তোকে চাই || সিজন -২ || Part_46 ❤ নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤

তোকে চাই সিজন ১ সকল পর্ব

তোকে চাই সিজন ২ সকল পর্ব 

💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔💔

#তোকে চাই❤
……. (সিজন-২)
#writer: নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤
#part:46
.
🍁
.
ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়লাম আমি।চারপাশের কিছুই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না আমার।চোখের পানিগুলোও শোক জানাতে নারাজ।আমাকে এভাবে বসে পড়তে দেখে ছুটে এলো রিসেপশনিস্ট…. কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলো –
.
ম্যাম আর ইউ ওকে?আপনি ঠিক আছেন?আপনার বাসার কাউকে জানাতে হলে প্লিজ বলুন আমায়….আপনার শরীর সুস্থ মনে হচ্ছে না।।
.
আমি কোনো কথা না বলে চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে আছি।।চোখে আমার শূন্যদৃষ্টি….মাথাও কেমন ফাঁকা!!মেয়েটা আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোনের টুকরোগুলো জড়ো করে…. টুকরোগুলো একের পর এক লাগিয়ে আবারও আগের মতো করে নিলো সেটা।।ফোনটা অন করতেই আবারও কেঁপে উঠলো সেটা।।মেয়েটা ফোনটা রিসিভ করে আমার কানে ধরে বললো কথা বলুন ম্যাম….আমি ফোন কানে নিয়ে ভাবলেশহীনভাবে বসে আছি।।ওপাশ থেকে ভেসে আসছে সাহেল ভাইয়ার উচ্ছ্বাসিত কন্ঠ…
.
কেমন আছো সানশাইন?তোমাদের দু’জনের কি হয়েছে বলো তো?কখন থেকে ট্রাই করছি বাট কাউকে পাচ্ছি না। জানো?দারুন একটা খবর আছে তোমাদের জন্য….এখানে আমার ফাস্ট সেমিস্টারে অসাধারণ ভালো রেজাল্ট করেছি আমি।।সাইশাইন??শুনতে পাচ্ছো??হ্যালো??
.
পরিচিত কারো গলার আওয়াজে কান্নারা বাঁধ ভাঙলো আমার।।নিজের অজান্তেই ফুঁপিয়ে উঠলাম আমি।।আমার কান্নার আওয়াজে উনি যেনো চমকে উঠলেন…. ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন –
.
কি হয়েছে সানশাইন?তুমি কাঁদছো কেন?শুভ্র কোথায়?শুভ্র থাকতে তুমি কাঁদছো? ইম্পসিবল!! আচ্ছা কেউ কিছু বলেছে তোমায়?তোমার শরীর ঠিক আছে তো?এই শুভ্র শালা করছে টা কি?বউ কাঁদছে তার খেয়াল নেই?আবার ফোনটাও অফ করে রেখেছে….ওকে তো আমি..
.
এটুকু বলতেই ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি।।আবারও মনে পড়লো…ডেড বডির কথা….দুনিয়াটা অন্ধকার লাগতে লাগলো আমার।।আবারও ধম বন্ধ হয়ে এলো আমার…কান থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে নিশ্চুপ বসে রইলাম….ওপাশ থেকে সাহেল ভাইয়ার চিন্তিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে ক্রমাগত..
.
সাইশাইন?শুভ্র ঠিক আছে তো?শুভ্র কোথায়?প্লিজ চুপ থেকো না…শুভ্র কোথায় বলো প্লিজ…ওর কিছু হয় নি তো?দোহায় লাগে কিছু বলো…আমি আর ভাবতে পারছি না সানশাইন.. আমার শরীর কাঁপছে…শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।।বলো না শুভ্র কই!!সাইনশাইন?হ্যালো?হ্যালো?ওহ শিট… ড্যামেড!!
.
ফোনটা না কেটেই হয়তো আছড়ে মারলেন উনি…একটা বিকট শব্দ এলো কানে….তারপরই আবারও শোনা গেলো সাহেল ভাইয়ার কন্ঠ…কাউকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন উনি।।কে হতে পারে?রুমমেট?
.
হেই হ্যারি?আই এম গোয়িং টু বাংলাদেশ।।ইট’স ইমার্জেন্সি… মাই ফ্রেন্ড ইজ ইন ডেঞ্জার… আই হেভ টু গো…. ক্যান ইউ ম্যানেজ আ ফ্লাইট টিকেট ফর মি?প্লিজ?
.
সাহেল ভাইয়ার বলা কথাগুলো কানে যাচ্ছে আমার কিন্তু ব্রেন যেনো কথাগুলোর অর্থ বুঝাতে ব্যর্থ হচ্ছে।।আমার চারপাশে ভাসছে শুভ্রর বলা কন্ঠ…”তুমিই তো আমার প্রাণভোমরা”…… “এই দেখো বউকে আমি এতো ভালো খবর একটা দিলাম কই সে খুশিতে নাঁচবে তা না মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে।আমি আসছি বলে কাঁদছো?? তাহলে কি আর আসবো না?এখানেই থেকে যাবো?”…….”বললেই হলো?তোমার শহরেই তো আমার বসবাস সুন্দরী….ওই শহরটাতেই রেখে এসেছি আমার প্রাণভোমরা.. তাকে ছেড়ে কি আমার চলে বলো?মরে যাবো তো…..”চারদিক থেকে যেনো শুভ্রর শরীরের গন্ধ কাবু করে চলেছে আমায়…ঝাপসা চোখে এখানে ওখানে ফুটে ওঠছে শুভ্রর হাসি মুখ আর তার বলা..” এই রোদপাখি?” আমি জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছি গলা শুকিয়ে কাঠ…চারপাশটা কেমন অচেনা লাগছে….খুব অপরিচিত লাগছে সব।।হঠাৎ করেই সামনে তাকিয়ে দেখি শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে।। পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে সে…শার্টের হাতা ফোল্ড করে ডানহাতেও ব্যান্ডেজ….কপালেও ব্যান্ডেজের মোটা পরদ।মুখে সেই বাঁকা দাঁতের হাসি।।সিল্কি চুলগুলো কপালে পড়ে কপালের ব্যান্ডেজটা ঢেকে গেছে অনেকটায়।।উনি হাত নাড়িয়ে হাসি মুখে কথা বলছেন মধ্যবয়স্ক এক ডাক্তারের সাথে….উনাকে দেখে উঠে দাঁড়ালাম আমি…ফোনটা আবারও নিচে পড়ে সিটকে গেলো।।আমি জানি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আমার হিলোসিনেশন তবুও আমার শুভ্র তো!!আমি কাঁপাকাঁপা পায়ে কয়েক পা এগিয়েই ছুটে গিয়ে উনাকে জড়িয়ে ধরলাম।।আমার ধাক্কা সামলাতে না পেরে কয়েকপা পিছিয়ে গেলো লোকটি।।তারপর সব নিস্তব্ধ… আমি চুপচাপ তার বুকের হৃদস্পন্দনের ঢিপঢিপ সংগীত শুনে চলেছি….কত পরিচিত এই সংগীত।।কতো পরিচিত তার ধারা।আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি…যেনো ছাড়লেই হারিয়ে যাবে বহুদূরে!!বেশকিছুক্ষন পর আমার পিঠে হালকা ভাবে হাত রাখলেন উনি।।হালকাভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় একটা চুমু দিয়েই বলে উঠলেন –
.
রোদপাখি?তুমি এখানে কি করছো?আর কি অবস্থা শরীরের…এভাবে কেউ বাইরে আসে?মানুষ তো পাগল বলবে বউ।
.
উনার মুখে “রোদপাখি” কথাটা শুনেই চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম আমি।।মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী ভরে উঠেছে আমার…. এতো খুশি…এতো আনন্দ কোথায় রাখবো আমি??এই খুশির মুহূর্তটা যেনো থেমে যায়….এই মুহূর্তে যেনো আমার মৃত্যু হয়….মৃত্যু হয়!!উনি আমাকে টেনে সোজা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই আঁতকে উঠলেন….অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বলতে যাবেন ঠিক তখনই একটা অল্পবয়সী মেয়ে এসে দাঁড়ালো রিসেপশনের সামনে।কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো….”শুভ্র!! এক এক্সিডেন্ট প পেশেন্ট শুভ্র আহমেদ?”রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অবাক হয়ে বললেন..”আপনি কে হোন উনার?” মেয়েটি কাঁপা গলায় বললো -“ওয়াইফ” রিসেপশনিস্ট মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা ফর্ম এগিয়ে দিয়ে বললো-
.
ম্যাম?ওইতো আপনার হাজবেন্ডের ডেড বডি রেডি আছে…. এটা ফিলাপ করেই নিয়ে যেতে পারেন উনাকে।।
.
মেয়েটা ফ্যাল ফ্যাল চোখে একবার রিসেপশনিস্ট আর একবার পাশে এনে রাখা লাশটির দিকে তাকালো।।তার সারা শরীর কাঁপছে…. ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে লাশটির মুখের কাপড় সরালো…আমি একদৃষ্টে মেয়েটিকে দেখছি….একদম পুতুলের মতো মেয়ে….কি সুন্দর তার চেহারা।।আমার থেকে বয়সে বড় হবে না…হয়তো সমবয়সীই হবে….আমি শুভ্রকে আবারও আকড়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকালাম…. যেনো এই মেয়েটি আমার শুভ্রটাকেই ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এখন।মেয়েটা কাঁপা হাতে লাশটির মুখে হাত ছোঁয়ালো…কপালে হালকা ঠোঁটের পরশ ছুঁইয়ে ধীর গলায় বলে উঠলো –
.
শুভ্র?এই শুভ্র? উঠো বলছি!!আজ না আমাদের বিবাহ বার্ষিকি…তুমি না বলেছিলে সারপ্রাইজ দিবে আমায়?এভাবে শুয়ে থাকলে হবে বলো??উঠো না…প্লিজজ!!
.
আমি শুভ্রকে জড়িয়ে ধরে আড়চোখে তাকিয়ে আছি।।মেয়েটার মাঝে যেনো নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি আমি।।আজ আমার শুভ্র বেঁচে গেলেও কোনো এক রোদের শুভ্র প্রাণ হারালো….এই মেয়েটাও নিশ্চয় কোন এক শুভ্রর রোদপাখি??তখনই মেয়েটির পরিবারের লোকজন এলো বলে মনে হলো।।তাদের মধ্যে একজন মেয়েটির কাঁধে হাত রেখে বললো-“নীর?মা শান্ত হো” মেয়েটা সেদিকে না তাকিয়েই ছেলেটির গালে হাত রেখে জাগানোর চেষ্টা করছে তাকে আর মুখে বলে চলেছে-“মা দেখো তোমার ছেলে কতো ফাজিল হয়েছে।।কেমন ফাজলামো করছে….আমার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করতে গিয়ে এখানে শুয়ে আছে।।একবার আমার প্রিন্সটা আসুক দুজন মিলে খুব করে বকবো তাকে।।আর তো ৮ টা মাস মাত্র….তারপর বুঝবে মজা….এই শুভ্র ওঠো না…”
.
আমি মেয়েটার পাগলামো দেখছি আর চোখ থেকে ক্রমাগত পানি ঝরছে।।শুভ্রর ছোঁয়ায় ঘোর কাটলো আমার…আমার গায়ে নিজের হাতে রাখা কোটটা পড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো -” দুদিনে নিজের কি অবস্থা করেছো রোদপাখি।।যার কারণে এক্সিডেন্টের খবরটাও তোমায় দেই নি….তবু ম্যাডামের এই অবস্থা।।আ…” শুভ্রর আর কোনো কথা কানে এলো না আমার।।চারদিককে অন্ধকার করে পরম শান্তিতে লুটিয়ে পড়লাম শুভ্রর বুকে।। আহ্ কি শান্তি!!কতো ক্লান্তির পর এই অবসাদ।।চারপাশের শব্দগুলোও আস্তে আস্তে ধীর হয়ে এলো আমার কানে…আমি হয়তো হারিয়ে যাচ্ছি কোনো এক অতল গহ্বরে…
.
#চলবে..🍁

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *