পরশ পাথর ! সত্যি কারের ভালোবাসার গল্প

পরশ পাথর 2nd

‘প্যা পু করতে করতে পুলিশের গাড়ি এসে থানার ভিতরে গিয়ে থামলো।দু’চোখে প্রচন্ড ঘুম,তাই গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দুটি জুড়িয়ে এসেছে বুঝতেই পারি নি। পাশে থাকা কন্সটেবল এর ঝাড়ি মারার শব্দতে চোখ খুলে তাকালাম।

—”এই যে স্যার দয়া করে গাড়ি থেকে নামেন।

বেশিক্ষণ গাড়িতে থাকলে এই সম্নান টুকু আর পাবো না।তখন আপনি থেকে তুই বলে সোজা শার্টের কলার চেপে ধরে নামাবে। তাই তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম।

পিছন থেকে অন্য একটা পুলিশ বলে উঠলো।

—ভিতরে চল,বড় স্যার তোকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

‘এ কোন মহাঝামেলার ভিতরে পড়লাম।সামান্য একটা ইস্যুকে টেনে টুনে এতদুর অবধি আনলো।আসলেই এদের কোনো কাজকাম নেই।আর সেই কারণে আমার মত নিরিহ মানুষগুলোদের ধরে এনে রামধোলাই করে।
যাই হোক,জীবনে বড় ধরনের একটা এডভেঞ্চার সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। স্বচক্ষে কখনো থানার ভিতরের নির্মম পরিবেশটা দেখা হয় নি।আজকে মনে হয় সেই সৌভাগ্যটা হবে।তাও আবার নিজেকে দিয়ে।
ভিতরে ঢুকতেই থানার বড় স্যার আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালো।টেবিলের উপর বসে একটা ফাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলো।সম্ভবত আনসলভ কেস হবে হয়তো।আমাকে দেখে ফাইলটা পাশে রেখে দিয়ে তাঁর কাছে ডাক দিলো।শান্ত হয়ে পা টিপে টিপে তার কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে দাড়ালাম।
বড় স্যার আমাকে দেখে গম্ভীরস্বরে বলে উঠলো।

—”অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ,এসব বাদ দিয়ে সোজাসোজি বল।এই মধ্যরাতে তুই রাস্তাতে কি করছিলিস?

— “স্যার আকাশের তারা গুনছিলাম।একা একা তারা গুনেছেন কখনো।না গুনলে একদিন গুনে দেখবেন।সব চিন্তা একবারে অবশন নিবে।

আমার কথা শুনে স্যার চেয়ার টা ঝাকি দিয়ে রাগান্বিত ভাবে বলে উঠলো।

—”এইটা দেখেছিস।(লাঠি নাড়তে নাড়তে)এটাকে বলে যাদুছড়ি।পিঠে দুটো পড়লেই তরতর করে সব সত্যি বলে দিবি।

—”স্যার আপনার লোক তো আমাকে সার্চ করেছে,সন্দেকজনকভাবে তেমন কিছুই পাই নি।আর আমি নেশা-টেশা করি না।

—”তাহলে এতো রাতে রাস্তাতে কি করছিলিস?

— “আসলে একজনকে রক্ত দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম তখনি আপনার লোক তুলে নিয়ে এসেছে।

‘আমার কথা শুনে দারোগা সাব জোরগলাতে বলে উঠলো।

—”মহা ত্যাদড় ছেলে,স্যার।ইনিয়ে বিনিয়ে এমনভাবে মিথ্যে বলবে বুঝারই উপাই নেই। আমাদেরকেও মিথ্যে বলে টুপি পরাতে চেয়েছিলো কিন্তু পারে নি।

—”স্যার,আমি দারোগা সাবকে মিথ্যা বলেছিলাম যাতে ছেড়ে দেয়।কিন্তু এখন যা বলছি পুরোটাই সত্যি।আপনার বিশ্বাস না হলে জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ২১১ নং কেবিনে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। তাকেই রক্ত দিয়ে ফিরছিলাম। ওসি স্যার আমার কথা শুনে হাসপাতালে ফোন দিয়ে ব্যাপারটার সত্যতা যাচাই করে নিলেন।

তাঁর মুখ দেখে বুঝে নিলাম,কাজ হয়েছে।

— “এই ছেলেটা ঠিকি বলেছে।তাকে ছেড়ে দাও।

‘ইচ্ছে ছিলো থানাতে একরাতের জন্য হলেও থাকবো,কিন্তু ব্যার্থ হওয়ার কথা চিন্তা করে, ওসি স্যারের কথা শুনে তাড়াতাড়ি বললাম।

—”স্যার আমাকে আজকের রাতটা আপনাদের হাযতে রেখে দিন।আমার না অনেকদিনের সখ একটা রাত পুলিশের হাযতে থাকবো। আজকে যখন সেই সুযোগ পেলাম তখন আর হাত ছাড়া করতে চাই না।

—”না,তাই হই না।একজন নিরাপরাধ মানুষকে আমরা হাযতে ঢুকাতে পারবো না।এটা করলে আমাদের আইন ভঙ্গ করা হবে।

(কতটা যে আইন মেনে চলেন আপনারা ভালো করে জানা আছে।)
বিড়বিড়িয়ে।

— “প্লীজ স্যার।এই অধমের একটা ছোট্ট ইচ্ছা পূরন করেন।

দারোগা সাব আবার হুংকার দিয়ে বললো

.—”দেখছেন স্যার বলেছিলাম না এই ছেলে মহাত্যাদড়।সবাই জেল দেখে ভয় পাই আর সে তাঁর ভিতরে থাকতে চাইছে।

— “দেখেন স্যার তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বকেয়া থাকার কারণে বাড়িওয়ালা তার বাড়ি থেকে বার করে দিছে। এমনিতেই রাতে থাকার জায়গা নেই,তারউপর আবার অনেক রাত,বাইরে ঠান্ডাটাও বেশ পড়েছে। প্লীজ স্যার একটারাতের জন্য আসামি ভেবে থাকতে দিন না।

বড় স্যার কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো।

—”আচ্ছা। ঠিক আছে,তবে হাযতের ভিতরে নই তোমাকে এই বেঞ্চে থাকতে দিতে পারি। তবে কাল ভোরে ভোরেই কিন্তু চলে যাবে এখান থেকে।

যাই হোক থানার ভিতরে তো থাকতে পারবো।তাই বাড়াবাড়ি না করে রাজি হয়ে গেলাম।ভাগ্যটা বেশ ভালোই বলা যেতে পারে।থানাতে এসে জ্বামায় আদর না পেলেও শুকনো একটা বিস্কুট আর এক কাপ চা মিললো।চা খেয়ে চুপটি করে বেঞ্চে বসে রইলাম।। থানার ভিতরটা ভালো করে দেখছি। বড় স্যারের পিছনে একটা বড় সাইনবোর্ড,সেখানে কয়েকজন মানুষের ছবি লাগানো আছে।সিনেমাতে দেখেছি যারা ভয়ংকর রকমের সন্ত্রাসী হয় তাদের ছবিগুলো পরিচয় সহ ছবি দিয়ে গাঁথানো হয়।

—”ইশ আমিও যদি ওদের মত হতে পারতাম।রোজ কত পুলিশ আমার পিছনে পাগলা কুত্তার মত দৌড়ে বেড়াতো।

‘ যাই হোক কালকে থানা থেকে বার হয়ে আরেকবার হাসপাতালে যেতে হবে। রিদিতার বাবা কেমন আছে দেখার জন্য।

সকাল হওয়ার সাথে সাথেই একজন পুলিশ এসে ঘুম থেকে ডেকে দিলো।

—এই উঠ,সকাল হয়ে গেছে।

ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলাম থানার ভিতরে বেঞ্চে সুয়ে আছি।
যাক তাহলে একটা রাতের জন্য হলেও তো থানার ভিতরে রাত কাটাতে পেরেছি।

থানা থেকে বের হয়ে আসলাম।নিজেকে কেমন জানি সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে।কিন্তু ছিপছিপে শরির দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না। যাই হোক সকালের দিকেও শহুরের রাস্তা গুলো য্যাম। বেলা বাড়তে গাড়ির আর সকালে ভুঁড়িওয়ালা মানুষগুলোর। উফপপ কেন যে এরা এতো খাই।খেয়ে খেয়ে ভুড়িটা এমন বানিয়েছে দেখে মনে হচ্ছে এক একজন আস্তো ড্রাম পেটে বেঁধে দৌড়াচ্ছে।
পেটটা ক্ষুধাতে চো চো করছে,কাল দুপুরের পর থেকে পেটে ভাত পড়ে নি।শুকনা খাবার খেয়েই কাটিয়েছি। তাই ভাত খাওয়াটা আমার জন্য খুবই জরুরি। রাস্তার পাশে থাকা হোটেলে ঢুকে বললাম।

— “মামা এক প্লেট ভাত দিন তো।

আমার কথা শুনে হোটেলের লোক চোখগুলো বড় বড় করে তাকিয়ে বললো..

— “মামা এখন ভাত খাবেন।

— “হ্যাঁ,কেন?

—”না,আচ্ছা ঠিক আছে।

বলেই চলে গেলো ভাত আনতে। আমি হাত মুখ ধুয়ে চেয়ারে বসে আছি।আশপাশের সবাই দেখি গরম গরম পরোটা আর ডাউল খাচ্ছে। হয়তো লোকটার বড় বড় চোখ করে তাকানোর কারণ এটাই হতে পারে। যাই হোক,সকালে পেট ভরে ভাত খেয়ে নিলে সারাদিনটা চা-বিস্কুট দিয়ে সেরে ফেলতে পারবো।

ওয়েটার একপ্লেট ভাতের সাথে আলু ভর্তা আর সবজি নিয়ে এসে দিয়ে গেলো। এদিক ওদিক না তাকিয়ে খেতে লাগলাম।প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে,এক প্লেটে কিচ্ছু হবে না।তাই আরো এক প্লেট আনতে বললাম। খাবার শেষে হোটেল মালিককে বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম। আহ্ পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা।

একবার ভাবলাম অবন্তিকাকে ফোন দেয়,কিন্তু নংটা গোড়াগোড়ির মতই বন্ধ দেখাচ্ছে।
হয়তো যোগাযোগ করবো ভেবে সিমটাই চেঞ্জ করে ফেলেছে।
থাক আর বিরক্ত করবো না তাকে। সে তার নতুন জীবনে সুখে থাকুক।

এখন একটা বার হাসপাতালে যাওয়া দরকার।
তাই রাস্তার ধারে দাড়িয়ে বাস গুলো দেখতে লাগলাম।
সকালের বাস গুলোর চেহারা অনেকটা আমার মত,রুচিতে বাঁধে।
নেহাত টাকা কম লাগে তাই গরিব আর মধ্যবিত্তরা এই বাস গুলোতে চলাচল করে।।
তা না হলে এগুলো কবেই ভাঙ্গা দরে বিক্রি হয়ে যেতো। সাতপাঁচ না ভেবে বাসে উঠে গেলাম।হাসপাতালে যেতে হবে।রিদিতার বাবাকে একপলক দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।কারন গতকাল রাতে তাড়াহুড়োর কারণে দেখা হয় নি।

‘ ঢাকা সেনানিবাসের কাছে যেতেই বাস হতে নেমে পড়লাম।কারণ এখানেই রিদিতার বাবা আছে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা বেশ দৃষ্টিনন্দন ভবন।রাতের আঁধারে তেমন ভাবে হাসপাতালটিকে দেখা হয় নি।এখানে রাত-দিন সবই সমান।প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অসুস্থ্য মানুষে আগমনের কারণে একটা গমগম ব্যাপার কাজ করে সবসময়।
কিন্তু এতো রুম আর মানুষের ভিতরে রিদিতাকে খুঁজে পাবো কি করে।তাকে তো একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে। গতকাল রাতে তাদের জন্যই আমাকে পুলিশ মামারা ছেড়ে দিছে।নইতো জ্বামায় আদরের নামে শরিরে হাড় গুলো এক এক করে ভাঙ্গতো।

নিচে থাকা রিসিপশন রুমে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে বসে আছে।মেয়েটা অনেকটাই অবন্তিকার মত দেখতে।

“ধুর রিসিপশন রুমের দায়িত্ব মেয়েদের কেই কেনো দিতে হবে।রিদিতার খোঁজ না নিয়ে একরকমের বিরক্তিভাব নিয়ে চুপ চাপ দাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।
ঝমঝলে রোদ খেলা করছে,সাথে মৃদু বাতাস।বাইরে থাকা হাসপাতালে প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়াচ্ছে অনেক রোগি। হাসপাতালে আমি তেমনভাবে কখনো যাই না।কারণ এখানকার মেডিসিন আর রোগিদের একটা গন্ধ্য আমার দম বন্ধ করে দেয়।কিন্তু আজকে তেমন কিছুই মনে হচ্ছে না।বাইরে ঘুরতে থাকা প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকার লড়ায়ে জয়ী হওয়ার আনন্দ দেখে অবাক হচ্ছি।
আসলেই তো,জীবন তো একটায়।আর এই জীবনটাকে ছোট্ট একটা ভুলের কারণে নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।একটা জীবনের যে কতটা মূল্য সেটা হয়তো এখানে না আসলে কখনো বুঝতেই পারতাম না।জানালার গ্রীল ধরে দাড়িয়ে থেকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের বাহিরটাকে দেখছিলাম এমন সময় একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বরে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি গতকাল রাতে দেখা হওয়া মেয়েটি(রিদিতা)দাঁড়িয়ে আছে।হাতে একটা কাগজের প্যাকেট।আমাকে দেখে গতকালকের মত করেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

—”আপনি এখানে..! আপনার কি কেউ এখানে ভর্তি আছে নাকি?

রিদিতার জবাব টা দেওয়ার জন্য অপ্রস্তুত ছিলাম তাই আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম।

—”না কেউ নেই,হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনার বাবার সাথে একটু দেখা করে যাই।আসলে গতকালকে তো দেখা হয় নি।

— “ওহ্ খুব ভালো করেছেন,বাবাও আপনাকে বার বার দেখতে চাইছিলো।ভাবছিলাম ফোন দিবো,কিন্তু নং তো নাই।তাই দিতে পারি নি।

রিদিতার কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

—”কেন?

— “গতকালকে তো রক্ত পাচ্ছিলাম না,আর আপনি স্বইচ্ছাতে এসে রক্ত দিলেন তাই।

আচ্ছা চলুন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।

‘ রিদিতার কথা মত জানালার গ্রীল ছেড়ে হাটা শুরু করলাম।কি বলবো কিছুই বুঝছিলাম না,তাই হাতে থাকা প্যাকেটটার কথা জানতে চাইলাম।

—”আপনি কি কোথাও গেছিলেন?

— “হ্যাঁ,বাবার জন্য ঔষুধ আনতে গেছিলাম। আপনি এতো সকালে কোথায় গেছিলেন।?

— “কোথাও না,সকালে হাঁটতে বার হয়েছিলাম।ভাবলাম একটুু দেখে যাই, তাই।”

— “আসছেন খুব ভালো করেছেন।আচ্ছা আপনার মোবাইল নং দেওয়া যাবে।মানে এখানে তো তেমন কেউ পরিচিতো নাই,তাই কোনো দরকার হলে আপনাকে ফোন দিতাম।”

— “আচ্ছা।আপনার ফোনটা দিন আমি তুলে দিচ্ছি।”

বলেই রিদিতার ফোন টা নিলাম।
রিদিতা আবারো বললো..

—”আপনি কি এখানেই থাকেন।”?

— “হ্যাঁ,পাশেই থাকি। দশ মিনিটের দুরুত্ব।” “ওহ্ তাহলে তো ভালোই হলো।দরকার হলে খুব তাড়াতাড়ি আপনাকে পেয়ে যাবো।”

‘ রিদাতার সাথে কথা বলতে বলতে কেবিনে পৌঁছে গেলাম। দেখি রিদিতার বাবা সুয়ে আছেন। প্রতিনিয়ত রক্ত দেওয়ার কারণে শরিরে হাড্ডি ছাড়া আর কিছুই নেই। রিদিতার হাতে থাকা কাগজের প্যাকেট থেকে ঔষুধ বার করতে করতে বললো।

—”বাবা ইনিই গতকাল তোমাকে রক্ত দিয়েছিলো।”

রিদিতার কথা শুনে তার বাবা আমার দিকে তাকিয়ে হাত ইশারা করে ডাক দিলো।আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। হয়তো কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু পারলো না।দুর্বলতা তাকে এতটাই গ্রাস করে নিয়েছে যে মুখ থেকে কথা বার হতেও খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ব্যাপার টা বুঝে আমি আংকেলকে চুপ করে থাকার জন্য বললাম।কিন্তু আংকেল তার যথাসাধ্য শক্তি দিয়ে দু -একটা লাইন বললো।
তারপর আর সম্ভব হলো না।

রিদিতা তাঁর বাবাকে ঔষুধ খাওয়ায়ে চুপটি করে বসে মাথাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। ব্যাপারটা এমন,যে ‘মা তার অবাধ্য ছোট্ট খোকাকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।
মুহূর্তেই আংকেল ঘুমের রাজ্যে বিচরণ করলেন। রিদিতা বসে বসে কি যেন ভাবছে,মায়াভরা মুখটা একরাশ বিষন্যতার ছায়াতে ঘিরে ধরেছে।চুপ করে দাড়িয়ে ছিলাম,ভিষণ বিরক্তি লাগছিলো। কারণ চুপ করে থাকাটা আমার কাছে একরকম মানুষিক যন্ত্রনার মত লাগে। রিদিতাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনো অবধি কিচ্ছু খাই নি।তাই কথা বলার একটা কারণ খুঁজে পেলাম।

—”আচ্ছা আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে এখনো অবধি না খেয়ে আছেন।হাসপাতালের পাশেই হোটেল আছে,চলুন খেয়ে আসি।”

রিদিতা আমার দিকে গম্ভিরতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাপাকণ্ঠে উত্তর দিলো।

—”খেতে ইচ্ছে করছে না।”

— “ভাবলাম আপনার সাথে একসাথে খাবো,চলুন।আর আংকেল তো এখন ঘুমাচ্ছেন।দুপুরের আগে আর উঠবে বলে মনে হয় না।

রিদিতা হয়তো সংকোচ করছিলো,কিন্তু আমি তো জানি ক্ষুধার জ্বালা পৃথিবীর সব থেকে বড় জ্বালা।তাই একরকম জোর করেই রিদিতাকে নিয়ে গেলাম। ঘন্টা খানেক আগেই পেট ভরে দু’প্লেট ভাত খেয়েছি তবুও এখন রিদিতার জন্য আবার খেতে হবে,তা না হলে আবার মেয়েটা খাবে না।হোটেলে ঢুকে খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর খাবার আসলেই রিদিতা বাচ্চাদের মত করে খাওয়া শুরু করে দিলো। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি।শুধু আমিই না হোটেলে বসে থাকা সবার চোখ রিদিতার দিকে। কারণ রিদিতা এমন ভাবে তার সামনে থাকা খাবার গুলো খাচ্ছিলো,দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে সে খাবারের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ করে নি। যাই হোক পেটে ক্ষুধা রেখে ভাব দেখানোটা আমিও মোটেও পছন্দ করি না। তাই রিদিতাকে সাপোর্ট দিলাম। পেট ভরে খেয়ে বিল পরিশোধ করে বার হয়ে আসলাম।

হোটেল থেকে বার হয়ে দেখলাম,রিদিতার গাল গুলো লজ্জাতে লাল হয়ে আছে।কারণ তখন সে এতটায় ক্ষুধার্থ ছিলো যে লজ্জার কথা মাথাতেই আসে নি তার। মাথা নিচু করে চুপি স্বরে বললো।

—”সরি,আসলে বাবার টেনশনে কইদিন ঠিক মত খাওয়ার সময় হয় নি তাই হঠাৎ সামনে পেয়ে ক্ষুধার পরিমানটা বেড়ে গেছিলো।

রিদিতার চেহারার মত কণ্ঠেও মিষ্টি আছে।খুব শান্ত আর গুছিয়ে কথা বলতে পারে মেয়েটা।রিদিতার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে সোজা হাঁটতে শুরু করে দিলাম হাসপাতালের দিকে।
কারণ,তার বাবাকে ছেড়ে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছে মেয়েটা। রিদিতাকে হাসপাতালে রেখে চলে আসছিলাম;এমন সময় পিছন থেকে ডাক দিলো।

—”একটু শুনেন।”

‘ পিছন ফিরে তাকিয়ে বললাম।

—”হ্যাঁ,বলেন?

—”আপনাকে খুব ঝামেলাতে ফেলে দিয়েছি তাই না।?

—”কোই নাতো।”

—”এই যে আমাদের জন্য এসব করছেন।”

“আপনি আমার জন্য যা করেছেন,তার কাছে এগুলো অতি নগন্য।

—”মানে ! আমি আবার কি করেছি?”

“সেটা না হয় আরেকদিন বলবো।

— “আচ্ছা ঠিক আছে।

— “আচ্ছা আজকে কি আপনার বিকেলে একটু সময় হবে?

—”কেন?

—”ঐ যে আপনি আমার জন্য কি করেছেন,সেটা বলতাম।

—”ওহ্ আচ্ছা।হ্যা,হবে।

—”ok ধন্যবাদ,তাহলে বিকেলে দেখা হবে।

— “আচ্ছা ঠিক আছে।

আংকেলকে আবারো একবার দেখে রিদিতার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। হাসপাতাল থেকে বার হয়ে গন্তব্য এক বন্ধুর বাসা।
নাম’রিফাত”।সেখানে গিয়ে কোনোরকম দুপুরটা কাটিয়ে দিবো।একাকি একটা ছোট্ট ফ্লাটে থাকে সে।রিফাতকে বলে কয়েকটা দিন ম্যানেজ করে তার ফ্লাটেই থাকবো,নতুন চাকুরি না হওয়া অবধি।।কারণ তার ফ্লাটটা হাসপাতাল থেকে একটু দুরে।জরুরি দরকারে রিদিতা ডাক দিলে খুব সহজেই চলে আসা যাবে। সাতপাঁচ না ভেবে হাটা শুরু করে দিলাম রিফাতের বাসার উদ্দ্যেশে।

সত্যিকারের ভালোবাসা ! পরশ পাথর

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *