সিনিয়র ভাবি যখন বউ । রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প । পার্ট-৩

সিনিয়র ভাবি যখন বউ

পার্ট=৩

নাহ এটা হতে পারে না। আমি নীলাকে ভালোবাসি। তাই নীলার দেয়া শর্ত আমি মেনে নিতে রাজি।
.
বাসায় ফিরলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে। নীলা এমন করতে পারল। কি করে বের হই এই গোলক ধাধা থেকে। একদিকে মিরা আমার বিয়ে করা স্ত্রী। একদিকে প্রেমিকা নীলা। আমার ভালোবসা।
মিরাকে ডিভোর্স দিলে আম্মু আর মিরাও কষ্ট পাবে। আম্মুর সিদ্ধান্ত ছাড়াতো কিছুই করতে পারব না। আর নীলাকে ছাড়াতো আমি অসম্পুর্ন।
.
বাসায় ফিরে সোজা রুমে গেলাম। মিরা রুমে নেই। কোথায় গেল মেয়েটা? বলেছিলাম বিশ্রাম করতে আর উনি…। কোথায় যে গেল। আম্মু রুমের দিকে গেলাম।
– কিরে এসে গেছিস?
[আম্মু]
– হুম, মিরা কোথায়?
[আমি]
– কোথায় আবার, রুমেই আছে দেখ গিয়ে।
– পেলাম না তো…।
– ভালো করে খুঁজে দেখ..। রুনেই কোথাও আছে মনে হয়।
– হুম।
রুমে এসে চারিদিক খুঁজে দেখলা কোথাও নেই। বারান্ধায় কারো উপস্থিতি টের পাচ্ছি। মনে হয় বারান্ধায় আছে। বারান্ধায় গিয়ে দেখলাম মিরা বারান্ধার গ্রীলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। বাহির দেখছে বোধ হয়। বলে গেলাম শুয়ে বিশ্রাম নিতে আর উনি বারান্ধায় দাঁড়িয়ে বাহিরের দৃশ্য অবলোকন করছেন।
.
মিরা বারান্ধায় দাঁড়িয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক দিন হলো বাহিরটা দেখেনি। আব্বু-আম্মু তো বাসায় নিতে চাইছিল কিন্তু যাই নি। কাব্য আর আমার বিয়ের দিন আম্মু ভিজে ভিজে চোখে তাকাচ্ছিল। তারপর আর আসেনি। বোধ হয় মেয়ের এই কষ্ট দেখতে পারবে না বলে আসছে না। কাব্যটা সেই কখন গেলো এখনো এলো না। ওও পাশে থাকলে ভালোই লাগে। একাকিত্ব গুছিয়ে উঠতে পারি। কতো সুন্দর সুন্দর কথা বলে। আমার কতো কেয়ার নেয়। কাব্য কি নীলারও এমন কেয়ার নেয়।
.
আমি অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। মিরা এখনো টেরই পায়নি। কি এতো ভাবে মেয়েটা?
– নেই…।
[আমি]
আমার কথা শুনে মিরা চমকে পিছনে ফিরে তাকাল। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
.
মিরা খুব বড়সড় শক খেলো। কাব্য বুঝল কি করে আমি মনে মনে কি ভাবছি।
.
– হ্যা, নেই। তুমি এই জগতে নেই। তুমি এখন ভাবনার জগতে। কি এতো ভাব? আমি কতোক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি তোমার সেদিকে খেয়ালই নেই।
মিরা আমার কথা শুনে বিষ্ময় যেন কাটিয়ে উঠল।
– ওও…
আমার কথায় যেন মিরা স্বস্তি পেল।
– তোমাকে না বলেছিলাম বিশ্রাম নিতে। তাহলে এখানে কি? প্রকৃতি প্রেমী হওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?
– না, শুয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। তাই এখানে দাঁড়িয়ে বাহির দেখছিলাম।
– ওও, তুমি তো অনেক দিন হল ঘুরতে যাও না।
মিরা মাথা নাড়াল।
– তাহলে আজ যাবে?
– কোথায়?
– ঘুরতে…
মিরা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
– কি হল? যাবে মানে যাবে। মানা করার চান্স নেই।
– কিন্তু…
– কোনো কিন্তু না। সন্ধ্যায় আমরা ঘুরতে যাচ্ছি এটাই ফাইনাল। ওকে…
– না মানে…
– বললাম তো আর কোনো কথা নেই। আমার ডিসিশন ই ফাইনাল।
মিরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
– দুপুর হয়ে গেছে নাঞ্চ সেরে নিতে হবে…।
– একটু আগেই না খেলাম সকালের নাস্তা।
[মুখ বোঁচা করে বলল মিরা [
– তো…
– এখন আবার খাবো কি করে?
– কেনো হাআআ করে খাবে।
মিরা হেসে দিল।
– তারপর, সন্ধ্যায় যাচ্ছো তো?
– মানা করতে বারণ করলে তো। তাহলে তো যেতেই হবে। তাই না।
– হুম, গুড গার্ল।
– গুড গার্ল না ছাই…।
– কিছু বললে?
– না তো।
– ওও।
আমি নিচে গেলাম। আম্মু আর রহিমা খালা তখন খাবার রেডি করছে। আব্বু অফিস থেকে বাসায় এসেছে লাঞ্চের জন্য। আমি নিচে যেতেই,
– কিরে বৌমা কোথায়?
– উপরে আসছে…।
– ওও, তা মেয়েটাকে একটু বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে আয় না। মন ভালো হবে।
– হ্যা, আব্বু সন্ধ্যায় ঘুরতে যাবো ভাবছিলাম।
– ওও খুবই ভালো কথা। গাড়ি নিয়ে সারা শহর ঘুরিয়ে আসিস বৌমাকে নিয়ে।
– হুম।
.
মিরা রুমেই আছে। ভাবুক হয়ে বসে আছে। কাব্য বুঝে নিলো যে, ওও ঘুরতে যেতে চায়। কি করে? আশ্চর্য। কিন্তু, আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে? যদি না যাই তাহলে তো কাব্য রাগ করবে। কি করি, কি করি? যেতেই তো হবে।
নিশানটা যে কেনো এমন করল আমার সাথে? আজ তো কাব্যের বদলে নিশানের সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, নিয়তি সেটা হতে দিল না। নিশানের বদলে কাব্যকে ঠিক করেছে নিয়তি। কিন্তু, কাব্যকে আমি কি করে মানা করি? ওও তো মানা করতেও বারন করেছে। যাক এসব কথা এখন নিচে যাই না হয় ওও নিজে উপরে এসে যাবে। মিরা রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেল।
.
মিরার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মিরা সিড়ি দিয়ে নিচে নামল। মিরাকে দেখতেই আব্বু স্নেহপূর্ন একটা হাসি দিল।
– গুড দুপুর আম্মু…।
[আব্বু]
আব্বুর কথায় আমরা হেসে উঠলাম। আমরা জানি আব্বু মিরাকে হাসানোর জন্য বলেছে এটা। মিরা ফিক করে হেসে দিলো,
– শুভ নুন। [GD NOON ]
[ মিরা ]
আম্মু তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে মিরা আর আব্বুর কথা-বার্তার ধরন দেখে।
– কেমন কাটল আজ দিনটা?
[আব্বু]
– ভালো কেটেছে আব্বু।
– সন্ধ্যায় আরো ভালো কাটবে।
মিরা প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাল আব্বুর দিকে।
– সন্ধ্যায় তুমি আর কাব্য বেড়াতে যাবে।
মিরা আমার দিকে তাকাল। মিরা হয় তো ভাবেনি আমি আব্বু-আম্মুকে বলব ব্যাপারটা।
– আচ্ছা, এখন আয় বস। খেয়ে নে। [আম্মু ]
মিরা আমার পাশে বসল। গল্প করতে করতে খাবার খেয়ে নিলাম। আব্বুও অফিসে চলে গেলো। আব্বুকে টিফিন সাথে দিলেও বাসায় খেতে আসে। সে নাকি একা একা খেতে পারে না। সবার সাথে খেতেই নাকি মজা।
.
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি রুমে গিয়ে দেখলাম মিরা আলমারিতে কি যেন খুঁজছে।
– কি খুজছো? শাড়ি?
মিরা ঘুরে দেখল আমি। মাথা নাড়াল।
– পছন্দ হচ্ছে না…।
– না।
ছোট্র করে জবাব দিল।
– আমি চুজ করে দিচ্ছি।
শাড়িগুলো উল্টে-পাল্টে দেখলাম। একটা সাদা শাড়ি পছন্দ হল। আমি মিরার দিকে এগিয়ে দিলাম।
– এটা! !
[অবাক হয়ে বলল মিরা ]
– হুম এটা পড়লে তোমাকে সাদা পরীর মতো লাগবে।
মিরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
– কি হল?
– না, কিছু না।
আমি একটা নীল শার্ট, প্যান্ট পরে রেডি হয়ে নিলাম। রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। নীলাকে কল করতে হবে না জানি মেয়েটা কি করছে? আমাকে শক্ত শক্ত কথা বললেও। আমি জানি ও নিজে কষ্ট পেয়েছে। কল দিলাম কিন্তু রিসিভ করছে না। কিছুক্ষণ পর মোবাইলটা সুইচড অফ দেখাচ্ছে।
শিট। মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে।
.
মিরা অবাক হচ্ছে। এরা দুই ভাইয়ের পছন্দ এক হয় কি করে? চলফেরাও এক। নিশান ঠিক একই কথা বলত,
– সাদা শাড়ি তোমাকে সাদা পরী লাগবে।
নিশানও সাদা শাড়িটাই পছন্দ করত।
.
আমি নিচেই ছিলাম। মিরার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মিরা যখন নিচে নামল। আসলেই মিরাকে সাদা পরী লাগছে। এতো সুন্দর মেয়েটা।
মিরা নিচে নেমে যখন দেখল আমি তাকিয়ে আছি তখন একটু লজ্জা পেল।
– কি হল? এমনভাবে তাকিয়ে আছী কেনো?
– নাহ, এম এমনি চল..।
– হুম। আম্মু যাচ্ছি।
[মিরা]
– হুম যা। যতক্ষণ মন চায় ঘুরে ফিরিস।
মিরা একটা হাসি দিল। গাড়ি উঠলাম দুজন। গাড়ি আমি ড্রাইভ করছি। মিরা বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরের দিকটা দেখছে। মিরাকে নিয়ে একটা নদীর কিনারায় নিয়ে গেলাম। জায়গাটা তেমন পপুলার না। এমনি জায়গাটা সুন্দর বলে অনেকে এখানে আসে ঘুরতে। খুব সুন্দর পরিবেশ। মিরা গাড়ি থেকে নামতেই লাফালাফি শুরু করে দিল। যেন কত বছর পর ঘুরতে আসল।
অনেক ঘুরাঘুরি করলাম। খেলাম। মিরাকে খুব খুশি মনে হচ্ছে।
– এখন যাওয়া যাক। অনেক রাত হয়ে গেছে।
– হুম চলো।
– না আরোও কিছুক্ষণ থাকবে?
– না চলো।
গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি স্টার্ট করলাম। অনেক পথ এগিয়ে আসলাম হঠাৎ মিরা চেঁচিয়ে উঠল। মিরা সামনের সিটে আমার পাশেই বসে ছিল।
– কাব্য গাড়ি থামাও কাব্য।
– কি কি হয়েছে?
– নিশান, নিশানকে দেখেছি আমি গাড়ি থামাও কাব্য।
ভাইয়ার কথা শুনে আমি গাড়ি থামালাম। গাড়ি থেকে বেরুলাম। মিরা পাগলের মত আচরণ করছে,
– কোথায় দেখেছো কোথায়?
– ঐতো এদিকে একটা গাড়ি যাচ্ছিল। ঐটাতে দেখেছি। কাব্য নিশান কে এনে দাও কাব্য।
[মিরা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল ]
– তুমি এখানেই থাকো। আমি আসছি।
আমি দৌড় দিলাম। চারিদিকে খুঁজতে লাগলাম। একটা গাড়ি দেখলাম। গাড়র পিছনে ছুটলাম নাগাল পেলাম না।
দৌড়ে গাড়ির পাশে এলাম। মিরা দাঁড়িয়ে আছে। কাঁদছে।
– কাব্য, নিশান কোথায় কাব্য?
– তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠো। তাড়াতাড়ি।
গাড়িতে উঠে তাড়াতাড়ি স্টার্ট করলাম। গাড়িটা যেদিকে গেছে সেদিকটা অনুসরণ করলাম।

কিন্তু….সেদিকে গিয়ে গাড়িটা খুঁজে পেলাম। পাগলের মতো গাড়ি চালাতে লাগলাম। নাহ, পেলাম না। কোথাও দেখাও যাচ্ছে না।
– তুমি ঠিক দেখেছে তো।
ভাবী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– হ্যা, আমি সত্যিই দেখেছি। একটা গাড়িতে ছিল।
উফফ!! খুব বড় ভুল করে ফেললাম। গাড়ির নাম্বারটাও নোট করা হয়নি। ধ্যাত…
মিরা কেঁদেইই যাচ্ছে। কি করে বোঝাই এখন?
– মিরা, তোমার হয়তো ভ্রম হয়েছে। বোধ হয় ভুল দেখেছো।
– না, না কাব্য। আমি সত্যিই নিশানকে একটা গাড়ি ড্রাইভিং করে যেতে দেখেছি। তুমি আমার নিশানকে এনে কাব্য। আমার নিশানকে এনে দাও..
[আমার শার্টে খামচে ধরে টানাটানি করে বলল ]
আমি আলতো করে মিরার মাথায় দিলাম,
– প্লিজ তুমি শান্ত হোও। তোমার এখন এভাবে উত্তেজিত হওয়া ঠিক না।
মিরা তবুও কাঁদছে।
– মিরা, ভাইয়া নিখোঁজ। হয়তো কখনো ফিরবে না হয়…কিন্তু তুমি কি চাও না ভাইয়া স্মৃতি ধরে রেখে জীবনযাপন করতে। মিরা বোঝার চেষ্টা করো। তোমার পেটে এখন ভাইয়ার অভিজাত। প্লিজ তুমি এখন এরকম করো না।
মিরা ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে,
– কাব্য, আমি কি আমার নিশানকে কখনো ফিরে পাবো না। প্লিজ তুমি ফিরিয়ে এনে দাও আমার নিশানকে।
– হ্যা, পাবে। কোনো একদিন ভাইয়া ঠিকই ফিরে আসবে। এখন বাড়ি চলো প্লিজ।
মিরা কেঁদেই চলছে। আমি জোর করে গাড়িতে উঠালাম। তাড়াতাড়ি গাড়ি ড্রাইভ করে বাসায় ফিরলাম। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে মিরাকে ডাকলাম,
– মিরা,মিরা…
কোনো কথা বলছে না। কি হল মেয়েটার?
– মিরা…এই মিরা।
কোনো কথাই বলছে না। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। পানি বোতল থেকে হাতে পানি নিয়ে মিরার মুখে ছিটিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে চোখ খুলল।
– কাব্য, কাব্য নিশান কোথায়? কাব্য নিশান কোথায়?
[আবার কান্না আরম্ভ করে দিল ]
-তুমি কান্না থামাও প্লিজ। এমন করে কেঁদো না। আমরা বাসায় ফিরে এসেছি। চলো বাসায় চলো।
– না, না আমার নিশানকেই চাই। আমার নিশানকে এনে দাও। তুমি জানো না আমি নিশানকে ছাড়া বাচবো না।
জোরে জোরে কান্না আরম্ভ করল।
মিরাকে জোর করে ধরে আমি গাড়ি থেকে নামালাম। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে। ওর মাথা আমার বুকে আছড়ে পড়ছে। মেয়েটাকে কি করে বোঝাই? এই সময় এতো চাপ সৃষ্ট ভালো না।
মিরাকে নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে কলিংবেল টিপলাম। আম্মু দরজা খুলল। মিরাকে কাঁদতে দেখে হকচকিয়ে গেলেন।
– একি মিরার এই অবস্থা কেনো? মিরা কাঁদছে কেনো কাব্য?
– আম্মু, আগে মিরাকে নিয়ে রুনে যাও। পরে আমি সব বলছি।
আম্মু মিরাকে ধরে নিয়ে গেল রুমে। পিছনে পিছনে আমিও গেলাম। আম্মু বিছানায় শুইয়ে দিল মিরাকে। মিরা কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয় যাচ্ছে। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। মিরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,
– শান্ত হোও প্লিজ। আর কেদো না। এরকম করো তুমি।
মিরা তবুও কাঁদছে।
– আম্মু, তুমি যাও। আমি মিরাকে ঘুম পাড়িয়ে আসছি।
– হুম।
বল মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।
আমি মিরার মাথায় হাত বুলাতে লাগলাম। মিরা কাঁদছে তো কাঁদছেই।
– চোখ বন্ধ করো। চোখ বন্ধ করো প্লিজ।
আমি নিজে মিরার চোখ বন্ধ করালাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মিরা ফোফাচ্ছে। অনেক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেছে । আমি আলতো করে উঠে পড়লাম। লাইট নিভিয়ে নিচে গেলাম। আম্মু পায়চারি করছে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলো,
– কাব্য, কাব্য। মিরার কি হয়েছে?
– আম্মু, মিরা ভাইয়াকে দেখেছে।
আম্মু ধড়ফড়িয়ে তাকাল আমার দিকে।
– সত্যি!! কোথায় আছে এখন? আমার ছেলে ভালো আছে তো।
[আম্মু কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল ]
– আম্মু তুমি শান্ত হোও। কাঁদছ কেনো?
– কোথায় দেখেছিস তোমরা? নিশান এখন কোথায় আছে? তুই ওকে বাড়িতে নিয়ে আসিস নি কেনো? আর ওও বাড়িতে আসেনি কেনো?
– আম্মু, আম্মু শান্ত হোও। ভাইয়াকে আমি দেখিনি। মিরাই আমাকে বলল যে, পাশের একটা গাড়িতে ভাইয়া ছিল। আমিও চারিদিকে গাড়িটিকে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু, কোথাও পেলাম না।
আম্মু কেঁদে দিল।
– আমার ছেলেটা এখন কোথায় আছে, কে জানে? যেখানেই থাকুক না কেনো আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ রাখেন।
আমি আম্মুকে জরিয়ে ধরে স্বান্তনা দিলাম,
– আম্মু, মিরা যখন দেখেছে ভাইয়া কে তখন ভাইয়া এই শহরেই কোথাও আছে? তুমি চিন্তা কর না আমরা খুঁজে বের করব ভাইয়াকে।
আম্মু মাথা নাড়াল। তবে কেঁদেই যাচ্ছে। আমি তো আম্মুকে স্বান্তনা দিলাম। কিন্তু, ভাইয়াকে এখন খুঁজব কোথায়? কোথায় আছে ভাইয়া?
এখন রুমে যাই। মিরাকে গিয়ে দেখে আসি। মেয়েটা কি করছে কে জানে?
রুমে গিয়ে দেখলাম মিরা এখনো ঘুমিয়ে আছে। কাচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে। আমি গিয়ে ওর মাথার পাশে বসলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। আমি মিরার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কি আছে ওর মুখে? যেটা আমাকে টানছে ওর দিকে। এতো মায়াবী মেয়েটা। মিরার প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি। কিছুক্ষণ মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তারপর বারান্ধায় গেলাম। নীলার ফোনে ট্রাই করছি । কিন্তু, ফোন রিসিভ করছে না।
ধ্যাত!! ফোন ধরছে না কেনো? আরেকবার ট্রাই করে দেখি। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ করল,
– কি সমস্যা ফোন ধরছ না কেনো?
[আমি]
– সমস্যাটা আমার না তোমার। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকো তাহলে আমার শর্ত পূরণ করবে। আর যেদিন তুমি আমার শর্ত পূরণ করতে রাজি হব সেদিনই ফোন দিবে তার আগে নয়।
টুত টুত টুত…
কি হলো? কেটে দিল। নীলা এমন কড়া কড়া কথা আমাকে শুনাতে পারল। ওর শর্ত পূরণ করতে না পারলে ওকে কল দিব না। কিন্তু, নীলার সাথে কথা না বলে আমি থাকব কি করে? বুঝতে পারছি না কিছু। কেনো এমনটা ঘটল সবার সাথে। রুম এলাম মিরা এখনো ঘুমুচ্ছে। বাইরে খেয়ে এসেছি। তাই আর না খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
.
এর পর সপ্তাহ দিন কেটে গেল। মিরা এখন একটু স্বাভাবিক। খুব কষ্ট করে মেয়েটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। প্রথম কয়েকদিন তো খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো। কাঁদতেই থাকতো সারাদিন। তারপর এই কয়েকদিন মিরাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরাঘুরি করলাম। প্রায় প্রতিদিনই মিরাকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম। রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতাম। গল্প করতাম। বাবুর উপর চাপ পড়বে বলে মিরা এখন তেমন ভাবে না আর কাদেও না। তবে উদাস হয়ে থাকে। আর এদিকে নীলার সাথে একবারও কথা হয়নি সেইদিনের পর থেকে। নীলা সিম বন্ধ করে রেখেছে। রাত হয়ে গেছে। মিরা বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছে। আমাকে যে করেই হোক নীলার দেয়া শর্ত পূরণ করতে হবে। যে করেই হোক মিরাকে বলতে হবে। আমি বারান্দায় যাচ্ছি আবার আসছি। অস্বস্থি লাগছে। কি করে বলব মিরাকে। মিরা হয়তো আমার উপস্থিতি টের পেলো। পিছনে না তাকিয়েই বলল,
– কাব্য…।
[মিরা]
– হ্যা, হ্যা।
– কিছু বলবে?
ঘুরে আমার দিকে তাকাল।
আমি মাথা নাড়ালাম।
– বলো।
– তুমি যদি কষ্ট পাও।
নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম।
মিরা মুচকি হাসল,
– কষ্ট পাবো কেনো? আর আমি জানি তুমি আমাকে এমন কোনো কথা বলবে না যাতে আমি কষ্ট পাই।
আমি চোখ তুলে মিরার দিকে তাকালাম।
– একি তোমার চোখ লাল কেনো?
মিরা চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। আমার পাশে এসে আমার হাত ধরল,
– বলো কি হয়েছে তোমার? একমাত্র তুমিই ছিলে আর আছো যে আমাকে আমার পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করতে সাহায্য করেছ আর করছ। এখন বল আমি তোমার জন্য কি করতে পারি।
আমি কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মিরা এসে আমার দু-গালে হাত দিয়ে মাথা উপরে তুলল। আমার চোখের দিকে তাকাল,
– বলো..।
– নীলা বলেছে..
– কি হল থেমে গেলে কেনো? কি বলেছে বলো।
– তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে যেন ওকে বিয়ে করে নিই।
মিরার মুখ মলিন হয়ে গেল। আমার গাল থেকে হাত নামিয়ে নিল।
– আমি জানি তুমি কষ্ট পাবে। তুমি নিজেকে দোষারোপ করবে। তুমি হয়তো ভাববে তুমি খারাপ তাই আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু, তুমি খুব ভালো মিরা। নীলার এই শর্ত পূরণ না করলে ওও আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখবে না। তাই…
মিরা মলিন একটা হাসি দিল,
– নাহ, আমি কষ্ট পাইনি। আচ্ছা তুমি ডিভোর্স পেপার রেডি করো।
– সত্যি আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।
মিরা হাসল,
– আমি কষ্ট পাইনি। তোমরা দুজন এক হতে পারলেই আমি খুশি। তোমাদের সমস্যা মিটিলেই আমি খুশি।
আমি মিরাকে জরিয়ে ধরলাম।
– সত্যি তুমি খুব ভালো।
খুব শক্ত করে জরিয়ে ধরলাম। মিরা ও হাত দুটো দিয়ে আমাকে জরিয়ে ধরল। আমি জরিয়ে ধরা থেকে ছেড়ে মিরা গালদুটো ধরে বললাম,
– ইউ আর বেরি গুড গার্ল। আমি এমনই একটা বন্ধু চাই। হবেতো?
নীলা হাসল। তবে হাসিটা নিষ্প্রাণ। আমি রুমের দিকে গেলাম।
.
মিরার বুকটা কেমন খালি খালি লাগছে। যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলছে। মিরা ভাবে তবে কি আমি কাব্যকে ভালোবেসে ফেললাম। একে ভালোবাসব না তো কাকে ভালোবাসব। এতো ভালোও আবার কেউ হয় নাকি। তবে নিশানও তো আমার মন থেকে যাচ্ছে না। নিশানকেও তো আমি আমার জীবন থেকে বেশী ভালোবাসি । কিন্তু, কাব্য আমার জীবন থেকে সরে যাচ্ছে দেখে আমার এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো? নাহ, কাউকে ছাড়তে পারব না আমি। আমি দুজনকেই ভালোবাসি। মিরা কেঁদেই চলছে। বিধাতা কেনো ওকে এই দ্বিধার মধ্যে ফেললেন?
.
এদিকে নীলা রুমে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। কাঁদছে। কাব্যকে কষ্ট দিয়ে নীলা নিজেও কষ্ট পাচ্ছে। কাব্যের সাথে কড়া করে বলা কথাগুলো নীলাকে বেশীই কাঁদাচ্ছে। কি করে কাব্য এতো কঠিন কঠিন কথা বলতে পারল। কি করে? নীলার আব্বু মেহতাব হোসেন রুমে ডুকলেন। বুঝতে পারলেন মেয়েটা কাদছে।
– কি হয়েছে আম্মু?
নীলা চোখ মুছে নিলো তাড়াতাড়ি। ওর আব্বুর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল,
– কিছু না আব্বু।
– কি ভাবিস তুই নিজেকে খুব বড় হয়ে গেছিস। তুমি আমার কাছে এখনো সেই ছোট্র খুকিই আছিস। আর সেই তুমি আমার কাছে তোর কাদার বিষয় লুকচ্ছিস।
নীলা কেঁদে দিল।
– কি হয়েছে আম্মু বল?
নীলার কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন।
– আব্বু, কাব্য..।
– কি হয়েছে?
– কাব্য বিয়ে করে নিয়েছে। আর সেদিন আমি কাব্যর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি।
– কি বলছিস? কাব্য বিয়ে করে নিয়েছে?
– হুম।
তারপর নীলা তার আব্বু সব খুলে বলল।
– ওও, ছেলেটা চাপে পড়ে বিয়ে করেছে। হয়তো..। কিন্তু তোর কাজটা করা ঠিক হয়নি।
– কোন কাজটা আব্বু?
– কাব্য আর মিরার বিয়ের কয়দিন হয়েছে।
– ১৪ দিন..।
– হুম। ওরা এখন স্বামী-স্ত্রী। ওদের মাঝে যে মায়ার সৃষ্টি হতে চলেছে। তা তুমি ডিভোর্স এর মাধ্যমে ত্যাগ করাতে পারবে না। আমি কি বলছি তুই বুঝতে পারছিস?
নীলা মাথা নাড়াল।
– মিরা আর কাব্য এখন স্বামী-স্ত্রী। এক ছাদের নিচেই তাদের বাস। যদিও তার একে অপরকে ভালোবাসে না। শুধু একটু কেয়ারিং। তবে আম্মু ভালোবাসা জেনে, শুনে আর বলে আসে না। ওরা স্বামী-স্ত্রী তাদের মাঝে মায়া জন্মাতেই পারে। আর মায়া থেকে ভালোবাসা। যেটা তোমার ভালোবাসা থেকে শক্ত।
– তুমি কি বলছ আব্বু? ওরা একে অপরকে ভালোবাসে?
– হুম, না বাসলেও। একবার না একবার ভালোবাসবেই। তাই তোমার উচিত ওদের মাঝখানে না থাকা।
– তুমি কি বলছো আব্বু? আমি কাব্যকে ভুলে যাবো।
– সেটা তোমার ব্যাপার আম্মু। তুমি যদি সত্যিকারে কাব্যকে ভালোবেসে থাকো তাহলে সরে আসো এই পথ থেকে। আমি তোমার,কাব্য আর মিরার ভালোর জন্যই বলছি। ভেবে দেখ…।
মেহতাব হোসেন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। নীলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ওকে কাব্যকে ভুলতে হবে। না, না এটা অসম্ভব। নীলা লাফ মেরে বিছানায় শুয়ে বালিশ আকড়ে ধরে কাঁদতে লাগল

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *