ভাবি যখন বউ পার্ট-৪| সিজন_২ | অভিমানী ভালোবাসার গল্প

গল্পঃ ভাবি যখন বউ
#পর্ব০৪ (জুয়েল)

(৩য় পর্বের পর থেকে)

আবারও হাটতে হাটতে বাসায় গেলাম, রাত প্রায় ১১ টা বাজে। আমি বাসায় গিয়ে বাবাকে ডাকলাম,,,

আমার ডাক শুনে আব্বু আম্মু আর অবন্তী আসলো।

বাবাঃ কিরে এতো দেরি হলো যে?

আমিঃ কাজের চাপ ছিলো। এই নাও (টাকা গুলো দিলাম)

বাবাঃ কি এখানে?

আমিঃ তোমার মেয়ের পরীক্ষার খরচ। ৬ হাজার আছে,,,

বাবা টাকা গুলো হাতে নিলো, অবন্তীকে দিয়ে দিলো। তারপর অবন্তী বললো….

অবন্তীঃ আব্বু একটা কথা বলতাম।

বাবাঃ হুম মা বল।

অবন্তীঃ জুয়েলের একা ইনকামে দিয়ে তো আর সব কিছু করা সম্ভব না। তাই বলছিলাম কি আমিও একটা চাকরি করি। তাহলে মোটামুটি আমাদের পরিবারে একটু স্বচ্ছলতা আসবে।

আমিঃ এই পরিবারে আর কারো ইনকাম করার দরকার নেই। আমি এখনো মরিনি। যদি করার এতো ইচ্ছা থাকে তাহলে আমি মরার পরে করিয়েন।

সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে,আমি আর কোনো কথা না বলে রুমে চলে গেলাম।

আসল কথা হচ্ছে আমি চাইনা অবন্তী কোনো কাজ করুক। এমনিতে আমি সারা দিন বাইরে থাকি, এখন যদি অবন্তীও বাইরে চাকরি করে তাহলে আব্বু আম্মুকে কে দেখবে? বুড়া বয়সে দুজনেরই কষ্ট হবে।

রাতে খেয়ে আমি বাইরে থেকে ঘুরে আসলাম, রুমে এসে দেখি অবন্তী ভাইয়ার ছবিটা হাতে নিয়ে বসে আছে। আমাকে দেখার পর ছবিটা রেখে দিলো।

আমি বিছানা থেকে একটা বালিশ আর কাঁথা নিয়ে ফ্লোরে শুয়ে পড়লাম।

অবন্তীঃ জুয়েল একটা কথা বলতাম!

আমিঃ হুম বলেন।

অবন্তীঃ তুমি খাটে থাকো, আমি ফ্লোরে ঘুমাই। সারাদিন কাজ করে আসছো এখন ফ্লোরে ঘুমালে হয়তো ঘুম আসবে না।

আমিঃ আমি কাপুরুষ নই যে একটা মেয়ে মানুষকে নিচে ঘুমাতে দিয়ে আমি নিজে খাটে ঘুমাবো। আপনি ঘুমান, এমনিতে অনেক রাত হইছে।

আর কোনো কথা না বলে ফ্লোরে ঘুমিয়ে গেলাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি অবন্তী গোসল করে আয়নার সামনে বসে চুল ঠিক করছে। ভেজা চুলে একটু অন্যরকম সুন্দর দেখাচ্ছে।

আমি দেখেও না দেখার ভান ধরে শুয়ে রইলাম। পরে মনে হলো যে পায়ে হেটে কাজ করতে হবে রোমান্টিক মুডে থাকার মতো সময় নাই।

উঠে ফ্রেশ হয়ে গোসল করে রেড়ি হয়ে বেরিয়ে গেলাম। আজকেও অনেক গুলো মাল নিয়ে কভার ভ্যান ঠ্যালতে শুরু করলাম।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম, অবন্তী কেন আমাকে মেনে নিচ্ছে না, যেখানে আমিই ওকে মেনে নিবো না সেখানে তার উলটো টা হচ্ছে।

এভাবে দিন যেতে লাগলো, বিয়ে করেও আমার অবন্তীর সম্পর্ক ভাবি দেবরের মতোই রয়ে গেলো

মাঝে মাঝে অবন্তীর উপর অনেক রাগ হয়, কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আব্বু আম্মুর জন্য আজকে আমার এই অবস্থা। দেশে মেয়ের অভাব পরেছে যে আমাকে ভাবিকেই বিয়ে করতে হলো।

সারা দিন কাজ করে এসে আবার রাতে ফ্লোরে ঘুম, জীবনটা অসহ্য লাগছে।

পরেরদিন কাজে গেলাম, শরীরটা ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও রাত পর্যন্ত কাজ করলাম।

রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে গেলাম। গভীর রাতে আমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। ঠিক মতো চোখও মেলতে পারছি না।

হঠ্যাৎ করে কপালে কারো নরম হাতের স্পর্শ পেলাম। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখি অবন্তী ডাকতেছে,,,,,

অবন্তীঃ জুয়েল, এই কি হইছে তোমার? এই রকম করছো কেন?

আমার অবস্থা এতোই খারাপ যে ওর সাথে কথা বলার মতো শক্তিও আমার নেই। অবন্তী আমাকে উঠিয়ে খাটে শুইয়ে দিলো। তারপর সারা রাত মাথায় পানি ঢাললো। আর কি কি করছে কিছুই মনে নেই, জ্বরের ঘোরে কোনো কিছু অনুভব করতে পারিনি।

সকালবেলা অবন্তীর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। তাকিয়ে দেখি আব্বু আম্মু সবাই বসে আছে। অবন্তী নাস্তা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে, মেডিসিন খাইয়ে দিলো।

বাবাঃ এখন কেমন লাগছে?

আমিঃ ভালো। তোমরা খেয়েছো?

আম্মুঃ হুম, ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করিস না তাই এমন হলো।

বাবাঃ ডাক্তার বলেছে কয়েকদিন রেষ্টে থাকতে।

আমিঃ ডাক্তার কখন আসলো?

বাবাঃ আরো আগে, তুই ঘুমে ছিলি। অবন্তী কল দিয়ে আসতে বলেছে।

আমি আর কোনো কথা বললাম না, সেদিন আর কাজে যাইনি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়….

অবন্তীঃ সরি!

আমিঃ সরি কেন?

অবন্তীঃ আমার জন্য আজকে তোমার এই অবস্থা।

আমিঃ আরে ধুর এগুলো কি বলেন, আপনার জন্য হবে কেন?

অবন্তীঃ ফ্লোরে ঘুমানোর কারনে এমন হইছে।

আমিঃ……

অবন্তীঃ প্লিজ তুমি খাটে ঘুমাও আমি নিচে ঘুমাচ্ছি।

আমিঃ দরকার নাই, আমার জন্মই হয়েছে নিচে ঘুমানোর জন্য। আমি থাকতে পারবো, সমস্যা নেই। আপনি ঘুমান।

অবন্তীঃ কিন্তু!

আমিঃ কোনো কিন্তু না, নিচে ঘুমালে আপনারওতো সমস্যা হতে পারে। তখন কি করবেন, সো ঘুমিয়ে পড়ুন।

অবন্তী কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো বাট আমি বলার আর সুযোগ না দিয়ে উলটো পাশ হয়ে শুয়ে গেছি। ফকিন্নি এটা বলতে পারছে না যে আসো আমরা দুজনে খাটে ঘুমাই।

দুজন খাটে ঘুমালে কি এমন সমস্যা হয়ে যাবে? আব্বু আম্মু বুঝে যাবে তাই অন্য রুমেও যেতে পারছিনা।

দেখবো অবন্তী মেডাম, আপনি কতোদিন এভাবে থাকতে পারেন।

কয়েকদিন পর মোটামুটি সুস্থ। আবারও কাজে চলে গেলাম।

এমন সময় আয়মানের সাথে দেখা হলো,,,

আয়মানঃ কিরে দোস্ত কি অবস্থা?

আমিঃ এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোর?

আয়মানঃ ভালোই, তোর কাজ শেষ হতে কতোক্ষন লাগবে?

আমিঃ সন্ধ্যা হবে।

আয়মানঃ আচ্ছা কাজ শেষে দেখা করিস, অনেক দিন তোর সাথে আড্ডা দিই না।

আমিঃ আচ্ছা ঠিক আছে।

তারপর আবার কাজে চলে গেলাম।

বিকালবেলা আয়মানের সাথে দেখা করতে গেলাম।

আয়মানঃ আসছিস?

আমিঃ হুম, বল কি অবস্থা?

আয়মানঃ এই তো চলছে। এই জানিস আগামী মাস থেকে তো পরীক্ষা।

আমিঃ কিহ! আগামী মাসে পরীক্ষা?

আয়মানঃ হুম, তোর প্রিপারেশন কেমন?

আমিঃ হা হা হা, পরীক্ষাও তো দেওয়ার কথা ছিলো না। তুই তো টাকার ব্যবস্থা করে দিলি। আর বইও তো কিনিনি। প্রিপারেশন কেমন হবে তুই বল।

আয়মানঃ তোর ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে।

আমিঃ হুম, বাস্তবতা কি জিনিষ এখন বুঝতেছি।

আয়মানঃ তোর ভাবি কেমন আছে?

আমিঃ ভাবি না, বউ আমার।

আয়মানঃ বউ মানে?

আমিঃ ভাবির সাথেই আব্বা আমার বিয়ে দিছে।

আয়মানঃ কিহ, কখন? আমাকে তো কিছুই বলিস নি।

আমিঃ……. (পুরো ঘটনা শেয়ার করলাম)

আয়মানঃ এতো কিছু হয়ে গেছে অথচ আমাকে কিছুই জানালি না?

আমিঃ সরি দোস্ত, বলার মতো তেমন সুযোগ ছিলো না।

আয়মানঃ তো অবন্তীর জন্য তো এটা প্লাস পয়েন্ট তবুও তোকে মেনে নিচ্ছে না কেন?

আমিঃ জানিনা রে, হয়তো আমি ওর যোগ্য নই।

আয়মানঃ তো এখন কি করবি?

আমিঃ কি আর করা এভাবেই দিন যাবে।

আয়মানঃ শোন জুয়েল, এটা কোনো জীবন নয়, তোরও একটা ভবিষ্যৎ আছে। এভাবে তো তোর কিছুই হবে না।

আমিঃ তো এখন কি করতাম?

আয়মানঃ অবন্তীর সাথে কথা বলে সব কিছু ঠিকঠাক কর।

আমিঃ কোনো লাভ হবে না। ও আমাকে মেনে নিতে পারবে না।

আয়মানঃ না নিলে ডিভোর্স দিয়ে দে। অন্য কোথাও বিয়ে হলে তখন ঠ্যালা বুঝবে।

আমিঃ ধুর তুই পাগল নাই, ওরে রাখার জন্যই আব্বু আমার সাথে বিয়ে দিছে। আর তুই বলছিস ডিভোর্স!!

আয়মানঃ ভালো তো, তাহলে সারা জীবন সিঙ্গেল থাক, ভাবি আর দেবরের মতো জীবন কাটা।

শোন ভাই, জীবন অনেক কঠিন সেটা তুই আমার থেকে ভালো জানিস।

আমিঃ সেটা ঠিক বাট অবন্তীকে ডিভোর্স দেওয়া তো দূরের কথা ডিভোর্স এর নাম মুখেও আনা যাবে না।

আয়মানঃ দেখ যা করবি ভেবেচিন্তে কর, আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। আব্বা কি বললো আম্মা কি বললো এগুলোর দিকে কান দিয়ে নিজের মন কি বলে সেটা দেখ।

তোর লাইফ তোকেই হ্যান্ডেল করতে হবে।

আমিঃ হুম ঠিক।

আয়মানঃ তুই একটা কাজ কর।

আমিঃ কি?

আয়মানঃ তুই অবন্তীর সাথে সরাসরি এই ব্যাপারে কথা বল।

আমিঃ কোন ব্যাপার?

আয়মানঃ তোকে স্বামী হিসেবে মেনে নিবে নাকি নিবেনা সেটা। যদি না মেনে নিবে বলে তাহলে তুইও অবন্তীকে বলে দিবি, যে তুই ওরে ডিভোর্স দিয়ে দিবি।

আমিঃ এটা কি করে হয়।

আয়মানঃ সব হয়, তুই কথা বল।

আমিঃ এখন না, পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর।

আয়মানঃ আচ্ছা ঠিক আছে।

তারপর আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাসায় চলে আসলাম।

এভাবেই দিন যাচ্ছে। অবন্তীর সাথে দরকার ছাড়া কথা বলি না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগে।

দেখতে দেখে পরীক্ষার সময় চলে আসলো। অবন্তী আর আমি একসাথেই পরীক্ষা দিলাম। আমার পরীক্ষার কথা শুনে বাবা মা অনেক খুশি।

পরীক্ষার কিছুদিন পর একদিন সকাল বেলা অবন্তী বসে বসে মোবাইল টিপতেছে, আব্বু আম্মু মামার বাড়িতে গেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম এটাই সুযোগ অবন্তীর সাথে এবার বোঝাপড়া টা হয়ে যাক।

আমি অবন্তীর সামনে গেলাম।

অবন্তীঃ কিছু বলবে?

আমিঃ হুম,,,

অবন্তীঃ বলো।

আমিঃ আপনি কি চান?

অবন্তীঃ মানে?

আমিঃ মানে আপনি কি আমার কাছে থাকতে চান নাকি আমার কাছ থেকে মুক্তি চান, কোনটা?

অবন্তীঃ জুয়েল তোমার মাথা ঠিক আছে, এগুলো কি বলছো?

আমিঃ আপনি উত্তর দেন। এখানে থালতে কি আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে?

অবন্তীঃ না,,,,

আমিঃ তাহলে আমাকে স্বামী হিসেবে মানতে আপনার সমস্যা কোথায়?

অবন্তীঃ দেখো আমি তোমাকে আগেই বলেছি এটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।

আমিঃ যদি আপনার অন্য কোথাও বিয়ে হতো?

অবন্তীঃ………. (চুপ করে আছে)

আমিঃ আমার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে আপনি আমাকে মেনে নিতে পারছেন না, কিন্তু অন্য কোথাও হলে কি পারতেন? জীবনেও না। আমি কোনো দিনই আপনাকে কোনো কথা বলিনি। তারমানে এই নয় যে সারাজীবন এভাবে থাকবো।

আমারওতো একটা লাইফ আছে,আমারও তো ইচ্ছা করে সুন্দর করে সংসার করতে।

আব্বু আম্মু আপনাকে অনেক ভালোবাসে, নিজের মেয়ের মতো দেখে। এখন যদি উনাদের বলি আপনাদের আদরের মেয়ে বিয়ের পরের দিন থেকে আমাকে ফ্লোরে রাখছে, তখন কি হবে চিন্তা করছেন?

অবন্তীঃ……..

আমিঃ আপনার সাথে বিয়ে টা হয়েই আমার জীবনটা শেষ, সারাদিন এতো কাজ করার পরেও কোনো শান্তি নাই।
আপনার সামনে দুটো রাস্তা খোলা আছে!

অবন্তীঃ….. (প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো)

আমিঃ হয় আপনি আমাকে মুক্তি দেন নাহয় আমি আপনাকে,,,,

পুরোটা বলার আগেই অবন্তী আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।

আর কোনো কথা না বলে সে রুমে চলে গেলো। ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দিলো, আমি সোফায় গিয়ে বসে রইলাম,একটু পর দেখি সে ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে যাচ্ছে।

থামাতে গিয়েও থামাইনি, যাক তাতে আমার কি? এসব আবেগ দিয়ে তো আর জীবন চলে না। আমি তো ওরে জোর করে বিয়ে করিনি।

আমাকে যদি এতোই অপছন্দ করতো তাহলে বিয়ের দিন বলে দিলেই পারতো।

সারা দিন বাসায় কাটিয়ে দিলাম, বাবা মাও নেই। বাসাটা কেমন খালি খালি লাগছে।

বিকালবেলা বের হতেই দেখি……..

#চলবে……
To be Continue…….

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *