তোকে চাই || সিজন -২ || Part_13 ❤ নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤

তোকে চাই সিজন ১ সকল পর্ব

তোকে চাই সিজন ২ সকল পর্ব 

💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔

#তোকে চাই❤
………(সিজন -২)
#writer : নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤
#part: 1 3
.
.
🍁
.
রাত ৮ টা বেজে ১০ মিনিট,,ফাঁকা রাস্তায় হেঁটে চলেছি।চিত্রা সকাল থেকে অনশন শুরু করেছে। আমরণ অনশন নয় আবিয়েভাঙন অনশন অর্থাৎ বিয়ে ভাঙার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার এই অনশন চলবে।।সে কিছুতেই বিয়ে করবে না এই দাবিকে সামনে রেখে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে রুমে দরজা দিয়েছে।। আন্টি আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন।।তার ধারনা উনার মিষ্টি কথার চেয়ে দরজার এপাশ থেকে আমার দেওয়া গালিগুলো বেশি কাজে দিবে।।একদম পেটে যাওয়ার আগেই কাজ,, অনেকটা হোমিওপ্যাথির মতো।।বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা!! আমিও গেলাম… গিয়েই উচ্চ মাপের কিছু গালি ছাড়লাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সুড়সুড় করে দরজাও খুলে গেলো।।ব্যাপারটায় আন্টি আমার উপর ব্যাপক ইম্প্রেস।।এই মুহূর্তে চিত্রাদের বাড়ি থেকেই ফিরছি… আমাদের বাসার এক নিয়ম সারাদিন ঘুরোফিরো নো প্রবলেম বাট সন্ধ্যার আগে বাসায় থাকা চাই এ বিষয়ে নো হাংকিপাংকি।।এই নিয়মটা আপাতত আপু আর আমার উপরই জারি আছে।ভাইয়া যখন ভার্সিটিতে পড়তো তখন তারউপরও জারি ছিলো এই নিয়ম। কিন্তু তারসময় সীমা ছিলো রাত ৮ টা পর্যন্ত।।এখন জব করায় তার উপর থেকে এই নিয়ম উইথড্র করা হয়েছে।।মাত্র রাত ৮ টা ভেবেছিলাম একাই চলে যেতে পারবো তাই আর ভাইয়াকে ফোন দিই নি।।কিন্তু এই সময়েই যে রাস্তা এতোটা ফাঁকা হয়ে যাবে ভাবি নি।।একদম অস্বস্তিকর নীরবতা চারপাশে তারউপর একটা রিকশাও পায় নি।এ আর নতুন কি আমার বিপদে কুকুর এগিয়ে আসলেও এই রিক্সাওয়ালা জাতি কখনো এগিয়ে আসে না।।এদের সাথে আমার শত্রুতাটা যে কি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।।হঠাৎ সামনে কিছু ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম….নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।।আরেকটু কাছে গিয়েই আত্মা শুকিয়ে গেলো আমার এই ছেলেগুলোই তো সেদিন ভার্সিটিতে মাতলামো করছিলো।।হায়!!আল্লাহ,, এবার কি হবে??কোনো রকম মুখ লুকিয়ে পা বাড়াতেই পথ আটকে দাঁড়ালো তারা।।আজকে কাউকে দেখেই মাতাল মনে হচ্ছে না সবাই একদম ফিট।।আর এদের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমি ফিট আই মিন অজ্ঞান।কাঁপা কাঁপা চাহনীতে চারদিকে তাকাচ্ছি একটা আশার আলোর অপেক্ষায়,, কিন্তু আশেপাশে কাউকেই চোখে পড়লো না।।দু একজন পথচারী আসছে যাচ্ছে কিন্তু তাদের কাছে আমি দেখেও না দেখা।।গলাটা শুকিয়ে আসছে রীতিমতো।।বারবার ঢোক গিলে চলেছি ঠিক তখনই একজন বলে উঠলেন….
.
মাম্মা?পাখি তো নিজেই ধরা দিয়েছে রে।।শুভ্রর জানেমান???ইশশ বাচ্চা মেয়েটা…. সেদিন তো তোমার এই নরম হাতটা ধরার জন্য আমাদের বেদরাম কেলিয়েছে সে।।মনজুর তো হাতটায় ভেঙে দিছে।।কতো প্রেম তাই না??কিন্তু এখন কে বাঁচাবে শুনি??(দাঁত কেলিয়ে)
.
দে..দেখুনন আ…আমি শুভ্র ভাইয়ার প্রে..প্রেমিকা নই।আ..আমাকে যেতে দিন বলছি।নয়তো…
.
নয়তো কি সোনা??শুভ্রকে বলবা??হা হা হা তোমাকে বলার মতো অবস্থায় রাখলে তো বলবা।এমন অবস্থা করবো যে শুভ্র চোখ তুলে তাকাতেও কেঁপে উঠবে….সেদিন ওর এলাকায় ছিলাম তাই কিছু করতে পারি নি কিন্তু আজ??এই সোহান??শুভ্র কি বলেছিলো জানি সেদিন??
.
ছেলেটির কথায় পেছনে থেকে তেলসিটে চেহারার একটা ছেলে বলে উঠলো….”ভাই শুভ্র ভাই বলছিলো যে….”
.
ওই হারামজাদা চুপ।শুভ্রকে আবার ভাই কস কেন??বল শুভ্র হারামজাদা…বল(ধমক দিয়ে)
.
না আসলে ভাই…উনি বড়ই ভদ্র কিসেমের মানুষ বিনা কারনে তো কিছু করে না।।তাই উনার প্রতি আমার একটা শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে আরকি।।হারামজাদা বলতে পারুম না।।এমনি বলি??
.
শুভ্রর চামচা কোথাকার…(গালে থাপ্পর বসিয়ে) হ্যা এখন বল…
.
থাপ্পড়টা খেয়েও ছেলেটার মধ্যে তেমন কোনো ভাবাবেগ হলো না।।সে গালে হাত ঘষতে ঘষতে বলে উঠলো….
.
উনি কইছিলেন-“শালা আমার ভার্সিটিতে এসে আমারই কলিজায় হাত দেওয়ার সাহস কেমনে হয় তোদের?এই ভার্সিটির একটা মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে মাটিতে পুঁতে ফেলবো।।আর এই যে একটু আগে মেয়েটার হাত ধরেছিলি…এর জন্য তোর হাতটা কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছে।ওর হাতের কব্জিতে লাল জখম হয়ে যাওয়াটা ঠিক(বুকে হাত দিয়ে) এইখানে লাগছে।।আর শুভ্রর বুকে আঘাত লাগে মানে অনেক কিছু।””ভাই?এরপর কি কইছিলো ঠিক মনে নাই তখন আমি চড় খাইয়া বেহুশ হইয়া গেছিলাম।
.
তোরে দিয়া কিচ্ছু হবে না হারামজাদা।।(বিরক্তি নিয়ে) তো ময়নাপাখি? তোমার হাত ধরায় ওর বুকে কাটা লাগছে আর যদি সারা শরীরে হাত রাখি তাহলে ওর কোথায় কোথায় লাগবে ভাবতে পারছো??
.
ভয়ে আমার কলিজা ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম।।শুভ্র ভাইয়ার কি দরকার ছিলো এসব করার।এখন ফেঁসে গেলাম তো।।চোখ ফেটে কান্না আসছে।কেনো যে ভাইয়াকে ফোন করে আসতে বললাম না।। এখন কি হবে?কালকের খবরের কাগজে নিশ্চয় হেড লাইন বের হবে-” গণ ধর্ষনের স্বীকার হয়ে এক বালিকার মৃত্যু ” না না বালিকা হবে না যুবতি হবে….” গণ ধর্ষনের স্বীকার হয়ে এক যুবতীর ভয়াবহ মৃত্যু ” হ্যা এবার পারফেক্ট। ছেলেগুলো এগিয়ে আসছে আমার দিকে,, আমি স্থির দাঁড়িয়ে আছি পা নাড়ানোর ক্ষমতায় যেনো পাচ্ছি না ।।হঠাৎই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো….”ভাবি??”
কথাটা শুনে কৌতূহলী দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকালো সবাই।।গোল চশমা চোখে,, ঘেমে যাওয়া চিপকানো শার্ট গায়ে,, বোকা বোকা চেহারার একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।।একটু খেয়াল করতেই ছেলেটিকে চিনতে পারলাম।।সেইদিন এই ছেলেটায় দৌড়ে এসে বার্গার দিয়ে গিয়েছিলো গাড়িতে,,সাকিব!! আমাকে দেখে দ্রুত পায়ে আমার কাছে এসে বলে উঠলো…
.
ভাই আপনারা উনাকে এভাবে আটকে রেখেছেন কেন??যেতে দিন…
.
ওই তুই কে রে??এখান থেকে ফুট নয়তো বাড়ি ফেরার অবস্থায় থাকবি না আর।(ধাক্কা দিয়ে)
.
আশ্চর্য ধাক্কা দিচ্ছেন কেন?ভাবি আপনি চলুন তো।।এদের সুবিধার মনে হচ্ছে না।
.
ওলে ওলে এই চিকনা এরে বাঁচাইতে আসছে।।ভাবি?তোর ভাইয়ের বউ নাকি??তোর ভাইরে যাইয়া বলে দে তার বউ আজ আমার বিছানায়…হাহাহাহা..
.
মুখ সামলে কথা বলবেন…উনাকে টাচ করলেও খবর হয়ে যাবে আপনাদের বলে রাখলাম।।
.
তাই নাকি??তুই খবর করবি?? করে দেখা…
.
কথাটা বলেই একটা ছেলে উড়না টেনে নিলো আমার।।সাথে সাথেই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সাকিব।সে হয়তো নিজেও জানতো এই ছয় সাতজনের সাথে একা পেড়ে উঠবে না সে।।তবু ছেলেটা শেষ চেষ্টায় ত্রুটি রাখছে না মোটে।।আমাকে চিৎকার করে বলে উঠলো…”ভাবি পালান!!আমি ওদের বেশিক্ষণ আটকাতে পারবো না।।দয়া করে দৌড়ান।।দৌড়ান ভাবি…ওরা আপনাকে শেষ করে দিবে।।যান!!” আমি তখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছি।।এই ছেলেটাকে একা ফেলে কি করে চলে যাবো আমি?আমাকে বাঁচাতে নিজে মার খাচ্ছে আর আমি কি না ভেগে যাবো??আর কতটুকুই বা যেতে পারবো??এইরাতে কে সাহায্য করবে আমায়??হঠাৎই কারো চিৎকারে চমকে উঠে সামনে তাকালাম আমি।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো কয়েকফোঁটা।সাকিবের মাথা থেকে রক্ত পড়ছে ক্রমাগত,,চোখের চশমাটাও ছিটকে পড়ছে রাস্তার মাঝখানে।।তবুও খুব কষ্টে বলে উঠলো ছেলেটি-“প্লিজ ভাবি যান…ভার্সিটির দিকে যান।।শুভ্র ভাই আছে ওখানে।।প্লিজজ” ছেলেটার কথাটা বুকে গিয়ে বিঁধলো,, এই ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে… আমায় দৌঁড়াতে হবে… কারো কাছে সাহায্য চাইতে হবে।।কি মনে করে নিজের সবটুকু দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম।।কোথায় যাচ্ছি জানি না…চোখে শুধু ভাসছে সাকিবের মাথা নিয়ে গড়িয়ে পড়া টাটকা রক্ত।।কি ভয়ানক চিত্র।কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পরই কারো সাথে ধাক্কা খেলাম… চোখ মেলে কোনোরকম দেখতে পেলাম সেই পরিচিত মুখ…সেই উদ্ধিগ্ন চোখ…শুভ্র!! দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটা আর নেই…গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না কিছুতেই।।মনে হচ্ছে কেউ একজন শক্ত করে চেপে ধরেছে গলা।।শরীরের ভরটা ছেড়ে দিতেই আমায় নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো শুভ্র।।উদ্ধিগ্ন কন্ঠে কতো কিছুই বলে চলেছে সে…
.
রোদ?হোয়াট হ্যাপেন্ট?তুমি এই সময় এখানে কেন??কথা বলো??কি হয়েছে তোমার?
.
অনেক কিছুই বলতে চাইছি আমি কিন্তু শক্তিটা পাচ্ছি না মোটেও।।তবু আমায় বলতে হবে ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে….নিজের সবটুকু দিয়ে বলে উঠলাম…
.
স স সাকিব… ও ও ওরা ওকে মমারছে।
.
এটুকু বলেই চোখ বন্ধ করে নিলাম।।ভয়,,আর উত্তেজনায় শরীরের ন্যূনতম শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছি।চোখ খুলে রাখারও শক্তি নেই আমার।।শুধু শুনে যাচ্ছি চারপাশের কথাগুলো…সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।।শুভ্র আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলে উঠলেন…
.
সাহেল,,সাব্বির ওদিকে গিয়ে দেখ তো কি হয়েছে।।গো ফাস্ট।রোদ??এই রোদ?ওপেন ইউর আইস…বলো কে কি করেছে বলো?? এই রোদ??একবার বলো খুন করে ফেলবো তাকে।।এভাবে কাঁপছো কেন?আমি তো আছি!!
.
উনি আমায় ক্রমাগত ডেকে চলেছেন।সেসব শুনতে পেলেও উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।।কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম উনি আমায় কোলে তোলে নিয়েছেন।।আমি যেন শূন্য ভাসছি।।নরম কোনো জায়গায় শুইয়ে দিলেন আমায়।ঠিক তখনই কানে এলো কারো কথা-
.
দোস্ত?সাকিব ছেলেটাকে ব্যাপক মেরেছে ফারুকেরা।ওকে হসপিটালে পাঠিয়েছি।প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে,, আল্লাহ জানে কি হবে।
.
কেনো মেরেছে??সাকিব বাচ্চা একটা ছেলে।।ও তো কোনো রকম বেয়াদবি করার ছেলে নয়।।তাহলে??
.
আসলে…ওরা রোদেলার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করতে চেয়েছিলো।ওকে বাঁচাতে গিয়েই….
.
শুভ্রর আর কোনো কথা শোনা গেল না।।কিছুক্ষণ পর হালকা করে বলে উঠলো -“ওকে”
.
.
🍁
.
প্রায় আধাঘন্টা হাতে পায়ে মালিশ করার পর শরীরে শক্তি পাচ্ছি আমি।।মিটমিট করে চোখ মেলে তাকাতেই শুভ্রর মুখটা ভেসে উঠলো সামনে।।শুকনো মুখে রক্তরাঙা দুটি চোখ।।আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখেই উজ্জল হয়ে গেলো উনার মুখ।আমাকে একহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে,, গাড়ি স্টার্ট দিলেন উনি।।কিছুক্ষণ পরই গাড়ি থেমে গেলো।আমাকে কোলে তুলে নিয়ে সরাসরি ঢুকে গেলেন ডক্টরের চেম্বারে ।আমার মাথায় শুধু একটা কথায় ঘুরছে-“সাকিব ছেলেটা ঠিক আছে তো?” ডক্টর আমায় ঘুমের ঔষধ দিয়েছেন।কিন্তু চোখ বুঝতে ইচ্ছে করছে না .. শুভ্র ভাইয়াকে সাকিবের কথাটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে খুব কিন্তু পারছি না।।কোনোরকম ঘুমে ঢুলুঢুলু প্রশ্নমাখা চোখে শুভ্র ভাইয়ার দিকে তাকালাম।উনি কি বুঝতে পারবেন আমার প্রশ্ন? আমার মন পড়ার ক্ষমতা কি তার আছে??আমাকে অবাক করে দিয়ে শুভ্র ভাইয়া আমার ডানহাতে হালকা চাপ দিয়ে বলে উঠলেন…”সাকিব আইসিইউতে আছে।ঠিক হয়ে যাবে ও।।চিন্তা করো না।।তুমি একটু ঘুমাও,ইউ নিড রেস্ট!!” উনার কথায় কোনো আশা খুঁজে পেলাম না আমি কিন্তু কিছু বলতেও পারলাম না।।তার আগেই গহীন ঘুমে তলিয়ে গেলাম।।জানি না কতক্ষণ ঘুমিয়েছি। চোখ মেলে দেখি বাবা-মা,ভাইয়া,মামু,মামানি,অভ্র ভাইয়া সবাই দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে।।আমাকে চোখ খুলতে দেখেই ওদের মুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেলো।।চারপাশে কোথাও শুভ্র ভাইয়াকে দেখতে পেলাম না।।সাকিব ছেলেটার কিছু হলো না তো?.
..
#চলবে🍁,

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *