নিয়তির খেলা । একটি ইসলামিক গল্প

গল্পঃ নিয়তির খেলা
লেখিকাঃ জান্নাত
.
বউমা “পুঁটি মাছ দিয়ে জলপাইয়ের টক’ খুব ভালো করে রান্না করবে কিন্তু! তোমার শশুড় মশাই খেতে চেয়েছেন।’ আমি একটু ওই পাড়া থেকে ঘুরে আসি। আর হ্যাঁ শোন, ঘরটা ঘুছিয়ে রেখো, বৃষ্টিকে কাল বর পক্ষ দেখতে আসবে।
আরেকটা কথা তরকারিতে বেশি মশলা দিবেনা কিন্তু! পাতলা ঝোল দিবে, মজা করে রান্না করবে কিন্তু! টিভির সামনে বসে থেকোনা। আরেকটা কথা, প্রত্যেকটা বিছানার চাদর বালিশ পাল্টে দিবে। ঘর মুছে সিঁড়ি গুলো ঝাট দিয়ে রাখবে। পর্দা গুলো বাক্সে আছে, পুরাতন চেইঞ্জ করে নতুন খয়েরী কালারের পর্দা লাগাবে। উঠোন ঝাড়ু দিয়ে ঝকঝক করে রাখবে। মেহমান যেন বাড়িতে ঢুকেই বুঝে এটা বনেদী বাড়ি।”(শাশুড়ি)
–আচ্ছা মা আপনি যান কিন্তু একটা কথা ছিল! আমি কোনো দিন টক তরকারি রান্না করিনি আপনি যদি একটু মশলাটা দেখিয়ে দিতেন তাহলে খুব ভালো হতো!
–কি? কেন আমি দেখিয়ে দিব? বয়সতো কম হলোনা! আমার ছেলের মাথাটা যখন চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিলে তখন মনে ছিলনা, শশুড় বাড়ি গিয়ে রান্না করতে হবে? মরার একখান শশুড় বাড়ি পাইছে আমার ছেলে, একটা ফ্রিজ আর কিছু ফার্ণিচার ছাড়া কি দিয়েছে তোমার বাপে?
কিছু যখন আনতে পারনি তাহলে সব কাজ করে পুষিয়ে দিবে। (শাশুড়ি)
–মা কি বলেন এমব? আপনার ছেলে বিয়ে করে এনেছে আমাকে। আর প্রেম শুধু আমি একা করিনি আপনার ছেলেও করেছে! বাবা বিয়েতে রাজি ছিলনা কিন্তু আপনারাই বাবাকে জোর করে রাজি করিয়েছেন! এত্ত কিছু দিয়েছেন তাও আপনাদের মন ভরেনি?

[ads1]
— কি? আমার মুখে মুখে তর্ক?
এই যে বৃষ্টির বাপ কই গেলে? এদিকে এসো শাকচুন্নি বড় বেড়েছে! আজ এর বিচার না হলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাবো। খাবারতো কম খাওনা এক ছাড়ি খাবার খাও। তাহলে কাজ পারনা কেন?(শাশুড়ি)
–কি হয়েছে বউমা! তোমার গলা শোনা যাচ্ছে কেন? কাজ পারনা বিয়ে না করলেই পারতে! শাশুড়ির মুখে মুখে তর্ক করছো সাহসতো কম নয়? বেশি বাড়াবাড়ি করোনা বাপের বাড়ি পাটিয়ে দিব! একদম কোন কথা বলবেনা, মাথা নীচু করে থাকবে আর সংসারের কাজ করবে। (শশুড়)
–আমি তর্ক করলাম কখন? শুধু বলেছি তরকারিতে কতটুকু মশলা দিবো একটু দেখিয়ে দিতে! এটা কি আমার অপরাধ? আমি যদি আপনার মেয়ে হতাম তাহলে কি দেখিয়ে দিতেন না? আমার মা নেই তাই আপনাকেই নিজের মা মনে করি!
.
উফফ মা আমার চুল ছাড়েন! আমি ব্যথা পাচ্ছি, খুব বেশি ব্যথা পাচ্ছি! বিয়ে করে এসেছি প্রায় পনেরো দিন! একদিনও আপনাদের আগে খাইনি, সবার আগে আপনাদের খাইয়ে তারপর আমি খাই! কোনও দিন মাছ পাই আবার কোনও দিন পাইনা। তাতেও কোনও দিন আপত্তি করিনি! আমার খাওয়ার সময় ননদ দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। এতে যদি আপনি সুখ পান তাহলে তাই ঠিক।
.
দুপুরে আজানের সাথে সাথে নামাজ পড়তে পারিনা। অথচ দিব্বি আপনি সবার সাথে গল্প করেন আর পান চাবান। আজানের সময় একটু হাসাহাসি কম করলে কি হয়? বিয়ের আগে বাবুকে জিজ্ঞেস করেছি ফ্যামিলির সবাই নামাজ পড়ে কি না! কিন্তু ও বলতো আরে ছাড়োতো তুমি আছোনা! তুমি সবাইকে নামাজের দাওয়াত দিবে, সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়বে।
–কি বললি নামাজ? নামাজ ওল্লির ঘরের নামাজ উল্লি, তুই আমাকে শিখাবে নামাজ? আহা কোত্থেকে হজ্ব কামাই করে এসেছেন নবাবজাদী! যা এক্ষুনি বাইরে বেরিয়ে যা। (শাশড়ি)
–রান্না করে আমি বাইরে গেলাম অজু করতে এই ফাঁকে শাশুড়ি ঘরে তালা দিয়েছেন! আল্লাহ আমি কোথায় আসলাম? এটা কোন জগৎ? নামাজ পড়া কি অন্যায়? বাবুকে দেখে খুব ভদ্র মনে হয়েছিলো! কিন্তু আজ আমার চোখে বর্ষিত হচ্ছে লজ্জার বারুদ আর মনে জ্বলছে ঈমানের জিহাদ! আমি খুব বড় ভুল করে ফেলেছি এমন একটা ফ্যামিলির ছেলেকে ভালোবেসে। আজ ঘরে আমার জায়গা হয়না। বাহিরে কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে আমার কাঁপুনি, শীতের পোষাক ও নেই গায়ে! লাকড়ির ঘরে খরের গাঁদায় মাগরিব তারপর এশার নামাজ পড়ে বসে বসে তসবীহ জপছি। আল্লাহর কাছে ওদের হেদায়েতের জন্য মোনাজাত করে সিজদায় অবনত মস্তকে ইসলামের শান্তির রোদনে নিজেকে শপে দিয়েছি! আল্লাহর কাছে আমার ভুলের হেফাজত কামনা করছি।
–হঠাৎ আমার নাম ধরে কে যেন ডাকছে! সিজদাহ থেকে মাথা তুলে মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছি কে ডাকছে! সারা বাড়িময় কান্নার রোদন বিলাপ। বাবু কাঁদছে আমাকে ডাকছে। অফিস থেকে ফেরার পথে এ্যাক্সিডেন্ট করে মাথায় আঘাত আর পায়ে ভীষণ ব্যথা পেয়েছে। সবাই উঠোনে বাবুকে ধরে আছে কিন্তু বাবু আমাকে ডাকছে! আমি আর থাকতে না পেরে নিজের স্বামীর ডাকে সাড়া দিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাবুকে ঘরে নিয়ে শুয়ালাম। শাশুড়ি তেরে এসেছে আমাকে মারতে।
–এই তুই আমার ছেলেকে ছুঁবিনা! যা বেরিয়ে যা! তুই কোন সাহসে আবার ঘরে এলি? এখন তুই বাপের বাড়ি চলে যাবি!(শাশুড়ি)
–আহ মা কি করছো? তোমাদের কি কোন বোধ, বুদ্ধি নেই? আমার এই অবস্থায় তুমি এমন করছো! আমি অসুস্থ কোথায় আমাকে সুস্থ করার জন্য চেষ্টা করবে তা না করে চিল্লা চিল্লি করে আমাকে আরো অসুস্থ করে দিচ্ছো! যাও কাল থেকে আর বাড়ি আসবোনা। এতো খাটা খাটনি করে বাড়ি আসি এখানেও শান্তি নেই। (স্বামী)
–ওহ বুঝছি এখনতো বউয়ের হয়ে কথা বলবি! মা এখন পর হয়ে গেছি। এই চল বাুবুর বাপ ঘরে যাই। (শাশুড়ি)
–যাবেন না মা! একটু দাঁড়ান, আপনার ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না। আপনারা চলে গেলে উনি কষ্ট পাবেন। উনার এখন শরীর ভালোনা দয়া করে সবাই মিলে খেয়ে নিন। আমার জন্য চিন্তা করবেন না আমি কাল সকাল হলে বাড়ি চলে যাব।
আমি টক রান্না করেছি বাবার জন্য। যদিও আপনার মত এতো ভালো রান্না করতে পারিনা তবু চেষ্টা করেছি, খুব স্নেহের মায়া দিয়ে তরকারি রান্না করেছি। আমিতো কাল সকালেই চলে যাবো। আমার ইচ্ছে ও শেষ আবদার আপনাদের সবাইকে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াবো। আপনার ছেলের পছন্দের মুগডাল, আর ননদীর প্রিয় ফুলকপি আর টমেটো দিয়ে বড় মাছের মাথা রান্না করেছি, বাবার জন্য টক, আপনার জন্য সুটকী ভর্তা! সবাই তৃপ্তি সহকারে খান আমি দেখে ধন্য হই।
.
–ঠিক আছে ভাত আনো বউমা।(শশুড়)
–খুব রস এসেছে জীভে তাইনা? খাও আখেরী খাওন খাইয়া লও।(শাশুড়ি)
–আহ মা, বাবাকে এমন করে বলছো কেন? বলছেতো ভাবী কাল বাপের বাড়ি চলে যাবে। তাহলে আর রাগ করছো কেন? চল সবাই মিলে খেয়ে নিই। (ননদ)
–ঠিক আছে বাবা আপনি এবং মা একসাথে বসুন আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি।
জগ ভরে পানি আর গ্লাস সামনে দিয়ে আল্লাহ কে মনে মনে ডাকছি,”হে আল্লাহ খাবার খেয়ে যেন সবাই সন্তুষ্ট হয়।”
–দারূণ বউমা! খুব ভালো হয়েছে রান্না!
এই বৃষ্টির মা খাও খাও খেয়ে দেখো খুব মজা হয়েছে! কিরে বৃষ্টি ফুলকপির তরকারী কেমন হলো? জলপাইয়ের টক যা মজা হইছে বউমা! কি আর বলবো এই জীবনে এমন মজার টক তরকারী আর খাইনি! সত্যি বলছি মা মুগডাল ও খুব মজা হয়েছে। শোন বউমা বাপের বাড়ি আর যাওয়া হবেনা তোমার! কাল বৃষ্টিকে দেখতে আসবে বর পক্ষ। তুমি নিজ হাতে রান্না করে তাদের রসনা তৃপ্তি দিবে কিন্তু!(শশুড়)
–তার মানে তুমি কি বলতে চাও এর আগে টক রেধে খাওয়াইনি তোমাদের? কোনও দিন মজা হয়নি বুঝি!
বাবুর বাপ হঠাৎ এত প্রশংসা তোমার মুখে বিষয়টা কি?
ঘুষ খাওনিতো তুমি?
(শাশুড়ি)

[ads2]
–আরে কি যে বল ঘুষ খাব কেন? কোন কিছু ভালো হলে ভালো বলতে হয়। না হয় উপর ওয়ালা নারাজ হয়। এই বৃষ্টি বউমা থেকে রান্নাটা শিখে নিস। (শশুড়)
–শোন আমি বিয়ে করে রান্না করতে যাবোনা যে শিখতে হবে! আমি রান্না ঘরেই যাবোনা। যদি কেউ কিছু বলে সোজা বাপের বাড়ি চলে আসবো।(ননদ)
–কি বললি? তুই কিসের চাকরী করিস রান্না ঘরে যাবিনা? এত অহংকার ভালো নয় কিন্তু! মেয়েদের এত উশৃঙ্খল হলে চলেনা! বিয়ের পর দু’একদিনের জন্য বেড়াতে আসতে পারবি। তাছাড়া আসবিনা। (বাবু)
–দেখেছো মা দাদা কি বলে! আমি নাকি বাড়ি আসতে পারবো না! এই দাদা দেখ তাহলে কিন্তু আর বিয়েই করবোনা!(ননদ)
–সুপ্তি এত মজা করে কিভাবে রান্না করলে? সবগুলো পদ ই মুখরোচক হয়েছে! আর টকটা জাস্ট ফাটাফাটি হয়েছে। সবার খাওয়া শেষ এবার খেয়ে নাও তুমি! (স্বামী)
আমার স্বামীর কথা শুনে শাশুড়ি মা খুব একটা খুশি হননি! তিনি চোখ দু’টো লাল করে দ্রুত পা চালিয়ে বড় ঘরে চলে গেলেন। দেখেই বুঝতে পারছি এই প্রশংসার প্রতিশোধ উনি ঠিক নিবেন।
উনাদের যাবার পর আমি অল্প খেয়ে স্বামীর পাশে এসে বসলাম। আমি কি করে খাই বলুন! যে ঘটনা আজ ঘটেছে
তারপর আর খাওয়ার রুচী থাকেনা। আমি বাবুর কপালে আস্তে করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আমার অন্তর ফেটে কান্না আসতেছে আর তার ই সুবাধে দু’ফোটা চোখের জল ওর কপালে গড়িয়ে পড়লো।
–আরে পানি কোত্থেকে আসলো! হঠাৎ কান্নাটা সুরে পরিণত হলো। কোন ভাবেই আটকাতে পারছিনা। ও বার বার বলে কি হয়েছে বল? কিন্তু আমি নির্বাক! কারণ পরিবারটাকে আমি ভালোবাসি। শাশুড়ি মায়ের এমন অত্যাচারের কাহিনী আমি বাবুর কাছে বলতে চাইনা। মায়ের এহেন অচরণে ছেলে কষ্ট পাক তা আমি চাইনা।
অনেক আশা নিয়ে শশুড় বাড়িতে এসেছি সবাইকে নিয়ে এক সাথে থাকবো বলে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আমার কপালে বোধ হয় আর সংসার করা হলোনা।
বাবুর প্রশ্নের জবাব দেইনি। শুধু একটু কেঁদে মনটাকে হালকা করেছি। অামার ব্যথা বাবু কিছুটা বুঝে কিন্তু জন্মধাত্রী মা তাই হয়ত অনেকটা এড়িয়ে যায়। আজ বাবু অনেক ব্যথা পেয়েছে তারপরও সে আমাকে তার বুকের পাশে টেনে নিয়েছে। আস্তে করে কপালে উষ্ণ চুমু এঁকে দিয়ে বলল,” আমি জানি আজ তোমার উপর দিয়ে কোনও বড় ঝড় বয়ে গেছে! তুমি আমাকে সংসার ভাঙ্গার ভয়ে বলছোনা।”
সুপ্তি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম তার থেকে অনেকটাই বেশি। (স্বামী)
মনে মনে বলি আর মায়া বাড়িওনা। কাল সকাল হতেই আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে! তা না হলে তোমার মায়ের হাতে আমার জীবন দিতে হবে। আমিও ওকে আদরের শেষ চুমুটা দিয়ে ঘুম পারিয়েছি। স্যুটকেস ঘুছিয়ে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। কারণ আমার শাশুড়িকে আমি চিনি। উনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না। কারণ টা অবশ্য আলাদা! উনি নিজের ভাইয়ের মেয়েকে বাবুর সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবু আমাকে বিয়ে করায় এ আশা গুড়েবালি।
আজ রাত আর ঘুম হবেনা। কি করবো বুঝতে পারছিনা। এত অশ্বস্তি হচ্ছে কেন? বাবুর ঘুমন্ত মুখটা দেখছি। কত নিষ্পাপ দেখাচ্ছে! আসলেই নিষ্পাপ খুব ভালো মানুষ। বাবুর পায়ের কাছে বসে সালাম করে নিলাম। ফজরের নামাজ পড়ে তসবীহ পাট করছি! আর আমার চোখে বইছে শ্রাবনের ধারা! কিভাবে থাকবো বাবুকে ছাড়া?
ভাবতে ভাবতে কিছুটা পরিষ্কার হলো দিনটা। এখন যাওয়া যাক তাহলে! মোনাজাতে বাবুর সুস্থতা কামনা করে স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। চারদিকে ঘেরা ইটের দেয়াল পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম কিন্তু কোনো গাড়ি পাচ্ছিনা। কিছুটা অন্ধকারে চৌরাস্তার মোড় না পেরুতে পারলে যে সবাই দেখে ফেলবে। আমার জন্য শশুড় বাড়ির মান ইজ্জত নষ্ট হোক তা আমি চাইনা।
হঠাৎ একটা গাড়ির আওয়াজে সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলাম সি এন জি। ব্যস পা বাড়িয়ে উঠতে যাবো হঠাৎ পিঠে কারো স্পর্শ! তাকিয়ে দেখি বাবু আমার কাঁধে হাত দিয়ে ধরে রেখেছে। আমি আর যেতে পারিনি। একটা থাপ্পর খেয়ে বাবুকে জড়িয়ে ধরেই কান্না শুরু।

[ads2]
এটাই বুঝি সম্পর্ক! এটাই বুঝি ভালোবাসা!
–তুমি কি ভেবেছিলে আমি ঘুমিয়ে গেছি? না সোনা আমি ঘুমাইনি। যখন চোখের দামী অশ্রু তোমার চোখ থেকে নির্গত হয়ে আমার গালে এসে জানান দিলো তুমি ভালো নেই। তখন কি আর আমার ভালোবাসার মানুষটিকে রেখে সুখের ঘুম আসে?
তবে একটা কথা কোন কিছু আড়াল করা ঠিক না। ছোট ছোট অন্যায় ধামা চাপা দিতে দিতে একদিন সে ডাকাতে পরিণত হয়। তখন আর পাপ মুক্তি পায়না হয়ে ওঠে আস্থ একটা পাপী শয়তান! তাই শয়তানকে বাড়তে দেয়া যাবেনা তার গলাটা অচিরেই কেটে মূখোশ সরিয়ে আসল মানুষটাকে বের করতে হবে। আর সে মূখোশ যদি আপন জনেরও হয়। তাও সে ছেড়ে কথা কইবেনা।
আসরের আযান পড়েছে অজু করে নামাজ পড়বো! বারান্দায় পুকুরের জল ভরে বালতি রাখা থাকে। বড় মগ দিয়ে পানি নিয়ে জলচৌকিতে বসে অজু করছি! হঠাৎ মুখে পানির ঝাপটা দিতেই চোখে এমন জ্বালা ধরেছে চিৎকার দিয়ে বারান্দায় চোখ বন্ধ করে চেচাচ্ছি। কে শুনে কার কথা! শশুড় মশাই কি হয়েছে বলে দৌড়ে এলেন! স্বামীতো রেগে আগুন কে করেছে এই কাজ? বালতির পানিতে মরীচের গুড়ো মিশিয়ে রেখেছে। বাবুর বুঝতে আর বাকী নেই এই জঘন্য কাজটা কার কাজ। তাড়াতাড়ি পুকুরে নিয়ে চোখে পানি দিচ্ছে কিন্ত জ্বালা কমছেনা। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে ঘুমের ইনজেকশন আর চোখের ঔষধে দিয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছে! কখন ঘুমালাম ঠিক বলতে পারবোনা।
দুইদিন খুব ঘুমিয়েছি কিছু বলতে পারবোনা। বাবু অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আমার সেবা করেছে। আমার এই অবস্থায় বৃষ্টিকে দেখতে আসা আর হলোনা। আমি ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে বাবু আমাকে খাইয়ে দিলো। কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল সুপ্তি আস্তে আস্তে জিনিস পত্র ঘুছিয়ে নাও তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাবো। কথাটা শুনার সাথে সাথে আমার বুকে কেমন যেন চিন চিন ব্যথা অনুভব করলাম। আমি তড়িৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসলাম! কি হয়েছে বাবু এমন বলছো কেন? বাবা, মা, বৃষ্টিকে ছেড়ে আমি একা ঐখানে খাকবো কি করে? কথাটা শুনে বাবু খুব রেগে গিয়ে বলল, তাহলে থাক এখানে পড়ে পড়ে মার খাও, আমার কি? তবে একটা কথা ভবিষ্যতে কিছু হলে আমাকে বলতে পারবেনা।” আমার ভয় হচ্ছে কিভাবে বাবুকে শান্ত করি! ও বাবা মাকে ডেকে বলছে, আমি বৃষ্টিকে নিয়ে শহরে চলে যাব। আমি প্রতিদিন ওকে পাহারা দিতে পারবোনা। ছুটি পাইনা তাও অনেক বলে কয়ে দুই দিনের ছুটি নিয়েছিলাম।
আমি বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও ওকে রক্ষা করতে পারিনি চলে গেলে কি হবে বুঝতে পারছি। বালতির পানিতে মরিচের গুড়ো কে মিশিয়েছে বলো? আর না হয় কালই সবকিছু ছেড়ে শহরে চলে যাবো আর কোনও দিন বাড়ি আসবোনা।
–বাবা, হ্যাঁ বাবু আমিও যাবো তোর সাথে। বউমাকে আমি দেখে রাখবো।
–মা, হুমম যাও যাও সবাই চলে যাও। আমাকে একা ফেলে সবাই চলে যাও। আমিতো তোমাদের জন্য কিছু করিনি! সব করেছে পরের বাড়ির মেয়ে!
–আহা চুপ কর মা! পরের বাড়ির মেয়েতো তুমিও একদিন ছিলে! তাই বলে কি আমার দাদু তোমাকে মরীচের গুড়ো দিয়েছিলো চোখে? চুলের মুঠি ধরে ছিলো কোনও দিন? সুপ্তি কি করেছে তোমার সাথে? আমার কাছে বিচার দিতে পারতে আর না হয় বাবার কাছে বিচার দিতে পারতে। তুমি যে কাজটা করেছো আদালকে কেইস করার দরকার ছিলো! তখন কোথায় থাকতো মান সম্মান?
শুধু নামাজের কথা বলেছে তাইতো? নামাজ পড়না কেন.? তোমার মেয়েকেও নামাজ শিক্ষা দাওনি! আল্লাহর কাজ করনা কেন? তোমাকে আমার
মা ডাকতেও ঘৃণা হচ্ছে। গ্রামটা ঘুরে দেখ এমন নামাজি বউ আরো দু’ চারটে পাও কি না! তোমার তো আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করার কথা। তোমার মত বয়সের এমন মহিলা নামাজ তাসবীহ নিয়ে থাকে। আর তুমি কিনা বাজে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকো।
–মা, বাবু আমি তোর মা। তোকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি আজ তুই বাইরের মেয়ের সামনে অপমান করলি? জীবনে তুই কোনদিন সুখী হবেনা। যা যেখানে পারিস চলে যা। আমি আর কোন দিন তোর চেহারা দেখতে চাইনা।
–মা প্লিজ আপনি রাগ করবেন না। আপনার ছেলের অমঙ্গল হবে, অভিশাপ দিবেন না। আমি আপনার পায়ে পড়ছি, দয়া করে আপনি রাগ করবেন না। আপনি শুধু নামাজ পড়বেন আমি আপনাকে বসিয়ে খাওয়াবো। রান্না বান্না সব আমি করবো। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না।
–মা, এই মেয়ে পা ছাড়ো বলছি আমি সব বুঝি আমাকে বসিয়ে দিয়ে তুমি সংসার দখল করতে চাও। এটা কখনো হবেনা।
আমি আমার সংসার কারো হাতে দিবোনা। যেখানে ইচ্ছা চলে যা তোরা।
–ঠিক আছে সুপ্তি এখন আর কোনো বাধা রইলোনা। কাল সকাল সকাল যেতে হবে আমাদের। আরেকটা কথা সুপ্তি বড় কোনো জিনিস নিবেনা সাথে শুধু কয়েকটা কাপড় চোপড় ছাড়া কিছু নিবোনা সাথে। খারাপ হলেেও উনি আমার জন্মধাত্রী মা। আমি চাই সব সংসার আমার মায়ের হাতে থাক। উনার কাছে ভালোবাসার কোনও মূল্য নেই, উনি সংসার নিয়েই থাকুন।
.
–গাড়ি সকালে গেইটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার চোখে শ্রাবনের বারি ঝরছে, বুকটা কাঁপছে মাকে ছেড়ে যাবো যেন ভাবতেই পারছিনা! যাক তবু যেতে হবে, কারণ উনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না। যাই শেষ সালামটা করে আসি, মা পা দুটো দিন সালাম করবো।
–মা, এই মেয়ে যাও এখান থেকে আর অভিনয় করতে হবেনা। একটা রাক্ষুসী মেয়ে মানুষ আমার সংসারটাকে ধ্বংস করে দিলো।
–ননদকে বুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম, তুমি যাবেতো আমার ওখানে? সেও কেঁদে বিদায় দিলো! বাবা যখন গাড়িতে ওঠে তখন আমার শাশুড়ি মা এমন কান্না করছে যে কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে গেলেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে মায়ের সেবায় লেগে গেলাম। আর শহরে যাওয়া হলোনা। এর পর থেকে শাশুড়ি নামাজ পড়তে শুরু করে দিলেন!
“দরদ দিয়ে কোনও কিছু আল্লাহর কাছে চাইলে হয়তো খালি হাতে ফেরান না উনি! আল্লাহ সবার মঙ্গল করুণ।”
সমাপ্তি

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *