হঠাৎ বিয়ে Part-2

লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা

২য় পর্ব 

আমি কিছু বুঝতে না পেরে এক গ্লাস পানি নিয়ে উনার নাক বরাবর ঢেলে দিলাম।ভূতমশাই খপ করে উঠে বসে বলতে শুরু করলেন

-কি হল? কি হল?আপনি এভাবে পানি দিলেন কেন?মাথার সব কি ছিড়ে গেছে নাকি আপনার?

আমি এবার হাসতে হাসতে বললাম

-মাথা তো আমার ঠিকেই আছে।বলি কি এভাবে যে নাক ডাকছেন মনে তো হচ্ছে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে।

খেয়াল করলাম উনি বেশ রেগে গিয়েছে আমার কথাটা শুনে। কিছুক্ষণ দম ধরে বসে থেকে আমাকে বললেন

-দেখেন এসব মজা আমার একদম পছন্দ না।আর এমন করবেন না।আপনি খুব বেশি করতেছেন।কালকে থেকে একের পর এক কাহিনী করে জ্বালাচ্ছেন।শেষমেষ আমি এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম।আল্লাহ আমায় রেহাই দাও।

আমি ভ্রূটা কুঁচকে বললাম

-হয়েছে হয়েছে এত কষ্ট পেতে হবে না।আমি আপনাকে এখনও তেমন কিছু করি নি।এত হতাশ হওয়ার মত কিছু হয় নি।এখন আমাকে একটু সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তো।আমি তো এ বাসার কাউকে চিনি না।

ভূতমশাই রাগ রাগ গলায় বললেন

-কারও সাথে পরিচয় হওয়ার দরকার নেই।বাসায় অনেক মেহমান আপনার বের হওয়ারেই দরকার নেই।ঘরে বসে থাকুন।

উনি আরও কিছু বলতে যাবেন ঠিক এ মুহুর্তে দরজায় কেউ নক করে বলতেছে

-অরন্য দরজাটা খুল।বউ নিয়ে নীচে বসার রুমে আয়।সবাই বউ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।

উনি আমার সাথে কোনরূপ কথা না বাড়িয়ে ঐ মহিলাকে জাবাব দিলেন

-ফ্রেশ হয়ে আসতেছি।তুমি যাও।

-আচ্ছা গেলাম আমি।

উনি উঠতে যাবে ঠিক এ মুহুর্তে উনার পাশে বসে উনাকে বললাম

-আচ্ছা আপনার বাসায় কে কে আছে বলুননা?

এবারও উনি রেগে গিয়ে বললেন

-আপনার এত কিছু জানতে হবে না বললাম তো।অতিথি হয়ে এসেছেন আর সময় মত ঠিক চলে যাবেন।এটাই মাথায় রাখুন।বাসায় কে আছে এটা জেনে আপনার কি হবে?

উনার কথাগুলো শুনলে যেন গা জ্বলে যায়।কিন্তু আমিও নাছোরবান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত উঠতে দিব না।আমি বললাম

-আপনি না বললে আমি কিন্তু আপনাকে উঠতে দিব না।আগে বলেন কে কে আছে।

-আপনি তো সত্যিই অনেক নাছোরবান্দা।বলব না কে কে আছে কি করবেন?আপনি একরোখা হলেও আমি আপনার থেকে বেশি একরোখা।আমি কিছুই বলব না।

আমি গলায় একটা কাশি তুলে বললাম

-এহেম,এহেম।ওকে বলতে হবে না। যান ওয়াশ রূমে যান।

উনিও আমার এভাবে হার মানা দেখে খুশি হল।কিন্তু যখন ওয়াশরুমে যেতে নিল আমি আমার পা টা বাড়িয়ে দিলাম।আমার পায়ে উনার পা লেগে উনি হোঁচট খেয়ে পড়ল।আর চিল্লায়ে বললেন

-আপনি ইচ্ছা করে এমন করছেন তাই তো?ইচ্ছা করে এমন করলেন কেন বলেন?

আমি মুচকি মুচকি হেসে বললাম

-কোথায় আমি তো কিছু করে নি।আপনি বলেন নি তাই শাস্তি পাচ্ছেন।যদি এবার ও না বলেন তাহলে আরও অনেক কিছুই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এবার ভেবে দেখুন কি করবেন।

উনি বেশ বুঝতে পারল আমি অনেক নাছোড়বান্দা তাই আরও অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আগে বললেন

-আমার পরিবারে বাবা,মা,আমি আর আমার বড় বোন আছে।বাবা বিদেশ থাকে সবসময়।আর মা দেশে থাকে কিন্তু প্রায় সময় অসুস্থ থাকে।আর বড় বোন তার স্বামী নিয়ে লন্ডন থাকে।একটু আগে যে মেয়েটা ডেকে গেল উনি আমার বড় বোন।আর আমার বাবা আমার বিয়েতে আসে নি।উনি সবসময় ব্যস্ত থাকেন।

-আচ্ছা তাহলে আপনার বাসায় রান্না করে কে?

উনি রাগ হয়ে বললেন

-এটাও কি আপনার জানতে হবে?

আমি এবার ভাব মাখা মুখ নিয়ে বললাম

-হ্যা ভূতমশাই জানতে হবে।

উনি মুখটা বাকিয়ে উত্তর দিলেন

-বাবুর্চি রান্না করে।এবার আমাকে ওয়াশরুমে যেতে দিন।আপনিও রেডি হন।বসার রুমে সবাই অপেক্ষা করছে।পারলে একটু ভালো করে সেজে যাবেন।না হয় মান সম্মান আর থাকবে না।বিয়ে তো করেছেন ফাঁসিয়ে।সেটা তো আর কেউ বুঝবে না।সুতরাং একটু গুছিয়ে যাবেন নীচে।পরে সময় আর সুযোগ মতে আলাদা হয়ে যাব আমরা।আশা করি বুঝতে পারছেন।

কথাটা শুনে বুকের ভিতরটা কাঁপতে লাগল।যতই হোক উনি এখন আমার স্বামী হয়।কোন মেয়েই হয়ত চাইবে না সে ডিভোর্সি হোক।খারাপ লাগলেও নিজেকে বেশ সামলে ভূতমশাইকে জবাব দিলাম

  • আমি ঐসব ময়দা মেখে নীচে যেতে পারব না।আমি যেমন ঐরকমেই যাব।কে কি বলল তাতে আমার যায় আসে না।ময়দা মেখে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর কোন ইচ্ছা আমার নাই।আশা করি বুঝতে পারছেন।

উনি এতক্ষণে বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে যে আমি খুব নাছোরবান্দা তাই উনি শুধু বললেন

-আপনার যা ইচ্ছা করুন আমাকে বলতে আসবেন না।যেভাবে ইচ্ছা ঐভাবে নীচে যান।আমার তাতে কিছু যায় আসে না।

কথাগুলো বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেন।এর মধ্যে আমি খেয়াল করলাম সারা ঘর বেশ অগোছালো হয়ে আছে।তাই ঘরটা গুছানো শুরু করলাম।আলমিরা থেকে উনার জন্য কাপড় বের করে বিছানায় সাজিয়ে রাখলাম যাতে করে উনি ওয়াশ রুম থেকে এসে হাতের নাগালে সব পেয়ে যায়।উনার ঘড়ি, ওয়ালেট সব একত্রে এক জায়গায় রাখলাম।আমি চটপট করে একটা শাড়ি পড়ে ফেললাম।যতটুকু সম্ভব নিজেকে ময়দা মাখা ছাড়া গুছানোর চেষ্টা করলাম।সবকিছু ঠিক করতে করতে খেয়াল করলাম উনি ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে।ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে উনি সারা ঘরটা দেখে একটু অবাক হল।বিছানার উপর উনার কাপড়গুলো দেখে বললেন

  • এখানে এগুলো কে রেখেছে?ঘরটা এত তাড়াতাড়ি এত পরিপাটি করে কে গুছিয়ে দিয়ে গেল।

আমি লাজুক স্বরে জাবাব দিলাম

-এসব কিছু আমি করেছি।

আমার কথাটা শুনে উনার মুখটা যেন আরও চুপসে গেল।উনার চুপসানো মুখটা পুরো আলোর চপের মত লাগছিল।চুপসানো মুখ নিয়ে আমাকে বলল

-এত কিছু করতে কেউ তো আপনাকে বলে নি।এতকিছু করতে গেলেন কেন?

আমিও বেশ ঝাঁঝালো গলায় জাবাব দিলাম

-নিজের ঘর নিজে গুছিয়েছি তাতে আপনার কি মশাই?

উনি ভ্রূটা কুঁচকে বলল

-আপনার ঘর মানে?এটা আপনার ঘর কবে হল?

আমি হাসি হাসি মুখে উত্তর দিলাম

-কেন স্বামীর ঘরেই তো স্ত্রীর ঘর হয়।বিয়েটা যেভাবেই হোক।ডিভোর্সের আগ পর্যন্ত আমি আপনার স্ত্রী আর আপনি আমার স্বামী।সুতরাং ঘর গুছাতে আমি পারব নিশ্চয়।

ভূতমশাই রাগ রাগ গলায় বললেন

-আপনি একটু বেশিই বকেন।আর আপনাকে এ ড্রেস বের করতে কে বলেছে?আমি তো এটা পড়ব না।

-আমার কাছে এটা ভালো লেগেছে তাই এটা বের করেছি।পড়লে খুশি হব।

উনি এবার ভীষণ গম্ভীর একটা মোড নিয়ে জবাব দিলেন

-আপনার খুশিতে আমার কি যায় বা আসে।?করেছেন তো ফাঁসিয়ে বিয়ে আবার অধিকার ফলাতে আসতেছেন।লজ্জা হওয়া উচিত আপনার।

এ কথাটা শুনে বুকের ভিতরে হুহু করে কষ্টের সাইরান বাজতে লাগল।চোখের কোণে হালকা মেঘ ও জমতে লাগল।তবুও নিজেকে অনেক শক্ত করে উনাকে বললাম

-আপনার ইচ্ছামত পড়ে নিন।সমস্যা নেই।

উনিও আমার কথা শুনে বিছানা থেকে আমার রাখা ড্রেসটা আলমিরাতে রেখে উনার পছন্দ মত একটা ড্রেস পড়লেন।কিন্তু আমিও কম নাছোরবান্দা না উনাকে এর শাস্তি তো আমি দিবই।কিভাবে কি করা যায় বেশ ভাবতে লাগলাম।ভাবতে ভাবতে যেন চিন্তার আকাশে হাবুডুবু খেতে লাগলাম।

হঠাৎ করে ভূতমশাই এর তুড়ির শব্দে চিন্তার ঘোর কাটল।ভূতমশাই তুড়ি বাজাতে বাজাতে বললেন

-এই যে আপনি উপরে তাকিয়ে কি দেখছেন?

-নাহ তেমন কিছু না।কি হয়েছে বলুন?

-আপনি আর কোনদিন আমার অনুমতি ছাড়া আমার আলমিরায় হাত দিবেন না বুঝছেন।

আমিও কথাটা শুনে বেশ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিলাম।লুটোপুটি খেয়ে তুড়ি বাজাতে বাজাতে বললাম

-ঐ হ্যালো স্বামীর আলমিরায় হাত দিতে অনুমতি লাগে নাকি।আমাকে জ্ঞান দিতে আসবেন না।আমি অন্যায় কিছু করি নি।

উনি বেশ বিরক্ত হয়েই আমাকে বললেন

-আপনি সত্যিই পাগল।আপনার মাথার তার মনে হয় সব ঢিলা।

আমি আবারও হাসতে হাসতে বললাম

-ভূতমশাই একটু ভুল বলে ফেলেছেন।

উনি উনার বিরক্ত মাখা মুখ নিয়ে প্রশ্ন করলেন

-কি ভুল শুনি?

আমি হাসি দিয়ে বললাম

-আমার মাথার তার ঢিলা না।

-তো আপনার মাথার তার কি?

-আমার মাথার তার তো সব ছিড়া।

এবার খেয়াল করলাম উনার মুখের বিরক্তের মাত্রাটা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।বিরক্ত মাখা মুখ নিয়ে বললেন

-দোহাই লাগে।হাত জোড় করি আপনি আপনার বক বকানিটা একটু থামান।এবার বসার রুমে চলুন একটু।আমাকে মুক্তি দিন।

আমিও আমার শাড়ির আঁচল নাড়াতে নাড়াতে বললাম

-চলুন।।

এরপর দুজন নীচে গেলাম।নীচে যাওয়ার পর খেয়াল করলাম সবাই আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকাচ্ছে।আর আমাকে দেখে বলছে অরন্যের কি কপালে চোখ ছিল নাকি এমন একটা মেয়ে কেউ বিয়ে করে আনে নাকি।তার উপর মেয়ের পরিবারও বেশি ধনী না কি দেখে এ মেয়ে বিয়ে করল আল্লাহ জানে ভালো।একের পর এক এসব কথা শুনে আমার মনটা ভীষণ খারাপ হতে লাগল।সবাই শুধু আমার বাহ্যিক সৌন্দর্যটাকেই দেখল আমার ভিতরটা বুঝার চেষ্টা করল না।ভিতরের মানুষটা কেমন আমি সেটা একটাবারও কেউ যাচাই করার প্রয়োজন অনুভব করল না।

হুট করে খেয়াল করলাম আমার শ্বাশুড়ি মা এসেছেন।সবাই শ্বাশুড়ি মাকে দেখে চুপ হয়ে গেল।শ্বাশুড়ি মা এসে আমাকে দেখে বললেন…

আমার শ্বাশুরি মা আমাকে এসে দেখে বললেন

-তোমার নাম কি মা?

আমি চট করে উনাকে সালাম করে, উত্তর দিলাম

-আমি অনন্যা।

উনি হাসি মুখে বললেন

-বাহ খুব সুন্দর নাম।

আমি মাকে বললাম

-মা আপনি এদিকে এসে বসুন।মা আপনি এ অসুস্থ শরীর নিয়ে কষ্ট করে এখানে আসলেন কেন?শুনেছি আপনাকে নাকি ডাক্তার বেড রেস্ট দিয়েছে।এ শরীর নিয়ে এখানে কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল।আপনি বললে আমিই আপনার রুমে চলে যেতাম।আমি আপনার রুমটা চিনলে সকালে উঠেই চলে যেতাম।কিন্তু আপনার রুমটা চিনি না আর এ বাড়িতে নতুন তো তাই কিছু চিনতে পারি নি। চিনলে আমিই চলে যেতাম।মা কষ্ট হয় নি তো আসতে?

উনি এক রাশ হাসি দিয়ে বললেন

-আমার মা টা দেখি অনেক সুন্দর করে কথা বলে।আমার মা টা দেখতে যেমন রূপবতী তেমন গুণবতীও।

মায়ের মুখে রুপবতী কথাটা শুনে যেন নিজের চোখে অজোরে বৃষ্টি নামতে লাগল।জীবনে এ প্রথম কেউ আমাকে রূপবতী বলেছে।নিজেকে সামলাতে অনেক চেষ্টা করলাম।কিন্তু জানি না কেন আবেগটা সামলাতে পারছিলাম না। তাই মাকে ধরে হুহু করে কেঁদে কেঁদে বললাম

-মা আপনি আমাকে রূপবতী বলছেন।আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ রূপবতী বলে নি।আপনার মুখে রূপবতী কথাটা শুনে কেন জানি না আবেগটা সামলাতে পারলাম না।

মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন

-সবাই তো তোমার বাইরের রূপটা দেখেছে কেউ তোমার ভিতরের রূপটা দেখে নি। তোমার ভিতরের রূপটা যদি কেউ দেখত তাহলে সবাই তোমাকে রূপবতীই বলত।আমি যে তোমার ভিতরের মানুষটাকে উপলব্ধি করতে পেরেছি যার কারনে তুমি আমার কাছে সবচেয়ে রূপবতী।আমি আমার মেয়ে নীলার মুখে সবটা শুনেছি বিয়ের ব্যাপারে।শুন মা আমার ছেলে তোমার কপালে ছিল তাই তোমার সাথে এভাবে বিয়ে হয়েছে।আমার ছেলের ভাগ্যে তুমিই ছিলে।কে কি বলল কানে দিবে না।কারন মানুষ যাই বলুক নিজের কাছে যেটা সঠিক মনে হবে সেটাই করবে।মানুষের কাজেই কথা বলা।মনে রাখবে যখন তোমাকে নিয়ে কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করবে ভেবে নিবে সে তোমার জয়ে ঈর্ষান্বিত তাই তোমার সুখে তার মন কাতর হয়েছে বলেই তোমার নামে সে নেতিবাচক মন্তব্য করছে।জীবনে চলার পথে অনেক বাধা আসবে।লক্ষ্য স্থির রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।মানুষের কথায় কান দিয়ে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হবে না।

মায়ের কথাগুলো শুনে মনে যেন আরও ভরসা পেলাম।মাকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আরও কাঁদতে লাগলাম।মা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন

-পাগলিটা কাঁদছে কেন এত।শোন মা আজকে রাতের পর থেকে বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাবে।নীলাও চলে যাবে রাতের ফ্লাইটে লন্ডনে।বাড়িতে আমি তুমি আর অরন্য ছাড়া কেউ থাকবে না।প্রতিদিন বাবুর্চির রান্না খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি। আমি জানি এবার আমি চিন্তা মুক্ত কারন আমাকে আর বাবুর্চির রান্না খেতে হবে না আমার বউ মা এখন আমাকে সব রান্না করে খাওয়াবে।কি রে মা খাওয়াবে না?

আমি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললাম

-কেন পারবনা।এত ছোট একটা আবদার পালন করতে পারব না মেয়ে হয়ে।তাহলে আমি তেমার কেমন মেয়ে!।চিন্তা কর না আমি সবটা গুছিয়ে নিব।আমাকে শুধু বুঝিয়ে দিও।আর দোআ কর।

উনি হাসতে হাসতে বললেন

-সে তো অবশ্যই।

চারপাশে এ মুহুর্তে বেশ নিস্তবতা বিরাজ করছে।সবাই খুব চুপ হয়ে গিয়েছে।খেয়াল করলাম আমার ভূতমশাই আমার দিকে আলুর মত চুপসানো মুখ নিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে।আমিও এ সুযোগে একটু পাগলামি করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলাম না।সুযোগ বুঝে ভূতমশাইকে চোখ টিপুনি দিলাম।ভূত মশাই আমার চোখ টিপুনি দেখে একটু নড়েচড়ে দাঁড়াল।আমি ভূত মশাই এর থেকে মনোযোগ সরিয়ে মা এর দিকে তাকিয়ে বললাম

-মা এবার ঘরে চলুন।বেশিক্ষণ এভাবে থাকা ঠিক হবে না।আপনি আমার সাথে ঘরে চলুন তো আর আমাকে আপনার ঘরটা চিনিয়ে দেন যাতে করে আমার পরে যেতে যেন অসুবিধা না হয়।

মা হাসতে হাসতে বললেন

-চল আমার সাথে চল।

আমি মাকে নিয়ে ঘরে গেলাম।এবার মা আমার হাতটা ধরে বললেন

-দেখো মা অরন্য বেশ সোজা,সাপটা সরল স্বভাবের ছেলে। তুমি অরন্যকে ভালো রেখ।কখন ও কষ্ট দিও না।

আমি মায়ের হাতটা চেপে ধরে বললাম

-মা বিয়েটা যেভাবেই হোক আমি এখন অরন্যের স্ত্রী।অরন্যের ভালোমন্দের বিষয়টা আমি মাথায় রাখব।আপনি শুধু আমার জন্য দোআ করবেন।

মা আমার মাথায় আবার হাত বুলাতে বুলাতে বললেন

-দোআ করি অনেক সুখী হও।

মায়ের আদর মাখা স্পর্শ নিয়ে আমি বের হলাম মায়ের রুম থেকে।মায়ের রুম থেকে বের হয়ে খেয়াল করলাম ভূতমশাই এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এই সুযোগ আমার প্ল্যান টা কাজে লাগানোর।আমি একটু কোক মুখে নিয়ে ভূতমশাই এর কাছে গিয়ে জোরে হাঁচি দিলাম আর মুখের সব কোক ওনার গায়ে ফেললাম।উনি বেশ লাফিয়ে উঠে বললেন

-আমি তো জানি আপনি ইচ্ছা করেই এমন করেছেন।কেন করেছেন এমন?আপনি আমার সাথে এমন করেন কেন?মাকে তো দেখলাম খুব হাত করে ফেলেছেন।ফাঁসানোর ব্যাপারে তো আপনি অনেক উস্তাদ।মাকেও ফাঁসিয়ে দিয়েছেন পুরা।

আমি এবার ফাঁসানোর কথাটা শুনে এতটা গায়ে লাগালাম না।উনাকে সজোরে বললাম

-সে আমি যা ইচ্ছা করি আপনার কি?যান ড্রেস টা চেন্জ করে আগের ড্রেসটাই পড়ুন যেটা আমি পছন্দ করে ছিলাম।আমার কথা শুনেন নি তো তাই এমন হয়েছে।মাঝে মাঝে বউ এর কথা শুনতে হয়, নাহয় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতেই পারে।

একথাটা শুনার পর উনার আর বুঝতে আর বাকি রইল না যে, আমি ইচ্ছা করে এমন করেছি।কিন্তু উনার মুখে তেমন রাগের ছাপটা এখন লক্ষ্য করলাম না।তবুও মুখটাকে একটু বাকিয়ে জবাব দিলেন

-আপনার পছন্দের ড্রেসটা পড়ব না।আপনাকে আমার ভালো লাগে না।অর্পাকে দেখে প্রথম দেখায় ভালো লেগে গিয়েছিল যে ভালোলাগাটা আপনার প্রতি চাইলেও আনতে পারছি না।

আমি এবার হালকা করে উনার একটু কাছে গেলাম।কাছে গিয়ে বললাম

-“প্রথম দেখায় ভালো লেগে যাওয়ার চেয়ে দেখতে দেখতে ভালো লাগাটা অনেক শ্রেয়”

আপনি আমাকে দেখতে থাকুন।এ বলে চোখ টিপুনি দিয়ে বললাম ঐ ড্রেসটা পড়লেই ভালো লাগবে।পড়বেন কিন্তু।

-পড়ব না।

এ বলে উনি তারাহুরা করে রুমে চলে গেলেন।কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম উনি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছে।আমি উনাকে দেখে পুরো অবাক কারন উনি ঐ ড্রেসটাই পড়েছে আমি যে টা পড়তে বলেছিলাম।আমি তো উনার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না।মনের ভিতর একটা হিমেল হাওয়া বইতে লাগল।উনি হুট করে আমার কাছে এসে বললেন

-ভাববেন না আপনার কথা রাখতে পড়েছি। আমার ড্রেস আমি পড়ব যা ইচ্ছা পড়ব।কারও কথায় পড়ি নি।

আমি এবার কিছুই বললাম না।শুধু মুচকি একটু হেসে দিয়ে বললাম

-ঠিক আছে কিছু ভাবব না।

ছোটখাট খুনসুটি দিয়েই সারাটাদিন পার করলাম।সন্ধ্যার দিকে একেক করে সব মেহমান চলে গেল।বাড়িটা বেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।নীলা আপুও রাতের ফ্লাইটে লন্ডন চলে গেল।যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল বিয়ে যেভাবেই হোক আমি যেন সবটা মেনেজ করে নিই।আমি ও আশ্বাস দিলাম সব ঠিক করে নিব।পরিবারের এমন সাপোর্ট পাব কখনও আশা করি নি।সবাই আমার পাশে আছে এটা ভেবে মনে যেন আরও ভরসা পেলাম।

সারাদিন পার করে রাতে রুমে ঘুমাতে গিয়ে দেখলাম ভূতমশাই বসে কি যেন কাজ করছে।আমি এক মগ কফি বানিয়ে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম

-এই যে আপনার কফিটা।

উনি আমার হাত থেকে কফিটা নিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে কিছুক্ষণ টেস্টটা বুঝার চেষ্টা করল মনে হচ্ছে।আর আমাকে বললেন

-কফিটা কে বানিয়েছে।

আমি লজ্জা মাখা মুখে বললাম

-কেন?

-কফিটা ভালো হয়েছে তাই।

আমি লজ্জা মাখা মুখে বললাম

-কফিটা আমি বানিয়েছি।

উনি এবার মুখটাকে আলুর চপের মত করে ফেললেন।ভুলক্রমে উনি আমার প্রশংসা করে ফেলেছেন এটা মনে হয় উনার উচিত হয় নি তাই মুখটা বাংলার পাঁচ করে ফেললেন। এবার আমাকে একটু পঁচিয়ে উনি উনার দায়িত্ব পালন করবেন সিউর।যাক যা ভেবেছিলাম তাই করেছেন।উনি মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন

-এজন্যই বলি টেস্ট টা এত জঘন্য কেন।

আমি উনার কথার ভ্রূক্ষেপ না করে একটু হাসি দিয়ে চলে গেলাম।

পরদিন সকালে উঠে সব রান্না করলাম।রান্না করে মায়ের খাবারটা নিয়ে মায়ের রুমে গেলাম।মা আমাকে দেখে হাসি মাখা মুখ নিয়ে বলল

-কি রে মা এখন এত খাবার নিয়ে আসলে কেন?

-এত খাবার কোথায় দেখলে তুমি।এগুলা সব খেতে হবে তোমাকে।না হয় সুস্থ হবে না।আমার কাছে খাবার নিয়ে কোন ফাঁকি দিতে পারবে না।খেতে না চাইলে মাইর দিয়া জোর করে খাওয়াব।

উনি হাসতে হাসতে আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন

  • বুঝতে পেরেছি আমার আর ফাঁকি দেয়া যাবে না।তা দাও খেয়ে নেই।

আমি মাকে খাওয়াতে লাগলাম।একের পর এক গল্প শুনতে লাগলাম।মনে হল উনি অনেক দিন পর মন খুলে কথা বলছেন।ঠিক এসময় অরন্য এসে বললেন

-মায়ের রুমে আপনি এখন কি করছেন?

-মায়ের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলাম।

-আচ্ছা আপনি যান মায়ের সাথে আমার কথা আছে।

পাশ থেকে মা বললেন

-অনন্যা তো পর না অনন্যার সামনেই বল কি বলবি।

  • না মা আমি একা কথা বলতে চাই।

আমিও আর কথা না বাড়িয়ে মায়ের পাশ থেকে উঠে চলে আসলাম।কিছুক্ষণ পর উনি কথা শেষ করে খাবার খেতে আসলেন আমি খাবার গুলো খেতে দিলাম।খেয়াল করলাম গপ গপ করে খাবার খাচ্ছে।আমি বললাম

-আরে মশাই আস্তে খান।সব শেষ হয়ে গেলে আবার রান্না করব।

-মানে?এগুলা কে রান্না করেছে?

লাজুক মুখে জবাব দিলাম

-আমি।

-এজন্যই বলি এত জঘন্য কেন।

এ বলে উনি খেতে লাগলেন।আমি তখন বললাম

-হুম জঘন্য খাবারেই এভাবে খাচ্ছেন।ভালো খাবার না জানি কিভাবে খেতেন।

আমার কথাটা কানে তুললেন না মনে হচ্ছে।খেয়েই যাচ্ছেন।এবার উনাকে বললাম

-এই যে শুনছেন

-হ্যা! কি বলবেন বলুন।

-আমি একটু বাইরে যেতে চাই।কিছু জিনিস কিনতে হবে।রান্নার জন্য কিছু সবজি লাগবে।আমি গেলে মনমত কিনে আনতে পারতাম।

-আপনি গেলে যান।তবে কি দিয়ে যাবেন?একটা গাড়ি আমি নিয়ে যাব আর একটা গাড়ি থাকলেও সে গাড়ির ড্রাইভার নেই।ড্রাইভারের স্ত্রী অসুস্থ তাই বাড়ি গিয়েছে।আপনি কিভাবে যাবেন?

আমি মুচকি হেসে বলললাম

-ঐ গাড়ির চাবিটা দিয়ে যান আমি চলে যেতে পারব একা।

উনি অবাক হয়ে বললেন

-একা চলে যেতে পারবেন মানে?গাড়ি কে চালাবে?

-কেন আমি চালাব।

আমার কথা শুনে এবার মনে হয় উনি বেশ চমকালেন।আমার মুখ থেকে এমন কথা উনি আশায় করেন নি হয়ত।আমাকে জিজ্ঞেস করলেন

-আপনি গাড়ি চালাতে পারেন?

আমি হাসতে হাসতে বললাম

-হ্যা পারি।অসুন্দর বলে নিজেকে কখনও ছোট ভাবি নি।সবকিছু শিখার চেষ্টা করেছি।নিজেকে পারফেক্ট ভাবে গড়ে তুলার চেষ্টা করেছি।

আমার কথাটা শুনে উনি কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর বললেন

-আচ্ছা আমি চাবি দিয়ে যাব।

তারপর উনি আমাকে চাবি দিয়ে চলে গেলেন।

আস্তে আস্তে দিন কাটতে লাগল।অরন্যের সাথে খুনসুটি গুলো বাড়তে লাগল।খেয়াল করলাম অরন্যও অনেক পরিবর্তন হতে লাগল।

এর মধ্যে হুট করে অরন্য একদিন…

Continue…..

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *