সেই মেয়েটার ভালোবাসা। Best romantic love story 2019

-দাঁড়াও সাদিক। তোমার সাথে আমার কথা আছে।
আমি পেছন ফিরে দেখলাম একবার। নীরা রুক্ষ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মুখ ফিরিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। ভার্সিটির গেইট দিয়ে বের হতেই নীরার চিৎকার শুনতে পেলাম।
-সাদিক! দাঁড়াও বলছি?
বেশ জোরেশোরেই কথাটা বলেছে ও। আমার খানিকটা বিরক্তি জাগল। আশপাশের সবাই কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হলো। আমার মেজাজটাও খানিকটা চড়ে গেল। তবুও নিজেকে সংযত রাখলাম। পেছন ফিরে দেখলাম নীরা সেই আগের জায়গায়ই দাঁড়িয়ে আছে। একটুও এদিক সেদিক হয়নি। আমি জানি, সে এদিক সেদিক হবেও না। আমাকেই তার কাছে যেতে হবে৷ যতটা না সে জেদি তারচেয়ে বেশি একরোখা। দাম্ভিক। তার রগে রগে অহংকার। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ওর ইগোটা বেশি। এত বেশি যে কল্পনাও করা যায় না৷ আমি ধীর পাঁয়ে হেঁটে ওর সামনে গেলাম। ও তখন আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। যেন আস্ত খেয়ে ফেলবে৷ আমি খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করলাম না৷ ওর কাছে গিয়ে বললাম,
-চল, মাঠে গিয়ে বসি।
নীরা বেশ কড়া স্বরেই বলল,
-না। আমি এখানেই থাকব। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলব তোমার সাথে।
-এখানে রোদ। রোদ তো তোমার অসহ্য৷
-সেটা নিয়ে তোমাকে না ভাবলেও চলবে।
-আচ্ছা বেশ। ভার্সিটি ছুটি দিয়েছে মাত্র৷ সবাই যাক। তারপর আমরা ধীরে সুস্থে কথা বলব। কেমন?
-উহু! আমি এখনই তোমার সাথে কথা বলব। আমি আর এক মূহুর্ত সহ্য করতে পারছি না এসব৷ কে কী দেখল, কী বলল এসব ভাবার সময় নেই আমার।
-সে আমার জানা আছে। বল, কী জানতে চাও তুমি?
-তুমি আমাকে এভয়েড করছো কেন? আমার সাথে কথা বল না কেন? দু’দিন হয়ে গেল আমাদের মাঝে কথা হয় না৷ দেখা হলে কেবল ভার্সিটিতে। তাও তুমি কথা বল না৷ এড়িয়ে যাও৷ এসব কী? এই তোমার প্রেম? এই তার নমুনা? প্রপোজ করার আগে খুব তো বলেছিলে এই করবে, সেই করবে, এখন সে সবের কী হলো? সব কী ভুলে গিয়েছো?
আমি হাসলাম কেবল। খানিকটা চুপ থেকে বললাম,
-কী করিনি বলতো? আমি যা যা বলেছি তা তা কি করিনি?
নীরা খানিকটা থতমত খেয়ে গেল। কী বলবে ভেবে পেল না৷ আমি আবার বললাম,
-তোমার খুব ইচ্ছে ছিল, তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে। আমাকে ফোন করে বললে কদম নিয়ে তোমার বাসার সামনে আসতে। রাত তখন সাড়ে আটটা বাজে। আমি কি আসিনি? তোমার হাত ধরে পিচ ঢালা রাস্তায় হাঁটিনি? তুমি খালি পাঁয়ে হাঁটতে চেয়েছো? আমরা কি হাঁটিনি? সেদিন কি তুমি একটিবার ভেবেছো আমি এই রাতের বেলায় কদম কই পেলাম? ভেবেছো? উল্টো দেরি করে আশায় আমাকে বকেছো। ভাগ্য ভালো ছিল বৃষ্টি থেমে গিয়ে আবার এসেছে। আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের ব্রেকাপ সেদিনই হয়ে যাবে। আর তুমি বলছো আমি কিছুই করিনি?
নীরার মুখের দাম্ভিক ভাবটা চট করে চলে যেত থাকল। রুক্ষতা আড়াল হয়ে তার প্রকৃত সুন্দর চেহারা বেরিয়ে আসতে থাকল৷ আমি আবার বললাম,
-রাত বারোটায় তোমার আমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে৷ তোমার ঘুম আসছে না৷ আমি কি ঘুম থেকে উঠে তোমার সাথে দেখা করতে আসিনি? তোমার আইস্ক্রিম খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। আমি কি আইস্ক্রিম এনে দেইনি? আর তুমি বলছো আমি কিছুই করিনি? সিরিয়াস্লি?
নীরা স্তব্ধ চেহারায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না আমি এভাবেও কথা বলতে পারি৷ আমি বললাম,
-তুমি ভোরের কুয়াশায় আমার সাথে হাঁটতে চেয়েছো। আমি কি তোমার জন্যে সেদিন নুপুর কিনে এনে দেইনি? দুজনে কি শিশির ভেজা ঘাসের উপর হাঁটিনি? এসব কার ইচ্ছে ছিল? আমি কেন করেছি এসব? আর তুমি কি না বলছো আমি তোমার জন্যে কিছুই করিনি?
নীরা সরল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। আমি বলতে থাকলাম,
-তোমার নৌকায় চড়তে ইচ্ছে হলো। টলটলে পানিতে পাঁ ডুবিয়ে আমার হাত ধরে বসে থাকবে৷ থেকেছো না? ওখানে তোমাকে নিয়ে গিয়েছে কে? আমি না? তোমার নীল পদ্ম ফুল দেখতে ইচ্ছে হলো। আমি কি তোমাকে আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তা দেখাইনি? তুমি বড় লাল পদ্ম ফুল দেখতে চাইলে। আমি তাও দেখাইনি? সেই গ্রামে কি আমি তোমাকে এক ঝাক জোনাকির সাথে পরিচয় করিয়ে দেইনি? তুমি কি দেখনি পুকুরের টলটলে পানির উপর একঝাঁক জোনাকি উড়ে বেড়ায়। এসব কে দেখাল? কে? আমি নই? আর তুমি কি বলছো? তুমি বলছো আমি তোমার জন্যে কিছুই করিনি৷ ওয়াও! ফাইন!
নীরার মুখটা বেশ মলিন দেখাল। চোখ গুলো কাঁদো কাঁদো হয়ে আছে। আমি তা গায়ে মাখলাম না। বললাম,
-এই যে গরমের মাঝে হাঁটতে, তোমার মাথার উপর ছাতা নিয়ে নিয়ে কে ঘুরত? কে? সে কি এই কামলাটা নয়? শপিং করতে গেলে যে এত ব্যাগপত্র হয়, সেগুলো কে বয়ে নিয়ে যায়? আমি কি সেই চাকরটি নই? কী না করেছি আমি৷ চন্দ্র বিলাস করতে চাইলে আমার সাথে৷ তাও করলাম। ঘুরতে যেতে চাইলে। নিয়ে গেলাম। আর তুমি বলছো আমি কিছুই করিনি তোমার জন্যে? কিছুই না? ওকে ফাইন। আমি কিছুই করিনি৷ তুমি কী করেছো আমার জন্যে? কী করেছো? এই তো সেদিন, মিহিনের সাথে রিক্সায় দেখলে। কী করলে সেদিন! ছিহ! মিতু মেয়েটাকে চড় দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? এত বাজে সিনক্রিয়েট কেন করলে? আমার কি মান সম্মান নেই? মিহিনের নেই! ভার্সিটির গেটে এতো গুলো মানুষের সামনে এমন বাজে বিহেভ করতে তোমার একটুও বাধেনি? এটাই কি করার ছিল তোমার?
একদিন দেখা করতে দেরি হয়ে তোমার সে কী রাগ! কোনো দিন তো চলেই যেতে। আরে এত জ্যাম ঠেলে তোমার সাথে দেখা করতে আসি, অন্তত আমার কথাটা ভেবে একটু অপেক্ষা করতে, কিংবা যেদিন বকতে একটু কমিয়ে বকতে। তুমি কি তা করেছো? এই তুমি জানো জ্যাম ঠেলে দেখা করতে আশাটা কত কষ্টের? ঘেমে একাকার হয়ে যেতে হয়। আরে তুমি সেই কষ্টের কী বুঝবে! আসো তো বাপের বিলাসবহুল গাড়িতে করে। এসিতে করে আসো। তোমার তো কষ্ট হয় না। তাহলে একটু অপেক্ষা করলে কী হয়? আমি অপেক্ষা করিনি? তোমার যেদিন দেরি হতো বসে বসে অপেক্ষা করিনি? বল করিনি? ফিরে যেতে পারবে সে কথা?
নীরার মুখ একদম কালো হয়ে গেল৷ চোখ জোড়া যেন এখনই বর্ষণ শুরু করবে৷ বললাম,
-তোমাকে একটু কান্না করতে পর্যন্ত দেইনি। আর তুমি? আমাকে সারাক্ষণ কাঁদিয়ে গেলে। তোমার কি একবারও মনে হয়নি যে তোমার এমন ব্যবহার আমার মাঝে কেমন প্রভাব ফেলবে? আমার কি খারাপ লাগে না? নীরা, আমিও তো মানুষ। আমারও তো মন আছে। কষ্ট কি আমার হয় না?
নীরার চোখে বেয়ে এক ফোটা পানি পড়ে গেল। আমি এবারও গায়ে মাখলাম না৷ বললাম,
-কী ভাবছো? আমি তোমার সাথে এত জোর গলায় কথা বলার সাহস পেলাম কই? কীভাবে এলো এতো সাহস? নীরা, তোমার কী মনে হয়নি তুমি আমার সাথে অন্যায় করছো৷ মনে হয়নি? তোমাকে প্রথমবার দেখতেই আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। তোমারও তো আমার ভালো লেগেছিল। নীরা, আগে প্রপোজ করেছিল কে বলতো? আমিই? না তুমি? সব কিছুর পরও আমি তোমাকে ভালোবেসে গিয়েছি৷ প্রতিটি ক্রিটিকাল মোমেন্টে তোমার সঙ্গ দিয়েছি। আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে ভালোবেসে তোমার এত ইগো,দাম্ভিকতা সব ঠিক করে ফেলব৷ তোমাকে নরমাল করার চেষ্টা করব। আমি কি সেই চেষ্টা করিনি? ফল কী হলো? জিরো! তুমি চেঞ্জ হওনি। খুব তো বলেছিলে চেঞ্জ হয়ে যাবে৷ চেঞ্জ হয়েছো কী? সেদিন তোমার গাড়ির সাথে ওই বৃদ্ধ মানুষটির রিক্সা কি লেগেছিল তুমি তাকে যাচ্ছে তাচ্ছে করে অপমান করেছিলে। মানুষটি গরিব হতে পারে৷ তার কি মন নেই? আত্মসম্মান নেই? দুনিয়ার সকল আত্মসম্মান কি কেবল তোমারই আছে?নীরা, আমি আর নিতে পারছি না৷ এসব আর সহ্য হয় না আমার। পারছি বয়ে নিতে৷ তাই তোমাকে ছেড়ে দিলাম। নিজের মতো করে চল। নিজের মতো একজনকে বিয়ে করে নিয়ে৷ এটাই ভালো হবে। আর কি বলছিলে না! দুদিন থেকে কথা হয় না আমাদের। আচ্ছা তা না হয় হয়নি৷ কিন্তু তুমি কি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলে? বল করেছিলে? আমি এখানে থামলাম নীরা৷ আমি আর পারছি না। তোমার এত এত ইগোর ভিড়ে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। ক্লাসমেট রা বলে আমি নাকি তোমার চাকর। বড় লোক মেয়ে পেয়েছি তো ঝুলে পড়েছি। আর তুমি? তুমি কী বলো? তুমি বলো, ‘বয়ফ্রেন্ড আছে সেই আমাকে সামলে নিবে। আমার সব কাজ সে করে দিবে। দিচ্ছেও। দেখছো না সাদিক আমার সব করে দেয়। ভবিষ্যতেও দিবে৷ ওকে দিতেই হবে৷’ এসব কি তুমি বলনি? বল? বলনি? আমার তো সন্দেহ হয়! আদৌ কি তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে? নাকি এসব অভিনয়। আমাকে নিয়ে খাটিয়ে নেওয়া। আ’ম সরি মিস নীরা। আমি আর পারছি না৷ এসব সহ্য হচ্ছে না আর। জাস্ট লিভ মি এলন। তুমি তোমার রাস্তায় যাও। আমি আমার রাস্তায় যাচ্ছি৷ গুভ বাই৷
কথা গুলো বলে আমি চলে আসতে চাইলাম। নীরা আমার হাত চেপে ধরল। বলল,
-তুমি ভুল বুঝছ আমায়। প্লীজ এমনটা করো না। আমি সহ্য করতে পারব না৷ তোমাকে ছাড়া সম্পূর্ণ অচল। কিছু ভাবতে পারি না আমি। প্লীজ…
আমি ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,
-তোমার চেয়ে ওই মিহিন কিংবা রিতুকে যদি এমন ভালোবাসতাম না, মেয়েটা আমার জন্যে নিজের জান হাজির করে দিত।
এই বলে আমি চলে এলাম। ভার্সিটির গেট দিয়ে বেরিয়েই রিক্সায় উঠলাম৷ মিহিনকেও দেখলাম গেট দিয়ে বের হচ্ছে৷ ডাক দিলাম ওকে৷ বললাম,
-এদিকে আসো। এক সাথে যাই।
ও একবার আমার দিকে তাকাল৷ আবার নীরার দিকে তাকাল। আমি বললাম,
-ভয় পেয়ো না। ও কিছু করবে না৷ আমাদের ব্রেকাপ হয়ে গিয়েছে৷
নীরা পেছন থেকে জোর গলায় বলল,
-মিহিন, ভালো হবে না কিন্তু। খবরদার যদি রিক্সায় উঠো। আমি তোমাকে শেষ করে ফেলব৷
আমি রিক্সা থেকে নেমে গিয়ে মিহিনের কাছে গেলাম৷ ওর হাত ধরে নীরার দিকে তাকালাম৷ বললাম,
-ইউ কান্ট চেঞ্জ নীরা।
এই বলে মিহিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে এলাম। রিক্সায় করে দুজনেই চলে এলাম৷ নীরাকে দেখলাম দৌড়ে আসতে। গেটের কাছে এসেই থেমে গেল ও। আমাদের রিক্সার দিকে তাকিয়ে থাকল কেবল৷ রিক্সায় যখন মিহিনের পাশে ছিলাম তখন আমার গা টা কাঁপছিল৷ আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না৷ চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকল। আমি মুখে হাত দিয়ে কান্না করতে থাকলাম। মিহিন কিছু বলল না৷ কেবল আমার হাতটা চেপে ধরে রাখল।
.
সন্ধ্যার দিকে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এল। আমি তখন ঘুমে ছিলাম। কয়েকবার রিং হতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একজন বয়স্ক লোকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মানুষটা বেশ মর্মাহত গলায় বললেন,
-সাদিক বলছো?
-জ্বী। আমি সাদিক। আপনি কে?
-আমি নীরার বাবা৷
-আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল। কেমন আছেন।
তিনি খানিকটা চুপ থেকে বললেন,
-খুব একটা ভালো না বাবা৷ সন্ধ্যা হয়ে গেল নীরা এখনও বাসায় ফেরেনি। চিন্তা হচ্ছে ভীষণ। ফোনও তুলছে না ও৷ তোমার সাথে আছে কি?
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম,
-না আঙ্কেল। নেই। চিন্তা করবেন না৷ ও বাসায় ফিরবে৷ আপনার মেয়ে কোথাও যাবে না।
ভদ্রলোক কিছু বললেন না আর৷ ফোন কেটে দিলেন৷ আমি বিছানার উপর স্থির হয়ে বসে থাকলাম। খানিকটা চিন্তা হতে থাকল। ভাবলাম চিন্তা করে লাভ নেই৷ আজ থেকে নীরা নামের কাউকে চিনি না আমি৷ কাউকে না৷ তার কি হলো না হলো এসব জানার প্রয়োজনও নেই আমার৷ আমি উঠে গিয়ে এক কাপ চা করে নিলাম। চা নিয়ে এসে বারান্দায় বসলাম। কয়েক চুমুক দিতেই চোখ গেল নিচের দিকে। দেখলাম নীরা দাঁড়িয়ে আছে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে৷ আমার দিকেই তাকিয়ে আছে৷ আমার ভ্রু জোড়া কুচকে এল। আমি ইশারা করলাম,
-এখানে কী?
ও হাত দিয়ে লাভ বানিয়ে দেখাল। আমি ইশারা করলাম যে ফোন নাও। কল দিব৷ ও নিচ থেকে চিৎকার দিয়ে বলল,
-তুমি নিচে নেমে এস৷ আমি তোমার সাথে কথা বলব৷
আমি অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। কি শুরু করছে মেয়েটা আশ্চর্য! এবার দেখি বাসার সামনের মান সম্মান খেয়ে ফেলবে সে। আমার সত্যিই এবার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। আমি চায়ের মগটা রেখে আঙ্কেলকে ফোন দিলাম৷ বললাম যে নীরা আমাদের এখানে আছে। এড্রেসটা মেসেজ করলাম। তারপর নিচে গেলাম নীরার কাছে৷ আমি ওর কাছে যেতেই মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। হাত জোড়া এক করে বলল,
-প্লীজ! পরগিভ মি সাদিক। প্লীজ৷
আমি ওকে দাঁড় করালাম। বললাম,
-বাসার সামনে চলে এলে। এখানে সবাই আমাকে ভালো জানেন। দয়া করে এখানে আমার মান সম্মানটা নষ্ট করিও না৷ প্লীজ!
নীরা কেমন করে যেন তাকাল। কেমন সরল দৃষ্টি। কী নিষ্পাপ! আমি বললাম,
-তুমি চাইলে আমার বাসায় এসে বসতে পারো। তারপর যতো ইচ্ছে অপমান করো। প্লীজ এখানে না৷
নীরার চোখে জল জমে গেলা এবার৷ ভেজা গলায় বলল,
-সাদিক, আমি তোমায় ভালোবাসি। আমার জীবনের চেয়েও বেশি।
-আমি জানি সেটা৷ কতটা ভালোবাসো সেটা আমি এতদিনে বেশ টের পেয়েছি৷
ওর গাল বেয়ে কয়েক ফোটা পানি পড়ে গেল৷ বলল,
-তুমি তো জানো। আমি এমনই৷ তুমি এটাও জানো যে আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না৷ তাহলে কেন এমন করছো?
-আমি এতদিন ভুল জানতাম৷ ভুল। তুমি কখনই আমার ছিলে না৷
ঠিক কথাটা বলার পরই দেখলাম নীরার বাবা চলে এসেছেন৷ তিনি গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে এলেন। আমি তখন বাসার দিকে ফিরে গেলাম। নীরা আমাকে ডাকতে থাকল।
-সাদিক, এই সাদিক। দাঁড়াও বলছি। প্লীজ দাঁড়াও।
আমি সেখান থেকে চলে এলাম৷ নীরাকে তার বাবা কীভাবে নিয়ে গেলেন তা জানি না। তবে লোকমুখে শুনলাম বেশ জোরাজোরি করতে হয়েছে৷ আমি সে সব ভ্রুক্ষেপ করলাম না। মেয়েটাকে যত এড়িয়ে চলা যাবে ততই ভালো হবে৷ কিন্তু সামনাসামনি না হয় এড়িয়ে চলা যায়৷ কিন্তু মন থেকে? মন থেকে কীভাবে এড়িয়ে যাব ওকে। কীভাবে ভুলে থাকব? কীভাবে তার কথা মনে না করে থাকতে পারব? এটা কি আদৌ সম্ভব হবে? আমি জানি না৷ কিছুই জানি না৷ আমার পক্ষে সম্ভব না৷ আমি বহু চেষ্টা করলাম তাকে ভুলে থাকার। খেলাধুলায় ব্যস্ত হলাম৷ ফেসবুকে এক্টিভ হলাম। আড্ডা দিতে থাকলাম৷ কিন্তু কোনো লাভ হলো না। মনের অবচেতনে তার চেহারা বারবার ভেসে উঠে৷ আমার আর তাকে ভুলে থাকা যায় না৷ ঘুমানোর সময় কেবল এপাশ ওপাশ করি৷ ঘুম হয় না৷ বারবার ওর কথা মনে পড়ে। ওর সাথে কথা বলার ইচ্ছে হয়৷ দেখতে মন চায়। আমি পারি না থাকতে। ভেবেছি তাকে ঘৃণা করব। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো রূপ ঘৃণাই আসে না৷ বরং ভালোবাসতে মন চায়। আসলেই সত্য৷ ভালোবাসার মানুষকে চাইলেই ঘৃণা করা যায় না। এটা সম্ভব না। এ কদিনে আমি বেশ টের পেয়েছি সেটা। বেশ কয়েকদিন পর আমি একদিন ভার্সিটির পথে পাঁ বাড়ালাম। যাওয়ার কোনো রূপ ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু তাকে দেখার ইচ্ছেকে আমি কোনো ভাবেই রোধ করতে পারছিলাম না। ভার্সিটি গেলাম। ক্লাসে সেই চিরচেনা মুখটা দেখতেই আমার উশৃংখল প্রাণ যেন হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল৷ স্পঞ্জের মতো চুষে নিয়ে গেল আমার সকল ক্লান্তি, অবসাদ। আমার বেশ লাগতে থাকল৷ আমার মনে হলো এত শান্তি আর কখনই হয়নি৷ এত কাছে থেকেও আমি তার থেকে দূরে থাকলাম। সে ভুল করছে। তার একট উপযুক্ত শাস্তি তাকে পেতেই হবে। তার জন্যে আমি যত কষ্ট পাই না কেন আমি তা সয়ে নিব৷ ক্লাস শেষে নীরা আমার সাথে কথা বলত্র চাইল। আম এড়িয়ে গেলাম। বড় অসহায় দৃষ্টিতে সে দেখল আমায়। আমার সমস্ত গা যেন কেঁপে উঠল। নীরার এমন চেহারা আমি আগে দেখিনি৷ মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। তার চোখের নিচে পড়া কালি তারই প্রমাণ দিচ্ছে। তবুও আমি এড়িয়ে গেলাম। কষ্ট পাক ও৷ বুঝুক কষ্টের তেজ কেমন হয়৷ আমি বাইরে এসে কোলাহল মুক্ত একটা জায়গায় এসে বসি৷ আমি নিজেকে রোখাতে পারি না৷ বড় কান্না করতে ইচ্ছে হয় আমার। কেন এই মেয়েটির প্রেমে পড়লাম আমি। কেন? কেন অন্য কোনো মেয়ে নয়? আমি ভেবে উঠতে পারি না৷ বড় কষ্ট হয় বুকের ভেতর। বাঁ পাশটা ভার হয়ে থাকে। এমন সময় দেখি নীরা আসছে৷ আমার দিকে অপরাধী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কাছে এসে বলে,
-প্লীজ সাদিক!
আমি উঠে দাঁড়াই। বড্ড অভিনয় করতে হয় ওর সামনে। অভিনয়টা যেন অভিমান থেকে আপনা আপনি তৈরি হয়৷ কী নিঁখুত হয় সেটা৷ আমি সেখান থেকে চলে যাই৷ ধীর পাঁয়ে হেঁটে যাই সামনের দিকে। দেখি মিহিন আসছে আমার দিকে। কাছে এসে বলে,
-এ কী হাল হয়েছে তোমার? সাদিক, তোমার কী হয়েছে?
আমি ওর দিকে তাকাই জল ভরা দৃষ্টিতে। ও আমার চোখ দেখে। বলে,
-কেন এমন কর সাদিক। নিজেও কষ্ট পাচ্ছো ওকে কষ্ট দিচ্ছো? কেন? কেন এই বিচ্ছেদ?
আমি খানিকটা চুপ থাকলাম। বললাম,
-এর বড় প্রয়োজন ছিল মিহিন৷ তুমিও তো প্রেম করো। তাসফি ভাইয়ের সাথে তোমার কী গভীর প্রেম। ভাইয়ের জন্যে তুমি যা করো ভাইও তোমার জন্যে তা করে। বরং বেশিই করে। রিলেশন একজনকে দিয়ে টিকে না৷ দুজনের ইচ্ছা,সমর্থন লাগে৷ মিহিন, তুমি তো বুঝবে আমার ব্যাথাটা।
-তাই বলে এভাবে কষ্ট পাবে?
-আমার আর কিছু করার নেই মিহিন। বাসায় চললাম আমি।
সেখান থেকে এসে আরো ক’দিন ভার্সিটিতে গেলাম না৷ নীরা আরো একদিন এসে হাজির হলো আমার বাসার সামনে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে কান্না করতে থাকল। আমি এবার আর নিচে গেলাম না৷ ওর বাবাকে ফোন দিলাম। তিনি এসে ওকে নিয়ে গেলেন। তারপর প্রায় পনেরো দিন আমি অনেকটা চোরের মতো ছিলাম। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দ্রুত বাসায় ফিরতাম। বন্ধু,আড্ডা সব ত্যাগ করলাম। অন্ধকার এক জগৎকে বেছে নিলাম আমি। আমার কোনো কিছুই ভালো লাগত না৷ আমার সকল আগ্রহ যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি৷ নিজের ভেতর কোনো বিশেষ অনুভূতির ছোঁয়া পাই না৷ অদ্ভুত লাগতে থাকে। যেন আমি পাগল হয়ে যাব। কী যাদু করেছে মেয়েটা কে জানে৷ নিজেকে ছাড়াতেই পারছি না ওই মোহো থেকে। আমার এই মুমূর্ষু সময়ে হাঠাৎই একদিন নীরার বাবা এসে উপস্থিত হলেন আমার কাছে। তাঁকে বড় উদাসী লাগল। প্রচণ্ড হতাশা যেন উনাকে গ্রাস করে নিচ্ছিলো। ভীষণ মলিন মুখ। স্বর ভাঙ্গা৷ আমি উনাকে দেখে খানিকটা অবাকই হলাম। বসার ঘরে তাঁকে বসতে দিয়ে বললাম,
-একটু বসুন। আমি চা নাস্তার ব্যবস্থা করি।
তিনি আমার হাত চেপে ধরলেন। তার পাশে বসিয়ে বড় জর্জরিত গলায় বললেন,
-মেয়েটা পাগল হয়ে যাবে৷ বাঁঁচবে না৷ দিনরাত কেবল তোমার নামই বলে যায়। আমি বুঝতে পারি না কী করব৷ মা মরা মেয়ে আমার৷ ছোট বেলা থেকে তাকে ঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারিনি আমি৷ বিজনেস আর বাসা এতটুকুই ছিল আমার। আসলে ওর মা মারা যাওয়ার পর আমি সম্পূর্ণই ভেঙ্গে পড়ি। নিজেকেই ঠিক করতে পারছিলাম না৷ পুরুষ মানুষ তো! তাই মেয়েকে বুঝতে পারিনি৷ আমি বুঝতে পারিনি তাকে সেই সময়ে আমার প্রয়োজন ছিল৷ কিন্তু সেই সময়ে ছিলাম না৷ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাই মেয়েকে ঠিক ভাবে গড়তে পারিনি৷ এ আমার ভুল। তার শাস্তি তুমি ওকে কেন দিচ্ছো বাবা? ওর এমন কষ্ট আমার সহ্য হয় না৷ আমি সইতে পারি না৷
ওর বাবার চোখের জল যেন আমার ভেতরটা একদম গলিয়ে দিল। মানুষটা কী নিষ্পাপ ভাবে কান্না করছে। নিজেকে অপরাধী ভাবছে৷ আমি কী করে চুপ থাকি? একজন পিতা সমতুল্য মানুষকে রূপে কান্না করতে দেখে আমার মোটেও ভালো লাগেনি৷ এপক্ষে আমার মনটাও খানিক অস্থির ছিল৷ মেয়েটাকে দেখার বড় সখ জাগল৷ তাই আর থাকতে পারলাম না৷ নীরার বাবার সাথে চলে গেলাম তাদের বাসায়। গিয়ে দেখলাম তার রুমের দরজা আঁটকানো। নীরার বাবা আমাকে রুম দেখিয়্ব চলে গেলেন। নীরার খাবারের ব্যবস্থা করতে। আমি দরজায় ঠোকা দিলাম। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। বেশ কয়েকবার দেওয়ার পরেও না৷ শেষে ডাক দিলাম,
-নীরা?
আমি অনুভব করলাম কেউ একজন অস্থির হয়ে দৌড়ে আসছে দরজার কাছে৷ ফ্লোতে ধপ ধপ শব্দ হলো খানিক। কী অস্থিরতা! মেয়েটা দরজা খুলে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। লালা লাল চোখ দু’টো ফুলে আছে। অগোছালো চুল। ফ্যাকাসে মুখ। বড় মায়া হলো আমার। ও স্থির দাঁড়িয়ে থাকল কিছু সময়৷ গাল বেয়ে পানি পড়ল ক’ফোটা৷ তাকে আর রোখানো গেল না। ঝাপিয়ে পড়ল আমার উপর৷ শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে রাখল৷ ভেজা গলায় বলল,
-আজ থেকে তুমি যা বলবে সব শুনব। সব৷ বিষ খেত্র বললে তাও খাব৷ তবুও প্লিজ এভাবে আমাকে ছেড়ে যেও না৷ আমি পারি না থাকতে হয় না৷ প্লীজ৷ যেও না কখনও৷
আমার চোখে জল খেলা করছিল তখন৷ গলাটা ধরে এল অদ্ভুত এক আনন্দে। কী এক আনন্দ আমাকে যেন আবেশিত করে ফেলল। আমি বললাম,
-ছাড়৷ তোমার বাবা দেখবেন।
-উহু না। দেখুক উনি৷ আমি ছাড়ব না৷ ছাড়লে তুমি চলে যাব। আমি চাই না তুমি চলে যাও৷
আমি আর কিছু বললাম না৷ জড়িয়ে ধরে রাখলাম ওকে। আমার সকল হতাশ,কষ্ট, গ্লানি যেন মূহুর্তে দূর হয়ে গেল। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আবেশিত হলো হৃদয়। একটা সময় নিজের প্রতি,নিজের জীবনের প্রতি ঘৃণা, অনিহা এসে গিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে নাহ৷ জীবনটা নেহাত মন্দ না। নিজের ইগোটাকে এক পাশে রেখে দিয়েও এমন একটি সুন্দর জীবন পাওয়া যায়৷ ইগো কী? কেন এই ইগোর জন্যে আমি, সে, আমাদের আশপাশের মানুষ কষ্ট পাবে? কেন? নিজের ইগোটা একটু আড়াল করে দেখুন। জীবনটা বড় সুন্দর। বড় রঙিন৷

.
ভুলত্রুটি মার্জনীয়
-তাসফি  আহমেদ

আমার লক্ষি বউ  

 

 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *