কি হবে??

চুপপপ,,,,ভার্জিনিটি না ছাই,,,,আপনার ভার্জিনিটি বিয়ের আগেই খতম,,সো এখন নেকামু কমিয়ে করেন,,,

ছি,,,রোদবালিকা এসব কি বলছো??আমি হলাম ইনোসেন্ট বয়,,,আর তুমি এমন অপবাদ দিচ্ছো???জীবনে মেয়েদের দিকে চোখ তোলে তাকালাম না,, আর তুমি আমাকে বানিয়ে দিলে চরিত্রহীন,,,,হাউ কোড ইউ রোদবালিকা,,,হাউ কোড ইউ??

এহহহ,,,মেয়েদের দিকে তাকায় দেখে নি,,মিথ্যুক।।রুমু আপুর বিয়েতে গেস্ট রুমে কি করছিলেন শুনি??তসবি পড়ছিলেন বুঝি??(রাগী গলায়)

ক,,,কবে??

মাথায় বাড়ি দিলেই সব মনে পড়ে যাবে,,,,দিবো বাড়ি??

আরে আরে,,,ওটা তো,,,কন,,কনভারসেশন ছিলো,,,এট’স কল্ড রোমান্টিক কনভারসেশন।।।লিপস টু লিপস(চোখ টিপে,,বাঁকা হাসি দিয়ে)

বাহ অসাধারন,,,,এতো কনভারসেশনের পরও আপনি ভার্জিন ছিলেন??(ভ্রু কুচঁকে)আর আমি টাচ করতেই সব শেষ??বাচ্চার বাবা হয়ে যাচ্ছে আর এতোদিনে আসছে ভার্জিনিটি বাঁচাতে হুহ।।।

ভ্রু কুঁচকাবে না তো,,,কতোদিন বলা লাগে???

কেন কি সমস্যা??(ভ্রু কুচঁকে)

উফফ আবার??ভ্রু কুচঁকালে তোমায় এত্তো কিউট লাগে ইচ্ছে করে,,কামড়ে কুমড়ে খেয়ে ফেলি।।

উনার কথায় আবারো ভ্রু কুচকে তাকালাম আর উনি হুহা করে ঘর কাঁপিয়ে হাসতে লাগলেন,,,


গাড়িতে বসে আছি,,,শুভ্র ভ্রু কুচঁকে তাকিয়ে আছে,,কপালে চিন্তার ভাজ,,,দৃষ্টি স্থির।।আর আমি একমনে আইসক্রিম খেয়ে চলেছি।।হঠাৎ করেই উনি বলে উঠলেন,,,

রোদ??অবোরশন করে ফেলো,,,

উনার কথায় আমি থমকে গেলাম,,,মাথাটা যেনো ফাঁকা হয়ে আসছে,,,

শুভ্র??(চিৎকার করে)আপনি পাগল হয়ে গেছেন??বাবা হয়ে নিজের বাচ্চাকে মেরে ফেলতে চাইছেন??

আই হেব নো আদার চয়েজ,,,,,তুমিই যদি না থাকো তো ওই বাচ্চাকে দিয়ে আমি কি করবো??ইউ হেব টু ডু ইট।।।সব ঠিক করে রেখেছি,,এবার তুমি গেলেই হয়ে গেলো,,লেটস গো।।

নো,,,শুভ্র,,আই কান্ট ডু দিস,,,আমার বেবি,,

চলো রোদ,,,

নো শুভ্র,,প্লিজ আপনার পায়ে পড়ি,,,এমনটা করবেন না,,,প্লিজ।।(পিছাতে পিছাতে)

কাম রোদ,,অযথা জেদ করো না,,,চলো,,,

নো,,, নো,,,কাছে আসবেন না,,,একদম কাছে আসবেন না,,,প্লিজজ না।।

উনি গাড়ি থেকে বের হয়ে আমাকে কোলে তোলে নিয়ে হসপিটালের পথে হাঁটা দিলেন,,,,আমি ছুটাছুটি করছি ক্রমাগত,,,

না না ননননননা,,,,,(চিৎকার করে)

ধরফর করে উঠে বসলাম,,,শরীর ঘেমে একাকার।।চারদিকে অন্ধকার,,আফসা আলোই মনে হচ্ছে এ যেনো এক আজব পুরী।।।চারদিকে উত পেতে আছে,,,ভয়ঙ্কর সব জীব।।।ক্রমাগত শ্বাস নিচ্ছি,, মনের মধ্যে বাচ্চা হারানোর তীব্র যন্ত্রনায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।।ঠিক এই সময় লাইট জ্বলে উঠলো,,,

রোদ??কি হয়েছে??ঠিক আছো তুমি??খারাপ স্বপ্ন দেখেছো নাকি শরীর খারাপ লাগছে??কি হয়েছে??

কা,,কাছে আসবেন না,,,দ,,দূরে যান,,, দূরে যান বলছি।।।(হাত দিয়ে ধাক্কিয়ে)

কি বলছো এসব??এমন করছো কেন??কি হয়েছে সোনা??বলো আমায়?

আ,,আমার বাবু,,,(কান্না ভেজা কন্ঠে)

কি হয়েছে আমার প্রিন্সেসের,,,,

আ,, আমি,,আ,,,মি

তুমি কি বলো??

আমি অবোরশন করবো না,,,প্লিজজ

কি বলছো এসব??অবোরশন করবে কেনো??এসব ফালতু কথা কেনো ভাবছো তুমি??

আমি করুন চোখে উনার দিকে তাকালাম,,এতোক্ষণে বুঝতে পারছি আমি স্বপ্ন দেখছিলাম,,,ভয়ানক দুঃস্বপ্ন।। এবার আমি উনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম,,,শরীর ক্রমাগত কাঁপছে,,,উনিও আলতো হাতে জড়িয়ে নিলেন আমায়,,উনার হাতের স্পর্শে ফুফিয়ে উঠলাম আমি,,,,এতোক্ষণ কতো অসহায় লাগছিলো নিজেকে,,এখন মনে হচ্ছে সব পেয়ে গেছি,,সব।।

কি হয়েছে রোদপাখি??বলো আমায়??

আমি উনাকে সবটা বললাম,,উনি আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন নিজের সাথে,,,

চুপ,,,চুপ করো,,শান্ত হও,,,তোমার মনে হয় আমি এমন করবো??ও আমার বেবি,,,মাই প্রিন্সেস,,নিজের বাবুকে মারবো এতোটা খারাপ নিশ্চয় আমি নই,,,বলো?

আমি চুপচাপ উনার কথা শুনছি।।যেনো হাজারো ভয় থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছি,,,স্বপ্নের শুভ্র আর এই শুভ্রের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য,,,এই শুভ্রর বুকে আমি নিরাপদ,,,সাথে আমার বাচ্চাও,,,,

পাগলী,,,আমি থাকতে আমাদের বেবির কিচ্ছু হবে না,,,শী ইজ অলসো ইম্পোর্টেন্ট ফর মি,,,আমি বেবি চাইনি তার মানে এই নয় যে ওকে মেরে ফেলবো,,,ও আমার অস্তিত্ব।।জীবন দিয়ে রক্ষা করবো ওকে,,,কিচ্ছু হবে না ওর,,,,রোদবালিকা??

আমি চোখ মেলে তাকাতেই বলে উঠলেন,,,”ভাবছি একটা দু’নলা বন্দুক কিনবো,,,,আমার প্রিন্সেসকে যখন স্কুলে দিবো,,ছেলেরা ডিস্টার্ব তো করবেই,,,ওদের জন্য এক্সট্রা প্রোটেকশন কি বলো??

উনার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়েই হেসে দিলাম,,,উনিও একগাল হেসে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন আমায়,,,,আহ,,কি শান্তি।।মেয়েদের জান্নাতটা হয়তো স্বামীর বুকেই আল্লাহ নিজ হাতে তৈরি করে দিয়েছেন।।।


রান্না করতে আমার বেশ ভালো লাগে,,,ইভেন এটা আমার প্যাশনও বলা যায়,,তবে অবিয়েসলি সব সময়ের জন্য নয়,,,মাঝে মাঝে।।আর আজকে আমার এই প্যাশনটাকে বের করে আনার একটা স্কোপও পেয়ে গেলাম।।রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে আছি,,উদ্দেশ্য সবার জন্য ডিনার তৈরি করা,,বিয়ে হওয়ার পর রান্না করার সৌভাগ্য আমার হয়ে উঠে নি,,মামানি আর আরিফ চাচার জন্য কোনো কিছু টাচই করতে পারি নি।।তাদের ব্যবহার দেখে মনে হয় আমি এখনো বাচ্চাটি,,কিছু ধরতে গেলেই হাতে ব্যাথা পেয়ে যাবো।।আর কনসিভ করার পর শুভ্রর জন্য কিচেনে আসাটাই আমার জন্য দিবাস্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে।।তবে আজ ব্যাপারটা ভিন্ন।।বাড়িতে একটা কাজের লোকও নেই সবাই ছুটিতে আছে,,আর আপুর তো ৮ মাস চলছে,,,এই অবস্থায় ও রান্না করবে আর আমি বসেবসে খাবো তাও মেনে নেওয়া যায় না।।।কাল রাত থেকে মামানির প্যাশারটাও ফল করছে সো এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেস্ট অপশন হলাম আমি।।যেভাবেই হোক শুভ্র ফিরে আসার আগে রান্না কমপ্লিট করতে হবে,,,নয়তো কি হবে কে জানে??মামানি তো কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না,,উনার এককথা,,,”মা তুই রান্না ঘরে যাস না,,,আমার ছেলে দেখলে কুরুক্ষেত্র করে ফেলবে,,যে ছেলে স্টোর রুমে পর্যন্ত কার্পেট বিছিয়ে রাখছে,,বউয়ের সেফটির জন্য,,সে যদি দেখে তার বউ রান্না ঘরে,,কি হবে ভেবে দেখেছিস??তারচেয়ে আমি যেমন পারি ম্যানেজ করে নিবো।।” কিন্তু ওই আমিও তো নাছোড়বান্দা,, বাড়িতে পুত্রবধূ থাকতে অসুস্থ শাশুড়ী মা রান্না করবে,,এমনটা বাবা-মা আমায় কখনো শেখায় নি।।।তাতে পৃথিবী উল্টে গেলেও আমার মোটেও যায় আসে না,,,,সেখানে শুভ্র তো কিছুই না।।এসব যুদ্ধের পালা শেষ করে আমি রান্না ঘরে দাড়িয়ে আছি।।ভাত,,মাংস হয়ে এসেছে,,এবার শুধু সবজি আর ডাল বাকি।।আমি সবজি কাটছিলাম হঠাৎ কোথা থেকে শুভ্র এসে সামনে দাঁড়ালো,,,উনি যে ভীষন রকম রেগে আছেন তা উনার টমেটোর মতো মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে,,,,আমি তাকাতেই দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,,,

তুমি এখানে কি করো রোদেলা??

উনার মুখে রোদেলা নামটা শুনে অবাক হলাম,,,বিয়ের প্রথমদিনেই শুধু উনি এই নামে ডেকেছিলেন,,,,তারমানে মশাইয়ের রাগের পাল্লা আজ ভীষন ভারি,,,উনার জলন্ত চোখের দিকে তাকালেই আমার কথা সব ফুঁস হয়ে যায়,,,তাই উনার দিকে না তাকিয়ে সবজি কাটায় মন দিলাম,,,

কি আবার করছি??রান্না করছি।।কিচেনে কাউকে ফুটবল খেলতে দেখেছেন কাউকে,,??

ফাজলামো বন্ধ করো রোদ,,,এসব করতে গিয়ে আবার নতুন কোনো অঘটন বাঁধাতে চাও??বাড়ির সবাই কই যে তোমায় রান্না করতে হবে।।

রান্না করতে গেলেই অঘটন বাঁধে আপনাকে কে বললো??রান্না করতে করতে শহীদ হয়ে গেছে এমন কাউকে কোনোদিন দেখেছেন??তাছাড়া বাড়িতে আজ কোনো সার্ভেন্ট নেই সো আমাকেই রাধঁতে হবে,,,(সবজি কাটতে কাটতে)

কেন?? সব কই মরেছে আর বউমনি বা মাই বা কোথায়??(ভ্রু কুচঁকে)

আরিফ চাচার বড় ভাই মারা গেছেন,,,নিশ্চয় জানেন??মামুও তো জানাজায় গেছেন,,,আর রাহেলার বিয়ে পড়শো,,,সো জামাই রেখে সে নিশ্চয় এখানে রান্না করতে আসবে না।।আর মাধবী তো আগে থেকেই অফ ডে তে আছে,,,

মা,,বউমনি??

আপনি পাগল??মামানির কাল রাত থেকে পেশার ফল করছে,,,উনি এই অবস্থায় রান্না করতে আসবে??আর আপুর কথা কিভাবে বলুন আপনি??ওর অবস্থা কি আপনার জানা নেই??

ওহ,,সরি।।তাহলে আমায় ফোন করে নিতে,,আমি হেল্প করতাম।।(মুচকি হেসে)দাও আমি সবজি কেটে দিই।।

নাহ,,,একদম ওস্তাদি দেখাতে আসবেন না,,,পরে বাংলা সিনেমার মতো হাত কেটে একাকার করবেন আর আমাকে নায়কা সাবানার মতো শাড়ি ছিড়ে নেকামো করতে হবে,,,আর তাতে আমি ইন্টারেস্টেড নই।।।সো দূরে থাকুন,,,

এভাবে বলছো কেন??(মুখ গোমরা করে)

কিভাবে বলছি??(ভ্রু কুঁচকে)

বাদ দাও,,,বাহ তুমি তো বেশ সবজি কাটতে পারো,,গ্যাচগ্যাচ কেটে চলেছো।।তুমি পুচকি হলেও গুণবতী বটে,,,রান্না পারো,,,শাড়িও পড়তে পারো,,

হুমম,,আই নো আমি গুণবতী,,,(ভাব নিয়ে)

শুভ্র দরজায় ঠেস দিয়ে হাত বাজ করে দাঁড়িয়ে ছিলো,,আমার কথা শুনে মুচকি হেসে পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো,,,,

হুমম হতেই হবে,,,নয়তো যেন তেন মেয়ের জন্য কি আবরার শুভ্র পাগল হয়??

আপনি আমার জন্য পাগল??(বাঁকা চোখে)

ব্যাপারটা বিশ্রী হলেও সত্য,,আম মেড ফর ইউ,,(মুখ গোমরা করে) জানো??(আমি আড়চোখে তাকাতেই)আমি মাঝে মাঝে ভাবি,,আমি দিনদিন পাগলাটে হয়ে যাচ্ছি,,,কনট্রোল করার যথেষ্ট চেষ্টা করি বাট তোমাকে দেখলেই সবগুলিয়ে যায়,,,এসব পাগলামো অটোমেটিক আমার মধ্যে চলে আসে,,,,আই কান্ট হেল্প।। (বাচ্চাদের মতো মুখ করে)

আমি উনার কথায় খিলখিল করে হেসে উঠলাম,,,আর উনি আমার ঘাড়ে মাথা রেখে আমার দিকে একপলকে তাকিয়ে আছেন,,,যেনো চোখের পাতা পড়লেই বিস্ময়কর কিছু হারিয়ে যাবে,,,উনার এভাবে তাকানো দেখে হাসি থামিয়ে চোখের ইশারায় জিগ্যেস করলাম,, “কি হয়েছে?”
উনি আমার কপালের চুলগুলো ডান হাত দিয়ে সরিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলেন,,,

কিছুই হয় নি,,,জাস্ট তোমাকে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে,,

কি??(ভ্রু কুঁচকে)

একদম আমার বউ বউ দেখাচ্ছি তোমায়,,,,(গালে হাত রেখে)

কেন?এমনি কি বোন বোন দেখায়??

কথাটা বলেই আমি হুহু করে হেসে উঠলাম,,,কেনো জানি প্রচুর হাসি পাচ্ছে আজ।।।আমি হাসতে হাসতে রীতিমতো কপোকাত,,,উনি কিছুক্ষণ ভ্রু কুচঁকে তাকিয়ে থেকে আমাকে উঁচু করে ভ্যাসিনের পাশে বসিয়ে দিয়ে,,,সবজিগুলো নিতে ধুতে লাগলেন,,,আমি অবাক চোখে উনাকে দেখছি।।আমাকে তাকাতে দেখেই উনি বলে উঠলেন,,,

এটা আমি বেশ পারি,,,সো লেকচার দেওয়া বন্ধ করো,,,আর কি জানি বলছিলে??অন্যান্য সময় কেমন লাগে??অন্যান্য সময় তোমায় আমার রোদবালিকার মতো লাগে,,,(চোখ টিপে)

মানে??(কনফিউড হয়ে)

কিছু না বাদ দাও,,,সবজি ধোয়া শেষ,,,কি রান্না করবে তারাতারি করো তো পিচ্চি।।

আমাকে নামিয়ে দিয়ে উনি ফ্রিজ থেকে একগাদা ফ্রুটস বের করলেন,,,আমি ভ্রু কুচঁকে তাকিয়ে আছি,,,এগুলো দিয়ে কি করবেন উনি??

এসব দিয়ে কি হবে??(ভ্রু কুচঁকে)

এসব খাওয়া হবে??

আপনি এখন এসব খাবেন??(ভ্রু কুচঁকে)

আমি কি বলেছি আমি খাবো??(ফল কাটতে কাটতে)

তো??

আমার বউ খাবে,,,বেচারী রান্না করবে এনার্জি ওয়েস্ট হবে সো,,সে রান্না করবে আর আমি তাকে ফ্রুটস খাওয়াবো,,,গট ইট বেবি??

নো,,এখন আমি কিছুতেই খাবো না,,কাজের মধ্যে ডিসটার্ব করবেন না বলে দিলাম,,

চুপপ,,,আমার খাওয়ানোর মধ্যে ডিসটার্ব করবে না বলে দিলাম,,,নয়তো দিবো একটা কানের নিচে।।(রাগী গলায়)

কি আর করা??আমি তো বাধ্য,,,তাই বাধ্য হয়ে খেতে হচ্ছে,,আমি রান্না করছি আর উনি আমায় খাওয়াচ্ছেন।।।পাগলের শেষ সীমানা যাকে বলে আরকি।।


ঘড়িতে এগারোটা বা সাড়ে এগারোটা বাজে,,,তবু চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না,,তাই ভাবলাম গল্পের বই পড়া যাক,,,শরৎচন্দ্রের “পরীনিতা” উপন্যাসটার পাতা উল্টাচ্ছি আর হাটছি,,,গল্পটা বেশ রোমান্টিক।।গল্পটা পড়লেই গল্পের নায়ক “শেখর দা” কে দেখতে ইচ্ছে করে।।বইয়ের পাতায় যেনো ডুবে গিয়েছি।।ঠিক এই সময় বুঝতে পারলাম,,কেউ আমার পিছে হাটছে,,,আমি ঘুরলে সেও ঘুরছে,,,আমি জোড়ে হাঁটলে সেও জোড়ে হাঁটছে,,ভয়ে আমার অন্তরাত্তা কেঁপে উঠার উপক্রম,, ভূত টূত নয় তো??দূরুদ পড়তে পড়তে পিছনে তাকাতেই মেজাজ খারাপ হলো,,,শুভ্র ফোন হাতে আমার পিছু পিছু হাটঁছে,,,

কি সমস্যা??আমার পিছু পিছু হাটছেন কেন??

যদি তুমি পড়ে যাও,,,তোমাকে তো ধরতে হবে তাই।।

হোয়াট??এখানে কার্পেট বিছানো আছে,,তবু আমি পড়ে যাবো??এটা কোনো কথা??

পড়ে তো যেতেও পারো,,,,আগে থেকে সেইব থাকা ভালো,,,(ফোন চাপতে চাপতে)

তাই বলে এভাবে পেছনে ঘুরবেন??বিরক্তিকর(,রাগী গলায়)

আর তোমাকে এতো রাতে বই পড়তে হবে??যখন দরকার ছিলো তখন তো পড়ো নাই,,তাহলে ঠিকই আমাদের ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যেতো,,,

খোঁচা দিচ্ছেন??(মুখ ফুলিয়ে)

নাহ,, জান,,, চলো তো ঘুমাবো,,

আপনি যান,,,আমি ঘুমাবো না,, (বিরক্তি নিয়ে)

উনি আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে কোলে তোলে নিলেন,,,

বেবি,,,তুমি না ঘুমালে,,আমাকে তো ঘুমোতে দেও,,,কাল তোমায় ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো,,,আই নিড সাম এনার্জি,,,এখনি টেনশন হচ্ছে,,সো চুপ থেকে আমাকে এনার্জি কালেক্ট করতে হেল্প করো,,,

কথাটা বলেই উনি আমাকে সহ কম্বল মোড়িয়ে শুয়ে পড়লেন,,,,আর আমি হাবলার মতো উনার দিকে তাকিয়ে আছি,,,

#চলবে,,,

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *