তোকে চাই || সিজন -২ || Part_41 ❤ নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤

তোকে চাই সিজন ১ সকল পর্ব

তোকে চাই সিজন ২ সকল পর্ব 

💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔

#তোকে চাই❤
……. (সিজন-২)
#writer: নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤
#part:41
.
🍁
.
সেদিন রোদদের গ্রামের বাড়ি থেকে ফেরার পর বাসায় ঢুকতেই চিত্রার মা একরকম টেনে ঘরে নিয়ে গেলো তাকে….দরজা লাগিয়ে আনন্দিত কন্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠলেন –
.
চেহারার কি অবস্থা করেছিস।অসভ্য মেয়ে…নিজের খেয়াল নিতে পারিস না?(বিছানার ওপর ইশারা করে) ওই আকাশী রঙের জামদানী শাড়িটা ফটাফট পড়ে ফেল তো।
.
মায়ের কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো চিত্রা।।বাসায় ফিরে মানুষ ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়…আর মা তাকে শাড়ি পড়তে বলছে?কি আশ্চর্য!! বিস্ময়মাখা কন্ঠে বলে উঠলো চিত্রা-
.
আশ্চর্য! হঠাৎ করে শাড়ি পড়তে যাবো কেন?
.
কেন?শাড়ি পড়লে কি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে?
.
পৃথিবী ধ্বংস হবে কি না জানি না মা।তবে এই মুহূর্তে যে আমি শাড়ি পড়ছি না সেটা আমি খুব ভালো করে জানি।
.
অবশ্যই পড়বি।দেখ…একদম ত্যাড়ামো করবি না বলে দিলাম।জামাই তার নানি দাদিকে নিয়ে আসছে…. উনারা প্রাচীন ধাঁচের মানুষ।ওদের সামনে যদি এমন ত্যাড়ামো করিস তো থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো।
.
জামাই মানে?কিসের জামাই,কার জামাই,কি রকম জামাই??(অবাক হয়ে)
.
জামাই আবার কিসের হয়?জামাই তো জামাই ই…ওদিন ওই ছেলেটা এলো না তোকে দেখতে?ছেলেটা তোকে না খুব পছন্দ করেছে,বুঝলি?একদম বিয়ে করবে তো তোকেই করবে….কি সুন্দর ব্যবহার!!আজকে ওর নানি,দাদি আসবে… এবার ওদের পছন্দ হলেই হলো।(খুশিতে গদগদ হয়ে)
.
মা!!আমি তোমাকে বলেছি আমি বিয়ে করবো না।।তবু কেন জোর করছো বুঝতে পারছি না।আমি কি তোমাদের কাছে বোঝা হয়ে গেছি মা?
.
এভাবে বলছিস কেন?দেখ…তুই বড় মেয়ে।বাবা মা কি কখনও সন্তানের খারাপ চায় বল?মেয়ে হয়ে জন্মালে তো বিয়েটা একদিন করতেই হবে।তাছাড়া তোর তো পছন্দেরও কেউ নেই যে অপেক্ষা করবো। আর দেখতে আসলেই কি বিয়ে হয়ে যায় বল?ওরা আসতে চাইছে আমরা কি মুখের উপর মানা করতে পারি?এটা কি ভালো দেখায় বল?এখন যদি তুই ঠিকঠাকভাবে ওদের সামনে না যাস তাহলে তোর বাবা ওদের সামনে ছোট হয়ে যাবে না??তুই কি তাই চাস?(করুণ গলায়)
.
কিন্তু মা…
.
কোনো কিন্তু নয়।ফ্রেশ হয়ে শাড়িটা পড়ে নে।ওরা এলো বলে…লক্ষী মেয়ে আমার।(কপালে চুমু দিয়ে)
.
মা বেরিয়ে যেতেই থম ধরে বসে রইলো চিত্রা।নাটকীয় সবকিছু যে তাদের সাথেই কেনো ঘটছে বুঝতে পারছে না সে?রোদের বিয়েটাও কেমন হুটহাট হয়ে গেলো…যদিও তাতে বেশ খুশিই হয়েছে চিত্রা।শুভ্র ভাইয়া যে রোদকে কতটা ভালোবাসা সেটা তো ওপেন সিক্রেট… বিয়ে হয়েই বরং ভালো হয়েছে।।কিন্তু তার সাথে এমনটা কেন হচ্ছে?একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হয়ে শাড়ি পড়া শেষ করতেই হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে এলো মা।ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলো –
.
চল চিত্রা।ওরা চলে এসেছে….তোকে ডাকছে।ইশশ মাথায় ঘোমটা টা দিয়ে নে না বাবা!!এই মেয়েকে নিয়ে যে কি করি।(বিরক্তি নিয়ে)
.
সোফায় বসে আছে চিত্রা।আজও মাথাটা নিচু করে রেখেছে সে….তার ঠিক সামনে নীল রঙের পাঞ্জাবি পড়ে বসে আছে একটা ছেলে।আজও চিত্রা আড়চোখে লোকটার পেট পর্যন্তই দেখতে পেয়েছে।। এরচেয়ে ওপর দিকে তাকানোর সাহস তার হলো না…লজ্জাটা যেনো ঘাড়ে চেপে বসেছে তার,, সেইসাথে চরম অস্বস্তি। হুট করেই পাশে বসে থাকা সাদা শাড়ি পড়া বৃদ্ধা মহিলাটি চিত্রার হাত টেনে নিয়ে একটি আংটি পড়িয়ে দিলো।সাথে সাথেই পাশ থেকে অন্য একজন বৃদ্ধা মহিলা বলে উঠলেন –
.
আমাদের দু’জনের সতীন হয়ে গেলে তো তুমি!!আমি কিন্তু এখন থেকে তোমায় নাতবউই ডাকবো।।আমার দাদু ভাই তো এখনই তোমায় চোখে হারায়…আমাদের দু’জন থেকে তাকে তো তুমি কেড়ে নিলে ভাই!!তবে দোয়া করি সারাজীবন আঁচলে বেঁধে রাখো তাকে।
.
আচমকা কি হয়ে গেলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না চিত্রা।চোখ দুটো ভরে আসছে তার…এমনটা হওয়া কি খুব প্রয়োজন ছিলো?চিত্রার মা ও হাসিমুখে সামনে বসে থাকা ছেলেটার হাতে একটা আংটি পড়িয়ে দিলেন।।চিত্রার এবার গলা ধরে এলো এভাবেও এনগেজমেন্ট হতে পারে জানায় ছিলো না তার।কিছুক্ষণ পর সামনে বসে থাকা ছেলেটি গমগমে ভরাট গলায় বলে উঠলো –
.
আমি কি উনার সাথে আলাদা কথা বলতে পারি?
.
সবার সম্মতিতে ওদের দু’জনকে চিত্রার ঘরে পাঠানো হলো।দু’জনেই ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে…কিছুক্ষণ নীরবতার পর হুট করেই বলে উঠলো লোকটি-
.
আচ্ছা?আপনি কি ট্যারা?
.
লোকটির এমন কথায় অবাক হলো চিত্রা। আশ্চর্য ট্যারা হতে যাবে কেন ও?ভার্সিটির কতো ছেলেরা তার চোখের প্রশংসা করেছে…আর এই ব্যাক্তি কি না বলছে সে ট্যারা??চিত্রা অবাক হয়ে মাথা নিচু করেই বলে উঠলো –
.
ক ক কেনো?আপনার এমন মনে হচ্ছে কেন?
.
আমার দিকে তাকাচ্ছেন না তাতেই বুঝতে পারছি।।আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে কোনো মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সে তাকাবে না এটা হতেই পারে না।আর যদি তা হয় তাহলে বুঝতে হবে তার চোখে সমস্যা আছে।আপনি নির্ভয়ে আমার দিকে তাকাতে পারেন।আপনি ট্যারা হলেও আমি আপনাকেই বিয়ে করবো…আমি হলাম জনদরদী মানুষ…এসব ট্যারা প্যারা মেয়ে বিয়ে করতে আমার তেমন একটা আপত্তি নেই।(মুচকি হেসে)
.
লোকটির কথায় এবার রেগে উঠলো চিত্রা।লোকটি রীতিমতো তাকে অপমান করছে!!কতো বড় সাহস….রেগে গিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো-
.
আপনাকে কি আমি বলেছি বিয়ে কর….
.
এটুকু বলেই থেমে গেলো চিত্রা।সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা তার পরিচিত।ভার্সিটিতে দেখেছে সে…তমাদের ডিপার্টমেন্টের নতুন স্যার…নামটা যেনো কি??মনেই পড়ছে না।।তবে রোদ আর সে স্যারটাকে নিয়ে বেশ মজা করেছিলো তখন।।তার একটা নেইক নেইমও দিয়েছিলো রোদ…কি জানি নাম টা?ঔষধের শিশি?হতে পারে…এমন কিছুই হবে… কিন্তু এই লোক তাকে বিয়ে করতে এসেছে কেনো?তাকে কি চিনতে পারছে?চিনতে পারার তো কথাও না।শিশির স্যারের তুরির শব্দে ঘোর কাটলো তার…
.
এই যে মিস.কি ব্যাপার? কোথায় হারিয়ে গেছেন?আমাকে কি খুব সুন্দর লাগছে?
.
চিত্রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ভয়ে তার হাত-পা কাঁপছে।তমার কাছে শুনেছে সে সুন্দর হলে কি হবে…একদম তিতা করলা মার্কা স্যার এটা।কথায় কথায় নাকি রাগারাগি করেন খুব।শেষ পর্যন্ত কোনো জলন্ত আগ্নেয়গিরি তার স্বামী হবে?সারা জীবন টিচারদের মতো স্ট্যান্ড আপ এন্ড সিট ডাউন করবে??ভাবা যায়??চিত্রাকে চুপ করে থাকতে দেখে এবার এগিয়ে এলো শিশির….ওর একদম কাছাকাছি এসে বলে উঠলো –
.
কি ব্যাপার বলো তো…আমায় দেখলেই কি তোমার সব সিস্টেম অফ হয়ে যায় নাকি?কখনো তাকাতে ভুলে যাও….কখনো চোখ ফিরাতে ভুলে যাও…আবার কখনো কথা বলতে ভুলে যাও!!
.
কথাটা বলেই চট করে একটা চুমু দিয়ে দিলেন চিত্রার ডান গালে।ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই চোখ বড়বড় হয়ে এলো চিত্রার।হাত পা কাঁপতে লাগলো…. শরীরে যেনো ১০ মাত্রায় ভূমিকম্প শুরু হয়েছে।কি ভয়ানক একটা ঘটনা ঘটে গেলো তার সাথে!!ছি ছি।এই মুখ কাকে দেখাবে এবার সে?? কিভাবে দেখাবে??চিত্রার কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে মুচকি হেসে বাম গালেও একটা চুমু দিয়ে বাঁকা হেসে বেরিয়ে গেলেন উনি।চিত্রা দুই গালে দু’হাত দিয়ে রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে।এটা কি হলো??কি হলো এটা??স্যার তাকে…নননননো!!তারপর থেকে স্যারকে নিয়ে ভয় ঢুকে গেলো তার মনে…দেখলেই ভয়ে হাত-পা কেঁপে ওঠে…তার সাথে অন্যরকম একটা ফিলিংসও হয়।।একদম অন্যরকম একটা ফিলিংস…যে ফিলিংসে মনটাও কেঁপে ওঠে তার।।চোখ দুটো তাকেই খুঁজে কিন্তু দেখা মিললেই শুরু হয় কাঁপা-কাঁপি।। তারমাঝে তিনমাস কেঁটে গেছে… শিশির প্রথম কিছুদিন তার সাথে বিভিন্নভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছে…ঘুরতে যাওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কাজ হয় নি।।চিত্রা তার সামনেই যায় নি।।তারপর থেকে শিশিরও আর চিত্রার সাথে যোগাযোগ করে নি।বাসায়ও সেই ব্যাপারে কথা উঠে নি।।তাই ব্যাপারটা আমলে আনে নি চিত্রা।কিন্তু সেদিন হঠাৎ ভার্সিটিতে দেখা হওয়ায় আবারও কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছিলো তার।।রোদকে তখন বলে নি…তাই পরে আর বলার সাহস হয় নি।।ভেবেছিলো যখন বিয়ে ফিক্সড হবে তখন একবারেই বলবে….
.
চিত্রার কাহিনীটা পুরোদস্তুর শুনে মাথা দুলালাম আমি।চিত্রা ডান কান ধরে বললো…”সরি”।। আমি আচাড়ের বয়ামটা পাশে রেখে ওকে হাত দিয়ে ডাকলাম-“এদিকে আয়” চিত্রা এগিয়ে আসতেই ওর ওড়না দিয়ে হাত মুছে শান্ত গলায় বললাম-“দুই কান ধর!”চিত্রা আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দুই কান ধরলো।আমি রেলিং থেকে লাফিয়ে নেমে বলে উঠলাম –
.
ঠিক আছে…. তোর সরি প্যান্ডিং অবস্থা থেকে এপ্রোব করা হবে বাট একটা শর্ত আছে।
.
কি শর্ত?
.
শর্তটা হলো শিশির স্যারের গালে চুমু দিতে হবে।তবেই সরি একসেপ্টেট।
.
কিহহহহ!!পাগল হইছিস তুই?তুই তোর জামাইকে কখনো চুমু দিয়েছিস যে আমাকে বলছিস??(রেগে তাকাতেই)প্লিজ দোস্ত…এটা কেমন হয়ে যায় না?আমায় ছ্যাচড়া ভাববে!!
.
বেশি বেশি হয়ে যাবে??
.
হুম! হবে।
.
তাহলে জড়িয়ে ধরিস তাতেই হবে।
.
কিহহ??জড়িয়ে?আর আমি??প্লিজ দোস্ত আরেকটু সহজ করা যায় না?প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
.
ওকে লাস্ট অপশন…এটা যদি না করিস তো ডিরেক্ট ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্যান করা হবে তোকে….রাজি?(ভ্রু নাচিয়ে)
.
আচ্ছা বল…!(মন খারাপ করে)
.
স্যারের সামনে গিয়ে সুন্দর করে বলবি “কেমন আছেন শিশির?” ব্যস এটুকুই।
.
নাম ধরে?
.
হ্যা।নাম ধরে।স্যার ট্যার বলা যাবে না।।হবু বরকে কেউ স্যার বলে?
.
তুই যে তোর পার্মানেন্ট বরকে ভাইয়া বলিস সেটা?
.
এই এদিকে আয়!!(ভ্রু কুঁচকে)
.
কেনো??(অবাক হয়ে)
.
আমি একটু এগিয়ে গিয়ে ওর গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বললাম -“এইজন্য!আরে আমি কি তোর মতো লুকিয়ে কিছু করেছি নাকি?করি নি।সো আমার বেলা সব ঠিকঠাক।। বুঝলি? এবার যা করতে বলছি… লক্ষ্মী বালিকা…সরি লক্ষ্মী যুবতীর মতো সেটা করে ফেলো…নয়তো খবর আছে….ওই চিপকু মফিসের সাথে বিয়া দিয়ে দিমু…হুহ।আচ্ছা আমি একটা ব্যাপার বুঝলাম না…শিশির স্যারের মতো একটা ড্যাশিং ছেলেকে তুই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না কেন?তোর জায়গায় আমি হলে তো গলায় ঝুলে পড়তাম…হা হা হা
.
শুভ্র ভাইয়া উনার চেয়েও ড্যাশিং…কয়েকগুন বেশি কিউট।।তাকালে তো তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে তাও তো তুই পাত্তা দেস না…আবার কথা!!
.
এই ফাজিল মেয়ে তুই উনার দিকে তাকাবি কেন,,যে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করবে?উনার দিকে তাকালে খবর আছে…. এতো ড্যাশিং জামাই রেখে সিঙ্গেল ছেলে খুঁজিস…আবার আমার বরের দিকেও তাকাস তোকে তো গণদোলাই দেওয়া উচিত….
.
তোকে গণদোলাই দেওয়া উচিত…. এতোগুলো মেয়ের মন ভেঙে শুভ্র ভাইকে বিয়ে করে নিলি…কেমনে পারলি বল তো?নির্দয়!!
.
এভাবে ঝগড়া নামক খুনসুটিতে পুরো বিকেল কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম আমি।।শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজ।।কোনোরকম কটা খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।।শুভ্রর কথা মনে হচ্ছে খুব…হয়তো উনার প্রেমে পড়ে গেছি আমি…বিয়ের পর প্রেম….নাকি ভালোবাসার পর প্রেম!!যায় হোক খুব অদ্ভুত বিষয় ঘটছে আমার সাথে…উনার কথা মনে হতেই উনাকে চিবিয়ে চুবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে ।।কি সাংঘাতিক ব্যাপার!!
.
🍁
.
রাত প্রায় ১ টা।হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেলো আমার।কেনো ঘুম ভাঙলো বুঝতে পারছি না।হয়তো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।হুট করেই কি যে হলো আমার….মনে হতে লাগলো শুভ্রকে এখনই দেখতে হবে আমায়…একদম সামনে থেকে দেখতে হবে…হবেই হবে।।বালিশের নিচ থেকে ফোনটা নিয়ে হাজারো অস্বস্তিকে উড়িয়ে দিয়ে ডায়াল করেই ফেললাম।যদিও ভেবেছিলাম ফোন রিসিভ হবে না।।এতো রাতে নিশ্চয় শান্তির ঘুম ঘুমোচ্ছেন উনি।কিন্তু আমার ধারনা ভুল প্রমাণ করে প্রথম বারেই রিসিভ হলো.. ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন –
.
হ্যালো!তুৃমি এখনো ঘুমোও নি রোদপাখি?
.
ঘুমিয়েছিলাম তো…ওঠে গেছি।আমার না আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে….খুবববব!!
.
কি নিঃসংকোচ আবেদন আমার।কেন জানি লজ্জা জিনিসটা আমার মাঝে কাজই করছে না আজ।আচ্ছা?লজ্জার সিস্টেম টা কি নষ্ট হয়ে গেলো তবে??আমি নিঃসংকোচে কথাটা বললেও ওপাশের মানুষটি নীরব হয়ে গেলেন।আমার মুখ থেকে এমন কথা শুনবেন কল্পনাও করতে পারেন নি হয়তো।।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে উঠলেন উনি-
.
তুমি ঠিক আছো?জ্বর টর কিছু হয়নি তো?
.
আমি একদম ঠিক আছি।জ্বর কেন হতে যাবে?শুনুন না…আমি আপনাকে দেখবো…এখনই… (মুখ ফুলিয়ে)
.
ওকে ছবি পাঠাচ্ছি দেখে নাও। তোমার হাজবেন্ড চেঞ্জ হয় নি যেমন ছেড়েছিলে তেমনি আছে।।
.
না ছবি নয়…
.
তাহলে ভিডিও কল করবো?
.
না ভিডিও কলও নয়।।আমি আপনাকে একদম সরাসরি দেখতে চাই।
.
ভিডিও কলে তো সরাসরিই দেখা হলো রোদুসোনা।
.
হলো না…ভিডিও কলে শুধু দেখা যাবে।আর কিছু তো করা যাবে না।(মন খারাপ করে)
.
তুমি কি আরো কিছু করতে চাও?(হেসে দিয়ে)
.
হুম চাই তো…
.
কি করতে চাও শুনি…
.
শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখতে চাই….সো আপনাকে আমার এখনই চাই…এখনই এখনই এখনই….
.
এখনই লাগবে আমায়?
.
হুম
.
আমার কথায় হুহা করে হেসে উঠলেন উনি। হাসিটা কোনোরকম থামিয়ে বলে উঠলেন –
.
তুমি পাগল হয়ে গেছো রোদ।এখন কটা বাজে জানো?১ঃ০৫।আচ্ছা!সত্যি করে বলো তো…উল্টাপাল্টা কিছু খাও নি তো??
.
একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।।কটা বাজে সেটা জানতে ফোন দিই নি আমি….আমার এখন আপনাকে চাই মানে চাই ব্যস।(মুখ ফুলিয়ে)
.
উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন-
.
অাধাঘন্টা ওয়েট করতে পারবে?আমি এখন অফিসে আছি…অফিস থেকে তোমাদের বাড়ি যেতে আধাঘন্টা লাগবে।এখনই বের হবো অফিস থেকে…নিচে এসে কল দিবো নেমে এসো…আমি বাসায় যাবো না।।চলবে?
.
হুম কিন্তু এতো রাতে আপনি অফিসে কেন?(ভ্রু কুঁচকে)
.
আমার কথায় উনি হাসলেন।তারপর ছোট্ট একটা শ্বাস টেনে নিয়ে বললেন-
.
তুমি যে মাঝরাতে এমন পাগলামোতে মেতেছো…যে ফিলিংসটা এখন তোমার হচ্ছে সেই পাগলামোটা আমার প্রতিটি মুহূর্তে করতে ইচ্ছে করে রোদ। এই ফিলিংসটা প্রতিটি মুহূর্তে আমি ফিল করি…যেকোনো সময় ছোঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে তোমায়।বাট আই এম হেল্পলেস।তোমার এই ইচ্ছে পূরণ করার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত কিন্তু আমি কাউকে আমার ইচ্ছে পূরণের দায়িত্ব দিতে পারি না।।তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছে আর পাগলামোগুলো আমার নিজেকেই পূরণ করতে হবে।।সেজন্য এটুকু পরিশ্রম তো করতেই হবে সোনা।
.
তাই বলে সারাদিন ভার্সিটি করে এখন, এতো রাতে…
.
উহুম.. এসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।আমি তো আছিই ভাবার জন্য।আমি অফিস থেকে বের হয়ে গেছি…আধাঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবো।। তোমার দায়িত্ব হলো আমার সামনে এসে তোমার মারাত্মক হাসিটা দিয়ে আমাকে আরেকটু পাগল করে তোলা।।হা হা হা।আমি চাই সবসময় হাসিখুশি থাকো তুমি…মাই লাভিং এঞ্জেল!!
.
থাক আসতে হবে না।কাল তো দেখা হবেই…আপনি বরং বাড়ি চলে যান।(মন খারাপ করে)
.
কেনো?(অবাক হয়ে)একটু আগেই তো পাগল হয়ে যাচ্ছিলে হঠাৎ কি হলো?
.
আমাদের বাসা তো উল্টো রাস্তায়….আপনার বাসায় পৌঁছাতে আরো লেইট হয়ে যাবে তাহলে।রেস্ট নিবেন কখন?কাল তো আবার ভার্সিটি আছে…
.
উফফো।।।আই উইল ম্যানেজ পুচকি।এতো পাকামো করতে হবে না আপনাকে…মহারানীর এক চিলতে হাসির জন্য জান হাজির!!!(হেসে)এবার রাখছি .. ড্রাইভ করবো তো…বাই।
.
আমি ফোন হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে আছি।।কেন জানি কান্না পাচ্ছে খুব।একটা মানুষ এতোটা পরিশ্রম কি করে করতে পারে?সকাল ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত ভার্সিটি…কখনো এর থেকেও দেরি হয়ে যায়…ল্যাব ট্যাব কতো ঝামেলা।।তারপর ৭ টা থেকে এতোরাত পর্যন্ত অফিসে কাজ করতে থাকেন।খাবারটা খান কখন উনি?একটু রেস্টের কি প্রয়োজন নেই উনার?এতো কিছুর পরও সবসময় মুখে হাসিটা ধরে রাখেন কিভাবে…কিভাবে সম্ভব??একটুও কি বিরক্তি নেই উনার?একটুও না??আচ্ছা উনি ডিনার করেছেন তো?জিগ্যেসই তো করা হলো না।।কথাটা মনে হতেই ছুটে গেলাম কিচেনে।কি রান্না করা যায় ভাবতেই মাথায় এলো বিরিয়ানির কথা।কিন্তু না দিন শেষে বিরিয়ানি একদমই ভালো খাবার নয়।।তাহলে কি সাদা ভাত??তাই ভালো হবে ভেবে ঝটপট রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে…চুলোয় বসালাম মাংস….অন্যচুলোয় মাছ ভাজি।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আর মাত্র ১২ মিনিট বাকি।।মাংস সেদ্ধ হয়ে এসেছে…মাছও ভাজা ভাজা প্রায়…ঠিক তখনই রুম থেকে পানি নিতে এলো মা…আমাকে রান্নাঘরে দেখে অবাক হলো।।ভ্রু কুঁচকে বললো-
.
মাঝরাতে এসব কি রোদ??
.
তেমন কিছু না মা।ঘুম আসছিলো না…তাই সময় কাটানোর জন্য রান্না করছি।।।রান্না করতে বেশ ভালো লাগছে….মা তুমি যাও তো বিরক্ত করো না প্লিজ।এমনি মন মেজাজ ভালো না।
.
আম্মু কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে পানি খেয়ে রুমে চলে গেলেন।আমি যেনো হাফ ছেঁড়ে বাঁচলাম। চুলোর আঁচ কমিয়ে দিয়ে ছুট লাগালাম রুমে।।আলমারি থেকে গোলাপী রঙের শাড়ি বের করে জড়িয়ে নিলাম গায়ে।চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক।।চুলগুলো হাতখোঁপা করতে করতে বিছানায় গিয়ে বসলাম।একদম ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি।।উফফ কি ছুট টায় না করলাম।।আনমনে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ চড়কগাছ…১০ মিনিট ওভার!!তাড়াতাড়ি ফোন খুঁজে হাতে নিতেই দেখি ফাইভ মিসডকল,, আবারও বেজে উঠতেই ঝটপট রিসিভ করে নিলাম-
.
রোদপাখি?ঘুমিয়ে গেছো?আমি কি চলে যাবো?তুমি বরং ঘুমাও…আমি..
.
এই একদম ঘুমিয়ে পড়ি নি।আপনি দাঁড়ান আমি এক্ষুনি আসছি ।জাস্ট ফাইভ মিনিটস।
.
ওকে আসো।
.
ফোনটা রেখে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে খাবারগুলো প্যাক করে…পা টিপে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম ।গেইট খুলে বেরুতেই দেখি গাড়িতে ঠেস দিয়ে হাত বাজ করে দাঁড়িয়ে আছেন উনি।গায়ে কালো শার্ট…হাতাগুলো ফোল্ট করে রেখেছেন,,হাতে কালো ডায়ালের ঘড়ি…টাই এর নাটটা ঢিলে করে উপরের দুটো বোতম খোলা…. পরনে এশ রঙের জিন্স।চুলগুলো একটু অগোছালো… মুখে ক্লান্তিমাখা হাসি।উনাকে দেখে কেনো জানি কান্না পেয়ে গেলো আমার।। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম….উনি ব্যাপারটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।কিছুক্ষণ পর মুচকি হেসে আলতো হাতে জড়িয়ে নিলেন আমায়….সাথে সাথে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি….আমার কান্নার শব্দ শুনেই চমকে উঠলেন উনি।।আমাকে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে অস্থির হয়ে বলে উঠলেন –
.
কি হয়েছে রোদপাখি?কাঁদছো কেন?কেউ বকেছে?কি হয়েছে শুধু বলো আমায়।।প্লিজ কেঁদো না…..আমি তো আছি রে বাবা….কে কি বলেছো বলো শুধু!! নাকি শরীর খারাপ??
.
আমি কিছু না বলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম উনাকে।সাথে সাথে বাড়লো কান্নার বেগ।উনি এবার জোড় করেই টেনে হালকা সোজা করে দাঁড় করালেন আমায়….গালে দু’হাত রেখে নরম গলায় বললেন-
.
কি হয়েছে বলো আমায়।।কেউ কিছু বলে…
.
উনি এটুকু বলতেই হুট করেই বলে উঠলাম আমি-“আই লাভ ইউ” আমার কথাটা কানে যেতেই যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলেন উনি।।অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন আমার মুখে….
.
#চলবে🍁

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *