বিশ্বাস করো আজও ভালবাসি (Part_4) Ending part

বিশ্বাস করো আজও ভালবাসি All part

#গল্প- বিশ্বাস করো আজও ভালবাসি
#পর্ব (3) ।
#লেখিকা- সানজিদা আক্তার
❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤
.
পেটে খাবার না পেয়ে চো চো করছে কিন্তু সজীব এর আসার কোন লক্ষ্মণ দেখি না । গুণ গুণ করে গান গাচ্ছি ” এবার আসুক তারে আমি মজা দেখাবো “। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্র দুর থেকে দেখা যায় তবে উড়ন্ত পাখিগুলো দেখা যায় না ।
দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো। আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেখি সজীব ।
— এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি ? (আমি)
— টিকিট কাটতে গেছিলাম । (সজীব)
— কিসের টিকেট ?
— আমরা বিকেলে চলে যাব তার টিকেট !
— আমরা কেন যাব ?
— এখানে সমস্যা আছে তাই ।
— কিসের সমস্যা ?
— তোমাকে নিয়ে সমস্যা ।
— ( প্রচন্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার রাগ বেড়ে গেল বললাম ) সমস্যা না আমার না সজীব সমস্যা হচ্ছে তোমার । তুমি নিচু মনমানসিকতার মানুষ ।
— কিভাবে ?
— একটা ছোট বিষয়ের জন্য বউকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছো তুমি ।
— আমার নিজের জিনিস নিজের করে রাখার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি ।
— এগুলো আমার একদম পছন্দ না ।
— তাহলে ঐ ছেলেকে পছন্দ হইছে ?
— কি সব উল্টো পাল্টা কথা বলছো সজীব ?
— তাহলে তোমার যেতে অসুবিধা কোথায় ?
— তোমার মনে এতো সন্দেহ কেন ?
— তোমাকে হারানোর ভয় ।
— নেকামি বন্ধ করো ।
— আচ্ছা ঠিক আছে বন্ধ করছি , কিন্তু সাড়ে বারটার সময় গাড়ি ছাড়বে তাড়াতাড়ি তৈরী হও ।
— আমি যাব না ।
— পাগলামি করিও না বৃষ্টি ।
— পাগল তুমি ।
— আচ্ছা ঠিক আছে ।
★★
নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাউন্টারে বসে আছি, আজ Precedent Travels গাড়িতে করে যাব । ঢাকায় আসার পথে সজীব এর সাথে রাগ করে আর কোন কথা বলি নাই আমি ।
কত কষ্ট করে সমুদ্র দেখতে গেলাম ,! আর একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে এভাবে চলে আসতে হবে ? আমি যদি ঠিক থাকি তাহলে চিন্তার কি আছে ? এখানে বুঝতে পারছি না ।
ঢাকায় এসেও মন ভালো হলো না , সকল প্রকার কথা বার্তা বন্ধ করে দিলাম । সেও হয়তো রাগ করেছে কারন প্রায়ই হোটেল থেকে ভাত খেয়ে বাসায় আসে । আমিও আর জোর করে সাধাসাধি করি না ।
★★
দুজনের মধ্যে বিশাল একটা কালো মেঘ জমেছে কিন্তু দুজনেই জিদ করে বসে আছি । প্রতিদিন আমি ভাবি ” আজ সজীব এসে হয়তো আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, চলো দুজনে এক হয়ে যাই ” ।
কিন্তু সে বলে না । হয়তো সেও আশা করে আছে , বাসায় আসার সাথে সাথে আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বলবো ” আমার ভুল হয়ে গেছে ”
কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলা হয়না , আস্তে আস্তে রাগ অভিমান বেড়ে যায় ।
যার ওপর মায়া পড়েছে তার সঙ্গে শুধু কথা বলতে ইচ্ছে করে।এই ইচ্ছেটিই বিপজ্জনক। কথা বলা মানেই মায়া বাড়ানো।পুরোপুরি নিশ্চিন্ত, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন সম্ভব না ।
সব জীবনেই কিছু ঝামেলা থাকবে । কাবাব যতই ভালই হোক,কাবাবের এক কোণায় ছোট হাড্ডির টুকরো থাকবেই । আল্লাহ মানুষকে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছেন কিন্তু মনের কথা বুঝবার ক্ষমতা দেন নি।
একদিন বিকেলে সজীব এর মামা-মামী ও মামাতো বোন আসলো আমাদের বাসায় । আমি সোজন্য কথা বলে নিজের রুমে চলে আসি কিন্তু একটু পরে আবার আমার ডাক পরে ।
— তোমার সমস্যা কি জানতে পারি ? (মামা)
— আমার কোন সমস্যা নেই ! (আমি)
— তাহলে এমন করছো কেন ? সজীব তোমার জন্য পাগল ছিল , বিয়ে করেছে তারপরও কিছু বলিনি । কিন্তু মা-বাবা মারা যাওয়া একটা ছেলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটা সস্তা মেয়ে সবকিছু শেষ করে দিবে সেটা মানা যায় না । (মামা)
— মামা কি সব বলেন আপনি ? চুপ করেন তো। এই সব বলার জন্য কি আসছেন আপনি ? (সজীব)
— হ্যাঁ সজীব আমি এগুলো বলার জন্য আসছি , ব্যাবসা পাতি সব কিছু ছেড়ে দিয়ে যে সস্তা মেয়ের জন্য সবকিছু শেষ করো । সে কি একবারও তোমার কথা চিন্তা করে ? (মামা)
— মামা প্লিজ তুমি চুপ করো । (সজীব)
— থাক সজীব সাহেব , আর নাটক করার দরকার নেই । নিজেই তাকে অপমান করার জন্য ডেকে আনছ আবার এখন নাটক করো ? নাটকের দরকার নেই মজা করে আমার অপমানিত মুখ দেখ শান্তি পাবে । ( আমি )
— কি বলছো তুমি ? আমি তাকে কেন ডেকে আনবো ? আমি তো তাকে কিছু বলিনি । (সজীব)
— সেটা বোঝা যাচ্ছে সজীব সাহেব । আর মামা আপনাকে বলছি , আমি আগামীকাল সকালে চলে যাব । আপনার ভাগ্নে কে বলবেন ডিভোর্স দিতে । আর তারপর একটা হিরের টুকরো এনে দিবেন ।
— আমার ভাগ্নে ডিভোর্স দিবে আর তখন তুমি দেনমোহরের টাকা দিয়ে অন্য যায়গা বিয়ে বসবে ? বাহহহ ভালো বুদ্ধি তো ।
— আমরা গরীব, ছোটলোক, সস্তা মেয়ে হতে পারি কিন্তু আপনাদের মত লোভি না ।
( বলেই আমি রুমের মধ্যে চলে গেলাম )
★★
পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। এক ধরনের মানুষ রাগ প্রকাশ করতে পারে কিন্তু আনন্দ প্রকাশ করতে পারে না। আরেক ধরনের মানুষ আনন্দ প্রকাশ করতে পারে কিন্তু রাগ প্রকাশ করতে পারে না।
কিছু কিছু সময় আসে যখন আমরা বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সীমারেখায় অবস্থান করি। তখন আমরা একই সঙ্গে দেখতে পাই ও পাই না। বুঝতে পারি ও পারি না। অনুভব করতে পারি ও পারি না। সে বড় রহস্যময় সময়। মানুষ কী অদ্ভুত দেখেছেন? মানুষ কত সহজেই- না ‘ভুল’ -সত্যি ভেবে গ্রহন করে।
সকাল বেলা আমি কাপড় চোপড় সব কিছু গুছচ্ছি আর বাবা কে বলেছি আমাকে নিতে আসার জন্য । আমি নিজেই চলে যেতাম কিন্তু বাবা গতমাসে বাসা পরিবর্তন করেছে তাই নতুন বাসা খোঁজার চেষ্টা করবো না ।
— এগুলো কি হচ্ছে ? ( দরজার সামনে সজীব দাঁড়িয়ে আছে )
— সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি ,আমার বাবা এখন নিতে আসতেছে । ( আমি )
— তুমি যাবে না ।
— সস্তা মেয়ে দিয়ে কি করবে তুমি ? একটা দামী মেয়ে বিয়ে করে সুখী হও । আর না পেলে তোমার মামাতো বোন তো আছেই পাত্রী ।
— আমাকে রেখে যাবে না প্লিজ , আমি যা কিছু করেছি শুধু তোমার জন্য । ( সামনে এসে জোর করে জড়িয়ে ধরলো ?
— আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে বললাম , একদম আমার গায়ে হাত দিবে না । খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু ।
— প্লিজ বৃষ্টি আমার ভুল হয়ে গেছে । আসো দুজনেই আবার এক হয়ে যাই ।
— সেটা সম্ভব না সজীব , আর তোমার সাথে আমি মোট ছয় রাত এক বিছানায় ঘুমিয়েছি । স্বামী স্ত্রীর চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক সুখ ভোগ করেছি । আশা করি সেগুলো ভুল যাবে । মনে করবে একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে তাকে নিয়ে আনন্দ করেছো কিন্তু বিয়ের কথা মাথা থেকে বের করে দাও ।
— হয়তো মরে যাবো আমি , ।
— এখন যদি তুমি এই বাসায় মারা যাও , তারপরও আমি বাবা আসার সাথে সাথে তার সাথে চলে যাব ।
— আচ্ছা ঠিক আছে । ( সজীব এর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখটা সমগ্র ধরনীর বেদনায় অন্তীম রেখা ধরে আছে ।)
— কিন্তু আমার একটা অনুরোধ ছিল,। (সজীব)
— বলো ,
— আলমারিতে যতগুলো শাড়ী আছে সবগুলোই আমি তোমার জন্য কিনেছিলাম । তাই ওগুলো নিয়ে যাবে , কারণ এ জীবনে কোনদিন হয়তো আর ওগুলো দরকার হবে না আমার ।
— আমার মত সস্তা মেয়ের ওগুলো দরকার নেই ।
সজীব মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল । এবার তার মুখটা দেখে সত্যি সত্যি আমার কষ্ট লাগলো । একবার মনে হলো কি দরকার চলে গিয়ে সংসারের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হাতাহাতি থাকবেই, তাই বলে কি সংসার ত্যাগ করতে হবে ?
পরক্ষনেই আবারও মনে হলো , না নিজে কেন ছোট হতে যাবো । সবকিছু গুছিয়ে নেয়া শেষ হয়ে গেল এখন শুধু বাবা আসার অপেক্ষা । কিন্তু প্রতিটি নীরব মুহূর্ত মনে করিয়ে দিচ্ছে মনের বেদনা গুলো । রুমের মধ্যে চোখ রেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল ।
কলিং বেল বেজে উঠলো মনে হয় বাবা এসেছে আর বাবার এই ক্ষমতা টা প্রচুর আছে । একটা বাসার ঠিকানা দিলে হাজার বস্তির ভিতরেও সে খুঁজে বের করে ।
— কেমন আছিস মা ? (বাবা)
— ভালো আছি,, তুমি একটু বসো আমি ব্যাগ গুলো এনে দিচ্ছি ।
— জামাই বাবা কোথায় ?
— সে বাসায় নেই তুমি চুপচাপ দাড়াও ।
— আচ্ছা এই টা কি ভাড়া বাড়ি নাকি তোদের নিজেরদের ?
— নিজেদের বাড়ি । তোমাকে বলছি না চুপচাপ বসে থাকো ।
— আচ্ছা ঠিক আছে ।
আমি বাবার কাছে লাগেজ গুলো এনে দিলাম । নিচে সিএনজি দাড়িয়ে আছে সেখানে সবকিছু নিয়ে সে রাখবে । আমি ফ্লাটের চাবি দিতে সজীব এর রুমে গেলাম কিন্তু সজীব রুমের বারান্দায় বসে আছে ।
কক্সবাজার থেকে আসার পরে এই চারদিন সজীব এই রুমে ঘুমিয়েছে । অথচ তার রুমটা দেখলে সত্যি সত্যি মনে হয় যে এমন অগোছালো মানুষের জীবনে আমার থাকাটা খুব প্রয়োজন ।
কোলবালিশ পড়ে আছে মাটিতে , মাথার পাশের বালিশ দুটো একটা আরেকটার সাথে লড়াই করে । তিনটা টিশার্ট আর দুটো শার্ট বিছানার উপর । কম্বল টা কলেজের নষ্ট কাগজের মত মোড়ানো ।
সজীব এর দৃষ্টি বাহিরে রাস্তার দিকে, আমি এসেছি সে হয়তো বুঝতে পারছে কিন্তু কিছু বলেনি । চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখেনি , যেমন ছিল তেমন করে বসে আছে সে । মনে মনে বলছি, সজীব একবার আমাকে জড়িয়ে ধরো তাহলে আমি সত্যি সত্যি আর যাবো না সজীব । প্লিজ আমাকে বুকে টেনে নাও । কিন্তু কিছুই বলা হলো না ।
পায়ের কাছে চাবিটা রেখে দিয়ে আরো কিছুক্ষন নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম । কিন্তু তার দৃষ্টির পরিবর্তন হলো না তাই আমি যেভাবে নিঃশব্দে এসেছি ঠিক সেভাবেই নিঃশব্দে চলে এলাম ।
ড্রইং রুমে এসে দেয়ালে ঝুলানো সজীব এর বিশাল ফ্রেমে বাঁধা ছবিটির দিকে তাকিয়ে আরেকবার চোখের পানি বেরিয়ে এলো । একটা মানুষের জীবনে রাগ অভিমান এতটা বিষাক্ত বিষাদে ভরপুর সেটা জানা ছিল না ।
এই ছবির দিকে কতদিন তাকিয়ে ছিলাম , যেদিন থেকে আমি এসেছি সেদিন থেকে প্রতিদিন সজীব বাসায় না থাকলে আমি মাঝে মাঝে ছবির সামনে দাড়িয়ে থাকতাম । ইচ্ছে করছে ছবিটা সাথে করে নিয়ে যাই । কিন্তু তাতে সজীব মনে করবে তার জন্য এখনো আমি পুরি সেজন্য নিলাম না ।
সিএনজিতে ওঠার সময় উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সজীব আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । করুনা, দয়া, ভালবাসা, অভিমান মিশৃত সেই মুখের অস্পষ্ট ভাষা আমার জানা নেই ।
আজ ১লা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস । তাই রাস্তায় বিভিন্ন শ্রমিকদের মিছিল মিটিংয় ও সমাবেশ চলছে । শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা করতে পারে শুধু শ্রমিক সংগঠনের নেতা কর্মীরা । মূলত যারা শ্রমিক তারা এই দিনটাও কাজ করেই পেটের ক্ষুধা নিবারন করে ।
একবার টিভিতে কোন এক শ্রমিক দিবসে সাংবাদিক ও কয়েকজন ইটভাঙ্গা শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার দেখেছি । সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন , আজকের এই দিবসে আপনারা কেন কাজ করেন ? তখন তারা বলেছিল কাজ না করলে খেতে দিবে কে ?
সাংবাদিক সেই প্রশ্নের জবাব দেশবাসীর কাছেই জানতে চেয়েছিলেন । জানিনা কতজন সেই জবাব দিতে পারে ?
★★
নতুন বাসায় এসে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যে, সৎ মা আমাকে আর আগের মত বকাবকি করে না । বাবা এখন সবসময় তাকে ঝাড়ি দিয়ে কথা বলতে পারে । আমি সারাক্ষণ চুপচাপ সুয়ে আর বসে আর বিভিন্ন গল্প উপন্যাস পরে দিন কাটাই ।
যেদিন এসেছি ঠিক সেদিন থেকে আমার পুরাতন সিম বন্ধ করে রেখেছি । বন্ধু বান্ধবী আত্মীয় স্বজন কারো সাথে যোগাযোগ নেই আর সজীব এর সাথেও না ।
সম্পর্কের বন্ধন ঠিক পেরেকের প্যাঁচের মত। একবার যদি প্যাঁচ কেটে যায়, তা আর যত চেষ্টাই করনা কেন তা আর আগের মত মজবুত হয়না। হয়তো কৌশলে বা বল প্রয়োগে তা দেখতে আগের মত থাকবে কিন্তু ভেতরটা দেখলে একদম নড়বড়ে।
কিছু কিছু সময় আসে যখন আমরা বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সীমারেখায় অবস্থান করি। তখন আমরা একই সঙ্গে দেখতে পাই ও পাই না। বুঝতে পারি ও পারি না। অনুভব করতে পারি ও পারি না। সে বড় রহস্যময় সময়।
★★
সজীবের কাছ থেকে এসেছি আজ দুই মাস এগারো দিন হয়ে গেল , কলেজেও যাইনি এতদিন । কিন্তু আগামীকাল যেতে হবে । কারণ আমার জানা মতে সপ্তাহ খানিক পরে কলেজে টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবার কথা । এটা পূর্ব নির্ধারিত ছিল কিন্তু এখন কবে কোন পরীক্ষা ? পরীক্ষার রুটিন , সময় , প্রবেশ পত্র সবকিছুর জন্য কলেজ যাওয়া জরুরি ।
এতদিন বই খাতার ব্যাগটা খোলা হয় নাই । আজ সন্ধ্যা বেলা তাই ব্যাগ নিয়ে খুলতে বসলাম কিছু বই বের করার জন্য । ব্যাগের ভেতর একটা প্যাকেট দেখে অবাক হচ্ছি কিন্তু এটা যে সজীব দিছে সেটা বোঝা যাচ্ছে ।
প্যাকেটের ভিতর অনেক গুলো টাকা গুনে দেখি ৫০,০০০ টাকা আর একটা ATM কার্ড ও একটা সাদা কাগজ। যার সবার নিচে সুন্দর করে লেখা আছে ★ কালি ফুরিয়ে গেছে ★।
★★
পরেরদিন সকালে কলেজের সামনে আমাদের সেই রেস্টুরেন্টের সামনে দাড়িয়ে আছি । মনে মনে ভাবি এখন যদি সজীব আমাকে দেখে ফেলে তাহলে কি করবে সে ?
পিছন থেকে দৌড়ে এসে কেউ একজন রাস্তার শত মানুষের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরলো । আমি জানি এটা আমার সজীব , তার শরীরের আলাদা ঘ্রাণ আমার পরিচিত । তাই আমিও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলাম কিন্তু ভুলেই গিয়েছি যে আমরা রাস্তায় দাড়িয়ে আছি ।
— কোথায় ছিলে তুমি ? আমার কথা একবারও মনে পড়ে নাই তোমার ? ( সজীব )
— প্রতিটি মুহূর্ত আমি তোমার কথা ভেবে আর তোমার স্মৃতি স্মরণ করে বেচে আছি । (আমি)
— তাহলে এতদিন দুরে ছিলে কেন ?
— অভিমানে ।
— তোমাকে আমি কত খুঁজেছি , কিন্তু তোমাদের বাসা পরিবর্তন করা হয়েছে তাই পাইনি ।
— খুব কষ্টে ছিলে তুমি ?
— হমমম ।
— আবার নেশা করা শুরু করোনি তো ? খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করছো ?
— সবকিছু ঠিক মত আছে কারন আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে । তাই ভাবলাম যেদিন তুমি ফিরে আসবে সেদিন যদি দেখতে পাও আমি নেশা করি , ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করি না । তাহলে তো তুমি খুব বকাবকি করবে । আর আবার যদি অভিমান করে চলে যাও তাই ঠিক মত আছি ।
— ভদ্র স্বামী আমার ।
— কিন্তু তোমার কপালে বকা আছে ।
— কেন কেন কেন ?
— না ঘুমিয়ে চোখের নিচে কালি জমে গেছে , মাথার চুলে কবে শ্যাম্পু আর তেল দিছো তা হয়তো তুমি তো দুরের কথা তোমার চুলও জানেনা ।
— হাহাহা , আজ বাসায় গিয়ে তুমি নিজ হাতে শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করিয়ে দিও , তারপর বিকেলে ছাদে দাড়িয়ে সুন্দর করে তেল দিয়ে দিবে । ঠিক আছে মনে থাকবে তোমার ?
— হমমম ।
— তাহলে এবার ছাড়ো তাড়াতাড়ি , সমস্ত রাস্তার মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে আমাদের স্যুটিক দেখে ।
— ওহহ তাইতো তাইতো ।
★★
কেউ একজন আমার হাত ধরে টানছে , তাকিয়ে দেখি ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে কতগুলো গোলাপ ফুল বিক্রি করার জন্য দাড়িয়ে আছে ।
তারমানে আমি এতক্ষণ কল্পনা করেছি । আর দিনের বেলা এই রৌদ্রময় মুহূর্তে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম ।
পাঁচ টা গোলাপ ফুল কিনে বাচ্চা মেয়েটাকে ২০০ টাকা দিয়ে দিলাম ।
ভিতরে সজীব কে দেখা যাচ্ছে না, ক্যাশ বাক্সে বুড়ো কাকা বসে আছে । আমি আস্তে আস্তে হোটেলের মধ্যে গেলাম ।
— আসসালামু আলাইকুম , কাকা কেমন আছেন আপনি ? (আমি)
— ওয়া আলাইকুম আসসালাম , আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি তুমি কেমন আছো ? (কাকা)
— আমি ভালো আছি । কাকা সজীব কোথায় ? হোটেলে আসেনি এখনো ?
— তুমি একটা খালি টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে বসো আমি আসছি ।
— আচ্ছা ঠিক আছে ।
কাকার মুখ টা হঠাৎ কালো হয়ে গেল , কিন্তু কেন সেটা বুঝতে পারছি না আমি । এক কোনে গিয়ে বসে আছি আমি । কাকা এসে আমার সামনের চেয়ারে বসলো ।
বললো ;-
— তুমি এতদিন কোথায় ছিলে মা ? (কাকা)
— বাবার বাড়িতে ছিলাম ,।
— তোমার আগের ঠিকানায় তো খুঁজে পেলাম না । তোমার বান্ধবীদের মাধ্যমে খোঁজার চেষ্টা করছি অনেক কিন্তু পাইনি ।
— বান্ধবীদের মাধ্যমে কেন ? সজীব তো আমাদের আগের বাসা চিনতো । সজীব কোথায় ?
— তুমি তো ১লা মে চলে গেছিলে তাই না ?
— জি কাকা ।
— ওর তিন দিন পরে মে মাসের ৪ তারিখে হোটেল থেকে বাসায় যাওয়ার পথে মেরুল বাড্ডার ওখানে মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করে । অনেক গুরুতর আহত হয়ে আমরা তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলাম ।
— ( আমার সমস্ত শরীর শীতল হয়ে গেল , কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম ,) তারপর ?
— ৬–৭ ঘন্টার মধ্যে ও সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে গেল , আমাদের সকলের সাথে হাসিখুশী হয়ে কথা বললো । আমরা সবাই আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করি । সজীব আমাদের সবাই কে বাসায় যেতে বলে আর সে একা রবে হাসপাতালে । আমি অনেক জোর করলাম থাকার জন্য কিন্তু সে বললো “কাকা আমি সুস্থ হয়ে গেছি । আপনারা চিন্তা করছেন কেন ? ” তারপর আমরা সবাই বাসায় চলে গেলাম ।
— তারপর ?
★★
— রাত তিনটা বাজে সজীব আমাকে ফোন করলো কিন্তু আমি অবাক হলাম আর ভয়ও পেলাম ।
তখন সজীব বললো, ” কাকা একটা কথা বলার জন্য ফোন করেছি । ”
আমি বললাম কি কথা সজীব ?
সে বললো , ” কাকা আপনার মোবাইলে রেকর্ডিং চালু আছে ? না থাকলে আমার কথা গুলো রেকর্ড করেন ।
তখন আমি আমার মোবাইলে রেকর্ড চালু করি ,
তখন সজীব বললো:- ” মনযোগ দিয়ে শুনেন কাকা যদি হঠাৎ করে কখনো আমি মারা যাই । তাহলে আমার বাড়িটা বৃষ্টির জন্য রেখে দিবেন , আর রেস্টুরেন্ট টা আমাদের বাসার পাশের মসজিদে দান করে দিবেন । ঐ রেস্টুরেন্টে যত লাভ হবে সবকিছু তখন মসজিদে জমা হবে । ”
আমি বললাম , ” সজীব কি হইছে বাবা ? তোমার শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে নাকি ? আমি এখনই আসবো ?
সে বললো,, ” না কাকা আসার দরকার নেই হঠাৎ করে একটা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠছি তাই আবল তাবোল বলছি । কিন্তু যা বললাম সেগুলো রেকর্ড রেখে দিবেন আর একটা উকিল ডেকে সবকিছু ঠিক করবেন । দলিলে লিখে রাখবেন যদি কোনদিন বৃষ্টি ফিরে না আসে তবে ঐ বাড়িটা একটা বৃদ্ধাশ্রম খোলা হবে । ”
আমি বললাম,, “ঠিক আছে বাবা তাহলে তুমি এখন ঘুমিয়ে পড়ো আমি ফজরের নামাজ পড়ে তাড়াতাড়ি চলে আসবো । ”
★*
পরের দিন ফজরের নামাজ পড়ে আমি হাসপাতালে চলে গেলাম । দেখলাম সজীব ঘুমিয়ে আছে কিন্তু ঘুমের পজিশন দেখে আমার কেন যেন ভয় হলো । আমি প্রথমে তিন চার টা ডাক দিলাম , কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে শরীর ধরে ধাক্কা দিলে অনুভব করলাম সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে ।
দৌড়ে ডাক্তার কে ডাকতে গেলাম , আমি জরুরি বিভাগের ডাক্তার নিয়ে এলাম । ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো সজীব অনেক আগেই মারা গেছে ।
আমি তখন হাউমাউ করে কান্না করছি । ওর সেই নিষ্পাপ ঘুমন্ত মৃত মুখটা এখনো আমার চোখে ভাসে প্রতিদিন । মনে হয় যেন এখনো ওর আত্মা আমাকে ডেকে ডেকে কথা বলে ।
আমি নিজ হাতে ওকে কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দিয়েছি । ওর কবর তোমাদের বাসার পাশের যে মসজিদে সজীব এই রেস্টুরেন্ট দান করে গেছে সেই মসজিদের পাশেই দিয়েছি । জীবনের শেষ বারের মত ওর বাসার সামনে নিয়ে গিয়েছিলাম । সেখানে ওকে কিছুক্ষণ রেখে আবারও নিয়ে সকল মানুষের একমাত্র ঠিকানা মাটির ঘর কবরে । এখনো সে তার সেই মাটির ঘরেই আছে ।

— তোমাদের বাসা সেরকমই আছে , আমি সপ্তাহে দুই দিন গিয়ে সমস্ত রুম ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি । ঐ বাড়ির কাগজ পত্র তোমার নামে করা আছে তুমি ওটা গ্রহণ করে সজীব এর দেয়া শেষ উপহার টার মর্জাদা রক্ষা করো ।
★★ পরিশিষ্ট :-
আমি নাজমা আক্তার বৃষ্টি এখন দাঁড়িয়ে আছি ড্রইং রুমের সজীব এর সেই ফ্রেমে বাঁধা ছবিটির দিকে । ছবিটি হয়তো জানেনা তার আসল শরীর টা মারা গেছে । যদি জানতো তাহলে ছবিটার মুখে এত হাসি থাকতো না । সেই হাসি টার দিকে তাকিয়ে বারবার বলতে ইচ্ছে করছে :-
★ বিশ্বাস করো আজও ভালবাসি ★
রান্না ঘরে আমি যাওয়ার সময় একটা পাতিলে কিছু নুডলস রান্না করে রেখেছিলাম । সেগুলো নষ্ট হয়ে কালো রূপ ধারন করে পড়ে আছে । প্রতিটি জিনিস আগের মত পড়ে আছে যেমন টা আমি সাজিয়ে রেখেছি ।
সজীব এর রুমের মধ্যে গিয়ে দেখলাম , সেদিন আমি যাবার সময় যে চেয়ারে সজীব বসেছিল সেই চেয়ার এখনো সেখানেই পাতা আছে । হয়তো তার মনিবের অপেক্ষা করছে । আমি যে তার মনিবের স্ত্রী সেটা মনে হয় সে চিন্তে পারে নাই । যদি চিনতো তবে সে আমাকে হয়তো ডাকতো আর বলতো, সজীব কোথায় আছে ভাবি ?
বিছানার কোলবালিশ এখনো সেই ফ্লোরে পরে আছে। কিন্তু কাকা নাকি সপ্তাহে দুই দিন পরিষ্কার করে তাহলে সে কি এটা কখনো খেয়াল করে নি ?
( সমাপ্ত )
কিন্তু যারা চাচ্ছেন তাদের মিলন ভালো ছিল তারা গল্পে বৃষ্টির স্বপ্ন দেখা টা ভাঙ্গবেন না । মনে করবেন ওটাই বাস্তব এবং ওখানেই তাদের মিল করিয়ে দিবেন ।
.
#সমাপ্ত

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *