পাওয়া না পাওয়া। একটি কষ্টের গল্প । বৃত্তি

প্রাইভেট রিক্সায় করে কোচিং সেন্টারে যাতায়াত করতাম। তখন সবে মাত্র পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছি। রিক্সাওয়ালা প্রতিদিন যথাসময়ে আমাকে নিতে উপস্থিত হয়ে যেতেন। তিনি আমার মতন আরো বেশ কয়েকটি স্টুডেন্টের প্রাইভেট চালক ছিলেন। প্রত্যেকের টাইম ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কয়েক মাস পর টাইমের গোলমাল শুরু হয়ে যায়। আমার আগে যাকে নিয়ে যেতেন তার ক্লাসের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়েছে, এর ফলে বেধে যায় বিরাট গন্ডগোল। একজনকে রেখে এসে আরেক ট্রিপ দিতে গেলে প্রতিবার ক্লাসে লেট হয়ে যেত। আমাকে আগে দিয়ে আসলে তার লেট, তাকে আগে দিয়ে আসলে আমার লেট। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন দুজনকে একত্রে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা ছিল অভিভাবকদের অনুমতি বিহীন বেআইনি সিদ্ধান্ত। আর এই সিদ্ধান্তের অনুমতি দাতারা ছিলাম ভুক্তভোগী আমরা দুজন। আমি এবং বৃত্তি নামের মেয়েটি। এটাই একমাত্র সহজ সমাধান এবং কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। সে সময় অনেক ছেলে মেয়ে এক ভ্যানে একত্রে যাতায়াত সহজ চোখে দেখলেও শুধু দুজন ছেলে মেয়ে এক রিক্সায় যাওয়াটা কেউ সহজ ভাবে দেখতো না। আমরাও অনেক লজ্জা পেতাম কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দিতাম না। ক্লাস ফাইভে পড়া মেয়েকে এতটাও পিচ্চি ভাবার কারণ নেই যে সমবয়সী যারতার সাথে গা ঘেঁষে চলবে। টিভি সিরিয়াল গুলো কম বেশি সবাইকে তখন অকালে পাকিয়ে দিয়েছিল।

বৃত্তি ছিল কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে। অভিভাবকের চোখে যেন না পরে তাই রিক্সাওয়ালা আমাকে রাস্তার মোরে দাড় করিয়ে বৃত্তিকে বাসা থেকে নিয়ে আসতো এরপর আমাকে তুলে একত্রে গন্তব্যের পথে রওনা দিত। প্রথম কয়েকটা দিন ছিল ভয়ানক অস্বস্তিকর। দুজন রিক্সার দুই প্রান্তের হুডের সাথে লেপ্টে বসে থাকতাম। প্রথম দিকে ভুল করেও কেউ কারো সাথে কথা বলিনি। আমি মনে মনে ভাবতাম আমি ছেলে মানুষ তাতেই কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে, সে মেয়ে হয়ে আমার পাশে বসতে রাজি হল কি করে! পরে বুঝতে পারলাম এসবকিছু রিক্সাওয়ালার চাপাবাজিতে সম্ভব হয়েছে, আমাকে মেয়ের থেকে এক ক্লাস কমিয়ে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র বানিয়ে দিয়েছিল! স্কুল ভিন্ন হওয়ায় ধরা খাওয়ারো উপায় নেই। ছোট ভেবে মেয়েও তেমন একটা সংকোচবোধ করেনি। আস্তে আস্তে কথা বলা শুরু হয় আমাদের। আমি তাকে আপনি করে সম্মান দিতাম আর সে বলতো তুমি করে। মেজাজ গরম হয়ে যেত। সমান হয়েও একটা মেয়ের সামনে ছোট সেজে থাকাটা অনেক কষ্টের ছিল।

একদিন কি নিয়ে যেন হাসাহাসি করছিলাম এমন সময় ভটভট শব্দে বাইক এসে রিক্সার সামনে এসে দাড়ালো। রিক্সাওয়ালা দ্রুত নেমে সালাম দিলেন। বৃত্তি কাছুমাছু হয়ে বসে। বাইকওয়ালা অন্য কেউ না, বৃত্তির বাবা! অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন এদিকে কই যান? মেয়ের কোচিং তো অইদিকে, আর রিক্সায় ছেলেটা কে?
রিক্সাওয়ালা মিনমিনিয়ে উত্তর দিচ্ছেন.. “স্যার এই পিচ্ছি পাশের এলাকায় থাকে, বাচ্চা ছেলে, এক টাইমে ক্লাস শুরু হওয়ায় ভাবলাম একত্রে নিয়ে আসি, এইতো সামনেই অর কোচিং সেন্টার তাই অরে এখানে নামায় দিয়ে এরপর মামুনিকে দিয়ে আসি। একটু নমনীয় সুরে কানের কাছে গিয়ে বললেন.. “একই রোড তো, তাছাড়া বাচ্চা পুলাইপান তাই ভাবলাম একত্রেই নিয়া নেই…”
মুরুব্বী দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “বাবা বাসা কোনদিকে তোমার?” আমিও ভদ্র ভাবে উত্তর দিয়ে দিলাম। মাথা নাড়িয়ে আবার প্রশ্ন করলেন কোন ক্লাসে পড়ো? রিক্সাওয়ালা তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন ক্লাস থিরিতে পড়ে! দৈনিক প্রতিভা কোচিং সেন্টারে রাইখা আসি। মুরুব্বী মাথা নাড়িরে আপাদমস্তক দেখে নিলেন, বয়সে মেয়ের ছোট বলে তেমন কোনো মাথা ঘামালেন না “আচ্ছা যাও তোমরা, ক্লাসের দেরি হয়ে যাইতেছে”
অনুমতি পেয়ে রিক্সাওয়ালা হাফ ছেড়ে বাচলেন। বাকি রাস্তাটুকু আমার মাথা ঘুরছে, তাই বলে আমি দেখতে ক্লাস ত্রির বাচ্চার মতন! এও মানতে হবে!
বৃত্তি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে… “এই তুমি ক্লাস ত্রিতে পড়ো!!”
আমি ডানে বামে না সূচক মাথা নাড়ালাম
“তাহলে মিথ্যে বললে কেন?
আমি আঙ্গুল ইশারা দিয়ে রিক্সাওয়ালাকে দেখালাম
মেয়েটার মাথার জটলা খুলা শুরু হয়েছে, মিথ্যার কারণগুলো বুঝা শুরু করেছে। মুখ ঘুরিয়ে আবার প্রশ্ন করলো.. “তুমি প্রতিভা কোচিং এ পড়ো?”
উপর নিচ মাথা নাড়ালাম
“কিন্তু ওইখানেতো শুধু ক্লাস ফাইভের কোচিং করায়”
আমি আবারও হ্যা সূচক মাথা নাড়ালাম
“এই তুমি পড়ো কোন ক্লাসে!?”
হাতের পাঁচটা আঙুল বের করে উত্তর দিলাম “ক্লাস ফাইভ, আপনার সাথে”
মেয়ে লাফ দিয়ে দুই ইঞ্চি সরে বসলো! পারলে রিক্সা থেকে পড়ে যায় যায় অবস্থা! মেয়েটি সেদিন আর একটা কথাও বলে নি।

আমি ভেবেই নিয়েছিলাম মেয়ে আর যাবে না। অন্য রিক্সা ব্যবস্থা করে নিবে। কিন্তু পরেরদিন যথারীতি আমাকে উঠিয়ে নিতে রিক্সা নিয়ে এগিয়ে আসে। অনেক ভাল লাগছিল সেদিন, মোটেও খারাপ কোনো ভাবনা সে বয়সে ছিল না তবে সেই অনুভূতিটা ছিল একদম অন্যরকম, পিওর বন্ধুত্ব যাকে বলে। কয়েক মাসে অনেক ভাল ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গিয়েছিল। সত্য জানার পর বন্ধুত্বের দূরত্ব একটুও বাড়েনি, শুধু বেড়েছিল দুজন বসার মাঝে কিঞ্চিৎ দূরত্ব। এভাবে বাকি মাসগুলো যাতায়াত করেছিলাম আমরা, দুজন গল্পগুজব হাসাহাসি করে ভালই যাচ্ছিলো সময়গুলি। অনেক বিষয় নিয়ে গল্প হতো, তর্ক হতো, ঝগড়া হতো । শেষ যেদিন একসাথে গিয়েছিলাম সেদিন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল, শীতের আবহাওয়ায় বছরের শেষ বৃষ্টি, শীত পুরোদমে নামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। বৃষ্টির প্রতি প্রতিটি মেয়ের কমবেশি দুর্বলতা থাকে তাই বলে শীতকালীন বৃষ্টি দেখেও কেউ পাগল হতে পারে এটা জানা ছিল না। রিক্সাওয়ালাকে বুঝতে না দিয়ে মেয়েটা চুপিচাপি রিক্সার হুড খুলে দেয়। আমি বাধা দেওয়ার সুযোগই পেলাম না। ভয়ংকরী রূপ ধারন করে ফিসফিসিয়ে থ্রেট মেরে বসে “একদম চুপ!”
বোকাত মতন বসে রইলাম, মুহূর্তেই বরফ পানিতে ভিজে একাকার! এটাই ছিল আমাদের দুজনের শেষ যাত্রা।

পরীক্ষা চলে আসে, ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। অনেক মিস করতাম সেইসব মুহূর্তগুলো। আব্বু আমার কানের কাছে চব্বিশ ঘন্টা ঘ্যানঘ্যান করতেন যেভাবেই হোক ফাইভে তোকে বৃত্তি পেতেই হবে! আর অমনেই আমার চোখে বৃত্তির মুখটা ভেসে উঠতো! এটা এক বিরাট সমস্যা। এভাবে অষ্টম শ্রেণী, এস এস সি, এইচ এস সি প্রত্যেকবার বৃত্তি পাওয়া নিয়ে ঘ্যানরঘ্যানর করতেন আর প্রতিটাবার বৃত্তির মুখটা ভাসিয়ে তুলতেন। শেষ পর্যন্ত আব্বুর বৃত্তি আমার বৃত্তি কোনো বৃত্তিই আর পাওয়া হয়নি। তবে পঞ্চম শ্রেণীর আব্বুর বৃত্তিটা পাওয়ার জন্য অনেক আশাবাদী ছিলাম, অনেক ভালো প্রিপারেশন ছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে যা শিখেছি ভয়ে সব ভুলে গিয়েছিলাম। এর বিশেষ কারণও ছিলো.. পরীক্ষার দিন হলে যে মহান ব্যক্তি পরিদর্শনে এসেছিলেন সেই ব্যক্তিটি অন্য কেউ নন, তিনি ছিলেন বৃত্তির বাবা! তার মুখ দেখে ভয়ে সব ভুলে গিয়েছি। ভেবেছিলাম আমাকে এই কয় মাসে ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু তিনি একটুও ভুলেননি! একটু পরপর ঘুরে ঘুরে আমার সামনে এসে প্রশ্ন করছে.. “বাবা পরীক্ষা কেমন চলে?!”

সেই আতংক বারো বছর পর আমি আজও ভুলিনি। এই কয় বছর অনেক খুঁজেছি তাদের কাউকেই পাই নি। সেই এলাকায় গেলে মাঝেমধ্যেই মনে হত আজ হয়তো বৃত্তির সাথে দেখা হবে, কিন্তু কখনোই দেখা পাইনি। কয়েকবছর পর একবার সেই রিক্সাওয়ালার দেখা পেয়েছিলাম শুনেছি বৃত্তিরা বাসা পরিবর্তন করেছে, এর বেশিকিছু তথ্য পায়নি। আমার যতটুকু ধারণা মেয়েটা ক্লাস সিক্স থেকে বোরকা নিয়েছিল তাই আর পথেঘাটে দেখলেও চিনতে পারিনি, আর এখনতো অনেক বড় হয়ে গিয়েছি দেখলেও চেনার উপায় নেই। মাঝেমধ্যে উৎসুক মন প্রশ্ন করে বসে মেয়েটা দেখতে কেমন হয়েছে? কোথায় ভর্তি হয়েছে? আমাকে মনে আছে? অন্য বিশেষ কিছুনা, শুধুই বন্ধুত্বের টানে খুজে বেড়াতাম।

দীর্ঘ দিন পর আজ সেই মহাসুযোগ এসেছিলো। বন্ধুর বিয়েতে এসে বৃত্তির বাবার দেখা পেয়ে যাই! বয়স যতই বাড়ুক বড়দের চেহারার খুব একটা পরিবর্তন আসে না। বৃত্তির বাবার মতন ভয়ংকর মানুষের মুখটা চিনে নিতে আমার একটুও ভুল হয়নি। যেহেতু আঙ্কেল আন্টি উপস্থিত সেহেতু বৃত্তিকে আশেপাশেই খুঁজে পাওয়া যাবে। বৃত্তি কি বোরকা পড়ে এসেছে! আসলে আসুক তবুও তার অস্তিত্বের দেখাটুকু তো পাবো। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ালাম। চট করে মাথায় চলে আসলো যেহেতু বিয়েতে এসেছে তাহলে অবশ্যই তিনি বন্ধু অথবা ভাবিদের আত্মীয় অথবা পরিচিত। যেকোনো এক ভাবে আজ বের করতেই হবে। ছুটে যাই বন্ধুর কাছে, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করি দাড়িওয়ালা ওই লোকটা কে রে? তোদের পরিচিত? উত্তর আসলো…
উনি তো আমার হবু শশুর আব্বা! আমি ঢোক গিলে থ মেরে বসে রইলাম। দোস্ত আমাদের ভাবির নামটা যেন কি বলছিলি? উত্তর আসলো ‘সানজিদা’, আর কোন নাম নেই? হুম..বাসায় ‘বৃত্তি’ নামে ডাকে। আমি শুনে ধীরে ধীরে মেয়ের দিকে এক ঝলক তাকালাম। বৃত্তি নব বধু সাজে পাশে বসে। এই সেই বৃত্তি!!

নাহ এভাবে আটাময়দা দেখে আমার পোষাবে না, দ্রুত বন্ধুর ফেসবুক আইডিতে ঢুকে যাই, হাত কাঁপছিল ঠিকমত পাসওয়ার্ডও বসাতে পারছিলাম না। সেদিন বন্ধুর মোবাইলে এক ঝলক ছবি দেখেছিলাম বটে কিন্তু সেই দেখা আর আজকের দেখার মাঝে বিশাল পার্থক্য। বৃত্তির আইডি খুঁজে একটি একটি করে ছবি গুলো দেখতে থাকি। মেয়েটার পরিবর্তন শুধু শারিরীক ভাবেই হয়েছে চেহারাটা ঠিক যেন আগের বৃত্তিই রয়ে গেছে। বৃত্তিকে খুঁজে পাওয়ার অনুভুতিটা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারছিলাম না। আচ্ছা আমার কি বৃত্তিকে পরিচয়টা দিয়ে দেয়া উচিৎ? অবশ্যই দিতে পারি , আমরাতো অন্য কেউ ছিলাম না যে এত লুকোচুরি করতে হবে। বন্ধু্ই তো ছিলাম। অতশত না ভেবে চট করে নববধূর পাশে ছবি তুলতে বসে পড়লাম।

এক ফাঁকে পরিচয় দেওয়া শুরু করি.. মেয়েটাও নববধূর মতন মিনমিনিয়ে নিচু স্বরে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো
– আমি সিয়ামের ক্লোজ ফ্রেন্ড ‘রাহাত’
– ও হ্যা.. সিয়াম বলেছিল আপনার কথা। চিনতে পেরেছি।
– কিন্তু… আপনাকে যে আরেকটা পরিচয় দেওয়ার ছিল !
– কী?
– আমি কিন্তু আপনার পরিচিত কেউ একজন!
– মানে? বুঝতে পারলাম না.. ?
– প্রাইভেট রিক্সার কথা মনে আছে? সেই ক্লাস ফাইভে?
বাকিটুক আর বলার প্রয়োজন হয় নি। বৃত্তি ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আশেপাশে ক্যামেরা উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়। অনেক কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছিল না, কথা আটকে আসছে তার। ছবি তোলা শেষে আমার দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে..
– “অনেক খুঁজেছিলাম তোমাকে, অনেক!”
– আমিও অনেক খুঁজেছি, এই যে দেখেননা আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত আজ বের করেই ফেললাম!
বৃত্তি শুকনো হাসি হেসে রোবটের মতোন আবারও ক্যামেরায় তাকিয়ে থাকে।

এদিকে বিয়ে পড়াতে মুরুব্বীরা চলে এসেছে। স্টেজে ফ্রেন্ডরা যারা ছিলাম নেমে চলে আসি।
দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে বৃত্তির বিয়ে দেখি! বৃত্তি অনেকবার আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, অনেকবার। বৃত্তির রিয়াকশনটা এমন হবে বুঝতে পারিনি। আমিতো ভেবেছিলাম সেতো ভুলেই গিয়েছে। বুঝলে আজ অন্তত পরিচয়টা দিতাম না। বৃত্তির এ মুহূর্তে কেমন লাগছে জানি না কিন্তু আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কেন খারাপ লাগছে জানিনা, জানার ইচ্ছেটাও নেই। বৃত্তির সেই একটা লাইন বার বার কানে বেজে যাচ্ছে “অনেক খুঁজেছিলাম তোমাকে” । খুব সাধারণ একটা লাইন হলেও এই লাইনের পেছনে থাকা হাজারটা লাইন আমি তার চোখে ভেসে উঠতে দেখেছি, শুধু পড়ে নেওয়ার সময়টা আর হয়ে উঠেনি!
শেষ মুহূর্তে অনেক আফসোস হচ্ছিলো যখন মনে পড়লো বিয়েটা এরেঞ্জ হচ্ছে। আচ্ছা এমন কি হতে পারতো না সিয়ামের যায়গাটায় আজ আমি বসে? বেমানান কিছুই তো ছিল না । তবে কেন ভাগ্যে মিললো না? আমি কখনোই বৃত্তিকে নিয়ে বিয়ের উদ্ভট স্বপ্ন দেখিনি কিন্তু আজ বন্ধুকে পাশে বসতে দেখে অসহ্য লাগছিল।

সবার মোনাজাত ধরা দেখে বুঝে নিলাম বিয়ে পড়ানো শেষ। নিজের মাথায় দুইটা থাপ্পড় মেরে নিজেকে বলতে লাগলাম “ছিঃ রাহাত! কি সব যে ভাবিস, বান্ধবী মানেই বউ বউ স্বপ্ন দেখা লাগবে নাকি! তুই এত লুচু হইলি কবে রে? নিশ্চই তুই সকালে কিছু খাসনি, ক্ষুদায় এমন উলোটপালোট লাগছে তোর , যাহ খেয়ে নে”
সত্যিই আবিষ্কার করলাম অনেক ক্ষুধা লেগেছে আমার। নিজের মনকে শক্ত করে নিলাম, কিছুই হয়নি আমার, সেই বারো বছর আগে সামান্য কয়েকমাসের পরিচয়, ধ্যাৎ। মাথা থেকে সব ঝেড়ে টেবিলে খেতে বসলাম, প্রচুর খেতে হবে আমাকে প্রচুর….

প্লেট উঁচু করে পোলাও নিয়েছি, ওয়েটারকে ডেকে দুইটা রোস্ট নিয়েছি। দুই ফ্রেন্ডের বিয়েতে দুইটা রোস্ট নেওয়া মোটেই দোষের কিছু না! আজ ডাবল খাবো আমি। খেয়েছিও বটে..কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারিনি। খাওয়া শেষ হতেই ওয়াশরুমে বেসিনে উপ্রে ফেলে দেই সব। সেখানে আয়নার সামনে খুঁজে পাই ভাগ্যের কাছে হেরে যাওয়া এক পাগলের প্রতিচ্ছবি!

এভাবে সেখানে থাকা আর সম্ভব হচ্ছিল না। কোনমতে দ্রুত বাসায় ফিরে আসি। বাসায় ফিরতেই অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখতে পাই। সবার মুখে আনন্দের হাসি! কি হয়েছে জানতে চাইলে আব্বুর রুমে যেতে বলে, আব্বু খুশিমনে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলেন…

“অভিনন্দন মাই বয়! এতদিনে তুই একটা কাজের কাজ করেছিস। একটু আগে এজেন্সি থেকে কল এসেছিলো, তুই যে অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার জন্য এপ্লাই করেছিলি, সেখানকার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি থেকে আজ ইমেইল এসেছে… তুই নাকি ৫০% বৃত্তি পেয়েছিস!

আমি মুচকি হেসে উত্তর দিলাম..
১০০% পেলে আরও ভাল হতো!!


Md Shahadat Hossain ( জাগ্রত প্রতিধ্বনি )

Related Posts

One thought on “পাওয়া না পাওয়া। একটি কষ্টের গল্প । বৃত্তি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *