একটু বেশিই অভিমানী পার্ট-০২

গল্পঃ- একটু বেশিই অভিমানী 💖
পার্ট -০২
#অদ্রিতআলমাসুদ


একটু বেশিই অভিমানী সকল পর্ব


.
—ম্যাডাম,আসব?(আমি)

—হ্যাঁ,আসেন।(ম্যাডাম)

—ম্যাডাম,আমার গত ছয়মাসের টাকাগুলো এখন লাগবে?

—কেন?

—আসলে ম্যাডাম,একটু আগে আমার একটা মেয়ে সন্তান হয়েছে।আপনি ত জানেনই সন্তান হলে কত খরচ করতে হয়।

—হ্যাঁ,আমি মেনেজার কে বলে দিচ্ছি সে তোমাকে তোমার টাকা দিয়ে দিবে।তার সাথে আরও কিছু টাকা বেশি দিয়ে দিবে।

—বেশি টাকা লাগবে না।শুধু আমার বেতন দিলেই হবে।

—আরে বেশি টাকাগুলো তোমার জন্য নয়।তোমার মেয়ের জন্য।তোমার মেয়েকে আমার হয়ে কিছু কিনে দিও।

—আচ্ছা।এখন তাহলে আমি আসি।

—আচ্ছা যাও।
.
তারপর আমি মেনেজারের কাছে থেকে টাকা নিয়ে বাড়িতে চলে গেলাম।সেখান গিয়ে আমি আমার জামা-কাপড় গুছিয়ে নিলাম।আমার দরকারি সকল কাগজপত্র নিয়ে নিলাম।
.
তারপর আমি কিছু সময় বসে দুইটা চিঠি লিখলাম।সবকিছু করে রাত ১১ টার পরে হাসপাতালে গেলাম।এত সময়ে মিশু আর কাকি ছাড়া হাসপাতালে আর কেউই নাই।
.
সবাই বাড়িতে চলে গেছে।আমি হাসপাতালে গিয়ে দেখি কাকি আর মিশু দুই জনেই ঘুমিয়ে পরেছে আর আমার মেয়েটা মিশুর পাশে শুয়ে রয়েছে।
.
আমি আস্তে আস্তে মিশুর কাছে গেলাম।সেখান থেকে আমি আমার মেয়েটাকে কোলে তোলে চিঠি দুইটা মিশুর পাশে রেখে চলে আসলাম এক অজানা ঠিকানায়।
.
সারারাত মা-বাবা আমাকে বাড়িতে না দেখতে পেয়ে ভোর হওয়ার একটু পরেই বাড়ির সবাই হাসপাতালে চলে আসল।মিশু আর কাকি এখনও ঘুম থেকে উঠেও নি।
.
বাড়ির সবার রুমে ডুকার শব্দ পেয়ে মিশু আর কাকি ঘুম থেকে উঠে গেল।মা মিশুর কাছে আসল।
.
—সাগর কি রাতে এখানে এসেছে?(মা)

—না।কেন?(মিশু)

—কালকে সারারাত সাগর বাড়িতে যায় নি।

—তাহলে কোথায় গিয়েছে?

—আমরা ত ভাবছিলাম হাসপাতালেই এসেছে।তাই ত এত ভোরে হাসপাতালে চলে আসলাম।

—কিন্তুু সাগর ত এখানে আসে নি।

—তাহলে ত আমাদের এখনই ওকে খুঁজতে হবে।কালকে যেভাবে কথা বলছিল মনে হয় ঐ ওর মেয়েটাকে নিয়ে কোথাও চলে যাবে।(বাবা)

—হ্যাঁ,আচ্ছা মিশু আমার নাতনি কোথায়?

—এই ত আমার পাশেই।

—দাও দেখি একটু।
.
মিশু যেই আমার মেয়েকে আনতে যাবে তখনই দেখতে পেল সেখানে আমার মেয়ে নেই।মিশু পাগলের মতো সম্পূর্ণ রুমে আমার মেয়েকে খুঁজতে লাগল।
.
—কি খুঁজছ বৌমা?(মা)

—আমার মেয়েকে।(মিশু)

—মানে?

—মানে আমার মেয়েকে আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

—কি বল এইসব?আমাদের নাতনি কোথায় যাবে?কালকে তুমি শুয়ার আগে ওকে কোথায় রেখেছিলে?

—আমি শুয়ার আগে ত ও আমার পাশেই ছিল।কিন্তুু এখন কোথাও নেই।

—কে নিবে ওকে?

—জানি না।কাকি আপনি কালকে কাউকে আমাদের রুমে আসতে দেখেছেন?

—না।(কাকি)

—তাহলে কোথায় গেল?

—মেয়েটা যেখানে ছিল সেখানে দুইটা চিঠি আছে মনে হচ্ছে।কি লেখা আছে দেখ ত।

—চিঠি দুইটা দেখে মনে হচ্ছে এইগুলো সাগর লিখেছে।একটা মার জন্য আর একটা মিশুর জন্য।(ভাইয়া)

—কি লেখা আছে একটু পড় ত।

—আচ্ছা।
.
প্রিয় মা,

তোমরা যখন চিঠি টা পড়বে তখন আমি আর আমার মেয়ে হয়ত তোমাদের কাছে থেকে অনেক দূরে চলে যাব।বিশ্বাস কর মা আমি তোমাদের কাছে থেকে কোথাও চলে যেতে চাই নি।কিন্তুু দিন দিন তোমাদের সবার অবহেলা আমি আর সহ্য করতে পারচ্ছিলাম না।জান মা বাবা যখন আমার শরীরে হাত তুল আমি বিশ্বাসই করতে পারচ্ছিলাম না বাবা আমাকে কখন মারতে পারবে।বাবা হিসেবে তার ছেলেকে মারতেই পারে।কিন্তুু বাবা যখন তোমাদের সবার সামনে বলেছিল আমি তোমাদের সবার জন্য মৃত তখন না আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল।মনে হচ্ছিল আমার শ্বাস আটকে যাচ্ছে।কিন্তুু দেখ তোমরা যে আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে আমি এখনও জানি না কি অপরাধে আমি শাস্তি পেলাম।বিশ্বাস কর মা আমি এমন কিছু কখনই করি নি যার জন্য তোমরা কষ্ট পাও।বাবা যখন আমাকে সেই কথাটা বলল তখনই তোমরা সবাই বাবাকে আটকালে না উল্টো বাবার সাথে মিলে আমাকে আরও বকলে।জান তখন না আমার মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল কিন্তুু কি করব বল আমি চাইনি আমার মতো আমার সন্তানও কষ্ট পাক।একমাত্র আমার সন্তানের জন্য আমি বেঁচে আছি।সেইদিন তোমাদের কাছে সময় চেয়েছিলাম।কারণ যাতে করে আমি আমার সন্তানকে নিয়ে কোথাও চলে যেতে পারি।দেখ আজকে আমি ঠিকই তোমাদের কাছে থেকে দূরে চলে এসেছি।কারণ আমি চাইনি আমি এতদিন যেই অবহেলা সহ্য করেছি আমার মেয়েটাও সেই অবহেলা পাক।আমি আমার মেয়েকে কিভাবে মানুষ করব জানি না।কিন্তুু এইটুকু বলতে পারি আমার মতো ওকে এমন অবহেলা পেতে দিব না।পারলে ক্ষমা করে দিও।

.
মার চিঠি পড়াশেষ হওয়ার পর মিশুর নিজের চিঠিটা পড়া শুরু করল।
.
মিশু,

আমি এখনও জানি না কোন দোষে আপনি আমাকে এত বড় শাস্তি দিয়েছেন।আমাদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হলেও বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে আমি আপনাকে অনেক ভালবেসে ফেলেছিলাম।এত ভালবেসে হয়ত অনেক বড় ভুল করেছিলাম তার জন্য ছয়মাস এত অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে।আপনি আমাকে অবহেলা করতেন এতে আমি তেমন কষ্ট পায় নি।কিন্তুু যখন আপনি আমার পরিবারকে আমার বিরুদ্ধে করে দিলেন তখন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম।পৃথিবীতে আমিই হয়ত প্রথম স্বামী যে কিনা তার স্ত্রীর পা ধরে তার সন্তানকে জন্ম দেওয়ার সময়টা চেয়েছে।সেইদিন যদি আমি আপনার পা না ধরতাম তাহলে হয়ত আমার মেয়েটা পৃথিবীর আলো দেখতেই পারত না।বলতে পারেন আমার মেয়েরার এমন কি ভুল ছিল যার জন্য মেয়েটার পৃথিবীর আলো দেখার পথ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন?হয়ত আপনার কাছে এর উওর নাই।আমার মেয়েটাকে জন্ম দেওয়ার জন্য আপনার ধন্যবাদ আর একটা কথা।আপনি আমাকে আমার পরিবারের কাছে থেকে দূর করেছেন সেইজন্য জীবনেও আমি আপনাকে ক্ষমা করব না।আপনি আমার মুখ দেখতে চেয়েছিলেন না।দেখেন আমি আমার কথা রেখেছি।সেইদিনের পর থেকে আপনার সামনে কখনও যায় নি।একমাত্র আপনার জন্যই সেই সকালে বাড়ি থেকে চলে আসতাম আর অনেক রাতে বাড়িতে যেতাম।আপনি আমার কাছে মুক্তি চেয়েছিলেন তাই না?আপনার মুক্তির কাগজ মানে আমাদের ডির্ভাস পেপার আমি বাড়িতে আপনার বিছানার পাশে রেখে এসেছি।

ইতি,
চরিএহীন সাগর
.
চিঠি দুইটা পড়ে বাড়ির সবাই কান্না করতে লাগল।
.
—মা,আমার মেয়েকে আমার কাছে এসে দেন।(মিশু)😭

—মিশু,এমন করে কান্না করিস না।এতে তোর শরীরের ক্ষতি হবে।কালকে মাএ তোর অপারশন হয়েছে।(মা)

—আমি জানি না আমার কাছে আমার মেয়েকে এনে দেন।আমি আমার মেয়েকে ছাড়া থাকতে পারব না।

—তুমি একটু সাগরকে খুঁজে দেখ না মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় গিয়েছে।

—আচ্ছা যাচ্ছি।(বাবা)

—বাবা,যেভাবেই হোক আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দেন।

—আচ্ছা,দিব।
.
বাবা আর ভাইয়া আমাকে খুঁজতে বের হয়ে গেল।কিন্তুু তত সময়ে আমি এই শহর থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি।অন্যদিকে আমি রাতে আমার মেয়েকে নিয়ে রেল স্টেশনে চলে আসি।
.
ট্রেন আসতে এখনও অনেক সময় বাকি আছে তাই আমি আমার মেয়েকে নিয়ে স্টেশনেই বসে রয়েছি।হঠাৎ করেই মেয়েটা কান্না করতে লাগল।
.
হয়ত খিদা লাগছে।তাই আমি তাড়াতাড়ি আমার ব্যাগ থেকে ফিটারে করে মেয়ের জন্য যে দুধ এনেছিলাম সেইগুলো খাওয়াতে লাগলাম।
.
দুধ মুখে যাওয়ার সাথে সাথে মেয়েটা কান্না করা বন্ধ করে দিল।আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে বসে দুধ খাওয়াচ্ছি।রাত দেখে আশেপাশে তেমন মানুষও নাই।
.
কিছু সময় পর দেখতে পেলাম একটি মেয়ে রেললাইন দিয়ে হাঁটছে।কিছু সময় যাওয়ার পর রেললাইনের উপর শুয়ে পড়ল।দেখে মনে হচ্ছে আত্মাহত্যা করতে এসেছে।
.
তাই আমি আমার মেয়েকে কোলে নিয়েই সেই মেয়েটার কাছে গেলাম।মেয়েটা এখনও এখানে শুয়ে আসে।আমার ট্রেন আসবে রাত ১:৩০ এ।এখন মাএ ১২:০০ টা বাজে।
.
—আপনি কি এখানে আত্মাহত্যা করতে এসেছেন?(আমি)

—হ্যাঁ।এতে আপনার কোন সমস্যা আছে?(মেয়েটি)
—না।আমার কি সমস্যা থাকবে?

—তাহলে জিজ্ঞাস করতে এসেছেন কেন?
—না।এমনি।আপনাকে একটা কথা বলতে আসলাম।
—কি?
—ট্রেন আসতে এখনও ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট বাকি আছে।
—কি কি কি?😱
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমি এত সময় কি করব?
—কিছু না মনে করলে এক কাজ করতে পারেন।
—কি?
—আপনি আত্মাহত্যা কেন করচ্ছেন সেইটা আমাকে বলে যেতে পারেন।এতে আপনার সময় কোথা দিয়ে যাবে আপনি জানবেনও না।
—বুদ্ধি টা ত খারাপ না।তাছাড়া আমি এখানে একা কত সময় বসে থাকব?
—তাহলে চলে সেখানে গিয়ে বসে আপনার গল্প শুনি।
—আচ্ছা চলেন।
.
যখনই সেখান থেকে আসতে যাব তখন আমার মেয়েটা আবার কান্না শুরু করতে লাগল।এইবার কেন কান্না করল বুঝতে পারলাম না।
.
আস্তে আস্তে মেয়েটা আরও বেশি করে কান্না করতে লাগল।আমার মেয়েটা কান্না করচ্ছে দেখে সেই মেয়েটা আমার মেয়েকে কোলে নিল।মেয়েটা কোলে নিতেই আমার মেয়ে কান্না করা বন্ধ করে দিল।
.
—মেয়েটা কি আপনার?(মেয়েটি)

—হ্যাঁ।(আমি)

—তাহলে এর মা কোথায়?

—ওর মা আমাদের সাথে থাকে না।

—কি বলচ্ছেন মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে কালকেই জন্ম নিয়েছে আর আপনি বলচ্ছেন মেয়ের মা আপনার সাথে থাকে না।নাকি আপনি মেয়েটাকে কোথাও থেকে চুরি করে এনেছেন?

—না না।এইটা সত্যিই আমার মেয়ে।

—তাহলে ওর মাকে নিয়ে আসেন।

—বললাম ত ওর মা আমাদের সাথে থাকে না।

—কেন?

—আগে আপনার গল্প শুনি তারপর নাহয় বলব কেন থাকে না।

—না আগে আপনি বলেন।নাহলে আমি পুলিশকে কল করব।

—আচ্ছা,আপনি বসেন আর ওকে আমার কাছে দেন তারপর বলচ্ছি।

—নেন।এখন বলেন।(আমার মেয়েকে আমার কোলে দিয়ে)

—তাহলে শুনুন।

—আচ্ছা,বলুন।
.
#চলবে

ভূল ত্রুটি মার্জনীয় ♥

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *