রোমান্টিক প্রতিশোধ Part_6

#রোমান্টিক_প্রতিশোধ♥
পার্ট -6
লেখকঃ অদ্রিত আল মাসুদ

রোমান্টিক প্রতিশোধ part-1

রোমান্টিক প্রতিশোধ part-2

রোমান্টিক প্রতিশোধ part-3

রোমান্টিক প্রতিশোধ part-4

রোমান্টিক প্রতিশোধ part-5

 

কান্না করতে করতে আরহী এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরল।আরহী আমাকে কোথাও পাঠায় নেই তাই আমি পড়তে বসলাম।পড়তে পড়তে রাত দশটা বেজে গেল।
.
প্রতিদিন আরহী এই সময় খাবার খায়।তাই আমিও পড়া শেষ করে আরহীকে ডাক দিতে গেলাম।আরহী তখনও ঘুমাচ্ছিল।আমার ডাকের কারণেই আরহীর ঘুম ভেঙ্গে গেল।
.
—ম্যাডাম,ম্যাডাম।(আমি)

—কি হয়েছে?ষাড়েঁর মতো চিৎকার করছিস কেন?(আরহী)

—খাবার খাবেন না?আপনি প্রতিদিন এই সময়ে রাতের খাবার খান ত তাই ডাকতে আসলাম।

—খাব না।তোর যদি খিদে লাগে তাহলে তুই গিয়ে খা।এখন দূর হ এখান থেকে।(চিৎকার করে)

—আচ্ছা।
.
আমি আরহীর ঘরের সামনে থেকে চলে আসলাম।আমার মতো আমি খাবার খেয়ে থালা-বাসন ধুয়ে আরও একটু পড়ালেখা করে ঘুমিয়ে পরলাম।
.
অন্যদিকে আরহীর ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে এখন আর ঘুম আসছে না।তাই আরহী ফেসবুকে গিয়ে আমার আইডি থেকে গল্প পড়তে লাগল।
.
গল্প পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে আরহী দেখল আরহীর চোখ দিয়ে একা একাই জল বের হচ্ছে।আসলে গল্পগুলো এতটাই কষ্টের যে আরহী বুঝতেই পারে নেই কখনও আরহীর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে।
.
গল্প পড়তে পড়তে আরহী এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরে।পরেরদিন আরহী যখন ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠল তখন আমি আরহীকে দেখে অনেকটা অবাক হয়ে গেলাম।
.
কারণ আজকে আরহী শাড়ি পরেছে।তার সাথে হাতে নীল চুঁড়ি, চোখে কাজল। পুরো বাঙ্গালী বধূদের মতো লাগছে।
.
আমি আরহীর দিকে খেয়াল না দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ভার্সিটিতে চলে আসলাম।ভার্সিটিতে আসার পর আরহী তার বান্ধুবীদের কাছে চলে গেল আর আমি ক্লাসে চলে গেলাম।
.
এইভাবেই দেখতে দেখতে আরও তিন-চারদিন কেটে গেল।এই তিন-চারদিনের মধ্যে আরহী আমাকে একবারের জন্যও অপমান করে নেই বা মারে নেই।আরহীর হঠাৎ করে এমন পরির্বতন দেখে আমি অবাক হয়ে পারলাম না।
.
আমি যখনই আরহীকে দেখি তখনই দেখি মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে কি জানি পড়ে।আমি ঐসব না ভেবে নিজের মতোই থাকি।এখন প্রতি রাতে আরহী আমার লেখা গল্প পড়ে আর কান্না করে।
.
কারণ আরহী বুঝতে পেরেছে আমার গল্প গুলোর মধ্যে কত কষ্ট থাকে।আরহী এইটাও জানে আমার সব কষ্টগুলোর কারণ শুধু মাত্র আরহী।
.
এখন আরহীর কাছে নিজেকে একটা অপরাধী মনে হয়।আরহী প্রতিরাতে ভাবে কি করে আরহী প্রতিদিন এত অপমান এবং এত মেরেছে?আরহী মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে সাগর এমন কি বড় অপরাধ করেছিল যার জন্য আমি ওর সাথে এত কিছু করলাম?
.
সত্যি বলতে আরহী এখন নিজেও সেই সকল প্রশ্নগুলোর উওর খুঁজে পায় না।দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা দিন চলে যায়।আরহী প্রতিদিন শুধু আমার কথা ভাবতে ভাবতে কাটিয়ে দিয়েছে।
.
এতদিনে আরহী এইটা ভাল মতো বুঝে গেছে যে আমাকে ছাড়া আরহীর চলবে না।কিন্তুু আরহী পরক্ষণেই ভাবে আমি কি আরহীকে কখনও ক্ষমা করব?আরহী নিজেও জানে আরহী আমার সাথে যা করেছে তা ক্ষমার যোগ্য না।
.
এইটা ভাবতে ভাবতেই আরহী প্রতিরাতে কান্না করে।আরহী প্রতি রাতে কান্না করার কারণে আরহীর চোখের নিচে কালি পরে গেছে।পরেরদিন ভার্সিটিতে আরহী আনমনে বসে বসে আমার কথা ভাবছে তখনই সেখানে আনিকা আর নিধি উপস্থিত।
.
—কিরে আরহী তুই তোর এমন অবস্থা করেছিস কি করে?আমি এতদিন পরে ভার্সিটিতে আসলাম ভেবেছিলাম তোকে আগের মতোই দেখব।কিন্তুু তুই এইটা কি অবস্থা করে ফেলেছিস?(আনিকা)

—আনিকা,মনে হয় সাগর ওকে মেরেছে,ঠিক মতো খাবার দেয় নেই।এমন কি সারাদিন রাত কাজ করিয়েছে।তাই ত ঘুমাতে পারে নেই।(নিধি)

—ঐ তুই কি ভুলে গিয়েছিস?সাগর আরহীর চাকর।আরহী সাগরের চাকরানি না।

—হ্যাঁ,হ্যাঁ।আমি ত ভুলেই গিয়েছিলাম।সাগর ত আরহীর বাবার টাকায় কেনা চাকর।(কথাটা শুনার পর আরহী কান্না করতে লাগল)

—কিরে কান্না করছিস কেন?কি হল তোর?

—তুই সাগরকে চাকর বললি কেন?

—চাকরকে চাকর বলব না ত কি বলব?

—তুই জানিস না সাগর আমার স্বামী?ও কোনো চাকর না।

—হাহাহাহাহা।স্বামী?কিসের স্বামী?যে ছেলেকে ভার্সিটির সবার সামনে জুতা দিয়ে মারতে পারিস সে কি স্বামী হতে পারে?

—আনিকা,দয়া করে চুপ কর।আমি আর সহ্য করতে পারচ্ছি না।(আরহী নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের কান ধরে বসে পরল)

—কেন?কথাগুলো শুনতে তোর এত কষ্ট লাগছে কেন?আমি ত মিথ্যা বলছি না।

—সত্যি বলছি এই এক কথা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।যেখানেই যাই সবার এক কথাই বলে।আমি আর সহ্য করতে পারছি না।(আবার কান্না করতে শুরু করল)

—আরহী,একটা কথা বলবি?

—কি?(কান্না কন্ঠে)

—তোর হঠাৎ করে কি এমন হল?যার জন্য তুই সাগরকে স্বামী বলছিস?আর কেনই বা কান্না করছিস?

—সাগরকে আমি ভালবাসি রে।তাই আমি আর ওর বিষয়ে খারাপ কিছু শুনতে পারি না।

—তুই কি সত্যিই সাগরকে ভালবাসিস?নাকি আবার নতুন কোন নাটক?

—এইবার আমি কোন নাটক করছি না।আমি সত্যিই সাগরকে ভালবেসে ফেলেছি।

—সত্যি বলতে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তুই কাউকে ভালবাসতে পারিস।

—তোরা বিশ্বাস কর।আমি এইবার কোন নাটক করছি না।আমি সত্যিই সাগরকে ভালবেসে ফেলেছি।

—আমাদের বিশ্বাস করা আর না করা দিয়ে কিছুই যায় আসে না।তুই যাকে ভালবাসিস সে বিশ্বাস করবে কি না সেইটা বড় কথা।

—তুই সাগরের সাথে যা করেছিস তোর কি মনে হয় সাগর তারপরেও তোকে ক্ষমা করে দিবে?

—আরহী,আমার মনে হয় তুই একটু বেশিই দেড়ি করে ফেলেছিস।তুই সাগরের কাছে থেকে ওর জীবনের সব কিছু কেড়ে নিয়েছিস।সাগরের হাসি-খুশি,সুখ,এমনকি সাগরের পরিবারের মানুষগুলোকেও তুই সাগরের কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছিস।

—তোরা একটু ওকে বুঝা না যাতে আমাকে ক্ষমা করে দেয়।

—তুই কি এখনও ওর কাছে ক্ষমা চেয়েছিস?

—না।

—আগে গিয়ে তুই ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।তারপরে নিজের মনের কথা বলে দে।যদি সাগর না মানে তারপর না হয় আমরা বলে দেখব।

—আচ্ছা।
.
তারপর সবাই ক্লাস করতে চলে যায়।আরহী মনে মনে বুদ্ধি করে বাড়িতে গিয়ে নিজের মনের কথা সব আমাকে বলে দিবে।ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমি আরহীকে গিয়ে গাড়ি করে রনা দিলাম।
.
—ম্যাডাম,কিছু বলার ছিল।(আমি)

—হ্যাঁ।বল কি বলবে?(আরহী)

—ম্যাডাম,আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে এখন আপনাকে নিয়ে একটা জায়গায় যেতাম।(কথাটা শুনার পর আরহীর মুখে হাসি ফুটে উঠল)

—কোথায়?

—সেইটা ত বলা যাবে না।

—কেন?

—এমনি।কিন্তুু চিন্তা করিয়েন না আপনাকে কোন খারাপ জায়গায় নিয়ে যাব না।আর এতদিন যখন আপনার কোন ক্ষতি হতে দেয় নেই তাহলে বাকি দুই মাসেও আপনার কোন ক্ষতি হতে দিব না।(কথাটা শুনার পর আরহীর মুখের হাসিটা চলে গেল)

—অহ।

—ম্যাডাম,আজকেই আমাদের সেখানে যেতে হবে।নাহলে পরে অনেক বড় সমস্যা হয়ে যাবে।

—আচ্ছা,তাহলে নিয়ে চল।
.
আমি গাড়ি নিয়ে সেই জায়গায় যাওয়ার জন্য রনা দিলাম।কিছু সময়ের মধ্যে আমরা সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম।আরহী গাড়ি থেকে নামার পর কিছুটা অবাক হল।
.
—তুমি আমাকে এখানে নিয়ে আসলে কেন?(আরহী)

—আমাদের কাজটা ত এখানে।(আমি)

—কোর্ট এ আমাদের কি কাজ?আর তুমি না বললে আজকে আমাদের এখানে না আসলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে?কিন্তুু কোর্ট না আসলে আমাদের কি এমন ক্ষতি হবে?

—আরে আপনি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?

—কি ভুলে গেছি?

—আজকে ত আমাদের কোর্ট হাজির হতে হবে।নাহলে দুই মাস পর আমাদের ডির্ভোস হবে না।

—কি ডির্ভোস?(অবাক হয়ে)

—হ্যাঁ।এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে?

—না।কিছু না।

—তাহলে তাড়াতাড়ি চলুন।আমাদের কাজটা শেষ করে আমাদের আবার বাড়িতে যেতে হবে।
.
তারপর আমি আর আরহী ভিতরে গিয়ে আমাদের ডির্ভোসের আবেদন করে বাড়িতে চলে আসলাম।আমি একটা জিনিস খেয়াল করলাম আরহী যখন আবেদন করার জন্য সাক্ষর করছিল তখন আরহীর হাত কাঁপছিল আর চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল বেরিয়ে আসছিল।
.
হয়ত আমার মতো একটা কাজের মানুষকে হারাবে বলে নাহলে আমাকে আরও কয়েকবছরের জন্য চাকর বানাতে চায় তাই কান্না করছিল।
.
কিন্তুু আমার পক্ষতে আর আরহীর মার সহ্য করার মতো ক্ষমতা নেই।তাই আমি আর সেইদিকে খেয়াল না করে গাড়ি নিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম।বাড়িতে আসার পর আরহী দৌঁড়ে নিজের রুমে চলে গেল।
.
রুমে গিয়েই দরজা বন্ধ করে দিল।আমি আমার মতো ফ্রেস হয়ে রান্না করতে লাগলাম।রান্না শেষ হওয়ার পর আরহীকে ডেকে খাবার দিলাম।
.
খাবার খাওয়ার সময়ও আমি আরহীর চোখে জল দেখতে পারলাম।এইভাবেই চলে গেল আরও দুই দিন।এই দুইদিনে আরহী বেশির ভাগ সময়ই নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ছিল।
.
ঘরে শুয়ে শুয়ে হয়ত কান্না করছে।আমি সেইদিকে খেয়াল না দিয়ে নিজের মতোই থেকেছি।কিন্তুু বিপদ ঘটল যখন আমি রাতে রিশকা চালিয়ে বাড়িতে এসে আরহীকে দেখলাম না।
.
আমি ভেবেছিলাম আরহী আজকে ক্লাবে গিয়েছে।তাই আমি তেমন একটা গুরুত্ব দিলাম না।

মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আরহীর বাবা ফোন করেছে।আরহীর বাবার নাম্বার দেখে আমি অনেকটা অবাক হলাম।কারণ সেইদিন পর থেকে আমাকে আরহীর পরিবারের এমনকি আমার পরিবারের মানুষেরাও কোনদিন ফোন দেয় নেই।আমি ফোনটা ধরলাম।
.
—হ্যালো,সাগর।(আরহীর বাবা)

—হ্যাঁ,বাবা বলেন।(আমি)

—তুমি এখন কোথায়?
(কিছুটা রাগে)

—আমি ত বাড়িতে।কেন?

—তুমি যেখানেই থাক না কেন এখনই আমাদের বাড়িতে চলে আস।

—কেন?কিছু কি হয়েছে?

—কিছু হয়েছে কিনা তুমি এখানে আসলে পরেই জানতে পারবে।
.
কথাটা শেষ করেই আরহীর বাবা ফোনটা কেটে দিল।আরহীর বাবা হঠাৎ করেই আমাকে ফোন দিল কেন?আর আমার সাথে এত রাগি কন্ঠেই কথা বলল কেন?আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।
.
হয়ত কোন বিপদ হয়েছে তাই এমন করে কথা বলছে।আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আরহীদের বাড়িতে চলে গেলাম।সেখানে গিয়ে আমি অনেকটাই অবাক হলাম।
.
কারণ সেখানে শুধু আরহী ছিল না।আমার মা আর শ্রেয়াও ছিল।মা আর শ্রেয়াকে দেখে আমি অনেক খুশি হলাম।কিন্তুু তাদের পাশে আরহী তার মায়ের কোলে মাথা রেখে কান্না করছে।আরহী হঠাৎ করে কান্না করছে কেন সেইটা বুঝলাম না।
.
মা আর শ্রেয়াকে দেখে আমি এতটাই খুশি ছিলাম যে আরহীর কান্নার দিকে খেয়াল না করে আমি মায়ের কাছে গেলাম।আমি নিচু হয়ে মায়ের পা ধরে সালাম করব হঠাৎ করে মা পা সরিয়ে নিল।সালাম করতে না পেরে আমি মাথা উঠালাম।মাকে কিছু বলতে যাব তার আগেই ঠাসস ঠাসস করে মা দুইটা থাপ্পর আমার গালে বসিয়ে দিল।
.
—ছি:ছি: আমার ভাবতেও ঘৃণা করে তোর মতো একটা অমানুষকে আমি জন্ম দিয়েছি।আমি ভেবেছিলাম তোকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পর তুই ভাল হয়ে যাবি।কিন্তুু আমি ভুল ছিলাম।আমরা তোকে দূরে ঠেলে দিয়েছি তার জন্য শেষ পর্যন্ত আরহীকে তুই এমন করে মারতে পারলি?(মা)

—ছি: ভাইয়া তুই এতটা খারাপ হতে পারলি?তোর থেকে ত রাজু ভাইয়াও অনেক ভাল।তোকে আমার ভাইয়া বলতেও ঘৃণা করে।সেইদিন মা বলেছিল আজকে আমি বলছি ঈশ্বর আমাকে তোর মতো ভাই দেওয়ার থেকে না দিলেই আমি সব থেকে বেশি খুশি হতাম।(শ্রেয়া)

—সাগর,তুমি এতটা খারাপ কি করে হতে পারলে?আমার মেয়েটা সেই কখন থেকে এসে কান্না করছে আর তুমি একটি বারের জন্যও ওর খবর নিলে না?(আরহীর বাবা)

—ঐ কি খবর নিবে?ওর জন্যই ত আমার মেয়েটা এমন করে কান্না করছে।সেইদিনও বলেছি আর আজও বলছি ওর সাথে আমি আর আমার মেয়েকে থাকতে দিব না।ওর সাথে আরহীর ডির্ভোসের ব্যবস্থা কর।নাহলে আমি হয়ত আমার মেয়েটাকে আর জীবিত দেখব না।

—হ্যাঁ,তুমি ঠিকই বলেছ।আমি কালকেই ওদের ডির্ভোসের ব্যবস্থা করব।(আমি এত সময় সব কথা মাথা নিচু করে শুনছিলাম)

—মা-বাবা তোমরা এইসব কি বলছ?(আরহী)

—আমরা ঠিকই বলছি।তুই চুপ থাক।

—না তোমরা সাগরকে ভুল বুঝছ।

—তারা আমাকে ভুল বুঝছে না।তারা যা বুঝছে সব ঠিকই বুঝছে।আর হ্যাঁ আপনাদের কষ্ট করে আমাদের ডির্ভোসের ব্যবস্থা করতে হবে না।আমি আরও তিনদিন আগে আমাদের ডির্ভোসের কাজ করে এসেছি আর দুইমাস পর আইনতভাবে আমাদের ডির্ভোস হয়ে যাবে।আর আরহী তুমি যা করেছ তা আমি কখনই ভুলব না।

—না।সাগর বিশ্বাস কর আমি আজকে কিছু করে নেই।আমি মা-বাবাকে কিছুই বলি নেই।

—বিশ্বাস?আর তোমাকে?কখনই না।আর মা আমি ভালই ছিলাম কিন্তুু আমার একটাই কষ্ট তুমি আর শ্রেয়া আমাকে কখনই বুঝছে না।তোমরা উনাদের কথাই বিশ্বাস করলে।আমার কথা গুলোর কোনই দাম দিলে না।(কথাটা বলেই আমি সেখান থেকে চলে আসলাম)

—সাগর,যেও না।একবার আমার কথা শুনে যাও।বিশ্বাস কর আমি আজকে বানিয়ে কিছুই বলি নেই।
.
আমি আরহীর কথা না শুনে ওদের বাড়ি থেকে চলে আসলাম।আজকে আমার অনেক খারাপ লাগছে।আজকেও আরহী আমাকে শুধু শুধু এতগুলো কথা শুনাল।
.
আজকে আমি কি করেছিলাম?আরহী আমাকে যেভাবে চলতে বলেছে আমি ত সেইভাবেই চলেছি।যখন যে কাজটা করতে বলেছে করে দিয়েছি।
.
মা আর শ্রেয়ার চোখে আমাকে আগের থেকেই ত খারাপ বানিয়েছে।তাহলে আবার নতুন করে খারাপ বানানোর কি আছে?আরহীর কথা মতো ত আমি আরহীকে ডির্ভোস দিয়েও দিব।
.
তাহলে আজকে এমনটা করার কি দরকার ছিল?মা আর শ্রেয়ার কাছে ফিরে যাওয়ার যে আশাটুকু ছিল সেই আশাটুকুও আজকে আরহী নষ্ট করে দিল।যে বোনটা আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না শেষ পর্যন্ত আমাকে তার চোখেও খারাপ বানিয়ে দিল।
.
আরহী কয়েকদিন এমন ভাব করছিল যেন আমার সাথে আর কোন কিছু করবে না।কিন্তুু শেষ পর্যন্ত আরহীর মনে এইটা ছিল আমি কোনদিন ভাবতেও পারি নেই।
.
আজকে আরহীকে প্রশ্ন করতে অনেক ইচ্ছে করছে।কেন করল আমার সাথে এমন?আমার সম্পূর্ণ জীবন নষ্ট করে দিল।আগে জানতাম বড়লোকরা যা চায় তাই পায়,যা করতে চায় তাই করতে পারে।আজকে দেখে নিলাম আরহী আমার সম্পূর্ণ জীবনটা নষ্ট করতে চেয়েছিল শেষ পর্যন্ত তাই করে দিল।
.
হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে এসেছি আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।তাই রাস্তায় বসে পরলাম।মনে হচ্ছে এই জীবনটা যদি এখানেই শেষ হয়ে যেত তাহলে আমার থেকে সুখি হয়ত আর কেউ হত না।
.
কথাগুলো যখন ভাবছিলাম তখন থেকেই আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল।আজকে আর চোখ মুছতে ইচ্ছে করছে না।রাস্তায় বসার কিছু সময় পরই অনেক জোড়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
.
আজকে বৃষ্টিতে ভিজতে অনেক ভাল লাগছে।বৃষ্টির জল দিয়ে চোখের জল গুলো লুকানের বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম।অন্যদিকে আমি আরহীদের বাড়ি থেকে চলে আসার পর আরহী দরজার সামনে বসে বসে কান্না করতে লাগল।
.
—মা,তুই কান্না করিস না।দেখবি আমি তোকে ওর থেকেও ভাল ছেলের সাথে আবার বিয়ে দিব।একটু অপেক্ষা কর।আগে ডির্ভোসটা হয়ে যাক তারপরে তোর আবার বিয়ে দিব।(আরহীর মা)

—না।আমি বিয়ে করব না।(কান্না করে)

—ঠিক আছে বিয়ে নাহয় না করিস।কিন্তুু এখন কান্না বন্ধ কর।(আরহীর বাবা)

—যে তোকে এতদিন মেরেছে।সে ত তোর জীবন থেকে চলে গেছে।এখন কান্না বন্ধ কর।

—কে আমাকে মারত?(কিছুটা রাগে)

—কেন?সাগর।

—আমি কি আজকে তোমাদের একবারও বলেছি সাগর আমাকে মারত?তাহলে তোমরা শুদু শুধু সাগরের মা আর বোনকে ডেকে ওকে এতকিছু শুনালে কেন?

—তুই সেই দুপুর থেকে এখানে এসে কান্না করছিস তাই ত আমি ভাবলাম তোকে সাগর মেরেছে।সাগর তোকে না মারলে ত তুই এমন করে কান্না করছিস না।

—তোমাকে এত বেশি ভাবতে বলেছে কে?আমি আগে যা করেছি তার জন্যই সাগর আমাকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে কিনা জানি না।তার উপরে তোমার জন্য আজকে সাগর আমাকে আবার ভুল বুঝল।(কান্না করে)

—কেন?সাগরের সাথে তুই এমন কি করেছিস যার জন্য সাগর তোকে ক্ষমা করতে পারবে না।তাছাড়া তুই সাগরের কাছে ক্ষমাই চাইছিস কেন?

—আমি জানি আমার মেয়ে কখনও ভুল করতে পারে না।কিন্তুু আজকে কি এমন দরকার পরল যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে?তাও আবার সাগরের মতো একজনের কাছে যে কিনা টাকার জন্য নিজের বউয়ের উপর হাত তুলে।

—মা,তোমার মেয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে।সাগরের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতদিনে হয়ত আমাকে ছেড়ে চলে যেত।(কান্না করে)

—আরহী,তুমি কি করেছিস?একটু পরিষ্কার করে বল।(তারপর আরহী সম্পূর্ণ ঘটনা বলল)

—ঠাসস ঠাসস।ঠাসস ঠাসস।ছি: তোর মতো একটা মেয়েকে আমি জন্ম দিয়েছি ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে।তোর জন্য আমি সাগরের মতো একটা নিস্পাপ ছেলেকে কত কিছু বলেছি।(আরহীর মা)

—আরহী,তুই সাগরের সাথে এমনটা কি করে করতে পারলি?তোর কি একটুও কষ্ট হল না?(আরহীর বাবা)

—বাবা,আমি রাগের মাথায় ঐসব করে ফেলেছি।দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দাও।

—তোর জন্য আমি সাগরকে কত কিছু বলেছি।শুধু সাগরকে না সাগরের মা আর বোনকেও কত কিছু বলেছি।আমি সাগরের মার লালন-পালনে প্রশ্ন উঠিয়েছি কিন্তুু আমি জানতাম না আমার লালন-পালনেই দোষ ছিল।বেয়ান আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দেন।আমি না জেনে আপনাকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি।(আমার মা এইসব শুনে অবাক হয়ে বসেই রয়েছে)

—নিশ্চুপ।(এইসব শুনার কর শ্রেয়াও কান্না করে দিয়েছে)

—মা,চল আমাদের ভাইয়ার কাছে যেতে হবে।আমরা ভাইয়াকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি।

—হ্যাঁ হ্যাঁ।চল যাই।(শ্রেয়া আর মা উঠে দাঁড়াল)

—বেয়ান,দাঁড়ান।আমরাও যাব।আপনরা আমাদের সাথেই চলেন।

—বাবা,আমিও তোমাদের সাথে যাব।(আরহী কান্না করে)

—তুমি আর গিয়ে কি করবে?তোমার যা করার তুমি ত তা করেই ফেলেছ।

—আমি সাগরের কাছে ক্ষমা চাইব।দয়া করে আমাকে নিয়ে চল।

—ঠিক আছে চল।
.
আরহী আর আরহীর পরিবার এই বাড়িতে আসার জন্য রওনা দিল।অন্যদিকে আমি রাস্তায় বসে বসে কান্না করছি আর মনে মনে বলছি এখন যদি মরে যেতে পারতাম তাহলে সব থেকে ভাল হত।
.
আমি আর এই কষ্ট দিতে পারছি না।চোখ বন্ধ করে এইসব ভাবছিলাম যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম সামনের থেকে কিসের জানি আলো আসছে।
.
সামনের থেকে গাড়ি আসছে বুঝার আগেই গাড়িটা আমার উপর দিয়ে চলে যায়।দেখতে দেখতে আমার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসে।তার সাথে আমার রাস্তাটা রক্তে মেখে যায় আর আমার কষ্টগুলোও শেষ হয়ে যায়।

আরহী,আরহীর মা-বাবা,আমার মা আর শ্রেয়া আরহীর সেই বাড়িতে গিয়ে আমাকে খুঁজতে থাকে।কিন্তুু আমাকে কোথাও পায় না।তারা ভাবে হয়ত আসতে দেড়ি হচ্ছে।
.
তাই অপেক্ষা করতে থাকে।দেখতে দেখতে সকাল হয়ে যায়।এর মধ্যে শ্রেয়া কিছুসময়ের জন্য ঘুমিয়েছিল।তাছাড়া আর কেউই ঘুম আসে নেই।সকাল দশটা বেজে গেছে তাও আমি বাড়িতে আসি নেই।
.
—ওগো,সাগর এখনও আসছে না কেন?(আরহীর মা)

—সেইটাই ত ভাবছি।
(আরহীর বাবা)

—সাগরের কিছু হয়ে যাই নেই ত?

—না,আমার ছেলের কিছু হতে পারে না।(মা)

—বেয়ান,একটু শান্ত হোন।আমি সাগরকে খুঁজতে যাচ্ছি।

—আমার ছেলেকে আপনাদের খুঁজতে হবে না।আজকে আপনাদের আর আপনাদের মেয়ের জন্যই আমার ছেলেটার এই অবস্থা।আমার ছেলেকে আমি ঠিক খুঁজে নিবো

—বেয়ান,আপনি এইসব কি বলছেন?সাগরকে আমরা না খুঁজলে কে খুঁজবে?সাগর ত আমাদের জামাই।জানি আমাদের মেয়ের দোষেই সাগরের এই অবস্থা।কিন্তুু তাও আমাদের ত ওকে খুঁজতে হবে।

—কিসের জামাই?সাগর ত একটা ছোটলোক।তাছাড়া আপনিই ত বলেছেন সাগরের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিয়ে আপনি আপনার জীবনের সব থেকে বড় ভুল করেছেন।

—সেইসব ত আমি রাগের মাথায় বলে দিয়েছিলাম।দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন।

—এখন আর ক্ষমা চেয়ে কি হবে?আপনাদের জন্য আমি আমার নিস্পাপ ছেলেটাকে দূরে ঠেলে দিয়েছি,ওকে ভুল বুঝেছি।শুধুমাত্র আপনার মেয়ের আর আপনাদের কথা বিশ্বাস করে।

—মা,আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দেন।আমি না বুঝে ভুল করে ফেলেছি।(আরহী মার পা ধরে)

—ছি: ছি: তুমি এইটা কি করছ?তুমি জান তুমি কার পা ধরেছ?তাড়াতাড়ি আমার পা ছাড়।(মা পা সরিয়ে নিয়ে)

—আমি ত আমার শাশুড়ি মার পা ধরেছি।

—শাশুড়ি?কে শাশুড়ি?আমি ত তোমার শাশুড়ি না।যাকে তুমি জীবনে স্বামী হিসাবে মান নেই তার মাকে শাশুড়ি বলছ কেন?তাছাড়া আমি ত একটা ছোটলোকের,চাকরের মা।চাকরের মায়ের পা কি কেউ ধরে?

—মা,এমন করে বলবেন না।আমার অনেক কষ্ট হয়।

—তুমি আমার ছেলেকে যে কষ্ট দিয়েছ তার কাছে এই কষ্ট কিছুই না।

—বাবা,তুমি একটু শাশুড়ি মাকে বুঝাও না আমি যা করেছি সব বুঝে করে ফেলেছি।শাশুড়ি মাকে একটু বল না আমাকে ক্ষমা করে দিতে।(আরহী আরহীর বাবার পা ধরে)

—ক্ষমা আর তোকে?কোনদিন না।বেয়ান তোকে ক্ষমা করুক আর না করুক তাতে আমি কি জানি না।কিন্তুু মনে রাখিস আমি তোকে কখনই ক্ষমা করব না।

—মা,তুমি ত একটু বাবাকে বুঝাও।আমি না তোমার ভাল মেয়ে?তুমি একটু বাবাকে বুঝাবে না?(আরহী আরহীর মার পা ধরে)

—আমি ত তোকে সব সময় ভালই জানতাম।তুই যখন যা চেয়েছিস তোর বাবাকে বলে আমি এনে দিয়েছি।তাই হয়ত আজকে তুই এতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিস।তুই আমার মেয়ে হয়ে এমন কি করে করতে পারলি?শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে তা আমার জানা ছিল না।

—মা,আমাকে ক্ষমা করে দাও।(কান্না করে)

—না।তোকে আর আমি ক্ষমা করব না।যতদিন পর্যন্ত সাগর তোকে না ক্ষমা করছে ততদিন পর্যন্ত তুই আমাকে আর মা বলে ডাকবি না।তোর জন্য আমি সাগরকে কত কিছু বলেছি।কথাগুলো ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে।আর তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছ কেন?তাড়াতাড়ি গিয়ে খুঁজ নেও ছেলেটা কোথায় আছে।

—হ্যাঁ,যাচ্ছি।(আরহীর বাবা চলে গেল)

—শুধুমাত্র আমার ইচ্ছে পূরণ করতে আর আমার জীবন বাঁচাতে আমার ভাইয়া আপনার মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করেছিল।আর আমি কিনা আমার সেই ভাইয়াকেই আপনার জন্য কতকিছু বললাম?আপনি আমার ভাইয়ার সাথে এমনটা কি করে করতে পারলেন?(শ্রেয়া)

—শ্রেয়া,তুমি ত আমাকে একটু বুঝার চেষ্টা কর।আমি কিছু ইচ্ছে করে করি নেই।(আরহী শ্রেয়ার হাত ধরে)

—আপনি আপনার এই হাত দিয়ে ছুবেন না আমাকে।আপনি এই হাত দিয়ে আপনি আমার ভাইকে মেরেছেন।আর আপনি কি বললেন আপনি ইচ্ছে করে কিছু করেন নেই তাই না?

—হ্যাঁ,আমি সত্যি বলছি আমি ইচ্ছে করে কিছু করে নেই।

—আপনি না কালকে বললেন আপনি আমার ভাইয়ার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে বিয়ে করে চাকর বানানোর জন্য আমার এক্সিডেন্ট করেছিলেন?তাহলে কি সেইসব ইচ্ছে করে করেন নেই?নাকি একা একাই হয়েছে?

—ঐসব আমি রাগের মাথা করে ফেলেছি।তুমি একটু শাশুড়ি মাকে বল না আমাকে ক্ষমা করে দিতে।

—মা,চল আমরা এখনই এখান থেকে চলে যাই।আমি আর ঐ মেয়ের মুখ দেখতে চাইনা।যে নাকি আমার ভাইকে এতদিন মেরেছে,আমাদের থেকে আমাদের ভাইকে দূরে সরিয়ে দেয় আমি সেই মেয়ের মুখ আর এক মিনিটও দেখতে চাই না।

—হ্যাঁ,মা।চল আমরা বাড়িতে যাই।সাগর যদি সেখানে থাকে।

—হ্যাঁ,চল।তাড়াতাড়ি যাই।(মা আর শ্রেয়া বাড়িতে চলে গেল)

—মা,তুমি ত আমাকে বিশ্বাস কর।আমি কিছুই ইচ্ছে করে করি নেই।আমি সব রাগের মাথা করে ফেলেছি।তুমি ত জানো আমার রাগ উঠলে আমি কি করি আমি নিজেও জানি না।

—তোকে একবার বলেছি না আমাকে মা বলবি না।আর হ্যাঁ তুই চিন্তা করিস না।তোর বাবা আসে আমিও তোর বাড়ি থেকে চলে যাব।

—মা,তুমি ত আপনাকে পর করে দিয়েও না।

—পর ত তুই সেইদিনই হয়ে গিয়েছিস যেদিন আমাদের কাছে মিথ্যা নাটক করে সাগরকে বকা শুনিয়েছিলি।নতুন করে আর কি পর করব?

.
কথাটা বলেই আরহীর মা একটা ঘরের ভিতরে চলে গেল।আরহী সেখানে বসে বসে কান্না করতে লাগল।আরহী বসে বসে ভাবতে লাগল সাগর তুমি সেইদিন ঠিকই বলেছিলে।
.
দেখে যাও আজকে আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছি।আমার পাশে কেউ নেই।আমার মা-বাবা পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।সাগর তুমি কোথায়?দয়া করে বাড়িতে ফিরে আস।আমি আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না।
.
আরহীর বসে বসে কান্না করছে আর এইসব বলছে।কিন্তুু আজকে আরহীর কথা শুনার মতো কেউ নেই।অন্যদিকে মা আর জয়া বাড়িতে পৌঁছে গেছে।
.
শ্রেয়া বাড়িতে এসে আমার নাম ধরে ডাকতে থাকে আর এই ঘর ঐ ঘরে খুঁজতে থাকে।কিন্তুু আমাকে কোথাও খুঁজে পায় না।আমাকে খুঁজে না পেয়ে শ্রেয়া কান্না করতে থাকে।
.
—ভাইয়া,তুই কোথায়?ফিরে আয় আমার কাছে।তুই ত জানিস তোর ছোট পিচ্ছিটা তোকে ছাড়া থাকতে পারে না।ফিরে আয় ভাইয়া।মা দেখ না ভাইয়া আসছে না।(শ্রেয়া কান্না করে)

—শ্রেয়া,কান্না বন্ধ কর।দেখবি তোর ভাই ঠিকই তোর কাছে ফিরে আসবে।(মা)

—আমি জানি ভাইয়া আমার কাছে আর কখনও ফিরে আসবে না।আমি ভাইয়াকে বিশ্বাস না করে ঐ মেয়েটাকে বিশ্বাস করেছি তাই ভাইয়া অভিমান করে আর কখনও আমার কাছে ফিরে আসবে না।

—শ্রেয়া,মা আমার এমন করে বলে না।দেখবি তোর ভাইয়া তোর কাছে ফিরে আসবে।তুই বল তোর ভাইয়া কি তোর কাছে না এসে থাকতে পারবে?(মারও কান্না পাচ্ছে।কিন্তুু মা কান্না করে দিল শ্রেয়া কে আটকাবে?তাই মা কান্না করছে না)

—আমি জানি ভাইয়া আমার কাছে ফিরে আসবে না।তুমি সেইদিন বলার পর ত আর আমাদের কাছে আসে নেই।আমি জানি ভাইয়া এখনও আমার কাছে ফিরে আসবে না।(কান্না করে)

—কাকি,সাগরের কি হয়েছে,সাগর কোথায়?আর আপনারাই বা কালকে কোথায় ছিলেন?(রাজু)(মা রাজুকে কালকের সব কথা বলল)

—রাজু,ভাইয়া তুমি কি জানো আমার ভাইয়া কোথায়?জানলে একটু আমাকে ভাইয়ার কাছে নিয়ে চল।দেখ না আমার ভাইয়া আমার উপর রাগ করে কোথায় জানি চলে গেছে।আমি ভাইয়াকে ভুল বুঝে অনেক কিছু বলে ফেলেছি তাই ভাইয়া আমার উপর রাগ করে চলে গেছে।(কান্না করে)

—শ্রেয়া,তুমি না ভাল মেয়ে?আর ভাল মেয়েরা কি কখনও কান্না করে?তাছাড়া তোমার ভাই যদি তোমাকে এমন করে কান্না করতে দেখে তাহলে কি তার ভাল লাগবে?

—না।

—তাহলে তুমি কান্না বন্ধ কর।

—তাহলে তুমি আমাকে আমার ভাইয়ার কাছে নিয়ে চল।তাহলেই আমি আর কান্না করব না।

—রাজু,তুই কি জানিস সাগর কোথায়?জানলে আমাদের একটু ওর কাছে নিয়ে চল।(মা)

—কাকি,আমি সত্যিই জানি না সাগর এখন কোথায় আছে।

—ওহ।(মন খারাপ করে)

—কাকি,আপনাদের একটা কথা বলার ছিল।

—কি কথা?

—এতদিন আমি যে আমি আপনাদের টাকা,চাল-ডাল দিতাম এইসব আমার টাকার না।এইসব সাগরের টাকায়।সাগর প্রতিদিন রিকসা চালিয়ে ওর পড়ালেখার খরচ আর আপনাদের খরচ চালাত।

—কিকিকিকি?

—হ্যাঁ।সাগর আগেও রিকসা চালিয়ে আপনাদের খরচ চালাত।কিন্তুু আপনারা ওকে ভুল বুঝছেন।

—রাজু,তুই এইসব কি বলছ?

—আমি সত্য বলছি।আপনি সাগরের উপর রেগে ছিলেন তাই সাগর আমার হাত দিয়ে আপনাদের এইসব দিয়েছে।সাগর জানত ওর নাম বললে আপনি এইসব নিতেন না।

—তার মানে আমি আমার ছেলেকে এতদিন ভুল বুঝেই গেলাম?আমি মা হয়ে আমার ছেলেকে চিনতে ভুল করলাম?আমি আমার ছেলেকে ভুল বুঝতে কিভাবে পারলাম?এখন ত আমার ছেলেটাকে খুঁজেও পাচ্ছি না যে ওর কাছে ক্ষমা চাইব।

—কাকি,আপনি চিন্তা করিয়েন না।আমি খু্ঁজ নিয়ে দেখি সাগরকে কোথাও পাই কি না।

—সাগরের খুঁজ পেলে আমাকে বলিও।

—আচ্ছা।
.
রাজু চলে গেল আর মা কান্না করতে লাগল।কারণ সে না জেনে আমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছে,আমাকে বিশ্বাস করে নেই।এইটা ভাবতেই মার কান্না চলে আসছে।
.
তারপর মা আর শ্রেয়া মিলে কান্না করতে থাকে।শ্রেয়া কান্না করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে।অন্যদিকে আরহীর বাবা বাড়িতে চলে আসে।মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে খারাপ কিছু একটা হয়েছে।আরহীর বাবাকে দেখে আরহীর মা আর আরহী চলে তার সামনে চলে আসে।
.
—তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?আর সাগরের কোন খুঁজ পেয়েছ?(আরহীর মা)

—হ্যাঁ।(কান্না কন্ঠে)

—কি হয়েছে?আর তোমার কন্ঠ এমন শুনাচ্ছে কেন?

—খবরটাই এমন যে ঠিক মতো কথা বলতেও পারচ্ছি না।

—বাবা,সাগর কোথায়?সাগরের কিছু হয় নেই ত?(আরহী)

—নিশ্চুপ

—কি হল বলছো না কেন?বল না সাগর কোথায়?

—সাগর আর এই পৃথিবীতে নেই।

—মানে?তুমি এইসব কি বলছ?

—সাগরকে খুঁজতে গিয়ে জানতে পারলাম কালকে রাতে বৃষ্টির সময় আমাদের বাড়ির পাশে কারো এক্সিডেন্ট হয়েছে আর সে সেখানেই মারা গিয়েছে।

—না।এইটা হতে পারে না।

—এইটাই হয়েছে।তোর জন্য সাগর মারা গিয়েছে।

—আমি বিশ্বাস করি না।আমার সাগর আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না।
.
কথাটা বলেই আরহী অজ্ঞান হয়ে যায়।

চলবে…… 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *