রহস্যময় ভালোবাসা

 

(১)
“আপনি কি বলতে পারবেন জাহিদ স্যার কোন বাড়িটায় থাকেন?”
বাক্যটি শুনে জাহিদ সিগারেট ফেলে পেছন ঘুরে তাকালো।অল্পবয়স্ক এক লোক দাড়িয়ে।লোকটাকে দেখে অপরিচিত মনে হচ্ছে।
মুখে খোচা খোচা দাড়ি।
সাদা একটা পাঞ্জাবি পড়া।পাঞ্জাবির হাতা হালকা ছেড়া।
কিছুটা বিব্রত হয়ে জাহিদ বললো “আমিই জাহিদ।”
লোকটা তখন দু’পা সামনে এগিয়ে বললেন “স্যার আমার নাম মুরাদ।আমি আপনাদের পাশের গ্রামেই থাকি।একটা বিশেষ কারণে আপনার কাছে এসেছি।”
“ওহ্ চলুন ঘরে বসে কথা বলি।”
জাহিদ কথাটা বলা মাত্র লোকটা ঘরে ঢুকে গেলেন।জাহিদ এতে কিছুটা অবাক হলেও গ্রামের লোক ভেবে বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো।
– তো এবার বলেন আপনার বিশেষ কারণ।
– আমাদের গ্রামে কিছুদিন আগে এক লোক গলায় ফাস নিয়ে মারা গেছে।তারপর থেকে সে যেই ঘরে মারা গেছে সেই ঘরে রাত বারোটার পর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।গ্রামের কয়েকজন এই কান্না শুনেছে।কিন্তু কেউ ঢুকে দেখার সাহস পায়নি।
– ওপ্স!আগে থাকতে বলে দেই আমি কিন্তু কোন ওঝা বা তান্ত্রিক না।
– জানি স্যার।আগে আমার পুরো কথা শোনেন।
– হুম বলেন।
– এভাবে কিছুদিন চলার পর আমি এক রাতে ঘরের ভেতরে যাই।অবাক করা বিষয় সাথে সাথে কান্না থেমে যায়।আমার তখন আরও ভয় হতে থাকে।কিন্তু মনে একটা আক্ষেপ ছিলো আজ যাই হোক না কেন কান্নার কারণ খুঁজে বের করবোই।দূরভাগ্যবসত সেখানে তেমন কিছু চোখে পড়ে না।শুধু টেবিলে একটা বই পাই।যার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিলো “others people never can finish.four people can try.but It’s not for two.if you are one,please start this game.cz, you can win two magical prize.” লেখার নিচে আপনার নাম এবং ঠিকানা দেওয়া।
– যেই লোকটা মারা গেছিলো তাঁর নাম কি?
– ডক্টর সুমিত।
– হোয়াট?সুমিত মারা গেছে?
– আপনি চেনেন তাকে?
– আমরা একসাথে বিদেশে পড়াশোনা করেছি।সবার তুলনায় সে অত্যান্ত মেধাবী ছিলো।একটা সময় আমরা খুব ভালো বন্ধুও ছিলাম।কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়।যাইহোক ওর পরিবারের কেউ থাকেনা বাড়িতে?
– না।উনি একাই থাকতেন।
– ও আচ্ছা।আমি কি বইটা পেতে পারি?
– হ্যা অবশ্যই।
– ধন্যবাদ।বাড়ি এড্রেসটাও দিন।সময় পেলে ঘুরে আসবো।
মুরাদ বাড়ির এড্রেস এবং বইটা দিয়ে চলে গেলো।জাহিদ মুরাদের চলে যাওয়ার পর অপেক্ষা করলো না।বইয়ের শুরু থেকে মনযোগ দিয়ে পড়তে লাগলো।
বইটা মূলত গুপ্তধন নিয়ে লেখা।যেখানে এক রাশিয়ান রহস্যময় নক্সা পায়।এবং একে একে সব রহস্য ভেদ করে।কিন্তু শেষে ভেদ করা রহস্যের জাল তাকে ঘিরে ফেলে।পরে লোকটা ডিপ্রেশনে ভুগে মারা যায়।
বইটা পড়ে জাহিদ হতভম্ব হয়ে গেলো।সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।এইমুহূর্তে তাকে বাড়িটায় যেতে হবে।রহস্যের জাল তাকেও আকর্ষণ করেছে।
(২)
রাত প্রায় দেড়টা বাজে।
জাহিদ তাঁর ভাঙা বাইক কোনরকম চালিয়ে সর্গীয় সুমিতের বাড়ি পর্যন্ত এসেছে।
ঝোপঝাড়ের ঠিক মাঝে চার দেয়ালের একটা ঘর।ঘরের ভেতর থেকে হালকা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।সুমিত যতই ঘরের নিকটে যাচ্ছে কান্নার আওয়াজ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে।এরপর ঘরে প্রবেশের সাথেই কান্না থেমে গেলো।
ভেতরটায় ঘন অন্ধকার।হালকা শব্দেও শরীর শিউরে উঠে।জাহিদ ভয় পাচ্ছে।
কিন্তু সে ভয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে আলো জ্বালিয়ে দ্বিতীয় রুমের পশ্চিম দিকের সিনারিটা সরালো।সেখানে একটা নতুন প্রযুক্তিতে লক সিন্দুক রাখা।
একটু বুদ্ধি খাটালে সিন্দুক খোলা সম্ভব।জাহিদ নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা রেখে বইয়ের শেষ পাতায় লেখা ইংরেজি বাক্যের মাঝে ইঙ্গিত আকারে সাজানো নম্বর গুলো ডায়াল করলো “4212.”
পরক্ষণে সিন্দুক খুলে যায়।ভেতরে দুটি নীল হিরা চকচক করছে।হিরার পাশে একটি চিঠি।
জাহিদ হিরায় হাত না দিয়ে চিঠি তুলে পড়তে শুরু করলো।

প্রিয়,
আমি যা ভাবি তাই কাব্য, আমি যা লিখি তাই গদ্য।কিন্তু চিঠিতে তেমন অভ্যস্ত নই।তবু তোমাকে ঘিরে সম্পূর্ণ আয়োজন।
এখন আমি মৃত।এবং তোমার সামনে চকচকে দুটি হিরা আমার মৃত্যুর প্রতিদান।
লন্ডন থেকে যখন গ্রাজুয়েশন শেষ করে দেশে ফিরি তখন রহস্যে ঘেরা একটি নক্সা হাতে পাই।নক্সাটা আমার দাদা আমার কাছে তুলে দেন।কেন আমার কাছেই দেন তা আজ পর্যন্ত অজানা।তবে নক্সার শুরুতে লেখা ছিলো যে সম্পূর্ণ রহস্য উন্মোচন করবে ১০ দিনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু অবধারিত।প্রথমে বিষয়টা আমি বিশ্বাস করিনি।কিন্তু অবহেলার সাথে নক্সার দুইটা রহস্য উন্মোচনের পর বুঝতে পারি বাক্যটা আসলেই সত্য ছিলো।ভাগ্যক্রমে তখন খুব দেরি হয়ে গেছে।আমি চাইলেও পুরো রহস্য ভেদ না করে বের হয়ে আসতে পারছিলাম না।রহস্যের খেলাঘর আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো।
যদি পুরো বিষয় আমি চিঠিতে তুলে ধরি তাহলে তুমিও রহস্যে আটকে যাবে।তাই এই নিয়ে আর না লিখে মূল বিষয়ে আসি।আর হ্যা, নক্সাটার কথা ভাবছো তো?
আমি সেটা পুড়িয়ে ফেলেছি।

আমার পরিবার এই মুহূর্তে তোমার পথ চেয়ে বসে আছে।জানো নিরা তোমাকে ভুলতে পারেনি।আমি অনেক বড় ভুল করেছিলাম তোমাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে।কিন্তু কি করতাম বলো, বড় ভাই হিসাবে ছোট বোনের সাথে বন্ধুর সম্পর্ক কেমন বিশ্বাস ঘাতকতার পথ দেখাচ্ছিলো আমাকে।সেই পথে চলে তোমাদের বিচ্ছেদ তো ঘটিয়েছিলাম কিন্তু কিছুদিন বাদে নিরা আন্তহত্যার চেষ্টা করে।এবং তাতে তাঁর দুটি কিডনি ড্যামেজ হয়ে যায়।পরবর্তীতে বাড়ি ঘর সব বিক্রি করে নিরার কিডনি পরিবর্তন করাই।
শুনলে অবাক হবে, এটাও নক্সার রহস্য উন্মোচনের একটি ধাপ ছিলো।

এবার হয়তো বুঝে গেছো, কেন তোমার কাছেই হিরা দুইটি হস্তান্তর করা?এই পৃথিবীতে আমার পরিবারকে দেখাশোনার জন্য একমাত্র তুমিই আছো।
সর্বশেষ, কান্নার কথাটা হয়তো তোমাকে বলতে হবে না।ঘরকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একটা সফটওয়্যারের আশ্রয় নেওয়া।যা শুধু রাতে কাজ করে।এর বেশি কিছু না।সিন্দুক যেহেতু খুলে গেছে সেহেতু পরবর্তী আর কান্নার আওয়াজ শোনা যাবে না।সফটওয়্যার ড্যামেজ হয়ে গেছে।
ও হ্যা,তোমার হাতের বইটা তোমাকে গিফট করলাম।আমার সারাজীবনের সংগ্রহ এই বইয়ে লেখা আছে।এটা তুমি নিজের নামে প্রকাশ করতে পারলে রহস্যপ্রেমী প্রতিটা লোক তোমাকে চিনবে।
এবং মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট কথা, বইটার নাম হবে “দ্যা ডেড স্পট।”
ইতি
তোমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু
এসএম সুমিত
(৩)
জাহিদ বইটা সুমিতের নামে প্রকাশনীতে ছাপাতে দিয়ে নিরাদের নতুন বাড়িতে গেলো।
বেলকনিতে বসে নিরা রোদ পোহাচ্ছে।
সূর্যের আলো নিরার মুখে পড়ায় তাকে একটা নতুন রূপ দিয়েছে।যা লেখকদের ভাষায় বলতে গেলে অপরূপা।
জাহিদ কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে নিরার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো “ম্যামের কি একটু সময় হবে?”
নিরা তাড়াহুড়ো করে বেলকনি থেকে নিচে তাকালো।তারপর চিল্লায়ে বললো “মা দেখো কে এসেছে?”
ভেতর থেকে নিরার মায়ের কণ্ঠে ভেসে এলো “কে?”
নিরা জবাব না দিয়ে ঝটপট নিচে নেমে এলো।

এই মুহূর্তে নিরা এবং জাহিদের মাঝে দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুটের।দুজন দুজনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তারপর একপর্যায়ে নিরা অভিমানী সুরে বললো;
– কোথা ছিলেন এতদিন?
– ছিলাম কোথাও একটা।
– আমি সেটাই জিজ্ঞাসা করেছি।আপনার কোথাওটা কোথায়?
– সূর্যনগরীতে।
– সেটা আবার কোথায়?
– আছে।বাদ দেন।কেমন আছেন?
– লজ্জা করেনা এতদিন পর এসে এই কথা জিজ্ঞাসা করতে।
– সরি।
– আপনার মাফ নেই।আপনি অনেক বড় অপরাধ করেছেন।
– সাজা দিয়ে মাফ করা যায় না?
– না।
– সরি বাবা।
– আপনি জানেন আমি এতদিন কিভাবে ছিলাম?খোজ নিয়েছেন একটাবার?মরতে বসেছিলাম।আবশ্য আমি মরলে আপনার কি?
জাহিদ পরক্ষণে নিরার মুখ চেপে ধরলো।নিরা আর নিজেকে আটকাতে পারলো না।
জাহিদের বুকে মাথা ঠেকিয়ে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লো।এ কান্না হয়তো চলবে।অনেকটা সময় জুড়েই চলবে।কিন্তু চিরস্থায়ী নয়।
কারণ কথায় আছে, দুঃখের পরেই সুখের দেখা মিলে।
©Aryan Rofi

রহস্যময় ভালোবাসা

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *