হঠাৎ বিয়ে Part-4 END

লেখিকা- শারমিন আঁচল নিপা

৪র্থ পর্ব  END

ঘরের ভিতর গিয়ে দেখলাম রনক ভাই দাঁড়িয়ে আছে।রনক ভাই কে দেখে আমার মাথায় যেন আগুন ধরে গেল।কারন রনক ভাই এর জন্যই অর্পা আপু আমাকে ভুল বুঝল।নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না।রনক ভাই রে গিয়ে বললাম

-আপনার কি দরকার ছিল এত বড় নাটক করার?অর্পা আপুকে কেন ভুল বুঝিয়েছেন?কি ক্ষতি করেছিলাম আপনার।

খেয়াল করলাম রনক ভাই কোন কথায় বলছে না।আমার রাগটা যেন আরও বেড়ে গেল।মন চাচ্ছে রনক ভাইকে কষিয়ে একটা চড় দেই।তাই করতে নিলাম।কিন্তু হুট করে অরন্য এসে পিছন থেকে আমার হাতটা ধরে ফেলল।আমি অরন্যের দিকে ফিরতেই অরন্য আমাকে জড়িয়ে ধরল।আমি বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে এসব?অরন্য জড়িয়ে ধরার সাথে সাথে খেয়াল করলাম।চারদিকের আলো আরও বেড়ে গেল।অর্পা আপু, রনক ভাই,আমার কিছু বান্ধবী সবাই হাত তালি দিয়ে বলতেছে “হ্যাপি বার্থ ডে অনন্যা”

এখনও আমার মাথায় কাজ করছে না এসব কি হচ্ছে?মাথাটা খুব ঝিমাতে লাগল।পরক্ষণেই জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরার পর খেয়াল করলাম অরন্য আমার পাশে চিন্তামগ্ন হয়ে বসে আছে।আমার জ্ঞান ফিরার সাথে সাথে আমাকে বললেন

-অনন্যা ঠিক আছ তো তুমি?কিছু হয় নি তো?

হুট করে সবার এত পরিবর্তন দেখে কেন জানি না অবাক লাগছে।খেয়াল করলাম সামনে রনক ভাই আর অর্পা আপু ও দাঁড়ানো।আমি ওদের দেখে রেগে যেতে নিলাম।অরন্য আমাকে শান্ত স্বরে বললেন

-অনন্যা ওদের কিছু বল না।ওরা এতক্ষণ যা করেছে আমার কথায় করেছে।

অরন্যের কথাগুলো শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম।কি বলে এসব!মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব!।আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম

-মানে?আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

অরন্য একটু মুচকি মুচকি হেসে বললেন

-কিছু বুঝতে হবে না।আগে তোমাকে একটা সংবাদ দেই।অর্পা কোথায় গিয়েছিল সেটা তো সবার অজানা ছিল।অর্পা রনকের সাথে পালিয়েছিল।

আমি কথাটা শুনে বেশ অবাক হলাম।তাহলে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা কি আমার স্বপ্ন ছিল

-ওরা যদি বিয়েই করে নেই তাহলে একটু আগে এমন বলল কেন?

অর্পা আপু পাশ থেকে বলে উঠল

-তুই একটু শান্ত হ আমি সবটা বলছি।

আমি নিজেকে শান্ত করে বললাম

-এবার বল।

-রনকের সাথে আমার রিলেশন ছিল তিন বছরের।রনক তোকে কিছু বলে নি কারন আমরা তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।কিন্তু হুট করে আমার বিয়ে ঠিক করাতে সব ঝামেলা পাকালো।কি করব বুঝতে পারছিলাম না।প্রচন্ড সিদ্ধান্তহীনতাই ভুগছিলাম।শেষমেষ বিয়ের দিন সকালে মনে হল নিজের ভালোবাসাকে এভাবে কুরবানী করা ঠিক হবে না।তাই রনক কে ফোন দিয়ে বললাম

-রনক তুমি কি চাও আমরা এক হই।

-অর্পা তুমি এখনও এ কথা জিজ্ঞেস করছ?তুমি যা করতে বল তাই করব তবুও আমাকে ছেড়ে যেও না।

-তাহলে বাগানের কাছে চলে আস।

রনক আমার কথা শুনে বাগানের কাছে আসল।আর আমি সুযোগ মত রনকের হাত ধরে পালিয়ে গেলাম।

-তাহলে একটু আগে যে কাহিনী বলেছিলি সেটা কি ছিল?

আমার প্রশ্নের জবাবে সবাই প্রথমে একটু হেসে নিল।সবার হাসি দেখে এবার সত্যিই আমার গা জ্বলে যেতে লাগল।রেগে গিয়ে বললাম

  • কি হয়েছে বলবি তো?

অরন্য মুচকি মুচকি হেসে বললেন

-৪ টা মাস খুব জ্বালিয়েছ আমাকে।তাই এর শাস্তি তো ভালোবাসি শব্দটা বলার আগে দিতেই হত।আর একটু সারপ্রাইজ দেওয়ার ও বাকি ছিল।হুট করে অর্পার সাথে দেখা।তখন অর্পাকে নিয়েই প্ল্যানটা করি।

-এরকম প্ল্যানটা কে করল শুনি?

অরন্য হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল

-আমি করেছি।

এরকম একটা প্ল্যান করেছে বলে অরন্যের প্রতি আমার খুব অভিমান জমে গেল।অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম।অর্পা আপু বলল

-আচ্ছা অনন্যা থাক তুই আমি আর রনক বাইরে গেলাম।তোদের মান অভিমানের পালা শেষ কর।আর চড়টা দেওয়ার জন্য সরি জোরে লাগে নি তো।নাটক করতে গিয়ে ক্যারেক্টারের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলাম।

অর্পা আপুর কথা শুনে অভিমান টা আরও বেড়ে গেল।অভিমানী গলায় বললাম

-হয়েছে জুতা মেরে গরু দান করতে হবে না।

অর্পা আপু হাসি দিয়ে রনক ভাইকে নিয়ে চলে গেল।আর আমি গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম।অরন্য আমার দিকে তাকাল কিন্তু অভিমানের জন্য আমি আর অরন্যের দিকে তাকালাম না।অরন্যের চোখ যেন আমার থেকে সরছে না।আমি যেন তার চোখের নিশানা থেকে নিজেকে সরাতে পারছিলাম না।ক্রমশ আমার অভিমান কমতে লাগল।তবুও অভিমান টা ধরে রাখার নিরলস কসরত করে যাচ্ছি।অভিমানটা স্থির রাখার অনেক চেষ্টার পর ও কেন জানি না অভিমান টা ধরে রাখতে পারলাম না।তাই অরন্যকে জড়িয়ে ধরে অভিমানটা চোখের বৃষ্টি করে নামিয়ে দিলাম।ফুপাতে ফুপাতে বললাম

-আমাকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার কি কোন দরকার ছিল।আমি যদি হারিয়ে যেতাম ঐ জায়গা থেকে?

-আমি তো আমার অনন্যাকে চিনি সে যে বাসা খুঁজে ফিরতে পারবে সেটা আমার ভালোই জানাই ছিল।সারপ্রাইজ টা কেমন লাগল।

-খুব বাজে লেগেছে।এভাবে আর সারপ্রাইজ দিবেন না।নাটক করতে গিয়ে তো রিংটাও ফেলে এসেছিলেন।

খেয়াল করলাম অরন্য আমার এ কথা শুনে অট্ট হাসি দিচ্ছে।

-কি ব্যাপার এত হাসি দিচ্ছেন যে।

-হাসি দিচ্ছি এজন্য আমি যে রিং টা ফেলে এসেছি সেটা নকল রিং ছিল আর আসল রিংটা আমার কাছে।নাটকটা বাস্তমুখী করার এক অভিন্ন প্রচেষ্ঠা আর কি।হাহাহা।

এত বড় ছলনা যান আর কথায় বলব না আপনার সাথে।অরন্য এবার আমাকে জোরে জড়িয়ে ধরল। মনে হচ্ছে তার নিঃশ্বাসের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি।তার হার্টবিটের আওয়াজ আমি শুনতে পাচ্ছি।এবার কানের কাছে মুখটা হালকা করে নিয়ে বললেন

-আই লাভ ইউ পেত্নী।

এবার যেন তার প্রতি থাকা সকল অভিমান আমার মনে দুমরে মুচরে গিয়ে ভেঙ্গে গেল।অভিমানটা টিকিয়ে রাখার ব্যার্থ চেষ্টা করলাম।কিন্তু পারলাম না।আমিও ফিস ফিস করে বললাম

-আই লাভ ইউ টু ভূতমশাই।আমার মত কালো মেয়েকে ভালোবাসলেন কিভাবে?

-মানুষের দৃষ্টি সুন্দর, অসুন্দরের বৈষম্য করে।আমার দৃষ্টিতে তুমি সবচেয়ে বেশি সুন্দরি।

কথাটা শুনার পর নিমিষের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম।কিছু বলতে চাইলেও আর বলতে পারছিলাম না।কারন গলাটা থরথর করে কাঁপতে লাগল।অরন্য আমাকে এবার চোখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।আর বললেন

-আমার সাথে একটু চল।

-কোথায়?

-আগে চল তো তারপর বলি।এত নাছোরবান্দা মেয়েরে বাবা।এত বকবক করতে পারে।

-হয়েছে হয়েছে আর বকবক করবনা। এবার নিয়ে যান।

চোখটা চেপে ধরে আস্তে আস্তে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।হুট করে চোখ খুললাম।খেয়াল করলাম আমি ছাদে।চারদিকে মোমবাতি দিয়ে সাজানো।অর্পা আপু আর রনক ভাইয়া বাজি ফুটাতে লাগল।পাশে মা দাঁড়িয়ে আছে উনার পাশে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে আমার বুঝতে বাকি রইল না উনি আমার শ্বশুর মশাই।আমি দৌঁড়ে গিয়ে উনাদের সালাম করলাম।অর্পা আপু আর রনক ভাইয়া আমার সামনে একটা কেক আনল আর বলল

-ভূত আর পেত্নী দুজন মিলে কেকটা কাটেন।আর অরন্য ভাইয়া আপনি অনন্যাকে রিং পড়িয়ে দিন।আর অনন্যা তোর হাতের নকল রিং টা ছুরে ফেলে দে
এত বোকা কবে হয়েছিস।সামান্য নাটক বুঝতে পারলি না।তুই তো বেশ নাছোরবান্দা আর বুদ্ধিমতি ছিলি।

আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম।বিড়বিড় করে বললাম প্রেমে পড়লে যে মানুষ বলদ হয় সেটা আমাকে দিয়েই প্রমাণ হল।অরন্য ধাক্কা দিয়ে বলল

-কি বিড়বিড় করা হচ্ছে হুম…

-নাহ কিছু না।

-একটু ঐদিকে ফির তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।

-কি সারপ্রাইজ?

-ঐদিকে ফিরেই দেখ।

আমি ঐদিকে ফিরে দেখলাম আমার বাবা,মা, চাচা,চাচী সবাই এসেছে।আমি খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেলাম।বিয়ের পর এসব ঝামেলায় আমার শ্বশুর বাড়িতে কেউ আসে নি।এভাবে যে সারপ্রাইজ পাব বুঝতে পারি নি।আমি তো খুশিতে স্থির হয়ে গিয়েছিলাম।কিছু বলতেও পারছিলাম না আবার নড়তেও পারছিলাম না।আমাকে অরন্য ধাক্কা দিয়ে বললেন

-এবার কেকটা কাট আর আপনি শব্দটার ইতি টান।

-আপনি শব্দটার ইতি টানব মানে?

-মানে আমাকে তুমি করে বলবে।

-আমার তো লজ্জা লাগবে।

-হয়েছে হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না।কেকটা কাট সবাই অপেক্ষা করছে।

কেকটা কাটার সাথে সাথে চারদিকে বাজি ফুটতে লাগল।কয়েকটা ফানুস আকাশে উড়তে লাগল।কি যে এক অণুভূতি বলে বুঝানো যাবে না।মনের ভিতরটা এমন লাগছে যেন ঝড় হওয়ার পর শীতল বাতাস বইছে।সত্যিই বুঝতে পারি নি আমার ভূতমশাই আমায় এত ভালোবাসে।

কেকটা কাটলাম।ভূতমশাই আমাকে হাতে রিং টা পড়িয়ে দিল।আমি লজ্জায় দৌঁড়ে রুমে চলে আসলাম।অরন্য আমার পিছন পিছন আসল।অরন্যকে বললাম

-আপনার তো

অরন্য আমার মুখটা আটকে দিয়ে বলল

-আপনি না তুমি বল।

আমি লজ্জা মাখা মুখে উত্তর দিলাম

-তোমার তো আমাকে ভালো লাগে না।অর্পা আপুকে তো প্রথম দেখায় ভালো লেগেছিল।হুট করে আমাকে ভালো লাগল কিভাবে?

-কারন “প্রথম দেখায় ভালো লাগার চেয়ে দেখতে দেখতে ভালো লাগা অনেক শ্রয়।”

-আমার কথাটায় আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

-সত্যি কথা বললে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না বরং সত্যতার প্রমাণ হয়।

সেদিনের পর থেকে অরন্য আর আমার জীবনটা পুরোপুরি পাল্টে গেল।দেখতে দেখতে ৩ টা বছর কেটে গেল।এর মধ্যে আমি একটা পুত্র সন্তানের মা হলাম।একদিন পাশের বাসার পরিচিত এক ভাবী আমার ছেলেকে দেখতে এসে আমাকে বললেন

-অনন্যা ভাবী আপনাদের বিয়েটা যেন কিভাবে হয়েছে?

উত্তরে আমি বললাম

-আমাদের #হঠাৎ_বিয়ে হয়েছে।

লেখিকা-শারমিন আঁচল নিপা

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *